Thursday, April 9, 2026
Home "ধারাবাহিক গল্প """ফেরারী বসন্ত ফেরারী বসন্ত পর্ব-চৌদ্দ

ফেরারী বসন্ত পর্ব-চৌদ্দ

0
4

#বড় গল্প
#ফেরারী বসন্ত
পর্ব-চৌদ্দ
মাহবুবা বিথী

হাসনা একরাশ অস্বস্তি নিয়ে ওর মায়ের বাসায় ফোন দেয়। কুশলাদি জিজ্ঞাসা করতেই ওর মায়ের কাছে জানতে পারে ওর বাবা ট্রেনিং এ ঢাকায় গিয়েছে। ও হাঁফ ছেড়ে বাঁচে। তবে মাকে সিতারার কথা বলতেই ওর মা রেগে গিয়ে বলে,
—সোমত্ত মেয়ে,কাল সারা রাত ও কোথায় ছিলো? জিজ্ঞাসা করেছিস?
এমন সময় ডোরবেলটা বেজে উঠে। ফোনে মাকে হাসনা বলে,
—দাঁড়াও,দেখি কে এলো আবার?
হাসনা দরজা খুলে দেখে হাসেম দাঁড়িয়ে আছে। ওকে দেখে হাসনা অবাক হয়ে বলে,
—তুই এসময় কোত্থেকে?
—কোথা থেকে আবার? ভার্সিটি থেকে এসেছি।
হাসনার ফোনে তখন আসমা বেগম হ্যালো হ্যালো করে যাচ্ছেন। হাসেম শুনতে পেয়ে বলে,
—তোমার ফোনে কে?
—-আম্মা,
—কথা শেষ করো?
হাসনা ফোনটা কানে তুলে বলে,
—-আম্মা তোমাকে যে কাজটা করতে বললাম সেটা দয়া করে করো। কোনো প্রশ্ন করো না। বুঝতে পারছো তো কেন বলছি?
—আমি বলদ না,ঠিকই বুঝতে পারছি। সায়মা তোর বিয়ের ব্যবস্থা করেছে। ওর মেয়ে বলে কথা। সবই বুঝি। কিন্তু যদি কোনো অঘটন ঘটে তখন এর দায়ভারও আমাকে নিতে হবে। তোর বাপকে তো ভালো করেই চিনিস। উনি কখনও কোনো ঝামেলায় জড়াতে চান না। আর হাসেম কেন এতো সকালে তোর বাসায় এসেছে? কাল তো ফোনে আমাকে বললো,ওর নাকি নিঃশ্বাস নেওয়ার সময় নাই। দুদিনের মধ্যে থিসিস পেপার জমা দিতে হবে। আবার সিতারাও এসেছে। এদের মাঝে আবার কোনো যোগসুত্র নাই তো?
—আমি কিছু বুঝতে পারছি না। এখন রাখি। একটু পর রাজ আসবে। ওকে নাস্তা দিতে হবে।
ফোনটা রেখে আসমা বেগম মনে মনে হিসেব মেলাতে লাগলেন। যদিও প্রবল অনিচ্ছা সত্বেও হাসনার কথায় রাজী হতে হলো কিন্তু মনের ভিতর অশান্তি শুরু হলো। আবার কোনো ঝামেলায় পড়তে হয় কে জানে?
হাসনা ফোন রাখতেই সায়মা মানে সিতারার মা ফোন দেয়। রিসিভ করতেই ওপাশ থেকে সায়মা বলে,
—তোর খালুর বুকে ব্যথা উঠেছে। মেডিকেলে যাচ্ছি। রাজকে নিয়ে একটু আসতে পারবি?
—-হঠাৎ খালুর বুকে ব্যথা হলো কেন? হার্টের সমস্যা ছিলো?
—আমি কিছুই জানি না। ডাক্তার দেখে বলতে পারবে। তুই বরং রাজকে নিয়ে এখুনি চলে আয়।
ফোন রেখে দিতেই আমেরিকা থেকে জারার ফোন এলো। হাসনা রিসিভ করতেই ওপাশ থেকে জারা বলে,
—আপু আব্বুর খবর পেয়েছো?
—-হুম,এই মাত্র খালামনির সাথে কথা হলো।
—সব হয়েছে সিতারার জন্য।
সিতারা পাশেই দাঁড়ানো ছিলো। ফোন লাউডস্পিকারে থাকার কারণে ও জারার সব কথা শুনতে পায়। হাসনার হাত থেকে ফোনটা নিয়ে জারাকে বলে,
—তুমি তো নিজের পছন্দে বিয়ে করেছো। তারপর বরের হাত ধরে বিদেশে নিজের আখের গুছাতে গিয়েছো। তখন বাবা মায়ের কথা মনে হয়নি? আর আমার বেলায় তোমরা কেউ একবার জানতে চাইলে না আমার পছন্দ আছে কিনা?
—এখানে আলাদা করে জানার কি আছে?তুই বললেই হতো।
—আব্বু আম্মু আমাকে সেই সুযোগ দিয়েছে?
এরপর ফোনের লাইন কেটে দিয়ে সিতারা হাসেমের দিকে তাকিয়ে বলে,
—তুমি কি আমার সাথে হাসপাতালে যাবে নাকি আমি একাই যাবো?
হাসেম কিছু বলার আগে হাসনা বলে,
—অবশ্যই যাবে, তোরা নাস্তা করে যা।
—না আপু, আমার কিছুই ভালো লাগছে না।
ওরা দুজন না খেয়েই হাসপাতালের দিকে রওয়ানা দিলো। বিষয়টা মরিয়ম আর জমিলার কাছে কেমন যেন লাগলো। যাক এরা এযুগের ছেলেমেয়ে। তাই নিজ থেকে কিছু বললো না। এর মাঝে রাজও মর্নিং ওয়ার্ক সেরে বাসায় চলে এসেছে। আরশাদ আর রিশাদ চৌধুরী ফজরের নামাজ পড়ে একটু ঘুমিয়ে নেন। রাজের দাদী আমেনা বেগমও তাই করেন। সে কারণে আজ সকালে এই কাহিনী ওদের সবার কাছে অজানা রয়ে যায়। তবে খাবার টেবিলে মরিয়ম বেগম হাসনাকে বলে,
—ওরা কি দুজন দুজনকে পছন্দ করে?
হাসনা কিছু বলার আগে রাজ বলে,
—সেরকম কিছু থাকলে তুমি এমনিতেই ক’দিনপর জানতে পারবে। আর হাসনা তো এখানে থাকে। ওর পক্ষে তো ওদের দুজনের মনের খবর জানা সম্ভব নয়।
মরিয়ম আর কথা বাড়ালেন না। কারো ব্যক্তিগত বিষয়ে কৌতুহল থাকা রাজ পছন্দ করে না। দেখা যাবে এখানে এমন একটা কথা বলে ফেলবে যে নিজের মান সম্মান রক্ষা করা কঠিন হয়ে যাবে।

