Thursday, April 9, 2026
Home "ধারাবাহিক গল্প """তার নাম জানিয়েছি সূর্যাস্তকে #তার নাম জানিয়েছি সূর্যাস্তকে #লাবিবা আল তাসফি ২.

#তার নাম জানিয়েছি সূর্যাস্তকে #লাবিবা আল তাসফি ২.

0
1

#তার নাম জানিয়েছি সূর্যাস্তকে
#লাবিবা আল তাসফি

২.
আজ সকাল থেকে তিহুর রুটিনে বিশাল পরিবর্তন নেমেছে। নিয়মের সাতদিন কেটে যাওয়ায় আজ সকাল থেকে সবাই টুকটাক কাজ করছে। তিহুর এতে বেশ লাভ হয়েছে। সে আজ সকালে দু ঘন্টা বেশি ঘুমিয়েছে। সকালের নাস্তা বানিয়েছে তার মেজ জা এবং ছোট জা। অন্যজন বাবার বাড়ি গিয়েছে গতকাল। তিহুর ধারণা সে কাজে ফাঁকি দিতে বাপের বাড়িতে টপকে গেছে। এসব তিহু খুব করে বুঝতে পারে।

তিহু দুদান্ত এক কাজ করেছে। পার্মিশন ছাড়াই তার এক ননদের রুমে ঢুকে পড়েছে। এটা অবশ্য সে ইচ্ছা করেই করেছে। সারাদিন একা একা বসে থাকতে কার ভালো লাগে?
এবাড়ির নিচতলা ভাড়া দেওয়া। দুটো পরিবার থাকে সেখানে। তিহুর অবশ্য এখনো কোনো ভাড়াটিয়ার সাথে দেখা হয়নি। দ্বিতীয় এবং তৃতীয় তলা দুটোই তাদের। দ্বিতীয় তলায় ডায়নিং, ড্রয়িং, রান্নাঘর আর দুটো বেডরুম। একটা তার অন্যটা তার শ্বাশুড়ির। বাড়ির বাকি সবার থাকার ব্যবস্থা তৃতীয়তলায়।
তিহু কখনো তৃতীয় তলায় যায়নি। যায়নি বলতে তার সুযোগ হয়নি।

তিহুর ননদ দুজন জমজ। তাদের নাম প্রিমা,প্রান্তি। সে আপাতত কার রুমে আছে সে নিজেও জানে না। তবে তিহু কিছুটা আতঙ্কিত। যদি ধমকে ওঠে!
কিন্তু তেমন কিছুই ঘটলো না। তিহুকে দেখতেই মেয়েটা মিষ্টি করে হাসলো। মেয়েটার হাতে পেইন্টের ব্রাস। সামনেই ক্যানভাস টানানো। তাতে চিত্র এখনো ফুটে ওঠেনি। আরো কিছু রংয়ের আচর কাটলে হয়তো বোঝা যাবে। তাছাড়া তিহু এসব আর্টের ব্যাপারে অনেক বেশিই অদক্ষ। তার এখনো মনে আছে ছোট বেলায় মানুষ আঁকাতে গিয়ে উগান্ডার ছাগল এঁকে ফেলেছিল। ক্লাসের সবার সে কি হাসি! অপমান সহ্য করতে না পেরে তিহু ভ্যাঁ ভ্যাঁ করে কেঁদে ফেলেছিল। সেই কথা মনে পড়লে তিহু এখনো লজ্জা পায়।

‘আরে ভাবী! এসো বসো। এই দেখোনা ব্যস্ততার জন্য তোমার সাথে ঠিকঠাক কথাই হলোনা।’

তিহু ভেবে পেলোনা ঠিকঠাক কথা বলতে মেয়েটা ঠিক কি বুঝিয়েছে। তাদের তো কখনো কথাই হয়নি। সেখানে ঠিক আর বেঠিক!

‘তোমাদের দুজনকে সবসময় ব্যস্ত দেখি। তাই ভাবলাম একটু দেখা করে যাই। যেহেতু একই বাড়িতে আছি!’

‘তোমার এই কাজটা আরো আগে করা উচিত ছিলো। যাই হোক এসেছো বেস করেছ। বলো কেমন কাটছে সময় এখানে?’

তিহু মুচকি হাসে। বলে,

‘সত্যি বলবো নাকি ফরমাল জবাব দিব?’

