মরীচিকার সন্ধানে পর্ব – ১২

মরীচিকার সন্ধানে
পর্ব – ১২

সিরিয়ার পথে যাত্রা এবং শুরুর দিকের সময়টা মায়মুনা এক ধরণের ঘোরের মধ্যে ছিল। হেঁটে হেঁটে স্কুলে যাবার পথে এক জায়গা থেকে ওর জন্য ঠিক করে রাখা ট্যাক্সিতে ও উঠে যায়। তারপর সোজা গ্যাটউইক এয়ারপোর্ট। সেখানে একজন মধ্যবয়স্ক মহিলা ওর অপেক্ষায় ছিল। এয়ারপোর্টের সব ফর্মালিটিজের সময় ওই মহিলা মায়মুনার সাথেই ছিল। ওরা দুইজন একসাথেই প্লেনে বোর্ড করেছে। কিন্তু ইস্তানবুলে নামার পর সে মায়মুনার কাছ থেকে বিদায় নিয়ে চলে যায়। ইস্তানবুল এয়ারপোর্টে অবশ্য ওর জন্য আরেক ব্রাদার অপেক্ষায় ছিল। সেই লোকই মায়মুনাকে এয়ারপোর্টের কাছের সেই বাস স্টপে পৌঁছে দিয়ে যায়। যাবার সময় ওর পুরোনো মোবাইলটা ওর কাছ থেকে নিয়ে ওকে ডাটা সহকারে একটা নতুন মোবাইল ফোন দিয়ে যায়। সেই ফোনে ইতিমধ্যে হোয়াটস্যাপ একাউন্ট ইন্সটল করা ছিল। মায়মুনা বাস স্টপে পৌঁছেই দেখে যে আসমা আর লীনা ইতিমধ্যে সেখানে পৌঁছে গিয়েছে। ওরা তো সবাই সবার ছবি দেখেছে হোয়াটস্যাপে। তাই চিনতে একটুও অসুবিধা হয়নি। বুঝাই যাচ্ছিলো যে তিনজন তিনজনকে দেখে ভীষণ উত্তেজিত ছিল কিন্তু অনেক কষ্টে ওদের উত্তেজনা চেপে রাখতে হয়েছিল। এমনকি সেই মুহূর্তে কেউ কারো সাথে কথা পর্যন্ত বলতে পারেনি। নির্দেশনা অনুসারে সবাই সবাইকে না চেনার ভাব করে বসেছিল। ইতিমধ্যে এই তিনজন মেয়ে আর অপরিচিত তিনচারজনের একটা আলাদা হোয়াটস্যাপ গ্রুপ খোলা হয়। সেখানেই ওদেরকে সব নির্দেশ দেওয়া হচ্ছিলো। সেই বাস স্টপে বসে ওরা একজন আরেকজনের সাথে মেসেজ চালাচালি করেই কথা বলছিলো। সে কী এক ভীষণ উত্তেজনা সবার মধ্যে। ওদের এই জীবনে যে এত উত্তেজনাকর মুহূর্ত আসতে পারে এই কয়েকমাস আগেও তা কল্পনার অতীত ছিল। সবই আল্লাহর ইচ্ছা, সবই আসলে আল্লাহর রহমত। তারপর যথাসময়ে বাস চলে আসলে বেশ কয়েকঘন্টা জার্নি করে ওরা মনেহয় বর্ডারের কাছে এক জায়গায় পৌঁছে যায়। সেখানও ওদের জন্য লোক অপেক্ষায় ছিল। সেখানে ওদেরকে আবায়া আর নিকাব পরিয়ে একটা ছোটোখাটো মিনিবাসে করে নিয়ে সোজা রাকাতে একটা গেস্টহাউজে উঠানো হয়। সেই জার্নিটা ছিল ওদের জীবনের সবচেয়ে স্মরণীয় যাত্রা। শুধুমাত্র তিনজন প্রিয় সিস্টার একসাথে সাথে যাত্রা করতে পেরেছে তা না, ওরা আল্লাহর পথে যাত্রা করেছে। কিন্তু সবচেয়ে বেশি উত্তেজনাকর ব্যাপার যেটা ছিল সেটা হলো পুরোটা সময় কেমন যেন ভীতি বা আশঙ্কার মধ্যে ছিল সবাই। এই বোধহয় কেউ ওদের আটকে দিলো, এই বোধহয় ওরা ধরা পড়ে গেলো। মায়মুনা গতবছর এক থিম পার্কে ভয়ঙ্কর এক রোলার কোষ্টারে উঠেছিল। ওর মনে হয়েছিল ওর জানটা হাতে নিয়ে রোলার কোস্টারে যাত্রা করছে। এই যাত্রা সেই রোলার কোস্টারের থেকেও ভয়ঙ্কর উত্তেজনার।

