Thursday, April 9, 2026
Home "ধারাবাহিক গল্প """ফেরারী বসন্ত ফেরারী বসম্ত পর্ব- ষোলো

ফেরারী বসম্ত পর্ব- ষোলো

0
4

#বড় গল্প
#ফেরারী বসম্ত
পর্ব- ষোলো
মাহবুবা বিথী

সিতারা মোবাইল সুইসস্টপ করে রেখে দিলো। ও জানে ওর মা ওকে এখন একটানা বকে যাবে। এই মুহুর্তে আম্মুর বকবক ওর ভালো লাগছে না। হাসেমভাই কেমন আছে কে জানে? হাসেমভাই বলে সিতারা মনে মনে শুধরে নিলো। আসলে হাসেম এখন ওর হাজবেন্ড। আর যাই হোক হাজবেন্ডকে ভাই বলাটা মনে হয় শোভন দেখায় না। ওদিকে সায়মা সিতারাকে মোবাইলে বার বার ফোন দিতে থাকে। কিন্তু মোবাইল সুইচস্টপ বলছে। সিতারার চাচী সহ সবাই তখন ড্রইংরুমে বসে আছে। সায়মাকে বার বার ফোন করতে দেখে রুবা মানে সিতারার চাচী ফোড়ন কেটে বলে,
—-আর ফোন দিয়ে লাভ নেই। যা ঘটার তাতো ঘটেই গিয়েছে। তবে হাসেম তোমার বোনপো হলে কি হবে ওকে আমার বরাবর ধান্ধাবাজ মনে হতো। এই ধরনের ছেলেরা গাছেরও খায় তলারটা কুড়ায়।
রুবার কথা শুনে সায়মার মনে মনে সিতারার উপর প্রচন্ড রাগ হলো। আজ সিতারার কারণে ওকে এই কথাগুলো শুনতে হলো। তবে রুবার উপরও চটে গিয়ে মনে মনে বললো,
“নিজের ঘর আগে সামলাও। তোমার মেয়ে স্কুলের গন্ডি এখনো পেরোয়নি তাতেই প্রেম করা শিখে গিয়েছে। আর এমন ছেলের সাথে প্রেম করে যে প্রতি ক্লাসে ফেল করে পরের বছর পাশ করে। আমার মেয়ে কিংবা বোনপোকে নিয়ে তোমায় ভাবতে হবে না।”
রুবার কথা শুনে সিতারার বাবা ফিরোজ রেগে গিয়ে বলে,
—-এখানে হাসেমের দোষটা কোথায়? দোষ যা করেছে সেটা সিতারাই করেছে।
রুবা ফোস করে উঠে বলে,
—-আপনার মতো ভালো মানুষের চোখে ঐসব বদমায়েশ ছেলেদের ত্রুটি ধরা পড়বে না।
ফিরোজ এবার রেগে গিয়ে বলে,
–রুবা,কিসব বলছো? হাসেম খুবই ভদ্র একজন ছেলে। তুমি আর ক’দিন দেখেছো? আমি ছোটোবেলা থেকে হাসেমকে ভদ্র ছেলে হিসেবে জানি।
সায়মা রেগে গিয়ে বলে,
—এসব আজাইরা প্যাঁচাল বাদ দিয়ে আমার সাথে রাজশাহী চলো।

