#বড় গল্প
#ফেরারী বসন্ত
পর্ব-এগারো
মাহবুবা বিথী
আরশী আসার পরদিনই হাসনার প্রচন্ড ব্লিডিং শুরু হলো। প্রথমে হাসনা বুঝতে পারে নাই ওযে কনসিভ করেছে। পরে ডাক্তারের কাছে যাওয়ার পর টেস্ট করে জানা যায় ও কনসিভ করেছিলো। কারণ গতমাসেই ওর পিরিয়ড হয়েছিলো। যাইহোক দীর্ঘ একমাস ও অসুস্থ ছিলো। এই সময়টাতে আরশী ওর সেবা করেছে। সায়েরাকে সামলিয়েছে। এছাড়া কিছু করার ছিলো না। কাজের হেলপার আকলিমা ওর বাবার অসুস্থতার কারণে কুড়িগ্রাম চলে গিয়েছে। জারা থাকলে হয়তো আরশীকে এতোটা চাপ নিতে হতো না। জারা আর পাভেল এর মাঝে আমেরিকাতে পাড়ি জমিয়েছে।
হাসনা একটু সুস্থ হলে কামাল কাছনায় আরশী আর সায়েরাকে নিয়ে বেরাতে যায়। আর এই সুযোগে জারার চাচী রুবা হাসনাকে বলে,
—সুস্থ হতে একমাস লাগলো তাই না?
—-জ্বী চাচী,তবে আরশী আমাকে খুব সাহায্য করেছে। আমার যখন যা লাগে হাতের কাছে এনে দিয়েছে। আমি আসলে মাথা তুলে বসতে পারছিলাম না।
—সায়েরাকে কে দেখেছে?
—আরশী সামলে নিয়েছে।
—রাজের বুদ্ধি আছে বলতে হবে। বিনা পারিশ্রমিকে কি সুন্দর তোমাকে একটা কাজের লোক এনে দিয়েছে।
হাসনা প্রতিবাদ করে বলে,
—চাচী আপনার কথাটা ঠিক নয়। রাজ আরশীকে অনেক ভালোবাসে।
সায়মা ডাইনিং রাস্তা রেডী করছিলো। রুবার কথা শুনে এই রুমে এসে বিরক্ত হয়ে বলে,
—না জেনে শুনে কারো সম্পর্কে এমন মন্তব্য করা উচিত নয়। রাজ ওকে ওর বাবার কাছ থেকে কিভাবে এনেছে সবই আমি জানি। এজন্য রাজকে অনেক টাকা গুনতে হয়েছে।
রুবা সাথে সাথে প্রসঙ্গ পাল্টে বলে,
—ভাবী আপনি কথাটা এতো সিরিয়াসলি নিয়েছেন,কিন্ত আমি তো ঠাট্টা করে বলেছি।
—এমন ঠাট্টা করা কখন উচিত নয় যে ঠাট্টায় বুকের ভিতর ব্যথা শুরু হয়। মানুষের সাজানো সংসারে সন্দেহের বীজ রোপিত হয়।
কথাগুলো বলেই হাসনা আরশী আর সায়েরাকে খাবার টেবিলে নিয়ে যায়। হাসনার যদিও রাতে ডিনার করে যাওয়ার ইচ্ছে ছিলো কিন্ত জারার চাচী রুবার কথাগুলো শোনার পর ওখানে আর থাকতে মন চাইলো না। দ্রুত বাসায় চলে আসে। সেদিন রাজ বাসায় এসে হাসনাকে বলে,
—আরশীর সামনে ফাইনাল পরীক্ষা। তবে ওকে পরীক্ষা দিতে হবে না। ওর বাকি দুই টার্মের উপর নির্ভর করে পর্যাপ্ত মার্ক দিয়ে পাশ করিয়ে দেওয়া হবে। আগের স্কুলের প্রিন্সিপালের সাথে কথা বলেছি। ওর টিচার ঠিক করেছি। জেলা স্কুলে ভর্তি পরীক্ষা দিতে হবে।
রাজের কথাগুলো শুনে আরশী ভীষণ খুশী হলো। জেলা স্কুলে পড়ার ওর বহুদিনের শখ ছিলো। খুশীতে হাসনার দুচোখের পাতা সিক্ত হয়ে উঠলো।
সবই ঠিকঠাক চলছিলো। আরশী ক্লাস ফোর আর সায়েরা নার্সারীতে ভর্তি হয়েছে। বিয়ের দুবছর পার হয়ে গেল কিন্তু হাসনার আর কনসিভ করছিলো না। সেটা নিয়ে শ্বশুর বাড়িতে নানারকম কথা উঠছিলো। প্রথমে হাসনা কথাগুলোর তেমন পাত্তা দেয়নি। ভেবেছে আজ না হোক কাল কনসিভ করলে সবাই এই বিষয়টা নিয়ে আর মাথা ঘামাবে না। কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন। রাজের মা প্রথমে ঐ বিষয়টাকে নোটিশ করলেন। সেটা হলো আরশী। কারণ আরশী আসার দুদিন পর হাসনার মিসক্যারেজ হয়েছিলো। সুতরাং এই মেয়েটা অলুক্ষণী অপয়া। হাসনার কানে কথাটা আসা মাত্রই ভীষণ কষ্ট পেলো। কিন্তু কিছু তো করার নাই। তবে কেন যেন মনে হলো এই কথাটা কেউ উনার কানে তুলে দিয়েছে। দুদিন আগে ওয়াশরুমে যাওয়ার সময় মরিয়ম বেগম মোবাইলটা ডাইনিং টেবিলে রেখে যান। হাসনা মোবাইল ওপেন করে কল লিস্ট চেক করে দেখে ওর দুই মামী আর জারার চাচী রুবার সাথে ওর শাশুড়ীর মাঝে মাঝে কথা হয়। ওয়াশরুমের দরজা খোলার শব্দে হাসনা ফোনটা টেবিলে রেখে দেয়। ওকে এখুনি বের হতে হবে। আরশী আর সায়েরাকে স্কুল থেকে আনতে হবে। শাশুড়ী মরিয়ম বেগমকে হাসনা বলে,
