#তার নাম জানিয়েছি সূর্যাস্তকে
#লাবিবা আল তাসফি
৩.
দিবস রজনী আমি যেন কার..
আশায় আশায় থাকি…
তাই চমকিত মন, চকিত শ্রবণ
তৃষিত আকুল আঁখি।
ভেজা চুলে গামছা ছুঁতে ছুঁতে গুণ গুণ করছে তিহু। প্রান্তির সাথে কথা বলার পর থেকেই তার মন বেশ ফুরফুরে হয়ে আছে। তিহু জানালার কাছ ঘেঁষে দাঁড়ায়। জানালার পাশেই মস্ত এক সজনে গাছ। ডাল পালা ছড়িয়ে রাজার মতো দাঁড়িয়ে আছে। এই গাছটার ছোট্ট একটা ডালে প্রতিদিন ঠিক দুপুর টাইমে দুটো চড়ুই পাখি এসে বসে। তিহুর মতে পাখি দুটোর মাঝে গভীর প্রেমের সম্পর্ক রয়েছে। পক্ষীকুল থেকে অদূরে আসে তারা একান্ত কিছু সময় কাটাতে। তিহু রোজ তাদের মনোযোগ দিয়ে দেখে। একটা পাখি পুরোটা সময় শান্ত হয়ে বসে থাকি। অন্যটা ভিষণ ছটফট করে। শান্ত হয়ে বসে থাকা পাখিটা নিশ্চয়ই পুরুষ পাখি হবে, অন্যটা মেয়ে। তিহু এক পলক দেখেই বলে দিতে পারে। তবে আজ তারা আসেনি। তিহুকে খানিক মনমরা দেখালো। ওরা কি বাড়িতে ধরা পড়েছে? ধরা পড়ার ব্যাপারটা জঘন্য।
তিহু যখন ক্লাস নাইনে পড়ে তখন তার জীবনে হঠাৎ আসা বৃষ্টির মতো করেই প্রেম এসেছিল। ছেলেটা ছিলো তার এক ক্লাস সিনিয়র। একদিন টিফিনের পর ক্লাসে যেতেই তার টেবিলে একটা চিঠি সাথে একটা লাল গোলাপ পায়। চিঠিতে খুব সুন্দর করে প্রেমের প্রস্তাব করা ছিলো। বলা আছে প্রেমে পড়তে কারণ লাগে না। তিহুর ও কোনো কারণ ছিলো না। সে ও চিঠি দাতাকে না দেখেই টুপ করে তার প্রেমে পড়ে গেল। লজ্জায় লাল নীল হয়ে আকাশে ভাসতে লাগলো। দু রাত তার ঘুম হলো না। চিঠির জবাবে কি লিখবে ভাবতে ভাবতেই হয়রান।
তিহু রঙিন কাগজ কিনলো। আরো দু রাত জেগে চিঠি লিখলো। কিন্তু তা আর তার হঠাৎ করে হওয়া প্রেমিক পর্যন্ত পৌঁছাতে পারলো না। কিভাবে যেন চিঠিখানা তার বাবার হাতে পৌঁছে গেল। তিহু নিশ্চিত ভাবে চিঠি তার স্কুলব্যাগে রেখেছিল। সেটা সকাল হতেই বাবার হাতে কিভাবে গেল বুঝতে পারলো না। এখানে নিশ্চিত কোনো ষড়যন্ত্র করা হয়েছে।
সে যাই হোক। পুরো একমাস তিহুর ঘর থেকে বের হওয়া বন্ধ হয়ে গেল। বাবা ঠিক করে কথা বলতেন না। তাকে অপরিচিতর মতো ট্রিট করা হতো। কা ভয়ংকর সে অনুভূতি! তিহুর একমাত্র প্রেম এভাবেই ঘর ছেড়ে পালালো। এরপর তার জীবনে আর কখনো প্রেম আসেনি। তিহু সচেতন ভাবেই মনের ঘরে খিল লাগিয়েছিল।
তিহুর উদাসিনতা কাটে কাজের মেয়ে সকিনার কথায়।
‘বড় ভাবী? আহেন। আমার কাজ কাম শ্যাষ। আমি এহন অন্যবাড়ি যাইতাম। মেজ ভাবী রানতেছে। আফনেও আহেন। সব গুছগাছ কইরা দিছি এহন খালি চুলায় দেবেন আর উঠাবেন।’
তিহু চুলে পেঁচিয়ে রাখা গামছা খুলে ফেলে। নেড়ে দিতে দিতে বলে,
‘না খেয়েই চলে যাবে?’