সেই গেস্টহাউজে পৌঁছনোর পরও ওদের জীবনে উত্তেজনার কোনো কমতি হয়নি। রাকা শহরে ছড়ানো ছিটানো অনেকগুলো মেয়েদের গেস্টহাউজ আছে। কিন্তু সেই গেস্টহাউজের আবার নানান লেভেল। দেশ, অর্থ, বিত্ত, ক্ষমতা, প্রতিপত্তি অনুসারে সেই গেস্টহাউজের মান এবং মর্যাদা। হোটেলের তারকার মতো গেস্টহাউজগুলোর রেটিং। যদিও অঘোষিত তারপরও সবাই জানে। সবচেয়ে ভালো গেস্টহাউজগুলো মোটামুটি সৌদি আর কিছু আরব দেশের দখলে। কারণ ওদের তো অর্থের অভাব নাই। সৌদিরা যেখানে যায় সেখানেই টাকাপয়সা আকাশে উড়তে থাকে। তা লন্ডনের হ্যারোডস শপিং মলই হোক আর রাকার যুদ্ধবিধস্ত গেস্টহাউজই হোক। তবে সৌদিদের মতো টাকা পয়সা উড়াতে না পারলেও পশ্চিমের দেশের মেয়েদেরও এই টপ রেটেড গেস্টহাউজে জায়গা হয়। নর্থ আমেরিকা, ক্যানাডা, ইউকে, অস্ট্রেলিয়া, ইউরোপ থেকে আগত মেয়েদের অনেক খাতির এখানে। তবে এদের মধ্যেও ভেদাভেদ আছে। একজন সাদা ব্রিটিশ মুসলিমের স্থান, মায়মুনার মতো দক্ষিণ এশীয় ব্রিটিশ মুসলিমের উপরে। এইসব নিয়ে অবশ্য এই তিন কিশোরীর তেমন কোনো দৃকপাতই ছিলোনা। যদিও যুদ্ধবিদ্ধস্ত শহর, তারপরও তাদেরকে মোটামুটি সবচেয়ে ভালো গেস্টহাউজেই উঠানো হয়েছে। এতেই ওরা অনেক খুশি ছিল। যদিও মায়মুনা জানতোনা যে ইতিমধ্যে ওকে নিয়ে ইংল্যান্ডে তোলপাড় হয়ে গিয়েছে, কিন্তু ও বুঝতে পারছিলো যে ওকে একটু বিশেষ খাতির করা হচ্ছে। গেস্টহাউজ চালনার দায়িত্ব যেই মহিলাদের এরা প্রত্যেকে সাংঘাতিক রিসোর্সফুল মহিলা। পুরো আই সিস বাহিনীর নেটওয়ার্কের সাথে ওদের নিত্য সংযোগ।

