মরীচিকার সন্ধানে পর্ব – ১৭

মরীচিকার সন্ধানে
পর্ব – ১৭

আজকে ফেব্রুয়ারির পাঁচ তারিখ। মায়মুনার আসলেই পেট ব্যথা করছে। চিনচিনে একটা ব্যথা। এটা কি টেনশনের ব্যথা নাকি খিদার ব্যথা মায়মুনা ঠিক বুঝতে পারছেনা। ওর অনেক খিদাও পেয়েছে। গতদুইদিন ধরে খুবই অল্প খেয়ে আছে ও। কী করবে? পেটে ব্যথার কথা বলে তো আর গপাগপ সবকিছু খেয়ে ফেলতে পারেনা মায়মুনা। তাই পেটে ব্যথার ব্যাপারটা সবার কাছে বিশ্বাসযোগ্য করে তোলার জন্য ভাব করতে হয়েছে যে ও কিছু খেতে পারছেনা। কিন্তু মায়মুনা খিদায় একেবারে অস্থির হয়ে আছে।

এই দুইদিন অসুস্থতার কারণে ওকে গেস্ট হাউজের কোনো কাজ করতে দেওয়া হয়নি। সিস্টার মাইশা ডাক্তার দেখানোর কথা বলেছিলেন। মায়মুনা রাজি হয়নি। ও বলেছে যে একটু রেস্ট নিলেই মনেহয় ভালো হয়ে যাবে। সিস্টার মাইশা আর জোরাজুরি করেনি। মায়মুনার এখন মনে হচ্ছে অকারণে সারাটাদিন শুয়ে থাকার মতো কষ্টকর আর কিছু নাই। শুয়ে শুয়ে ওর মাথায় নানান চিন্তা ঘুরছে। ওর জীবনটা যেন ওর চোখের সামনে বার বার ভেসে উঠছে। ওর মনে হচ্ছে সবই তো ঠিকমতো চলছিলো। এখানে আসা, ইব্রাহিমের সাথে বিয়ে, ক্ষনিকের সংসার এই পর্যন্ত তো সব ঠিকই ছিল। এই জীবনের জন্যই তো ও এখানে এসেছিলো। কেউতো ওকে ভুল বুঝিয়ে আনেনি, ধোঁকা দেয়নি, ব্রেইনওয়াশ করেনি। কিন্তু ইব্রাহিমের এরকম হিরো সেজে এত তাড়াতাড়ি চলে যাওয়াটাই তো সবকিছু ওলোটপালোট করে দিলো। ওর মনে হচ্ছে ব্রেইনওয়াশ করা হয়েছে আসলে ইব্রাহিমকে। তা না হলে ইসলামের জন্য ও কত কাজ করে যেতে পারতো। আর মায়মুনাও ওর সাথে থাকতে পারতো। কিন্তু তা না। কী বুঝে ও এত তাড়াতাড়ি নিজেকে শেষ করে দিলো? মায়মুনার হঠাৎ করেই ইব্রাহিমের উপর ভীষণ অভিমান হচ্ছে। তারপর আবার ওর নিজের উপর রাগ হচ্ছে।

এসব কী অলুক্ষুনে কথা চিন্তা করছে ও? হায়াত মউত তো সব আল্লাহর হাতে। মায়মুনা কি অবিশ্বাসী হয়ে যাচ্ছে। নিশ্চয়ই। তা না হলে ওর মনের মধ্যে এত পরিতাপ, এত আফসোস কেন? কোথায়, লীনা তো এমনভাবে চিন্তা করছেনা। মায়মুনার সেই কুরআনের আয়াতটার কথা মনে পড়ে গেলো ….

