না চাহিলে যারে পাওয়া যায়,
দ্বিতীয় পর্ব
২
তুমি তো জানো ওই অবস্থায় তর্ক করলে, আমার মাথা ঠিক থাকে না। কি ,জানো না তুমি?আরে অল্প ই খেয়েছিলাম।আমার উপর দিয়ে কি যাচ্ছে, সেটা তো কেউ বুঝতে চাইছে না। আমি তোমার বোনের খারাপ চাই না। মোজাম্মেল সাথীকে সুখে রাখবে।দেখি কোথায় কোথায় লেগেছে, ওষুধ খেতে হবে একটা। না না… শুধু ক্রিম লাগালে হবে না। কিছু খাওনি তো। কিছু খেয়ে ওষুধ খেতে হবে। আমি জানি তো, তুমি কিছু খাওনি।
টিকলি আর টায়রার ঘর থেকে আপা আর দুলাভাইয়ের গলা শোনা যাচ্ছে।রাতে মার খেয়ে মেয়েদের ঘরে এসে শুয়েছিল যুথি। সাদেক আলীর নেশা কেটে গেছে,তাই যুথির মন ভোলানোর চেষ্টা করছে সকাল সকাল।
ভোরের আলো আঁধারের একটা অদ্ভুত মায়া আছে।এই মায়ায় কঠিন রাগও কেমন গলে যায়।সব মানুষকে তখন ভীষণ নিষ্পাপ লাগে। ভোরের এই নরম আলোয় সাদেক আলীর গলার স্বরের মধ্যে, সাথী কেমন একটা সত্যিকারের ভালোবাসার গন্ধ পেলো। যুথিকে এইটুকু ভালোবাসা দেবার জন্য, সাদেক আলীকে চেঁচিয়ে ধন্যবাদ দিতে মন চাইল।এক মুহুর্তের জন্য সাথী ভুলেই গেলো, ঋনমুক্ত হবার জন্য এই লোকটা তাকে কিভাবে ব্যবহার করতে চাইছে।
সকাল সকাল ছাদে যাবার জন্য ঘর থেকে বের হয়ে এসেছিল সাথী। এখন মাঝপথে দাঁড়িয়ে, নিজের আপা দুলাভাইয়ের কথা শুনতে খুব ভালো লাগছে কেন যেন।যদিও ব্যথায় যুথি কথা বলছে খুব আস্তে, ভালো করে বোঝাও যাচ্ছে না যুথির কথা, তবুও। সত্যি বলতে,যুথি আর সাদেক আলীর মধ্যে এতটা কোমল কথোপকথন খুব একটা হয় না।
ভোরের দিকে সাথীদের ঘরটাতে দমবন্ধ করা গন্ধ আর কেমন একটা ভ্যাপসা গরম লাগে। তাজুল ইসলাম বহুবছর যাবৎ শয্যাশায়ী, টয়লেটে যেতে পারে না বলে বিছানাতেই সব কাজ সারেন । রাহেলা বানু যদিও এ ব্যাপারে খুব সতর্ক থাকেন সবসময়। খুব মেপে খাবার খাওয়ান,বারবার কাপড় নোংরা করবে সেই ভয়ে।তবু, সকালের ভ্যাপসা গরমে সাথীদের ঘরটাতে দুর্গন্ধ হয়।
তাজুল ইসলামের বিছানা বরাবর বড়সড় একটা জানালা রয়েছে। দিনভর সেই জানালা খোলা থাকে। দক্ষিণ দিকের ঘরের দখিনা জানালা আছে বলেই, দিনে ঘরটায় দুর্গন্ধ কম হয়। তবে মশার হাত থেকে বাঁচতে, রাতে জানালাটা বন্ধ করতেই হয়। রাতে জমা ময়লা জামাকাপড়ের গন্ধে, সকালের দিকটা কেমন দমবন্ধ লাগে। রাহেলা বানু উঠে জানালা খোলার আগ পর্যন্ত সাথী তাই প্রায় সকালেই ছাদে চলে যায়।