ওদের তিনজনের জন্য একটা বিশাল রুম বরাদ্দ করা হয়েছিল। ওদের রুমের সাথে অ্যাটাচ বাথরুমও ছিল। ওদেরকে গেস্টহাউজের নিয়মকানুন বুঝিয়ে দিয়ে বলা হয়েছিল যে ওদের জন্য ইতিমধ্যে উপযুক্ত পাত্র ঠিক করে রাখা হয়েছে। ওদের কোনো আপত্তি না থাকলে দুতিনদিনের মধ্যেই ওদের বিয়ের ব্যবস্থা করা হবে যাতে করে তাড়াতাড়ি ওরা সুন্দর জীবন শুরু করতে পারে। ওদের তিনজনেরই পাত্রের ব্যাপারে কিছু পছন্দ অপছন্দ ছিল , সেটা ওরা আগেই জানিয়ে রেখেছিলো। তারপরও তিনজনই পাত্র সম্পর্কে আরেকটু বিস্তারিত জানতে চেয়েছিলো। যেই সিস্টার ওদের সাথে কথা বলছিলো সে ওদের হাবভাব দেখে না হেসে পারেনি। তারপর বলেছিলো,

– ঠিক আছে। দেখি তোমাদের পাত্র দেখানোর ব্যবস্থা করতে পারি নাকি। তোমরা পাত্র পছন্দ করলেই বিয়ে করবে। না করলে নাই। এখানে তোমাদের জন্য পাত্রের কোনো অভাব হবেনা।

পুরো ব্যাপারটাই ওদের কাছে ভীষণ উত্তেজনাকর মনে হয়েছিলো। লোকে বলে ইসলাম ধর্মে নাকি মেয়েদের পছন্দ অপছন্দের কোনো মূল্য নাই অথচ এখানে ছেলেরা পাত্রী দেখবেনা বরং ওরাই পাত্র দেখে পছন্দ করবে।

পরের দিন রাতেই ওদের পাত্র দেখার ব্যবস্থা করা হয়েছিল। কিন্তু মায়মুনার বেলায় একটু সমস্যা বেঁধেছিলো। মায়মুনা ইউরোপিয়ান ছাড়া বিয়ে করতে চায়নি এবং সেই অনুসারে ওর জন্য একজন ঠিক করে রাখা হয়েছিল। কিন্তু এক ক্ষমতাবান সৌদি মায়মুনাকে বিয়ে করার জন্য অস্থির হয়ে উঠে। সম্ভবত বিশ্বব্যাপী মায়মুনার খবর শুনে সেই লোকের মনে হয়েছে মায়মুনাকে বিয়ে করতে পারলে তার ক্ষমতা আর প্রচার বাড়বে। কেন সেই লোক মায়মুনাকে বিয়ে করতে চায় তা অবশ্য কেউ বলেনি। শুধু মায়মুনাকে সেই লোককে বিয়ে করার জন্য অনুরোধ করা হয়েছিল। তাকে বিয়ে করলে মায়মুনা নাকি শহরের সবচেয়ে সুন্দর একটা এপার্টমেন্টে সংসার করতে পারবে। তার আগের একজন স্ত্রী ছিল কিন্তু সে তার সাথে সিরিয়ার আসতে রাজি হয়নি। তাই সেই লোক আপাতত সিঙ্গেল।

গেস্ট হাউজের সিস্টার বলেছিলো যে বিয়ে তো পরের কথা। সেই লোকের সাথে তো দেখা করতে অসুবিধা নাই। কিন্তু মায়মুনা শুরুতেই অসম্মতি জানিয়ে দেয়। ওকে অবশ্য এই নিয়ে বেশি জোরাজুরি করা হয়না। মায়মুনার ধারণা ব্রাদার তৌফিক মায়মুনার মনের ভাব বুঝতে পেরে সব ব্যবস্থা করে দেয়। অবশেষে সতেরো বছরের ব্রিটিশ ইব্রাহিমের সাথে মায়মুনার বিয়ে হয়। মায়মুনার ইব্রাহিমকে দেখে মনে হয়েছিলো রূপকথার রাজকুমার। ইব্রাহিম সাদা ইংলিশ ছেলে। কট্টর খ্রিষ্টান পরিবারে ওর জন্ম। সিরিয়া আসার মাত্র একমাস আগে ও ধর্ম পরিবর্তন করে মুসলিম হয়। ইংল্যান্ডে অনেক বখে যাওয়া ছেলেদের অথবা আসামী ছেলেদের জেলে বুঝিয়ে শুনিয়ে ইসলাম ধর্মে উদ্বুগ্ধ করা হয়। কিন্তু ইব্রাহিম একদম ভালো পরিবারের সাধারণ ছেলে ছিল। কিন্তু ধর্মান্তরের পর ওর ধর্মের প্রতি আনুগত্য, একনিষ্ঠতা যেন সবাইকে ছাড়িয়ে গেছে। ওর মতো দুঃসাহসী এবং বেপরোয়া যোদ্ধা সেই গ্ৰুপে আর একজনও ছিলোনা। আর মায়মুনার কী ভাগ্য। সেই ইব্রাহিমের সাথেই ওর বিয়ের সুযোগ হয়ে যায়।