‘ওমা! খাওনের জন্য বইসা থাকি নাকি আমি? একটা প্যাট, খাওনের অভাব হয়না। তাছাড়া আফনাগো মানুষ হিসাব করা মাছ। আমি খাইলে একজনের ভাগে কম পড়ব। আফনের শ্বাশুড়ি যা হিসাবি!’
এটা অবশ্য সকিনা ভুল বলেনি। তার শ্বাশুড়ি ভিষণ হিসাবি মানুষ। এ কয়দিনে তা ঠিক ঠিক বুঝেছে তিহু। বাড়াতে কখনো বাড়তি বাজার করা হয়না। বসুর চাচা মাসিক বাজার করে দিয়ে যান একবারে এবং তা দিয়েই পুরো মাস কাটাতে হয়। এখন মাসের শেষ প্রায়। ফ্রিজে মাছ মাংস বলতে খুব অল্প পরিমাণ রয়েছে। তিহুর এ বাড়িতে নতুন আসা উপলক্ষে অনিয়মিত রান্না করা হয়েছে। তাছাড়া দুদিন কিছু বাড়তি মেহমান ছিলো। সব মিলিয়ে এ মাসে অন্যমাসের তুলনায় বাজার খরচ পড়েছে বেশি। রান্নার তেল শেষের পথে। তিহু এ কথা সবুর চাচাকে বললে তিনি বলেছেন,
‘এ কথা আপনার শ্বাশুড়ির কাছে বলেন বউ। আমার হাতে কিছুই নাই। আমাকে যা বলা হয় আমি তাই করি শুধু।’
এ বাড়ির কাজের লোক থেকে শুরু করে সকলে তার শ্বাশুড়িকে মানেন খুব। তার কথাতেই চলে পুরো সংসার। কিন্তু তেল ছাড়া রান্না চলবে কিভাবে? মাস শেষ হতে এখনো নয়দিন বাকি।
তিহু মাথয় কাপড় টেনে সকিনাকে বলে,
‘অতো ভেবোনা তো তুমি। এসো দুপুরের খাবারটা খেয়ে যাও। তুমি নাহয় আমার ভাগের এক পিস মাছ খেলে।’
সকিনার চোখ চকচক করে ওঠে। দু বছর যাবত কাজ করছে সে এই বাড়িতে। এবাড়ির কেউ কখনো তাকে এক বেলা ভাত খেতে বলেনি। এতে অবশ্য সকিনার আপত্তি ছিলো না। মাইনে অন্যসব বাড়ির থেকে বেশি দেয় এ বাড়িতে। এক বেলা ভাতে কি আসে যায়!
সকিনাকে টেবিলে খেতে দেওয়া হয়েছে। তিহু তাকে বেশ বড় দেখে এক পিস মাছ দিয়েছে খেতে। তিহুর মেজ জা রেমী ভাজি করছে। চার পদের সবজি দিয়ে ভাজি করা হচ্ছে। তিহু ভাবছে সে একঠু ভাজি চেয়ে আনবে কিনা। রেমীর সাথে তার কথা হয়নি এখনো।
তিহু রান্নাঘরের দরজার সামনে মুর্তির মতো দাঁড়িয়ে আছে। রেমী আড় চোখে তাকে দেখে। বলে,
‘কিছু লাগবে তোমার?’