‘উহু ওসব ফরমালিটি বাহিরের মানুষের জন্য। আমি তো তোমার আপন মানুষ। এখানে নো ফরমালিটি।’

তিহু অবাক হয় কিছুটা। এত প্রাণোচ্ছল মানুষ নিজেকে কিভাবে সারাদিন বদ্ধ রুমে বন্দী করে রাখে? এ বাড়িতে কিছু তো একটা চলছে। যা সে জানে না বা বুঝতে পারছে না।
তিহু প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে বলে,

‘তার আগে তুমি বলো তুমি প্রিমা নাকি প্রান্তি?’

মেয়েটা খিলখিল করে হেসে ফেলে।

‘তুমি আমাকে না জেনেই এতক্ষণ গল্প করছিলে? আমি প্রান্তি। শোনো তোমাকে আমাদের চেনার সহজ একটা উপায় বলছি। প্রিমার ঠোঁটের কোণে একটা তিল আছে। গাঢ় বাদামী রঙের। আমার নেই। বাকি সব সেম সেম। ইভেন ভাইয়ারাও আমাদের এভাবে চিনতে পারে। ছোট ভাইয়া এখনো ভুল করে। ওর মাথায় ঘিলু কম। ও নিজের বউকেও তিশার জায়গায় মাঝেমধ্যে দিশা বলে ডেকে ফেলে।’

তিহুর খেয়াল হয় সে এখন পর্যন্ত তার কোনো দেবরদের ও দেখেনি বাড়িতে। ব্যাপারটা অদ্ভূত। সে এ বাড়িতে এসেছে আটদিন হয়েগেল এখন পর্যন্ত এ বাড়িতে কোনো পুরুষ লোককে দেখা যায়নি।

‘তোমার ভাইয়ারা সবাই কোথায়? আমি এখনো কাউকে দেখিনি। বাসায় আসেননা কেউ?’

প্রান্তি ক্যানভাস থেকে চোখ সরিয়ে তিহুর দিকে তাকায়। বিষ্ময় ভরা চোখে চেয়ে বলে,

‘এমা তুমি ভাইয়াদের সম্পর্কে জানো না?!’

তিহু একটু থতমত খেয়ে যায়। যেন সে এ বাড়ির ছেলেদের সম্পর্কে না জেনে বিশাল কোনো ভুল করে ফেলেছে। ভুল তো সে একটা করেছেই। আর তা হলো এ বাড়ির বড় কলাগাছটাকে বিয়ে করা। এ ছাড়া দ্বিতীয় কোনো ভুল তিহু তার গোটা জীবনে করেনি।

তিহুর চুপসে যাওয়া মুখ দেখে হেসে ফেলে প্রান্তি।

‘এত নার্ভাস কেন হচ্ছো? তোমার না জানাটা খুবই স্বাভাবিক ব্যাপার। তোমার বর হচ্ছে আমাদের সবার বড়। মেজ ভাইয়া প্রান্তিক। সে একজন ডাক্তার। প্রতিদিনই বাসায় ফেরে তবে রাত করে। আবার আলো ফোটার আগেই বেরিয়ে যায়। এজন্য তোমার সাথে দেখা হয়নি। ভাইয়া ভাইয়ার এক ফ্রেন্ডের ক্লিনিকে গেস্ট ডক্টর হিসেবে আছে। আর একমাস পর এতটা ব্যস্ত থাকবে না। সেজ ভাইয়া আর্মিতে। ছুটি ছাড়া তাকে দেখতে পাওয়া যায় না। আর ছোট ভাইয়া একটা সফটওয়্যার কোম্পানিতে জব করে। ভাইয়া বাসায় আসে রাত আটটায়। তুমি তখন তোমার রুমে থাক হয়তো। এভাবেই কারো সাথে দেখা হয়না তোমার।’

তিহু মনোযোগ দিয়ে সবটা শুনলো। এই পরিবারের মতো ব্যস্ত পরিবার পৃথিবীতে দুটো নেই হয়তো। এই পরিবারে বর্তমানে সেই একজন যার কোনো ব্যস্ততা নেই।
প্রান্তি মনোযোগ দিয়ে ক্যানভাসে তাকিয়ে রয়েছে। যেন সে গভীর কিছু ভাবছে। তিহু একবার ক্যানভাসে অন্যবার প্রান্তির পানে চাচ্ছে। শিল্পীর চোখ যা দেখতে পায় তা নাকি সাধারণ মানুষের চোখ দেখতে পায়না। তরু সে কথাটারই চাক্ষুষ প্রমাণ দেখতে চাচ্ছে।
এর মাঝে প্রান্তি বেশ গম্ভীরভাবে বলে উঠলো,

‘ভাবী তুমি না সেকেন্ড ইয়ারে?’