হে মু’মিনগণ! তোমরা তাদের মত হয়ো না, যারা কুফরী করে এবং তাদের ভাই-বন্ধুগণ যখন বিদেশে সফর করে কিংবা কোথাও যুদ্ধে লিপ্ত হয় তাদের সম্বন্ধে বলে, ‘তারা আমাদের কাছে থাকলে মরত না, নিহতও হত না । ফলে আল্লাহ এটিকে তাদের মনের অনুতাপে পরিণত করে দেন, বস্তুতঃ আল্লাহ্ই জীবিত করেন ও মৃত্যুদান করেন আর তোমরা যা কিছু কর, আল্লাহ তার সম্যক দ্রষ্টা। (সূরা আল ইমরান: আয়াত ১৫৬)

তাহলে কি আল্লাহ ওর সবকিছু অনুতাপে পরিণত করে দিচ্ছে? হোয়াটস্যাপ গ্ৰুপে তো প্রতিদিন এই আয়াতটা নিয়ে আলোচনা হতো। তারপরও মায়মুনার বার বার মনে হচ্ছে ইব্রাহিম এত তাড়াতাড়ি কেন চলে গেলো। আর কিছুদিন কাজ করে যেতে পারতো তো ও। মায়মুনা বিছানায় শুয়ে শুয়ে ছটফট করছে। ওর মনেহচ্ছে কুরআনের এই আয়াতটা সম্পর্কে ওর একটু ভালোভাবে জানা দরকার। এই আয়াতটায় আসলে কী বুঝানো হচ্ছে? আগে প্রতিদিন আলোচনা করেও এটা নিয়ে বেশি কিছু জানার প্রয়োজন বোধ করেনি ও। তাছাড়া শুধু ওদের গ্ৰুপ না, ওদের মতো যারা সব ছেড়ে এই পথে পা বাড়িয়েছে তাদের অনেকেই এই আয়াতটাকে সযতনে বুকের ভিতর লালন করে এসেছে। তা না হলে এভাবে জীবন দেওয়া এত সহজ? মায়মুনা হঠাৎ করেই ওর মোবাইল আর ইন্টারনেট খুব মিস করছে। ইন্টারনেট থাকলে সবকিছু একটু ঘেটে দেখতে পারতো। আবার পর মুহূর্তে ওর মনে হচ্ছে ইন্টারনেট না থাকাই ভালো। বেশি জানলে ওর মাথা খারাপ হয়ে যাবে। ও আর কিছু জানতে চায়না। কিচ্ছু না। ওর অনেক খিদা পেয়েছে। ও শুধু মায়ের কাছে গিয়ে একটু ভালোমন্দ খেতে চায়। কতদিন ও পেট ভরে আরাম করে কিছু খায়নি। মা নিশ্চয়ই ওর জন্য টেবিল ভরে রান্না করে রাখবে। আর ফাতিমা, আমিনা, ইব্রাহিম? ওরা মায়মুনাকে দেখে কী করবে? ওদের কি মায়মুনার উপর রাগ, ঘৃণা, অভিমান আছে? তা কী করে সম্ভব। ওরা তো মায়মুনাকে পাগলের মতো ভালোবাসে। আপু ঠিক করলেও ওদের কাছে আপু ভালো আর আপু দোষ করলেও ওদের কাছে আপু ভালো। ওরা ওদের আপুর ব্যাপারে একেবারে অন্ধ। কিন্তু মায়মুনা? ও কি ওদের ব্যাপারে অন্ধ? ও কিভাবে এত অনায়াসেই ওদের ছেড়ে চলে এলো। এক মুহূর্তের জন্যও তো ওর বাধেনি। ও কি এখন অনুতপ্ত? মায়মুনা আসলে জানেনা। মায়মুনা জানতেও চায়না। ও শুধু মায়ের কাছে গিয়ে ভালো মন্দ দুটা খেতে চায়। মায়মুনা আর কিছু চায়না। এই চাওয়া টা কি পাপ? এই চাওয়াটা কি গুনাহ?

মায়মুনার দুই চোখ দিয়ে অঝোর ধারায় পানি গড়িয়ে পড়ছে।

এই সময় হঠাৎ ওর কপালে একটা হাত টের পেলো। কোনো রকমে চোখ খুলে দেখে যে ওর মুখের সামনে মা ঝুঁকে আছে। মাথায় হাত দিয়ে ওকে জিজ্ঞেস করছে,

– পেটের ব্যথাটা কি খুব বেশি?