গতকাল সারারাত সাথী দুই চোখের পাতা এক করতে পারেনি। অনেকবার চিৎকার করে কাঁদতে ইচ্ছা করেছে, সেটাও পারেনি।ছোটবেলা থেকে মায়ের একরকম যুদ্ধ, বাবার একরকম যুদ্ধ, আপার একরকম যুদ্ধ, নিজের যুদ্ধ… এইসব দেখতে দেখতে, সাথীর চোখ সহজে ভিজতে চায় না। দুঃখের দিনে মনভরে কাঁদতে না পারার কি যে যন্ত্রনা, সেটা সাথীর চেয়ে ভালো বোধ হয় আর কেউ জানেনা।
আপা দুলাভাইয়ের কথোপকথন শারীরিক অন্তরঙ্গ মুহূর্তের দিকে যাচ্ছে। আচ্ছা , এরমধ্যে কি কোনো প্রেম আছে? নাকি শুধুই অভ্যাস?স্বামী স্ত্রীর প্রেমহীন শারীরিক সম্পর্কের চেয়ে জঘন্য, পৃথিবীতে আর কিছু কি আছে?
ধীর পায়ে, ছাদে যাবার জন্য দরজার কাছে এগিয়ে গেলো সাথী।
৩
তাজুল ইসলামের বিছানার পাশে থাকা টেবিলের চেয়ারটাতে বসে, কাজল লাগাচ্ছে সাথী। হাতে তার প্রিয় আয়নাটা।এই আয়নায় সাথীর প্রিয় মানুষের বাস। বাড়িতে সবাই সাথীকে নিয়ে হাসাহাসি করে, বকাঝকা করে ,আয়না হাতে নিয়ে এতো সময় বসে থাকে বলে। সবাই ভাবে, আয়নায় সাথী কেবল নিজেকে দেখে।কেউ তো জানে না, এই আয়নায় কে থাকে। তার সাথে কত কথা বলে সাথী, সারাদিন।
পাশে বিছানায় পড়ে থাকা বাবা, মাঝে মাঝেই চুপ হয়ে আয়নার সাথে সাথীর গল্প শোনেন। কখনো একটু হেসেও উঠেন মনে মনে, মুখটা তখন খুশি খুশি দেখা যায়। বাবার মুখের এই পরিবর্তন সাথী ছাড়া কেউ বুঝতেও পারেনা।
আজও সাথী মন খারাপের ঝুলি নিয়ে বসেছে আয়নার সামনে। সকালে লম্বা সময় ধরে ছাদে ছিল সাথী। এতদিন ধরে যত্ন করা সবগুলো গাছের কাছ থেকে বিদায় নিয়েছে সাথী। আগামীকাল তার বিয়ে হবার কথা। জীবন তাকে কোথায় নিয়ে যাবে,কেউ জানেনা।
ছাদ থেকে নেমে, মায়ের সাথে মিলে বাবার সব ময়লা জামা কাপড়, বিছানা পরিষ্কার করেছে। বাবাকে নাস্তা খাইয়েছে। সকালে বাবাকে নাস্তা খাওয়ানোটা বড় একটা ঝক্কি।
তারপর, নিজের প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র একটা ব্যাগে আলাদা করে গুছিয়ে নিয়েছে।কবুল হবার পর এ বাড়িতে থাকবে, না বরের সাথে চলে যাবে সেটা এখনো জানেনা সাথী। মায়ের কথামত তাই একটা ব্যাগ গুছিয়ে নিয়েছে।সাথে এই বাড়িতে যে সব জিনিসপত্র রয়ে যাবে সাথীর, সেগুলোও একটু ঝেড়ে মুছে গুছিয়ে রেখেছে।
একটু বেলা হবার পর,আপা আর দুলাভাই বিয়ের বাজার করতে গেছে। সাথী, টিকলি টায়রাকে গোসল করিয়ে, নিজের হাতে ভাত মেখে খাইয়ে দিয়েছে। বাচ্চা দুইটা ছিল বলে সাথী কতো মন খারাপ ভুলে থেকেছে।