পাত্র দেখাদেখির ব্যাপারটাও ভীষণ চমকপ্রদ ব্যাপার। গেস্টহাউজে বিয়ে পড়ানো আর পাত্র দেখার জন্য আলাদা একটা রুম আছে। সেখানে ইব্রাহিম এসে বসেছিল। ওর সাথে আরো কয়েকজন ব্রাদার ছিল কিন্তু ওরা আরেক রুমে অপেক্ষা করছিলো। পাত্র পাত্রী দেখাদেখির সময় মায়মুনার সাথে গেস্টহাউজের কয়েকজন সিস্টার সাথে ছিল। তারা অবশ্য ইব্রাহিমের সামনে তাদের নিকাব খুলেনি।

মায়মুনা ওর নিকাব উঠিয়ে ইব্রাহিমের দিকে তাকানো মাত্র ইব্রাহিম চোখ নামিয়ে নেয়। মায়মুনা যদিও ইব্রাহিমের দিকে তাকিয়ে ছিল কিন্তু ও কিছুই ঠিক দেখতে পারছিলোনা। ওর বুকের মধ্যে এমন ড্রাম বেজে যাচ্ছিলো যে ওর কিছু দেখা বা বুঝার ক্ষমতা ছিলোনা।

ইব্রাহিম লাজুক ভঙ্গিতে মায়মুনার দিকে একনজর তাকিয়ে বলেছিলো,

– আর ইউ রেডি ফর দ্য জার্নি? আমার হাত ধরে এই যাত্রা করতে তুমি রাজি?

মায়মুনা ঘোরের মধ্যে শুধু মাথা নেড়ে হ্যাঁ বলেছিলো। ও এমনই ঘোরের মধ্যে ছিল যে তারপর কী হয়েছিল ওর ঠিকমতো সব মনে নাই। ও রাজি হবার সাথে সাথেই আলহামদুলিল্লাহ বলে এক সিস্টার ওর নিকাব নামিয়ে দেয়। সেই ঘরে আরো কয়েকজন লোক মহিলা এসে ভরে যায়। সেখানে ব্রাদার তৌফিকও ছিল। অল্প সময়ের মধ্যেই ওদের বিয়ে পড়ানোর কাজ শেষ হয়ে যায় আর তার আধঘন্টার মধ্যে মায়মুনা আর ইব্রাহিমকে একটা ভাঙা ধরধরা গাড়িতে উঠিয়ে দেওয়া হয়।
গাড়িতে পাশাপাশি ইব্রাহিম আর মায়মুনা বসে ছিল। মায়মুনা যতটা নার্ভাস ছিল, ইব্রাহিম মনেহয় তার চেয়েও বেশি নার্ভাস ছিল। কেউ কোনো কথা বলেনি। কিন্তু তারপরও যাত্রাটা উপভোগ করছিলো দুইজনে। রাস্তায় ইব্রাহিম শুধু কয়েকবার জিজ্ঞেস করেছিল যে মায়মুনা ঠিক আছে নাকি। মায়মুনা মাথা নেড়ে শুধু হ্যাঁ বলেছিলো।