মায়মুনা ঝাপসা চোখে মাকে দেখছে। মায়ের গায়ের গন্ধটা ওর নাকে লাগছে। ও আরামে আবার চোখটা বন্ধ করে ফেললো। আহ, কী শান্তি। এখন আর মায়মুনাকে খাবারের চিন্তা করতে হবেনা। আরামে চোখটা আবার বন্ধ হয়ে যেতেই ও খেয়াল করলো যে মা একটু জোরে গায়ে ধাক্কা দিয়ে উঠানোর চেষ্টা করছে। ধাক্কা দিয়ে বলছে,

– মায়মুনা, মায়মুনা, তোমার শরীরটা কি বেশি খারাপ? হাসপাতালে নেবার ব্যবস্থা করবো নাকি?

হঠাৎ এত জোরে ধাক্কা খেয়ে মায়মুনা ধড়ফড় করে উঠে পড়লো। উঠে দেখে সিস্টার মাইশা চিন্তিত মুখ করে ওর উপর ঝুকে আছে। কয়েকমুহূর্ত একটু চিন্তা করে নিলো মায়মুনা। ওর মাথার মধ্যে এখন ঘুরপাক খাচ্ছে যে আজ ফেব্রুয়ারি মাসের পাঁচ তারিখ। আজকে ও মায়ের কাছে ফিরে যাবে। কথাটা মনে হতেই মায়মুনা পেটটা চেপে ধরে আবার শুয়ে পড়ে বলে উঠলো,

– পেটের ব্যাথাটা আর সহ্য করতে পারছিনা সিস্টার।

– কয়েকদিন তো হয়ে গেলো। ব্যথাটা তো কমছেই না, বরং বেড়েই চলছে। তুমি কি কষ্ট করে আবায়া আর নিকাবটা পরে নিতে পারবে? আমি তোমাকে হাসপাতালে নেবার জন্য একটা গাড়ির ব্যবস্থা করার চেষ্টা করছি।

মায়মুনা কোনোরকমে মাথা নেড়ে হ্যাঁ জানালো। সিস্টার মাইশা আলতো করে মায়মুনার মাথায় হাত বুলিয়ে নিচে চলে গেলো।

সিস্টার মাইশার ব্যাপারটা মায়মুনা ঠিক বুঝতে পারছেনা। কিন্তু এইটুকু ও ঠিকই বুঝেছে যে উনি মায়মুনার অনেক কিছুই টের পেয়ে গেছে। কিন্তু কোনো এক বিশেষ কারণে মায়মুনাকে ধরছেনা। ওর সিস্টার মাইশাকে দেখলেই এখন হাত পা ঠান্ডা হয়ে যায়। ওর মনেহয় উনি উপযুক্ত মুহূর্ত খুঁজছেন। একদম সঠিক মুহূর্তে মায়মুনাকে উনি ধরে ফেলবেন।

সেইদিন বাথরুম থেকে বের হয়ে সিস্টার মাইশার মুখোমুখি পড়ে মায়মুনা ঘাবড়ে গিয়ে কোনো কথারই ঠিকঠাক উত্তর দিতে পারেনি। কোনোরকমে বলে উঠেছিল যে ওর এত পেটে ব্যথা করছে যে দরজা নক করার আওয়াজ শুনেও ও উত্তর দিতে পারেনি। কিন্তু সিস্টার মাইশার সন্দেহ মিশ্রিত দৃষ্টি দেখে মনে হয়েছে যে উনি মায়মুনার কথা এক বিন্দুও বিশ্বাস করেনি। উনি চাইলেই মায়মুনাকে সার্চ করে দেখতে পারতো। এরকম মেয়েদের সন্দেহ করা হলে প্রায়ই গেস্টহাউজের সিস্টাররা সার্চ করে থাকে। কিন্তু সিস্টার মাইশা সেরকম কিছুই করেনি। রক্ত হিম করা দৃষ্টি দিয়ে বলেছিলেন,