একটা একটা করে হাতের বেশ কিছু কাজ শেষ করে নিয়েছে। তারপর,সময় নিয়ে নিজের গোসল সেরে , বেশি করে মরিচ দিয়ে কড়া করে ডিম ভেজে, এক প্লেট ভাত খেয়ে নিয়েছে সাথী।এ বাড়িতে একসাথে ভাত খাওয়ার রেওয়াজ নেই। সেরকম সম্পর্কের গভীরতাও নেই তো।
শীতের দিনে বেশি করে পেঁয়াজ মরিচ দিয়ে, কড়া করে ডিম ভাজা দিয়ে এক প্লেট গরম ভাত আর গরমের দিনে একইরকম ডিম ভাজা দিয়ে, এক প্লেট পান্তা ভাত…এই হলেই সাথীর জীবন আনন্দময় হয়ে উঠে।
জীবনের কাছে এই এক প্লেট ভাত আর ডিম ভাজা, নিজের প্রিয় মানুষটা পাশে নিয়ে… বৃষ্টি আর জোছনায় হাত ধরে চুপচাপ বসে থাকা…এটুকুই চাওয়া ছিল সাথীর। এর বেশি কিছু নয়।এটুকুও পাওয়া হবে না কেন,কে জানে?
মোজাম্মেল নামের যে লোকটার সাথে তার বিয়ে ঠিক হয়েছে,দুই দিন তাকে দেখেছে সাথী। কলেজে যাওয়ার পথে একদিন দেখেছে, সামনের বাড়ির দারোয়ানকে ধরে মারছে। আরেকদিন, দুলাভাইয়ের অফিসে একটা দরকারে গিয়েছিল সাথী। তখন দেখেছে অফিসের রান্নার কাজ করে যে মহিলাটা, তাকে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দিয়েছে। মোজাম্মেল মহিলাটিকে তুই তুই করে
বলছিল। খুব জঘন্য লাগছিল শুনতে।
সাথীর কল্পনায় যে মানুষটার বাস, সে মেয়েদের খুব সম্মান করে।সে কখনো কারো গায়ে হাত তোলে না।
একটা সিনেমায় দেখেছিল সাথী, নিজের স্ত্রীকে খুব ভালোবেসে বিয়ের প্রথমদিকে বেশ অনেকদিন আপনি আপনি করে ডেকেছিল ,নায়ক। সকাল সকাল নতুন বউয়ের জন্য নাস্তাও বানিয়েছিল। নতুন বউয়ের ঘুম ভাঙ্গার সাথে সাথে,খাট থেকে কোলে তুলে নিয়েছিল, যেন বউয়ের পা মাটিতে না পড়ে।বউ যেন কতো সাধনার,বউ যেন কোন রূপকথার রানী।কি ভালো লেগেছিল সাথীর।
মোজাম্মেলের মতো মানুষ স্বামী হিসেবে কেমন হবে ভাবতেই পারছে না,সাথী।আপাকে অনেক যন্ত্রনা সহ্য করতে দেখেছে সে ছোট থেকে। স্বামী কতোটা লোলুপ হতে পারে, দুলাভাইকে দেখে জেনেছে সে।এক কৌটা ঘুমের ওষুধ তাই আলাদা করেই রেখেছে সাথী। তার বাবার ওষুধের থেকেই সরিয়ে রেখেছে সেগুলো।দরকার মনে হলে যে কোন সময় খেয়ে নিবে।
আয়নায় থাকা কাল্পনিক মানুষটার সাথে এইসব কথাই বলছিল,সাথী।
এরমধ্যেই যুথি ঘরে ঢুকে, রাহেলা বানুর সাথে হৈচৈ শুরু করে দিয়েছে। দুপুরে ভাত খাওয়ানোর সময় টিকলি টায়রাকে বলেছিল সাথী, সে হয়তো অনেক অনেক দূরে চলে যাবে। বাচ্চা দুইটা মাকে কি বলেছে, কে জানে?