ওদের সংসার শুরু হয় এক বেডের ছোট একটা ফ্ল্যাটে। যুদ্ধের চিহ্ন সেই ফ্ল্যাটেও সুস্পষ্ট। বিল্ডিংয়ের দুইএকজায়গা একটু ভেঙে গেছে, যদিও সেরকম কিছুনা। অনায়াসে মানুষজন বাস করতে পারে। সেই ফ্ল্যাটে মোটামুটি আট -দশ পরিবারের বসবাস। বেশিরভাগ পরিবারেই ছোট বাচ্চা আছে। মায়মুনারও শখ ওদের বাসাতেও শীঘ্রই একটা বাচ্চা আসবে। ইব্রাহিমকে কথাটা বলেছিলোও মায়মুনা। ইব্রাহিমের কোনো আপত্তি নাই কিন্তু ওদের উপর নাকি এই মুহূর্তে ভিন্ন নির্দেশ আছে। যারা ফ্রন্টলাইনে যুদ্ধ করছে বা সুইসাইড মিশনের জন্য তৈরি হচ্ছে, তারা যেন স্ত্রীদের প্রেগন্যান্ট না করে। পরবর্তীতে বাচ্চা সহ বিধবাদের বিয়ে দিতে নাকি সমস্যা হয়। ওদেরকে একারণে প্রচুর পরিমানে গর্ভনিরোধক পিল এবং কনডম বরাদ্দ করা হয়। এসব কথা মায়মুনা শুনতে চায়না। এসব কথা শুনলে মায়মুনার বুক কেঁপে উঠে। মায়মুনার মনেহয় ইব্রাহিম সব দিক থেকে একদম পারফেক্ট। কিন্তু অতিরিক্ত বেপরোয়া, অতিরিক্ত সাহস। ওর বয়স অল্প। ও একজন ডেডিকেটেড মুসলিম। ইব্রাহিম খিলাফতের জন্য অনেক কাজ করতে পারবে। ওকে তো নিশ্চয়ই এত তাড়াতাড়ি সুইসাইড মিশনে পাঠানো হবেনা।

ইব্রাহিম বেশিরভাগ সময়ই বাইরে থাকতো। মাঝে মাঝে কাজের কারণে রাতেও ফিরতে পারতোনা। মায়মুনার হাতে সারাদিন সীমাহীন সময়। তারপরও ওর খারাপ লাগতোনা। ছোট্ট ফ্ল্যাটটা ধুয়ে মুছে পরিষ্কার করে রাখতো, নিজে নিজে আপন মনের মাধুরী মিশিয়ে জগাখিচুড়ি এটা ওটা রান্না করতো আর বেশিরভাগ সময় ইব্রাহিমের চিন্তা করেই কাটিয়ে দিতো। মায়মুনার একা একা বাইরে যাওয়া নিষেধ ছিল। ইব্রাহিমকে বাজারের লিস্ট দিয়ে দিলে একলোক সেই বাজার করে বাসায় নামিয়ে দিতো। তারপরও মায়মুনার মাঝে মাঝে ভীষণ একাকীত্ব পেয়ে বসতো।

কোনো এক কারণে ফ্ল্যাটে যারা থাকতো তারা কেউ কারো সাথে মন খুলে কথা বলতোনা। সবাই কেমন যেন ভয়ে ভয়ে থাকতো। সবাই অকারণে সবাইকে কী নিয়ে যেন সন্দেহ করতো। চা, চিনি, প্যারাসিটামল এধরণের এইটা ঐটা চাওয়া ছাড়া কেউ কারো সাথে পারতপক্ষে কোনো কথা বলতোনা। সেই সময় থেকেই মায়মুনা ওর মা, বাবা, ভাই, বোনকে খুব মিস করা শুরু করে। ওদের একটু গলা শুনার জন্য ওর জানটা একেবারে ছটফট করতে থাকে। বিয়ের পর মায়মুনার আর ফোন ছিলোনা। অবশ্য হোয়াটস্যাপ বা সোশ্যাল মিডিয়ায় সিস্টারদের মোটিভেট করতে চাইলে কাছের মসজিদে গিয়ে সিস্টারদের অফিসের কম্পিউটার ব্যবহার করা যেত। এছাড়া আর কোনো কাজে মোবাইল বা ইন্টারনেট ব্যবহার করা মায়মুনাদের মতো গৃহিণীদের জন্য নিষেধ ছিল।

