#বড় গল্প
#ফেরারী বসন্ত
পর্ব-বিশ
মাহবুবা বিথী
প্রতিদিনের মতো হাসনা ঘুম থেকে উঠে ফজরের নামাজ আদায় করে কিচেনে গিয়ে চুলায় চায়ের পানি চাপিয়ে দেয়। রাজ এসময় মর্নিং ওয়ার্ক করতে বাইরে বের হয়।চা বানিয়ে ফ্লাক্সে ঢেলে টেবিলে কাপ সহ রেখে দেয়। সাথে মুড়ি মাখা। ওর শ্বশুর আর চাচা শ্বশুর দুজনেই টেবিলে এসে কাপে চা ঢেলে নেয়। মুড়ি মাখা দিয়ে খেতে থাকে। এই ফাঁকে হাসনা চা আর মুড়িমাখা নিয়ে ওর দাদী শাশুড়ীর রুমে যায়। দাদী শাশুড়ী তখন নামাজ শেষ করেছেন। হাসনাকে দেখে মুচকি হেসে বলেন,
—শরীর কেমন আছে?
—আলহামদুলিল্লাহ, দাদীমা ভালো আছি।
চায়ের কাপটা আমেনা বেগমের হাতে তুলে দিয়ে হাসনা বলে,
—দাদী আপনার চা,
আমেনা বেগম চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে বলে,
—এবার একটা ছেলে হলে ভালো হয়।
সাথে সাথে হাসনার বুকের ভিতরটা মোচড় দিয়ে উঠে। মনে মনে বলে সাত সকালে এই প্রসঙ্গটা সামনে আনার কি দরকার ছিলো। সাথে সাথে ওর এটাও মনে হয়, মেয়ে হলে এরা কি কেউ খুশী হবে না? অথচ একজন মায়ের কাছে ছেলে সন্তান যেমন প্রিয় তেমনি মেয়ে সন্তানও। এমন সময় জারার শাশুড়ী জমিলা বেগম রুমে আসেন। হয়তো আমেনা বেগমের কথাগুলো শুনেছেন। সেই কথার সুত্র ধরে জমিলা বেগম বলেন,
–আম্মা,আজকাল ছেলে কিংবা মেয়ের কোনো তফাৎ নেই। উভয়কে একইভাবে বড় করে তুলতে হয়।
আমেনা বেগমও বলেন,
—-তা অবশ্য ঠিকই বলেছো।
হাসনা মনে মনে বলে এটাই যদি আপনারা মানেন তাহলে এই প্রসঙ্গে কথা বলার কি দরকার ছিলো। এরমাঝে ডোরবেল বেজে উঠে। বেল বাজার ধরণ দেখে হাসনা বুঝে ফেলে রাজ এসেছে। পরপর তিনবার চাপ দেয়। হাসনা দরজা খুলে দেয়। রাজ ভিতরে এসে ডাইনিং এর চেয়ারটায় বসে পায়ের মোজাগুলো খুলে ফেলে। গায়ের টিশার্টও ঘেমে গিয়েছে। ওটাও খুলে ফেলে। মনোয়ারা বেগম ততক্ষণে টেবিলে এসে বসেন। ফ্লাক্স থেকে চা কাপে ঢেলে নিয়ে তাতে চুমুক দিয়ে বলেন,
—-,হাসনার চারমাস হয়ে গেলে আলট্রাসনো করতে হবে।
—-এই সিদ্ধাম্তটা ডাক্তার নিবে। আমরা তো ডাক্তারের অনুমতি ছাড়া ইচ্ছে করে ওর সনোগ্রাফি করাতে পারি না।
—তাহলে এবার আমাকে তোদের সাথে নিয়ে যাস। আমিই ডাক্তারকে বলবো।
—-তুমি এতো সনোগ্রাফি নিয়ে ব্যস্ত হচ্ছো কেন?