তিহু খানিক ভেবে উত্তর দিলো,

‘তেমনটাই তো মনে পড়ছে।’

‘ক্লাসে যাচ্ছ না যে!’

তিহু হেসে জবাব দেয়,

‘বিয়ে হয়েছে। ঘর,বর সামলে পড়াশোনা করার সময় কোথায় বলো?’

উত্তরে প্রান্তি ভিষণ সিরিয়াস হয়ে জবাব দিলো,

‘ভাইয়ার সাথে তোমার দেখা হয়নি এখনো এজন্যই এমনটা ভাবতে পারছ। সমস্যা নেই দু এক দিনের মাঝেই তুমি বাস্তবতা শিখে যাবে। এই দুটো দিন না হয় ছেলেখেলা ভাবেই কাটাও।’

তিহু কপাল কুঁচকায়।

‘কেন কেন?’

‘কারণ দু একদিনের মাঝেই তোমার বর ফিরছেন।’

তিহুর বুকের ভেতরটা কেমন করে ওঠে। তার বর ফিরছে! তিহু না চাইতেও বেশ উত্তেজনা অনুভব করছে। মুখে সে যতই বলুক বর নামক মানুষটার ব্যাপারে সে কেয়ার করেনা কিন্তু মন যেন অন্য কিছু ভাবে। তার মন তাকে না জানিয়েই যেন প্রোণো নামক মানুষটার জন্য বুকের ছোট একটা অংশ গুছিয়ে রেখেছে। তিহু বোঝে না যে মানুষটাকে সে কখনো দেখেনি, যার গলার স্বর অবদি শোনেনি, যার সম্পর্কে কিচ্ছুটি জানে না সে তার জন্য এমন অনুভূতি কিভাবে তৈরি হতে পারে!
উত্তর হয়তো একটাই। মানুষটা তার স্বামী। পৃথিবীর সবথেকে মধুর সম্পর্ক। তার সবথেকে কাছের মানুষ ঐ অজানা মানুষটা।

‘ভাইয়াকে নিয়ে ভাবতে বসে গেলে নাকি!’

প্রান্তির কন্ঠে দুষ্টুমি। তিহু একটু লজ্জা পায়। মুখে বলে,

‘তুমি কিন্তু বেশ দুষ্টু।’

‘অন্য ভাবীরাও সেটাই বলে।’

অন্য ভাবীদের কথা উঠতে তিহু সোজা হয়ে বসে। একটু আমতা আমতা করে বলে,

‘তোমায় একটা কথা জিজ্ঞেস করার ছিলো। কিছু মনে করো না কেমন?’

‘একটা কেন দশটা জিজ্ঞেস করো। আমার আপত্তি নেই।’

তিহু কিছুটা স্বস্তি পায় জেন।

‘ভাবীরা কেউ আমার সাথে কথা বলেন না কেন?’

‘ইসস দেখেছো তোমায় এখনো আমাদের গ্রুপে অ্যাড দেওয়া হয়নি। আজই দিয়ে দিবনি। তুমি মন খারাপ করোনা গো। আসলে তোমার এ বাড়িতে আসার ঠিক দুদিন পূর্বে এ বাড়িতে বিশাল ঝামেলা হয়েছে। মায়ের উপর রাগ করেই তোমার বড় ফিরে গেছেন। বাড়ির সকলে মায়ের সাথে কথা বলা বন্ধ করে দিয়েছে। প্রয়োজন ছাড়া কেউ কারো রুম ছেড়ে বের হয়না। ভাবীরা যখন বের হয় তখন মা আশপাশে থাকে বলেই হয়তো তারা কথা বলেন না। কিন্তু গ্রুপে তারা তোমার খুব প্রশংসা করেন। সেজ ভাবী তো সারাক্ষণ বলেন তুমি কত মিষ্টি দেখতে!’

তিহু জোর পূর্বক হাসার চেষ্টা করে। এ পরিবারের কিছুই সে বুঝতে পারে না। অংকের থেকেও জটিল এ পরিবারের মানুষ গুলোর সম্পর্ক। এ পরিবার সম্পর্কে যত জানছে তিহু জেন তত বেশি গোলক ধাঁধার ঘরে আটকে যাচ্ছে। আর তিহুর বর? সে তো নিজেই এক গোলক ধাঁধা। মানুষটা কি একবারের জন্য তার খোঁজ নিতে পারতো না? তিহু কি অন্যায় করেছে? তিহুর উপর কিসের রাগ তার? তিহুকে কিসের শাস্তি দিচ্ছে সে?

চলবে…….?

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here