তিহু আমতা আমতা করে।
‘একটু ভাজি নিতাম। সকিনার খাওয়া প্রায় শেষ।’
‘একটা বাটি দাও। আমি তুলে দিচ্ছি।’
তিহু দ্রুত পায়ে বাটি হাতে রেমীর পাশে দাঁড়ায়।
‘তুমি করে বলেছি বলে রাগ করোনি তো? বয়সে কিন্তু তুমি আমার থেকে অনেকটাই ছোট। আমার ছোট বোনটা তোমার বয়সী। তোমায় দেখলে আমার তোমাকে ছোট বোনের মতোই মনে হয়। তবে তুমি যদি চাও তাহলে বড় জায়ের মতো করেও দেখতে পারব।’
তিহু চোখ মুখ চকচকে। রেমী তার সাথে কথা বলায় সে বেশ খুশি। তুমি, আপনিটা আপাতত ম্যাটার না। তবে রেমী যদি তার সাথে ভাব দেখিয়ে কথা বলতো তাহলে তিহু অবশ্যই তার সম্মানে বড় হওয়ার ফায়দা লুটে নিত। আপাতত সেসব মাফ।
‘কোনো ব্যাপার না। আমার নাম ধরেই ডেকো না হয়। এ বাড়িতে আমি এতগুলো বড় বোন পাব তা ভাবিনি। আমার তো নিজেকে ভাগ্যবতী বলে মনে হচ্ছে।’
রেমী মুচকি হাসে। সে কথা খুব কম বলে। বাকি দুজন জায়ের সাথেও তার তেমন কথা হয়না। সে বাদে এ বাড়ির বাকি সবঢ়মেয়ে বউয়েরাই চটপটে স্বভাবের। তিহু হয়তো সবার প্রাণকেন্দ্র হয়ে থাকবে। মেয়েটা বেশ মিষ্টি স্বভাবের। কি দারুন ভাবে কথা বলে!
______________
তিহু সটান হয়ে বিছানায় শুয়ে আছে। মাথার উপর শব্দ করে ফ্যান ঘুরছে। তবে ফ্যানের বাতাস যেন তার দেহ পর্যন্ত পৌঁছাতে পাড়ছে না। মাঝ পথ থেকেই হাওয়া হয়ে যাচ্ছে।
এ বাড়ির অন্যসবার রুমে এসি থাকলেও এ রুমটাতে নেই। তার বর কি অন্যসবার থেকে গরীব? তেমন হলে তিহুর খুব দুঃখ হবে। সে তো ভালো ব্রান্ডের জামাকাপড় ছাড়া পড়তে পারে না। তিহু মোবাইল হাতে নিয়ে গুগলে সার্চ করলো,
‘How much money does a detective earn per month’
কিন্তু গুগলের জবাব দেখে তিহুর চোখ কপালে। ও মা গো! এত হলেতো তার রানীর হলে থাকার কথা। তাহলে সে একশো বছরের পুরোনো রং ওঠা দালানের এসি বিহীন কামরায় কি করছে? সে কি ভুল করে এখানে চলে এসেছে?
তার বর মশাই ফিরলে তিহু অবশ্যই জানতে চাইবে এ রুমে এসি কেন লাগানো হয়নি। ঠিক কোন উদ্দেশ্যে। সে কি চাইছে এই অতি গরমে হিট অ্যাটাকে তিহু মারা যাক? এর জবাব তিহুর অবশ্যই অবশ্যই দরকার।
তিহু হুড়মুড় করে প্রান্তির ঘরে হানা দেয়।
‘বালিকা শুনছো? চটপট করে তোমার স্বৈরাচার ভাইয়ের নম্বরখানা দাও তো।’
প্রান্তি সবে গোসল করে বের হয়েছে। বেলা করে গোসল করতে ভালো লাগে তার। সে চকিত চোখে তিহুর দিকে তাকিয়ে আছে। তিহুর হঠাৎ এমন কথায় সে খানিক অবাক হয়েছে। ভাইয়ের ব্যাপারে তিহুকে সে তেমন একটা আগ্রহী দেখেনি। সে খানিক হতাশ হয়েছিল। তিহুর হঠাৎ এই পরিবর্তনে সে খানিক চিন্তিত। সব ঠিক থাকলেই হলো!
‘কিন্তু ভাবী ভাইয়াতো কারো কল ধরছে না!’
‘সেটা পরের ব্যাপার। শূন্য দশমিক শুন্য এক ভাগ সম্ভাবনা যেখানে আছে সেখানে হাল ছাড়তে নেই, জানো না এ কথা?’
প্রান্তি উপর নিচ মাথা নাড়ায়। এই ভাবীকে তার মনে ধরেছে খুব। সে খুশি মনে ভাইয়ের নম্বর ফাঁস করে দিলো। ভাইয়ের এই নম্বর কেবল সে এবং প্রিমা জানে। অন্য কাউকে জানানো মানা। কিন্তু প্রান্তি সেই নিষেধাজ্ঞা পেরিয়ে তিহুকে নম্বর দিয়ে দিয়েছে। কিছু সময় জীবনের রিস্ক নেওয়াটা অত্যন্ত জরুরী।
চলবে………?