—-কারণ আছে।
এরমাঝে রাজের বাবা আরশাদ চৌধুরী বললেন,
—-তোর মা যেহেতু বলছে নিশ্চয় কোনো কারণ আছে।
রাজ ওর চাচার দিকে তাকিয়ে বলে,
—-চাচা,আজ তুমি আমার আগে অফিসে গেলে ভালো হয়। আরশীর স্কুলে প্যারেন্টস মিটিং আছে। আমাকে যেতে হবে।
—-ঠিক আছে,
এর মাঝে হাসনা টেবিলে দুটো সিদ্ধ ডিম আর ব্লাক কফি দিয়ে যায়। সাথে সাথে রাজ বলে,
—-এখান থেকে একটা ডিম নিয়ে যাও। তোমাকে আবার ওষুধ খেতে হবে। ডিমটা খেয়ে ওষুধ খেয়ে নিও।
মনোয়ারা বেগম ছেলের দিকে তাকিয়ে বলেন,
—তুই তো প্রতিদিন দুটো ডিম খেয়ে নিস। আজ আবার একটা খাচ্ছিস কেন? দরকার হলে হাসনা একটা সিদ্ধ করে নিবে।
—-মা আমি ছোটা বাচ্চা নই। আমার কখন কোনটা খেতে হবে সেটা আমি খুব ভালোভাবে জানি। বরং হাসনা নিজের প্রতি বড্ড অবহেলা করে। সে কারনে ওকে খেতে বললাম।
কিচেনে এসে হাসনা ডিমটা খেয়ে নেয়। তবে ওর খুব নার্ভাস লাগে। হাসনা জানে সনোগ্রাফি করার কারণটা কি? ছেলে না মেয়ে হবে ওর শাশুড়ী জানতে চায়। কিন্তু সনোগ্রাফি করার কারণ রাজ তো ওর মাকে জিজ্ঞাসা করতে পারতো? কিন্তু ওতো কিছু জিজ্ঞাসা করলো না বরং ওর মায়ের আমাদের সাথে ডাক্তারের কাছে যাওয়াটা মেনে নিলো। এদিকে সায়েরা আর আরশীর স্কুলে যাওয়ার সময় চলে আসলো। হাসনা ওদের টিফিন রেডী করে রুমে গিয়ে ওদেরকে ডেকে তুলে। সকালে ওরা নাস্তা খেতে পারে না। ওদের নাকি বমি বমি লাগে। সে কারণে হাসনা টিফিন একটু বেশী করে দেয়। মেয়ে দুটো ওর বেশ বুদ্ধিমতী। শুধু ঘুম থেকে ডেকে তুলে দিলেই হয়। বাকি কাজ যেমন দাঁত ব্রাশ করা, হাতমুখ ধোয়া, ব্যাগটা গুছিয়ে নেওয়া স্কুলের ড্রেস পড়ে রেডী হওয়া সব ওরা নিজেরাই করে নেয়। আরশী অবশ্য সায়েরাকে সাহায্য করে। এর মাঝে ওর শাশুড়ী আর চাচী শাশুড়ী মিলে নাস্তা রেডী করে ফেলে। হাসনার শরীরটা একটু অসুস্থ বোধ করাতে বিছানায় শরীরটা এলিয়ে দেয়।
হাসেমকে দেখতে না পেয়ে সিতারা ওর মোবাইলে ফোন দেয়। কিন্তু মোবাইল সুইচ অফ বলছে। বেশ কয়েকবার ফোন দেয় কিন্তু প্রতিবার একই রেজাল্ট আসে। এদিকে আসমা বেগম সিতারাকে নাস্তা করার জন্য ডাকে। অগত্যা হাসেমকে ছাড়াই সিতারা, আসমা বেগম,আর ওর শ্বশুর রায়হান মাস্টার একসাথে নাস্তা করে নেয়। কিন্তু সিতারা মনে মনে হাসেমের জন্য খুব অস্থির হয়। সকাল গড়িয়ে ঘড়ির কাঁটা দুপুর দুটোয় পৌঁছায়। সিতারা বাসার সামনে একটা অটো থামার শব্দ পায়। জানালা দিয়ে তাকিয়ে দেখে হাসেম অটো থেকে নামছে। ওর প্রচন্ড অভিমান হয়। বিছানায় ঘুমের ভাণ করে শুয়ে থাকে। হাসেমকে বাসায় ঢুকতে দেখে আসমা বেগম বলেন,
—-সাত সকালে কোথায় বেরিয়েছিস? আর এখন তোর ফেরার সময় হলো। মোবাইল অফ রেখেছিস কেন? সিতারা তোকে বহুবার ফোন দিয়েছে।
–চার্জ শেষ হয়ে গিয়েছে। দেখ হাসেম,বিয়ের আগে যা করেছিস এখন আর এগুলো করতে যাবি না। এভাবে হুটহাট করে বাসা থেকে বের হওয়া যাবে না। মনে রাখিস, এখন তোর ঘরে বউ আছে।
—ঠিক আছে, এখন সবাইকে বলে বের হবো।
—সিতারাকে জানালেই হবে।
হাসেম রুমে ঢুকে গলায় শব্দ করে। কিন্তু সিতারার কোনো সাড়া শব্দ নেই। একসময় সিতারার অনামিকায় হাসেম একটা আংটি পরিয়ে দেয়। সিতারা শোয়া থেকে উঠে বসে। এরপর আংটির দিকে তাকিয়ে বলে,
—-তুমি আংটি কেনার জন্য সাতসকালে বেরিয়ে ছিলে?
—-হুম,বিয়ে উপলক্ষে তোমাকে আমি কিছুইতো দেইনি।
—-আংটিটা সুন্দর হয়েছে।
—-পরে দেখো অনামিকায় ঠিকঠাক মতো লাগে কিনা?
