Thursday, April 9, 2026
Home "ধারাবাহিক গল্প """ফেরারী বসন্ত ফেরারী বসন্ত পর্ব -পনেরো

ফেরারী বসন্ত পর্ব -পনেরো

0
4

#বড় গল্প
#ফেরারী বসন্ত
পর্ব -পনেরো
মাহবুবা বিথী

অনেকদিনপর সিতারা ছাদে পা রাখলো। পুরো ছাদে গোলাপের পাপড়ি বিছানো রয়েছে। আকাশে ঝরছে চাঁদের আলো। একটা মিষ্টি সুবাস নাকে এসে লাগছে। মনে হলো গোলাপের সুবাস। একসময় এই ছাদটা ওর পৃথিবী ছিলো। পুরো ছাদটা যেন নন্দন কাননে সেজে উঠেছে। সিতারা ঘোর লাগা আখিতে দৃষ্টি মেলে ভাবছে, এসব কি হচ্ছে ওর সাথে? হঠাৎ মনে হলো ছাদে হেলে পড়া নারিকেল গাছের চিরল চিরল পাতার আড়ালে সাদা শেরওয়ানি পরে কে দাঁড়িয়ে আছে? সিতারা নিজের দিকে তাকিয়েও অবাক হয়। ওর পরনে তো টুকটুকে লাল বেনারশী। কখন পরেছে মনে করতে পারছে না। কিছুদূরে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটার দিকে তাকিয়ে মনে হলো,
এতো সেই পরিচিত দাঁড়ানোর ভঙ্গিমা। এখন সব মনে পড়েছে। আজই তো এই মানুষটার সাথে ওর বিয়ে হয়েছে। সিতারা আস্তে আস্তে ধীর পায়ে মানুষটার পিছনে দাঁড়ালো কিন্তু ঐ মানুষটা ওর দিকে ফিরেও তাকালো না। উনাকে সিতারার স্পর্শ করতে ইচ্ছে হয়। সে কারণে যখন ছুঁতে গেল তখনি মানুষটা সরে দাঁড়াতে গেলেই ছাদের উপর থেকে নীচে পড়ে যেতে থাকে। সিতারা জোরে চিৎকার দেয়। অমনি ওর ঘুম ভেঙ্গে যায়।
ঘুম ভাঙ্গতেই বুকের ভিতরটা ব্যথায় মোঁচড়াতে থাকে। রুমের দরজা খুলে বেরিয়ে আসে। প্রতিটি রুমে গিয়ে হাসেমকে খুঁজতে থাকে। কিন্তু কোথাও হাসেমকে খুঁজে পায় না। এরমাঝে মীরা এসে বলে,
—ঘুম ভাঙ্গলো তোমার? কি গভীর ঘুমরে বাবা,কতক্ষণ ধরে দরজা নক করছিলাম।
—এই হাসেম ভাইকে দেখেছিস?
—-ভাইয়া তো চলে গেছে। আর এখন ভাইয়া ভাইয়া না করে ওয়াশরুমে গিয়ে গোসল সেরে নাও। একটুপর ছেলেপক্ষ চলে আসবে।
—-মানে কি?
—মানে হচ্ছে,ছেলে পছন্দ হয়ে গেলে চাচা তোমার কাবিন করে ফেলবে।
—কে বলেছে তোকে?
—ড্রইংরুমে সবাই কথা বলছিলো তখন আমি শুনে ফেলেছি।
এমন সময় মীরার মা রুবা হাতে একটা শাড়ির প্যাকেট নিয়ে এসে সিতারার সামনে দাঁড়িয়ে বলে,
—এখন গোসল করোনি? ওরা তো রওয়ানা দিয়েছে।
—চাচী,আমি এই বিয়ে করবো না।
—-কোনো ঝামেলা পাকিও না। মনে রেখো তোমার বাবার শরীর খারাপ। এমন কোনো কাজ করো না যাতে তোমার বাবার শরীর আবার খারাপ হয়।
সিতারা ওর চাচীর সাথে কথা না বলে কিচেনে গিয়ে ওর মাকে বলে,
—মা আমি এই বিয়ে করবো না,
—-ঠিক আছে তোকে বিয়ে করতে হবে না। শুধু শাড়ি পরে ছেলেপক্ষের সামনে গিয়ে একটু বসবি।
—বিয়ে করবো না তাহলে ওদের সামনে যাবো কেন?
—-সিতারা তোর বাবার শরীর কিম্তু ভালো না। এখানে দাঁড়িয়ে না থেকে দ্রুত শাড়ি পরে সাজুগুজু কমপ্লিট কর।
ও কিচেন থেকে বেরিয়ে আসে। মাথাটা ঝিম ঝিম করছে। একদিকে স্বপ্নের বিষয়টা মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছে অন্যদিকে এই বিয়ের ধাক্কা কিভাবে সামলাবে? নিজের রুমে এসে সিতারা হাসেমকে ফোন দেয়। কিন্তু মোবাইল সুইসস্টপ বলছে। ওর দুচোখ ভরে বাঁধভাঙ্গা অশ্রু ঝরতে শুরু করে।