– যাও রুমে গিয়ে রেস্ট নাও। পেটে ব্যথা বেশি বেড়ে গেলে জানাবে।

সেই দিনের পর থেকেই মায়মুনা হালকা পাতলা পেটে ব্যথার অভিযোগ করে যাচ্ছে। গতদুইদিন ধরে ভাব করছে ব্যথাটা বেড়ে যাচ্ছে। আর আজকে তো একেবারে চরম পর্যায়ে চলে গেছে। মায়মুনা বিছানা থেকে সন্তর্পনে উঠে ধীরে ধীরে ওর আবায়াটা পরে নিলো। আবায়ার ভিতরে ইতিমধ্যে সেলাই করে ওর পাসপোর্ট আর সেই মোবাইলটা রেখে দিয়েছিলো। আর কিছু সাথে নিচ্ছেনা মায়মুনা। সাথে বেশি জিনিস নিয়ে অহেতুক সবার সন্দেহ বাড়ানো। এমনকি মোবাইলের চার্জারটাও ও নেয়নি। শুধু মোবাইলটা পুরো চার্জ করে নিয়েছে। হাসপাতাল থেকে বেরিয়ে বাবা মায়ের লোকদের কাছে পৌঁছে গেলে ওদের মোবাইলই তো নিশ্চয়ই ব্যবহার করতে পারবে।

মায়মুনা মাটিতে বসে পেটে ব্যথার ভান করে আস্তে আস্তে নিকাবটা পরে নিতেই সিস্টার মাইশা আবার রুমে এসে হাজির। মায়মুনাকে দেখে বললো,

– কী রেডি তুমি?

– হু।

– তোমার ভাগ্য ভালো। খুব সহজেই হাসপাতালে যাবার জন্য গাড়ি জোগাড় হয়ে গেলো। কিন্তু তোমাকে একাই যেতে হবে। আমি তো রিসেপশন ছেড়ে যেতে পারবোনা আর আমার মনেহয় তোমার সাথে আর কারো না যাওয়াই ভালো। ড্রাইভার লোকটা তোমাকে হাসপাতালে ঠিক মেয়েদের সেকশনে পৌঁছে দিবে। সেখানে ডাক্তার রাবেয়া তোমার অপেক্ষায় থাকবে। আশাকরি এইটুকু যেতে পারবে তুমি। তাইনা?

সিস্টার রাবেয়ার কথা শুনে মায়মুনার হৃদস্পন্দন একেবারে বন্ধ হয়ে গেলো। তার মানে সিস্টার মাইশা সবকিছু জানে? নাকি এমনিই ওকে পাঠানোর আগে হাসপাতালে কথা বলে ব্যবস্থা করে রেখেছে? মায়মুনার কাছে এখন পুরো ব্যাপারটাই কেন যেন পরিষ্কার হয়ে যাচ্ছে। মায়মুনাকে সন্দেহ করেও কোনো ব্যবস্থা না নেওয়া, এত সহজে হাসপাতালে যাবার জন্য গাড়ির ব্যবস্থা করে ফেলা, সাথে আর কাউকে না পাঠানো, এসব সবকিছুই মায়মুনার পরিকল্পিত মনে হচ্ছে। সিস্টার মাইশার প্রতি কৃতজ্ঞতায় মায়নুমার একেবারে চোখে পানি চলে আসছে। তারপরও ও কিছু বলতে পারছেনা। যদি ব্যাপারটা ঠিক না হয়।

মায়মুনা শুধু চোখ ভরা জল নিয়ে মাথা নাড়িয়ে হ্যাঁ জানালো। মানে ও একা একা ড্রাইভারের সাথে যেতে পারবে।

বাইরে এসে একেবারে গাড়ি পর্যন্ত মায়মুনাকে উঠিয়ে দিয়ে গেলো সিস্টার মাইশা। যাবার সময় আরব দেশের ট্রেডিশন অনুসারে মায়মুনাকে জড়িয়ে ধরে দুই গালে নিজের দুই গাল ছুইয়ে চুমু দিয়ে বললো,

– ভালো থেকো মায়মুনা।

মায়মুনা আবার ওর মায়ের শরীরের গন্ধ পেলো। কিছুক্ষন আগে বিছানায় শুয়ে ঘুমের ঘোরে মাকে দেখে যেই গন্ধ পেয়েছিলো ঠিক সেই গন্ধ।