আপার কান্না শুনে সাথীর সত্যি খারাপ লাগছে। একথা সত্যি যে, দুলাভাই তাদের ফেলে দেয় নি। তাছাড়া দুলাভাই কখনো সাথীর দিকে খারাপ দৃষ্টিও দেয়নি। চাইলে দিতেই পারতো। কারো কিছুই করার থাকতো না।
তাই বলে দুলাভাই মোটেই ভালো মানুষ নয়। এতো বছরে দুলাভাইয়ের কতো যে জঘন্য চেহারা দেখেছে সাথী সেটা কাউকে বলে বোঝানো যাবে না।মদ, জুয়া,লোক ঠকানো, কোনো টা বাদ নেই। অশ্লীল এবং অশ্রাব্য ভাষায় আপাকে গালাগালি করে, মারধর করে। মাঝে মাঝে মনে হয়,বোকা আপাটা তবু এই লোকটাকে ভালোবাসে।
মায়ের সাথে একদফা হৈচৈ, কান্নাকাটি করে সাথীকে টানতে টানতে চেয়ার থেকে তুলে আনলো যুথি।
আপার এধরনের আচরণ খুব স্বাভাবিক,তাই একটুও অবাক হলোনা সাথী। কিন্তু মা যখন গম্ভীর মুখে সাথীকে পালিয়ে যেতে বললো, ভীষণ ভয় লেগে উঠলো সাথীর।
পালিয়ে যাবার কোন জায়গা তো নেই সাথীর।সেই সাহসও নেই। তবে হ্যাঁ, দুনিয়া থেকে চিরতরে বিদায় নিতে পারবে সে। কিন্তু সেই কথা মাকে বলবে কি করে?মা যে সাথীর উপর খুব ভরসা করে।
রাহেলা বানুর কথা শুনে, তাজুল ইসলামের গোঙানির শব্দ বাড়তে থাকে।
যুথি বললো, “সাথী পালাবে কেন, আম্মা? আমি নাহয় বোকা সোকা,তাই তোমাদের জামাইকে বশ করতে পারিনা।কিন্তু সাথী তো যথেষ্ট বুদ্ধিমতী। মোজাম্মেলের মতো ছেলেকে নিজের ইচ্ছামত চালাতে না পারলে, এতো রূপ আর বুদ্ধি কোন কাজে লাগবে?”
“আর শোন সাথী, তোকে একটা বলি… ভালো স্বামী বলতে দুনিয়াতে কিছু নাই। বিয়ের একবছর কিংবা বড়জোর দুই বছর, এরপর আর স্বামী স্ত্রীর প্রেম থাকে না। তখন শুধু দায়িত্ব থাকে। দায়িত্ব পালন করতে পারলে সব ঠিক, না পারলে সব ঠনঠন।এই যে আমাদের আব্বা, তিনি তো সাদেক আলীর মতো বদ লোক না।তোর কি মনে হয়? আম্মা আব্বার মধ্যে প্রেম ভালোবাসা কিচ্ছু আছে? আজকে যদি আব্বার টাকা থাকতো, আমাদের কি এই অবস্থা হতো? সাদেক আলী যত খারাপই হোক, তার দুই মেয়েকে টাকার অভাবে বদ লোকের সাথে বিয়ে দিবেনা। ভেবে দ্যাখ একবার, কোন রাজপুত্রের আশায় তুই পালিয়ে যাবি। সিদ্ধান্ত তোর।”
চলবে…
না চাহিলে যারে পাওয়া যায়,
দ্বিতীয় পর্ব
রুচিরা সুলতানা