—মা, আরশী আর সায়েরাকে আনতে যাচ্ছি।
—যাও,আমার ছেলের ঘরে সন্তান এখনও পয়দা করতে পারলে না। তা কি আর করা। অন্যের জিনিস বয়ে বেড়াও। বসে তো থাকা যাবে না। আপাতত এই কাজটাই মনোযোগ দিয়ে করো।
হাসনা মুখে কিছু বললো না। আর কিইবা বলার আছে। বাস্তবতা মেনে নিতেই হবে। হাসনা চলে যাবার পর রাজের দাদী এসে বলে,
—হাসনাকে তোমার এভাবে বলা উচিত হয়নি। মেয়েটা কষ্ট পেলো।
—কষ্ট পেলে পাবে। আমার কিছু করার নেই। আমি বুঝতে পারছি ও ইচ্ছে করেই সম্তান নিচ্ছে না।
–তা কি করে হয়?
—হয় মা,নিজের সন্তানের আদর কমে যাবার ভয়ে ও বাচ্চা নিতে চাইছে না।
এরমাঝে জারার শাশুড়ী এসে বলে,
—তোমার কথা ঠিক নয় ভাবী। বাচ্চা হবার বয়স তো পেরিয়ে যাচ্ছে না। আজ না হয় কাল হবে।
—সে জন্য তো ইচ্ছা থাকতে হবে। ওর তো সেই ইচ্ছাটাই নাই। সবই আমার ছেলের দুর্ভাগ্য।
জমিলা বেগম আর কথা বাড়ালেন না। নিজের কাজে মন দিলেন। এর মাঝে হাসনা আরশী আর সায়েরাকে নিয়ে বাসায় চলে আসে। ওদেরকে খাইয়ে দেয়।টেবিলে সবার জন্য খাবার বেড়ে দিয়ে নিজের রুমে চলে আসে। যোহরের নামাজ আদায় করে নেয়। এরপর ডাইনিং টেবিল থেকে সবার এঁটোবাসনগুলো রান্না ঘরের সিংক এ রেখে নিজে মুখে কিছু খাবার তুলে নেয়। এরপর সব কিছু ধুয়ে রুমে চলে আসে। সায়েরা ততক্ষণে ঘুমিয়ে পড়েছে। আরশী ওর রুমে হোম ওয়ার্ক করতে থাকে। হাসনা ছাদে চলে যায়। পেতে রাখা স্টিলের চেয়ারটায় বসে পড়ে। ছাদে শুকনো পাতা এখানে ওখানে ছড়িয়ে আছে। ধুলোর আস্তরণ পড়ে আছে। আসলে মনটা ভালো না থাকায় এদিকে নজর দিতে ইচ্ছে করছে না। টবের মাটিগুলো শুকিয়ে চৌচির। অবহেলা অযন্তে গাছগুলো যেন কোনো রকমে বেঁচে আছে। অনেকটা ওর মতোন। ইদানিং রাজও ওকে সময় দেয় না। যদিও হাসনা কোনোদিন রাজকে কোনো অভিযোগ করেনি তারপরও রাজ হয়তো বুঝে যে হাসনা ওকে অনুভব করে। সে কারণে নিজ থেকেই বলে,
—ইদানিং ব্যস্ততা একটু বেড়েছে। তাই তোমাদের সময় দিতে পারছি না। তবে এটা ক্ষণিকের জন্য। এরপর তোমাদের নিয়ে দেশের বাইরে ঘুরতে যাবো।
হাসনা রাজের কথাগুলো বিশ্বাস করতে চায়। তবে সেদিন রাজের মোবাইলের কল লিস্টে রশ্নির নাম্বার দেখেছিলো। রশ্নির কথা মনে হতেই বুকের ভিতরটা ফাঁকা হয়ে গেল। শিরদাঁড়া দিয়ে একটা তীব্র ব্যথার স্রোত বয়ে গেল। গোধুলীর আবীর চারদিকে ছড়িয়ে পড়ছে। হাসনা গাছগুলোতে পানি দিতে থাকে। দূরের মসজিদে মাগরিবের আজান শোনা যায়। ক্লান্ত শ্রান্ত দেহে প্রচন্ড অবসাদ নেমে আসে। কখন যে মাথা ঘুরে ছাদে পড়ে যায় ও নিজেই বুঝতে পারে না। একসময় একটা ছোটো ছেলে এসে ওকে হাত ধরে টেনে উঠায়। হাসনা ওর হাত ধরে নদীর ঘাটে চলে যায়। সেখানে একটা নৌকা বাঁধা রয়েছে। ছেলেটার হাত ধরে নৌকাতে উঠে পড়ে। হাসনা অবাক হয়ে যায় এতোটুকু ছেলে নৌকাটা কিভাবে চালাতে পারে। একসময় প্রবল ঝড় উঠে। নৌকাটা দুলতে থাকে। মনে হচ্ছে এখুনি ডুবে যাবে। এসময় হঠাৎ আরো একটা নৌকা নিয়ে রাজ চলে আসে। রাজ হাসনাকে ডাকতে থাকে। হাসনা ধড়মড় করে উঠে বসে বলে,
—বাবুটা কোথায়?