হাসপাতালে পৌঁছে সিতারা ইমার্জেন্সিতে চলে যায়। ওখানে ওর বাবার পরীক্ষা নিরীক্ষা চলছে। সিতারাকে দেখে ওর মা রেগে গিয়ে কিছু বলতে যাবে অমনি পিছনে হাসেমকে দেখে নিজেকে সামলে নেয়। এরপর সিতারার দিকে তাকিয়ে গলা ভার করে বলে,
—-কাল রাতে কোথায় ছিলি?
সিতারা বেশ মুড নিয়ে বলে,
—বড় খালামনির বাসায়।
সায়মা হাঁফ ছেড়ে বাঁচে। কাল সিতারার বন্ধু বান্ধবদের কাছে খোঁজ নেওয়া হয়েছিলো। তবে কেউ হারিয়ে গেলে তাকে খুঁজলে তবুও পাওয়া যায় কিন্তু কেউ নীচ থেকে লুকিয়ে থাকলে সে ধরা না দিলে তাকে খুঁজে পাওয়া মুশকিল। সে কারণে ফিরোজ আর সায়মা আত্মীয়স্বজন কাউকে খুব একটা জানায়নি। তবে ফিরোজকে বুকে ব্যথা হওয়ার অভিনয়টুকু করতে হয়েছে। যাইহোক জারা যখন বাপের অসুস্থতা নিয়ে ফেসবুকে স্ট্যাটাস দিবে তখন সিতারা আর লুকিয়ে থাকতে পারবে না। কারণ সিতারা উনার উপর দুর্বল সেটা উনি জানেন। ডাক্তার বললো গ্যাসের সমস্যা হয়েছে। তবে সিতারা ভেবেছিলো ওর অন্তর্ধানে বাবা হয়তো ছেলে পক্ষকে নিষেধ করে দিবে কিন্তু বাস্তবতা হলো ভিন্ন।
সায়মা মনে মনে আল্লাহপাকের কাছে শোকরিয়া আদায় করলো। ফিরোজ বাসায় যেমন ব্যথায় কাঁতরাচ্ছিলো সায়মা ধরেই নিয়েছে, মনে হয় হার্টে সমস্যা হয়েছে। তবে হাসেমকে দেখে মনে মনে সায়মা বেশ খুশী হলো। কারণ আজকে মেহমানদের রান্নাগুলো হাসেমকে দিয়ে করিয়ে নিতে পারবেন।
সবাই মিলে বাসায় চলে আসার পর সিতারা মনে মনে ভাবলো বিপদ কেটে গিয়েছে। তাছাড়া কাল সারা রাত তেমন একটা ঘুম হয়নি। খুব ক্লান্ত লাগছে। ও নিজের রুমের দরজা বন্ধ করে ঘুমিয়ে পড়ে। সায়মা হাসেমকে ডেকে বলে,
—তুই এসেছিস ভালোই হয়েছে। আজ আবার পাত্রপক্ষ সিতারাকে দেখতে আসবে। আমাকে একটু রান্নার কাজে সাহায্য করবি।
হাসেম চমকে উঠে বলে,
—ক্যান্সেল হয়নি?
—ক্যান্সেল কেন হবে? এরকম সোনায় সোহাগা ছেলে কি সহজে পাওয়া যায়? যদি সব কিছু ঠিক থাকে তাহলে কাবিন করিয়ে রাখবো। পরে ছেলে ছ,মাস পর এসে বিয়ে করে সিতারাকে নিয়ে যাবে।