হাসেম ইচ্ছে করেই মোবাইল বন্ধ রেখেছে। ও জানে,সিতারা ফোন দিয়ে কান্নাকাটি করবে। তখন হাসেমের মনটা আরো বেশী খারাপ হবে। রাজশাহী পৌঁছাতে বিকেল গড়িয়ে গেল। হাসেম বাস থেকে নেমে সোজা পদ্মা পাড়ে চলে যায়। সেখানে বালির উপর বসে পড়ে আকাশের দিকে দৃষ্টি মেলে ধরে। আকাশটা যেন আজকে অন্যরকম নীল হয়ে আছে। এম্নিতে হাসেমের কখনও আকাশ দেখতে ভালো লাগে না। আজ বালির উপর শুয়ে পুরো দৃষ্টিটা আকাশের দিকে ছড়িয়ে দেয়। কিন্তু আকাশটা আজ বড় বেশী বিষন্ন হয়ে আছে। বুকের ভিতরটা ব্যথায় মোঁচড়াতে লাগলো। ভীষণ কষ্ট অনুভব হচ্ছে। সিতারার কথা খুব মনে পড়ছে। ওর কি এতোক্ষণে আকদ হয়ে গেছে? মোবাইলটা খুলে হাসনাকে ফোন দেয়। রিং হতেই ওপাশ থেকে হাসনা ফোন রিসিভ করে বলে,
—তোর সমস্যাটা কি? হঠাৎ আসলি আবার চলেও গেলি। কিছ বুঝলাম না।
—সিতারার খবর কিছু জানো?
—-আমার শরীরটা ভালো লাগছিলো না তাই যাইনি। আমি যাইনি বলে রাজও যায়নি। সেকারণে বলতে পারছি না আকদ হলো কিনা?তুই সিতারাকে ফোন দিলেই তো সব জানতে পারতিস।
—-তা পারতাম,
—-তুই কি সিতারাকে পছন্দ করিস?
—না না সেসব কিছু না। এমনিই জিজ্ঞাসা করলাম।
হাসেম দ্রুত ফোন রেখে দিলো। এরপর একটা অটো ভাড়া করে হলের দিকে রওয়ানা দিলো। চারিদিক অন্ধকার হয়ে আসছে। হলের কাছে পৌঁছাতে ভাড়া মিটিয়ে ভিতরে প্রবেশ করে। রুমে এসে আগে শাওয়ার নিয়ে নেয়। পেটের ভিতর শব্দ হচ্ছে। ক্ষিদা লাগলে ওর পেটে কেমন অদ্ভুত শব্দ হতে থাকে। ঘরে বিস্কুট আর চানাচুর আছে। বের করে মুখে দিতেই ভীষণ তিতা লাগলো। মুখে কোনো স্বাদ নেই। ফোনটা বেজে উঠলো। তাকিয়ে দেখে সিতারা ফোন দিয়েছে। হাসেম ফোন রিসিভ করে না। সিতারা একের পর এক কল দিতেই থাকে। কিন্তু হাসেম রিসিভ করে না। একসময় ফোনটা মিউট করে রাখে। তারপর নিজের থিসিস পেপার নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। ওদিকে হাসেম ফোন রিসিভ করেনি দেখে অভিমানে সিতারাও আর ফোন দেয়নি। একটানা সাতদিন পরিশ্রম করে থিসিস পেপার জমা দেয়। তবে রুমে আসার পর শরীর কেঁপে জ্বর আসে। জ্বরের ঘোরে হাসেম সিতারার নাম ধরে ডাকতে থাকে। একসময় ও জ্ঞান হারিয়ে ফেলে। ওর রুমমেট আসিফ ওকে রাজশাহী মেডিকেলে ভর্তি করে।