রাজ রেগে গিয়ে বলে,
—কিসের বাবু আর তুমিই বা এখানে কিভাবে আসলে?
হাসনা কিছুই মনে করতে পারে না। কিছুক্ষণ পর ধাতস্থ হলে আস্তে আস্তে সব মনে পড়ে। এরপর রাজের দিকে তাকিয়ে বলে,
—গাছে পানি দিতে এসেছিলাম।
মরিয়ম বেগম রেগে গিয়ে বলেন,
—ন্যাকামি করার জায়গা পাওনা? তোমাকে ভরসন্ধায় কে গাছে পানি দিতে বলেছিলো।
জমিলা বেগম মরিয়মের দিকে তাকিয়ে বলে,
—বাদ দাও না ভাবি এসব রাগারাগি। দেখছো না ওর পুরো শরীরে ধুলো মেখে আছে।
জমিলা হাসনার দিকে তাকিয়ে বলে,
—উঠে দাঁড়াতে পারবে?
হাসনা উঠে দাঁড়ানোর চেষ্টা করে। কিন্তু পেরে উঠে না। মাথা ঘুরে আবার পড়ে যেতে থাকে। রাজ সাথে সাথে ওকে ধরে ফেলে। রাজের বাবা আরশাদ চৌধুরী রাজকে বলেন,
—তুই হাসনাকে পাঁজাকোলা করে নীচে নিয়ে আয়। আমি ডাক্তারকে কল করছি।
রাজ হাসনাকে পাঁজাকোলা করে নীচে নামিয়ে নিয়ে আসে। হাসনা রাজের দিকে তাকিয়ে বলে,
—সায়েরা আর আরশী কোথায়?
–ওরা ঘুমিয়ে আছে।
—-ওদের ডেকে দেননি কেন? হোম ওয়ার্ক শেষ করেছে কিনা কে জানে?
—ওদের ভাবনা না ভেবে নিজের শরীরের কথা ভাবো। তাছাড়া কাল শুক্রবার। সুতরাং হোমওয়ার্ক নিয়ে ব্যস্ত হওয়ার দরকার নেই।
রাজ হাসনাকে নিয়ে নীচের ওয়াশরুমে চলে যায়। ক্লসেট থেকে ম্যাক্সি বের করে ওর হাতে দেয়। হাসনা হালকা করে শাওয়ার নিয়ে ম্যাক্সি পড়ে রুমে চলে আসে। রাজ ওকে বিছানায় শুয়ে পড়তে বলে। এরমাঝে ডাক্তার চলে আসে। পরীক্ষা নীরিক্ষা করে বলে হাসনা কনসিভ করেছে। নিশ্চিত হওয়ার জন্য প্রেগনেন্সি কিড রেখে যায়
সকালে পরীক্ষা করতে বলে। এখন কিছু ভিটামিন ওষুধ দিয়ে ডাক্তার চলে যায়। মরিয়ম বেগম একথা শুনে আল্লাহপাকের কাছে প্রার্থনা করে বলে,”আমার দোয়া তুমি কবুল করে নাও মালিক। এবার যেন আমার ছেলের ঘরে সন্তান আসে।”
হাসনাকে রাতে জমিলা বেগম গরম সুপ এনে দিয়ে বলে,
—-এটা খেয়ে নাও। তোমার শরীর খুব দুর্বল।
হাসনা মুখে দেওয়ার সাথে সাথে বমি করে ঘর নোংরা করে ফেলে। একটু সামলে নোংরা পরিস্কার করতে ও শোয়া থেকে উঠে বসে। কিন্তু রাজ ওকে বিছানা থেকে নামতে দেয় না। নিজেই নোংরাগুলো সব পরিস্কার করে। মায়ের অসুস্থতা দেখে সায়েরা আরশী জ্বালাতন ছাড়াই দ্রুত ভাত খেয়ে নেয়। সারা রাত উত্তেজনায় হাসনা ঘুমাতে পারে না। আধো ঘুম আধো জাগরণে পুরোটা রাত পার হয়ে যায়।
চলবে