হাসেম মনে মনে বলে,এও কপালে লিখা ছিলো। নাহ্ এখানে থেকে নিজের বৌয়ের বিয়ে দেখা ওর পক্ষে কিছুতেই সম্ভব নয়। সে কারণে চলে যাওয়াই ভালো। সায়মা হাসেমের নিরবতা দেখে বললো,
—কি ভাবছিস? আমাকে একটু সাহায্য কর।
আসলে খালামনি থাকতে পারলে আমার ভালোই লাগতো। কিন্তু আমার থিসিস পেপার জমা দিতে হবে। খালুর অসুস্থতার কথা শুনে দেখতে এসেছিলাম।
—-তাহলে আর কি? আমাকে একাই ম্যানেজ করতে হবে।
হাসেম আর বেশীক্ষণ এখানে থাকতে চাইলো না। যদিও সায়মা কিছু খেয়ে যেতে বলেছিলো। কিন্তু হাসেমের পক্ষে এখানে একফোঁটা পানি খাওয়াও সম্ভব নয়। বাসা থেকে বের হয়ে বাসে করে রাজশাহীর উদ্দেশ্যে রওয়ানা দিলো। ওর খুব খারাপ লাগছে। সিতারার প্রস্তাবে রাজী হয়ে এভাবে ওকে বিয়ে করাটা একদম ঠিক হয়নি। সিতারার বিয়ের কথা শুনে হাসেমের মনে হলো কে যেন ওর হৃদয়টা একটা ধাঁরালো তলোয়ার দিকে কেটে রক্তাক্ত করে দিলো। আকাশে প্রচন্ড মেঘ জমেছে। বাসে উঠার সাথে সাথে আকাশ কালো করে বৃষ্টি নামতে শুরু করলো। মুষলধারে বৃষ্টি ঝরছে। হঠাৎ মনে হলো ওকি কাপুরুষ? নিজের বৌয়ের বিয়ের কথা শুনে এভাবে চলে আসা ঠিক হলো কিনা বুঝতে পারছে না। আসলে হাসেমের মাথা ঠিক মতো কাজ করছে না। শুধু বুকের ভিতরটা ফাঁকা লাগছে। হাসেমের চোখ দিয়ে পানি গড়িয়ে পড়ছে। কে বলে পুরুষ মানুষ কাঁদে না। হয়তো মেয়েদের মতো হাহুতাশ করে কাঁদে না তবে নিরবে হৃদয়ের অন্তপুরে বেদনার অশ্রু ঝরতে থাকে। তার কিয়দংশ কিছুটা হয়তো চোখ দিয়ে গড়িয়ে পড়ে।

চলবে

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here