ইব্রাহিম বেপরোয়া হলে কী হবে, ওর মায়মুনার জন্য অনেক মায়া ছিল। ইব্রাহিমকে এই মন খারাপের কথা বলার পর ও মায়মুনাকে ওর মোবাইলটা ব্যবহার করতে দিয়েছিলো। ওকে বলেছিলো,

– তুমি ফোন করে তোমার মায়ের গলা শুনতে পারো। কিন্তু খবরদার কোনো কথা বলো না। ধরা পড়লে কিন্তু তুমি আর আমি দুইজনই মারা পড়বো।

এরপর থেকে প্রতি রাতের বেলা খাবারের পর মায়মুনা যাতে মায়ের গলা শুনতে পারে সেকারণে ইব্রাহিম ওকে ফোন করে দিতো। মায়মুনা কিছুক্ষনের জন্য কানে ফোন ধরে বসে থাকতো। মায়ের গলা শুনে ওর দুচোখ দিয়েই এমনি এমনিই জল গড়িয়ে পড়তো। আর পাশেই ওকে গভীরভাবে জড়িয়ে ধরে বসে থাকতো ইব্রাহিম।

কেন ইব্রাহিম এই কাজটা করতে দিতো? ও তো সব ব্যাপারে ভীষণ অনুগত। নিয়মের কোনো এদিক ওদিক হতে দিতোনা। তাহলে কি ইব্রাহিমও ওর মাকে অনেক মিস করতো? আর তাই মায়মুনার কষ্টটা উপলব্ধি করতে পেরেছে? নাকি ও মায়মুনাকে ভীষণ ভালোবাসতো। তাই মায়মুনার জন্য নিষেধ অমান্য করতে ওর বাধেনি? যদি মায়মুনাকে ও ভালোবেসেই থাকে তাহলে এত তাড়াতাড়ি ওকে ছেড়ে চলে যাবার জন্য অস্থির হয়ে উঠলো কেন?

ইব্রাহিমের মিশনের সবকিছু যখন ফাইনাল হয়ে গেলো, মায়মুনা পাগলের মতো কান্নাকাটি করে ইব্রাহিমকে আটকাতে চেয়েছিলো। এমনকি ও চলে গেলে মায়মুনা আত্মহত্যা করবে সেই হুমকিও ও দিয়েছিলো। কিন্তু কিছুই কাজে দেয়নি। ইব্রাহিম ছিল ওর সুইসাইড মিশনে, ওর লক্ষ্যে অটল। যাবার আগে বলে গিয়েছিল,

– মায়মুনা, চললাম আমি স্বর্গের সন্ধানে। তবে এই জীবনেও আমি স্বর্গ লাভ করেছি। সেই স্বর্গে পৌঁছনোর প্রস্তুতি হিসেবে আল্লাহ আমাকে স্বর্গের কিছুটা স্বাদ উপলব্ধি করার সুযোগ এই জীবনেও দিয়েছেন। আল্লাহ তোমাকে দিয়েছেন। আই অ্যাম গ্রেটফুল টু হিম। ভালো থেকো।

(চলবে)
©আমিনা তাবাস্সুম

(হঠাৎ করেই একটু ব্যস্ততা বেড়ে যাবার কারণে লেখাটা মন দিয়ে লিখতে পারছিনা। কোনো ভুলত্রুটি থাকলে ধরিয়ে দিবেন প্লিজ। ধন্যবাদ)

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here