ওদিকে সিতারার রাজশাহীতে পৌঁছাতে রাত আটটা বেজে যায়। একটা অটো নিয়ে রাজশাহী মেডিকেলের দিকে রওয়ানা দেয়। হাসপাতালে পৌঁছে আগে রিসিপশনে একটা কেবিনের জন্য চেষ্টা করে। তবে খুব তাড়াতাড়ি কেবিন পেয়ে যায়। আসলে জেলা শহর গুলোতে কেবিন খালি পড়ে থাকে। এরপর ওয়ার্ডে গিয়ে দেখে সিতারা হাসেমের দিকে তাকিয়ে অবাক হয়। হাসেমের চোখের নীচে কালো দাগ পড়েছে বেশ অনেকখানি জায়গা জুড়ে। চেহারা হয়েছে কাকের মতো। মুখ ভর্তি দাড়িগোঁফ। স্যালাইন দেওয়া হচ্ছে। সিতারাকে দেখে আসিফ হাসেমের কাছ থেকে ছুটে এসে সিতারাকে বলে,
—আপনার হাসপাতালে আসতে কোনো অসুবিধা হয়নি তো?
—না তেমন কোনো সমস্যা হয়নি। হাসেম এখন কেমন আছে?
—দুপুরের পর জ্বর আর আসেনি।
সিতারা লক্ষ্য করে আসে পাশের রুগীর বেড থেকে তাদের এটেনডেন্টরা উঁকি ঝুঁকি মারছে। আসলে পুরুষ ওয়ার্ডের সামনে এরকম এক সুন্দরী তরুনী দাঁড়িয়ে আছে তাকে দেখার জন্য উঁকি মারবে এটাই স্বাভাবিক। আসিফ সিতারার দিকে তাকিয়ে বলে
—আপনি এখানে কিভাবে থাকবেন? ওয়ার্ডের অবস্থা ভালো নয়। তাছাড়া বাথরুমের অবস্থা বেশী খারাপ। দুর্ভাগ্যজনক হলেও এটাই সত্যি রুগীর সাথে যারা থাকতে আসে তারাই মনে হয় বাথরুম ব্যবহার করতে জানে না। আসিফের কথা শুনে সিতারার বিরক্ত লাগলো। সেটা গোপন রেখে আসিফকে বলে,
—আসার সময় কেবিন ঠিক করে এসেছি। আপনি শুধু ওকে কেবিনে শিফট করার ব্যবস্থা করুন।
আসিফ সিতারার আপাদমস্তকে চোখ বুলিয়ে মনে মনে বলে,
—-হাসেম তোর কপাল বটে। এরকম একটা নারী তোর জীবনে জোটাতে পেরেছিস। যে তোর সেবার করার জন্য ছুটে এসেছে। মনে হচ্ছে তোর কপালের সাথে আমার কপালটা ঘষে নেই।
সিতারা আসিফের দিকে তাকিয়ে বলে,
—এভাবে এখানে দাঁড়িয়ে থাকলে রোগী তো শিফট করা যাবে না তাই না?
—ওহ্ সরি,এখনি সব ঠিক করে দিচ্ছি।
আসিফ সাথে সাথে ওয়ার্ড বয় ডেকে ঘুমন্ত হাসেমকে স্টেচারে করে কেবিনে নিয়ে বেডে শুয়ে দিলো। সিতারা তখন করিডোরে দাঁড়িয়েছিলো। আসিফকে নিষেধ করে দিয়েছে ওর আসার খবর যেন হাসেমকে না জানায়। বিছানায় শোয়ার সাথে সাথে হাসেমের ঘুম ভেঙ্গে যায়। আসিফের দিকে তাকিয়ে বলে,
—-ওয়ার্ডে তো ভালোই ছিলাম,কেবিনে আনলি কেন? তাছাড়া কেবিনের খরচ এখন কে বহন করবে? এমনি আমার পকেট খালি হয়ে আছে।
—সেসব নিয়ে তোকে ভাবতে হবে না। আমি একটু বাইরে থেকে আসছি।
আসিফ চলে যাবার পর হাসেম বিছানায় পাশ ফিরে শুয়ে চোখ বন্ধ করে রাখে। সিতারা কেবিনে ঢুকে বেডের পাশে রাখা চেয়ারটায় বসে পড়ে। এরপর হাসেমের কপালে হাত দিয়ে বলে,
—কেমন আছো?
হাসেম চমকে উঠে পাশ ফিরে সিতারার দিকে তাকিয়ে বলে,
—তুমি এসময় কোথা থেকে আসলে?
—যেখান থেকে আসা দরকার সেখান থেকেই এসেছি।
—তোমার হাজব্যান্ড জানতে পারলে বিষয়টা খারাপ হবে। তাছাড়া—-
—থামলে কেন? তাছাড়া কি?
—-আমার বোনের ডিভোর্স হওয়াতে আমি বুঝি একজন ডিভোর্সী মেয়েকে এই সমাজ কি চোখে দেখে? তাই আমি চাই না তোমার এমন কিছু হোক।