সিতারা এসে বারান্দায় বসে। একটা দাঁড়কাক কখন থেকে কা কা করেই যাচ্ছে। ঘরে সকালে বানানো একটা রুটি ছিলো। সিতারা রুটিটা এনে বারান্দার গ্রীলে রাখতেই কাকটা ছোঁ মেরে রুটি নিয়ে চলে যায়। যাক কাকের চেঁচামেঁচি থেকে রক্ষা পাওয়া গেলো। সিতারা বারান্দায় পেতে রাখা চেয়ারটায় বসে। আজ সকাল থেকে হাসেমের কথা ওর খুব মনে পড়ছে। ওর কথা ভাবতেই দুচোখ জলে টইটম্বুর। হাসেমের কথা মনে হলে কেন চোখ ভর্তি করে অশ্রুর ঢল নামে সিতারা বুঝতে পারেনা। অথচ সাতদিন আগে হাসেমের সাথে ওর বিয়ে হয়েছে। যেভাবেই বিয়েটা হোক না কেন তিন কবুল বলে আল্লাহপাকের কালাম স্বাক্ষী রেখে বিয়ে হয়েছে। অথচ এই সাতদিন ঐ মানুষ ফোন দিয়ে একটা খবর নিলো না। এমনকি ওর ফোনও রিসিভ করলো না। তার জন্য ওর চোখে পানি কেন আসে ও বুঝতে পারে না। হঠাৎ অপরিচিত নাম্বার থেকে ফোন আসে। ধরবে না ভেবেও সিতারা ফোন রিসিভ করলো। সাথে সাথে ওপাশ থেকে পুরুষ কন্ঠে একজন বলে,
—আপনি কি সিতারা বলছেন?
—-জ্বী,
—-আপনাদের বিয়েতে স্বাক্ষী হয়েছিলাম। আমি আসিফ বলছি,
—-বলুন কি বলতে চান?
—-হাসেমকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। জ্বরের ঘোরে ও আপনার নাম ধরে ডাকছে। আপনি কি আসতে পারবেন?
—ঠিক আছে, আমি আসছি।
সিতারা রাজশাহীতে হাসেমের কাছে যাচ্ছে। এই কথাটা একটা কাগজে লিখে পেপার ওয়েট দিয়ে চাপা রাখলো। তারপর কিছু টাকা ব্যাগে ভরে একটা অটো নিয়ে বাসস্টান্ডের দিকে রওয়ানা দিলো। সামনে বাসটা পেলো সেটাতেই উঠে বসে। ঘন্টাখানিক পর ফোনটা বেজে উঠে। স্ক্রীনে তাকিয়ে দেখে ওর মা ফোন দিয়েছে। রিসিভ করতেই ওপাশ থেকে কর্কশ কন্ঠে সায়মা বলে,
—তুই কার অনুমতি নিয়ে রাজশাহী রওয়ানা দিয়েছিস?
—-আমার নিজের অনুমতি নিয়ে রওয়ানা দিয়েছি।
—-ওর সাথে তোর এতো খাতির কবে থেকে হলো যে জ্বরের কথা শোনা মাত্রই লজ্জাশরমের মাথা খেয়ে রওয়ানা দিয়েছিস?
—হাসেম আমার কেমন খাতিরের মানুষ তুমি রাজশাহী আসলে জানতে পারবে। আর কথা বলতে ইচ্ছে হচ্ছে না। মাথাটা ব্যথা করছে। ফোন রাখলাম।
—-এই ফোন রাখবি না,কথা এখনও শেষ হয়নি।
—-বলো কি বলবে?
—-তুই এতো নির্লজ্জ কবে থেকে হয়েছিস? একটা সোমত্ত মেয়ে আর একটা সোমত্ত ছেলের কাছে ছুটে যাচ্ছে। দেখতে ভীষণ খারাপ লাগছে। লোকে কি বলবে?
—-লোকে কি বলবে সেটা পরেও ভাবা যাবে। কিন্তু এই মুহুর্তে আমি না গেলে হাসেম ভাইয়ের অনেক বড় ক্ষতি হয়ে যেতে পারে।

চলবে

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here