গাড়িটা সিস্টার মাইশাকে পিছে ফিরে দ্রুত চলে যাচ্ছে। মায়মুনার চোখ বেয়ে এখনো জল পড়ে যাচ্ছে। ও জানেনা কিসের জন্য ও কাঁদছে। ও কি বাড়ি ফেরার খুশিতে কাঁদছে, নাকি সিস্টার মাইশার ভালোবাসায় কাঁদছে, নাকি এই স্বপ্নের শহর রাকা ছেড়ে, ইব্রাহিমের স্মৃতি ছেড়ে চলে যাবার কষ্টে ও কাঁদছে। মায়মুনা বুঝতে পারছেনা ও কেন কাঁদছে। কিন্তু ও বুঝতে পারছে যে এই সবকিছুর জন্যই ও কাঁদছে। এই সব অনুভূতি একেবারে মিলেমিশে একাকার হয়ে আছে। এই অনুভূতিগুলো এমনভাবে মিশে আছে যে একটার থেকে আরেকটা আলাদা করার কোনো উপায় নেই।

মাত্র মিনিট দশেকের মধ্যেই হাসপাতালে পৌঁছে গেলো মায়মুনা। সেখানে সিস্টার রাবেয়া ওর অপেক্ষায়ই ছিলেন। ওকে দেখা মাত্র সালাম দিয়ে আর অল্প কিছু কুশলাদি বিনিময় করে বললেন,

– ব্যাপারটা এত সহজ হবে বুঝতে পারলে তোমার লোকদের এখুনি তোমাকে নিয়ে যেতে বলতে পারতাম। কিন্তু এখন তো ঠিক করা আছে যে ওরা রাতে আসবে। ততক্ষন তোমাকে হাসপাতালেই কাটাতে হবে।

মায়মুনাকে উনি একটা চেয়ারে বসিয়ে ব্লাড প্রেশার, জ্বর এসব মেপে, রুগী দেখার ভাব করে কথাগুলো বলছিলেন। ব্লাড প্রেশার মেপে বলে উঠলেন,

– তোমার প্রেশার এত লো কেন?

মায়মুনা তো জানেনা কেন। ও বোকার মতো তাকিয়ে থাকলো শুধু। ওকে চুপ থাকতে দেখে সিস্টার রাবেয়া বললো,

– খাওয়া দাওয়া ঠিক মতো করোনি?

খাবারের কথা শুনে মায়মুনার আবার খিদায় পেটটা মোচড় দিয়ে উঠলো। পেটের সেই চিনচিনে ব্যথাটা আবার ফিরে এলো। এবার কোনোরকমে উত্তর দিলো,

– নাহ, সবাইকে বলেছি তো আমার পেটে ব্যথা। এই কারণে ভালোমতো কিছু খেতে পারিনি কয়দিন।

– তোমাকে তো কিছু খেতে হবে। ভীষণ দুর্বল হয়ে পড়েছো। এরকম শরীর নিয়ে তো এতদূর জার্নি করতে পারবেনা। চলো, আগে তোমার বিছানাটা দেখিয়ে দেই তারপর দেখি তোমার জন্য কোনো খাবারের ব্যবস্থা করতে পারি কিনা। খাবার না পেলে পানিতে স্যালাইন গুলে দিবো। ওটা খেয়ে নিও। তাহলে শরীরে একটু শক্তি পাবে কেমন?

এই বলে সিস্টার রাবেয়া উঠে হাঁটা শুরু করে দিলো। মায়মুনাও সাথে সাথে উঠে দাঁড়িয়ে উনার পিছে পিছে হাঁটা শুরু করলো। সিস্টার রাবেয়া ওকে একটা হলঘরের মতো বিশাল রুমে নিয়ে এলো। সেখানে সারি সারি বিছানা পাতা। বেশিরভাগ বিছানায়ই কেউ না কেউ আছে। সিস্টার রাবেয়া ওকে সেই রুমের আরেকটা দরজা দিয়ে বের হয়ে একটা করিডোরে নিয়ে এসে বললো,

– ঐযে সামনের দরজাটা দেখছোনা? ওটা হলো টয়লেট আর তার উল্টাদিকের দরজা দিয়ে বের হয়ে যাওয়া যায়। সেই দরজাটা কিন্তু তালাবন্ধ থাকে। আমি রাত নয়টার আগে সেই তালা খুলে রাখার ব্যবস্থা করবো। তুমি ঠিক নয়টার সময় টয়লেটে যাবার নাম করে উঠে এসে ওই দরজা দিয়ে বের হয়ে যেও। আর বাইরে বের হলেই একটা লাল রঙের টয়োটা করোলা গাড়ি তোমার অপেক্ষায় থাকবে। চুপচাপ গাড়িতে উঠে পড়বে। ঠিক আছে?