হাসনা আঙ্গুলে পরে দেখে একদম ঠিক আছে। ও অবাক হয়ে হাসেমকে বলে,
—তুমি তো আমার আঙ্গুলের মাপ নাওনি তাহলে এতো সঠিকভাবে কি করে আনলে?
— চোখের আন্দাজে কিনেছি। আমার প্রিয়তমার আঙ্গুলের মাপ যদি নাই জানলাম তাহলে আমি কেমন প্রেমিক?
এরপর হাসেম শার্টের পকেটে থেকে আর একটা লাল রঙের ছোটো বাক্স বের করে। সিতারা অবাক হয়ে বলে,
—আংটি দুটো এনেছো কেন?
—-আগে দেখোই না এতে কি আছে?
হাসেম একটা সাত পাথরের সোনার নাকফুল বের করে সিতারার হাতে দিয়ে বলে,
—-আজ এটা পরো। ইনশাআল্লাহ,একদিন আমার অনেক টাকা হবে সেদিন তোমাকে ডায়মন্ডের নাকফুল আর আংটি কিনে দিবো।
আনন্দের আতিশয্যে সিতারার মুখটা জ্বল জ্বল করছে। হাসেম সিতারার দিকে তাকিয়ে ভাবে,
“এই মেয়েটা খুব অল্পতেই খুশী হয়ে যায়।”
হাসেম অপলক দৃষ্টিতে সিতারার মুখের দিকে তাকিয়ে থাকে। হাসলে মেয়েটাকে ভীষণরকম সুন্দর লাগে। সিতারা আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নাকফুলটা পরার চেষ্টা করে কিন্তু পেরে উঠে না। এমনসময় হাসেম এগিয়ে এসে বলে,
—কাছে এসো,আমি তোমাকে পরিয়ে দিচ্ছি।
সিতারা হাসেমের একদম নিকটে চলে আসে। হাসেম সিতারাকে নাকফুল পরাতে গেলে ও জোরে হাঁচি দেয়। এতে নাকফুলটা ছিটকে পড়ে। হাসেমের মুখের উপর হাঁচি দেওয়াতে ও বিরক্ত হয়ে বলে,
—-তুমি এটা কি করলে?
—-কি করলাম?
—-এভাবে কেউ মুখের উপর হাঁচি দেয়?
—-বাইরের মানুষ তো দেয়নি। তোমার বউ দিয়েছে। তাতে সমস্যা কি?
—তোমার সব জীবানু আমার মাঝে ছড়িয়ে পড়লো।
—কত কিছু এখন ছড়িয়ে পড়বে। নাকফুলটা খুঁজে বের করে আমাকে আবার পরিয়ে দাও।
হাসেম রেগে গিয়ে বলে,
—-তুমি খুঁজে আন।
—- জ্বী না,তোমাকেই খুঁজতে হবে।
হাসেম জানে,ও যখন খুঁজবেনা বলে সিদ্ধান্ত নিয়েছে সুতরাং ওকে খুঁজতে হবে। অগত্যা হাসেম নাকফুল খুঁজতে শুরু করে। তাছাড়া আংটি আর নাকফুলটা কিনতে ওর পঞ্চাশ হাজার টাকা খরচ হয়েছে। ওর তিনমাসের টিউশনির টাকা। বেশিদূরে পড়েনি। খাটের পায়ার কাছে পড়ে ছিলো। নাকফুলটা তুলে সিতারার হাতে দিয়ে বলে,
—তোমার জিনিস তুমি পরে নাও।
—জ্বী না তুমি বলেছো পরিয়ে দিবে সুতরাং তোমাকেই পরিয়ে দিতে হবে।
অগত্যা হাসেম নাকফুল পরাতে শুরু করে। ওর ঘনশ্বাস সিতারার উপর পড়তে থাকে। সিতারার দেহ মন রোমাঞ্চিত হয়ে উঠে। নাকফুল পরাতে গিয়ে হাসেম সিতারার মুখটা খুব কাছ থেকে দেখতে পায়। কত নিশ্পাপ মুখশ্রী। অথচ কি ত্যাড়া টাইপের মেয়েরে বাবা!এমন সময় আসমা বেগম ওদের দুজনকে দুপুরের খাবার খেতে ডাকলেন। নাকফুল পরানো হলে হাসেম সিতারাকে বলে,
—এতো কষ্ট করে নাকফুল পরিয়ে দিলাম আমাকে গিফট দিবে না?
—-কিসের গিফট? মা খেতে ডাকছে, আমি গেলাম।
একথা বলেই সিতারা দৌড়ে ঘর থেকে বেরিয়ে যায়। হাসেম ওকে দৌড়ে যেতে দেখে মনে মনে বলে,
“পাগলি একটা।”
চলবে