মায়মুনা মাথা নেড়ে শুধু হ্যাঁ জানালো।

তারপর সিস্টার রাবেয়া মায়মুনাকে আবার সেই হলঘরে নিয়ে এসে কোনার দিকের একটা খালি বেড দেখিয়ে বললো,

– এটা তোমার বেড। এখানে আপাতত চুপচাপ শুয়ে থাকবে। আমি তোমার খাবার বা স্যালাইনের ব্যবস্থা করছি। আজকে আমি খুবই ব্যস্ত। অনেক সিরিয়াস রোগী দেখতে হচ্ছে। আমি তোমার কাছে আর নাও আসতে পারি। কিন্তু চিন্তা করোনা। অন্য কেউ তোমাকে খাবার দিয়ে যাবে। আর ঠিক নয়টার সময় সেই দরজা দিয়ে বের হতে ভুলবেনা কিন্তু। কেমন?

মায়মুনা মাথা নেড়ে থ্যাংক ইউ জানালো। তারপর সুবোধ বালিকার মতো বিছানায় এসে শুয়ে পড়লো। ঘড়িতে এখন বেলা তিনটা বাজে। নয়টা বাজতে এখনো অনেক দেরি। এতক্ষন যে কিভাবে কাটাবে মায়মুনা বুঝে পাচ্ছেনা। একটু মায়ের সাথে কথা বললে মনেহয় ওর একটু ভালো লাগতো। কিন্তু মোবাইল বের করে কথা বলা মনেহয় ঠিক হবেনা। তবে এই বিছানায় শুয়ে ওর ভীষণ আরাম লাগছে। একেবারে ক্লান্তিতে চোখ বুজে আসছে। সাথে পেটের ভিতরটাও একেবারে খিদায় মোচড় দিয়ে উঠছে। কখন যে একটু খাবার দিবে ওরা। চুপচাপ শুয়ে থাকতে থাকতে একসময় মায়মুনা গভীর ঘুমে তলিয়ে গেলো।

ঘুমের মধ্যেই ও ভীষণ আওয়াজ শুনতে পাচ্ছে। কীসের এত শব্দ। সবাই এত চিৎকার চেঁচামেচি করছে কেন। আবার কে যেন আজানও দিচ্ছে। ওর হঠাৎ মনে হলো ও আসলে হাসপাতালে না। ও যুদ্ধের কোনো ময়দানে। চারিদিকে হট্টগোল, গোলাগুলি, চিৎকার চেঁচামেচি, ছুটাছুটি। এত মানুষ কেন চারিদিকে? সবাই এভাবে ছুটছে কেন? এত আওয়াজ কেন? মায়মুনা কিছুই বুঝতে পারছেনা। ও কোনোরকমে চোখ খুলে দেখলো ওর মা ওর উপর ঝুঁকে আছে। ওকে জিজ্ঞেস করছে,

– তুমি ঠিক আছো?

– হ্যাঁ মা। আমার খুব খিদা লেগেছে। তুমি কি আমার জন্য কিছু রান্না করেছো?

মায়ের উত্তর মায়মুনা ঠিক শুনতে পেলোনা। তার আগেই বিকট আওয়াজ করে একটা বোমা ফাটল। মায়মুনার কানে তালা লেগেছে। চোখ জ্বলছে। ও কিছু দেখতে পাচ্ছেনা, কিছু শুনতে পাচ্ছেনা, উঠে বসার মতো শরীরে কোনো জোর পাচ্ছেনা। ওর ভীষণ খিদা পেয়েছে। মা কি ওকে একটু খাবার দিবেনা?

(চলবে)
©আমিনা তাবাস্সুম

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here