—আমিও চাই না বলেই তোমার কাছে চলে এসেছি। আমার সেদিন বিয়ে হয়নি। ছেলেপক্ষ আংটি পরিয়ে চলে গিয়েছে। ওরা চলে যাওয়ার পর আমি আংটি খুলে রেখে দিয়েছি। আর আজ পুরোপুরি তোমার কাছে চলে এসেছি।
—-কিন্তু খালা খালু কি এই বিয়েটা মেনে নিবেন?
—-না নিলে সমস্যা নেই। তোমারও গ্রাজুয়েশন শেষ আর আমারও সামনে শেষ হয়ে যাবে। তুমি একটা চাকরি যোগাড় করতেই পারবে। আমিও দুটো টিউশনি করবো। এতে আমাদের টেনাটুনির সংসার ভালোই চলবে।
—কিন্তু আমি খালা খালুকে কষ্ট দিতে চাই না।
হাসেমের কথায় সিতারার প্রচন্ড অভিমান হলো। নিজের অভিমান প্রকাশ না করে হাসেমকে বলে,
—ঠিক আছে, তোমাকে কাউকে কষ্ট দিতে হবে না। রাতটা পার হলে আমি কাল সকালে চলে যাবো।
এরমাঝে দরজায় নক করার শব্দ হলো। সিতারা দরজা খুলে দেখে আসিফ হোটেল থেকে খাবার কিনে এনেছে। সিতারার হাতে খাবার বুঝিয়ে দিয়ে ও হলে চলে যায়। সিতারা খুব স্বাভাবিকভাবে হাসেমকে খাবার দেয়। নিজেও একটুখানি খিচুড়ী আর ইলিশমাছের ভাজি আর বেগুন ভাজি দিয়ে খেয়ে নেয়। হাসেম খাওয়া শেষ করে ওষুধ খেয়ে নেয়। সিতারা খাওয়া শেষ করে কেবিনের বাইরে চলে আসে। রাত বারোটা বাজে। পুরো হাসপাতাল আস্তে আস্তে নিরব হয়ে যাচ্ছে। করিডরের কিছু লাইট অফ করে দেওয়া হলো। হাসেমের কেবিনটা এক পাশে থাকাতে সিতারার ভালোই হলো। ও পেতে রাখা চেয়ারটায় বসে নিজের দৃষ্টি বাইরে মেলে ধরে আর মনে মনে ভাবে,
“কি মানুষকে ও ভালোবেসেছে? যে কিনা ওর ভালোবাসার গভীরতা অনুভব করতে পারলো না।”
ওর দুচোখ বেয়ে অশ্রু গড়িয়ে পড়লো। তবে কিছুক্ষণ পর নিজের চোখের পানি মুছে মনে মনে বলে,একজন কাপুরুষের জন্য চোখের পানি ফেলা উচিত নয়।
আকাশে আজ চাঁদের ফকফকা জোছনা ঝরছে। সিতারা দৃষ্টিটা বাইরে মেলে ধরে। দূরে ঘন বৃক্ষরাজী দেখে ওর মনে হলো ঐ জায়গাটা যেন বৃক্ষের দুর্গ। অনর্গল ঝিঁঝিঁ পোকা ডেকে চলেছে। সিতারা এখানে ঘুমিয়ে পড়তে মন চাইছে। তবে সেটা মনে হয় ঠিক হবে না। সিতারার মন আজ বড় শান্ত। কারণ ও আজ বুঝে গিয়েছে আর যাই হোক জোর করে কারো ভালোবাসা আদায় করা যায় না।
—সিতারা,
সিতারা পাশ ফিরে তাকিয়ে হাসেমকে বলে,
—দেখো, বাইরে আজ কি সুন্দর জোছনা,আমি আজ সারারাত এখানে বসে কাটিয়ে দিবো।
এরপর কিছুক্ষন নিরব থেকে হাসেমকে বলে,
—তুমি আমাকে নিয়ে কোনো প্যারা নিও না। আমি খুব দ্রুত তোমাকে মুক্ত করে দিবো।
হাসেমের বুকের ভিতরটা মোঁচড় দিয়ে উঠে। ও তো সিতারাকে অনেক ভালোবাসে। হাসেম কেবিনে এসে একটা চাদর নিয়ে সিতারাকে দিয়ে বলে,
—এটা গায়ে জড়িয়ে নিও। ঠান্ডা লেগে যেতে পারে।
সিতারার কিছু কঠিন কথা হাসেমকে শোনাতে মন চাইছিলো। ওর বাঁচামরাতে কার কি এসে যায়। পরক্ষনেই নিজেকে সামলে নেয়।
খুব ভোরে সায়মা আর ফিরোজ চলে আসে। সিতারা তখন ওয়াশরুমে গিয়ে ফ্রেস হচ্ছিলো। সায়মা আর ফিরোজ সিদ্ধান্ত নিয়েছে, হাসেমের সাথেই সিতারাকে বিয়ে দিবে। ঘরের ছেলেমেয়ে ঘরেতে থেকে যাবে। ফিরোজ রুমে এসে হাসেমকে দেখে বলে,
—-এখন কেমন আছো?
—-ভালো,আঙ্কেল আপনার সাথে আমার কিছু কথা আছে।
সিতারা ওয়াশরুম থেকে বের হয়ে হাসেমের মুখের দিকে অবাক হয়ে তাকায়। আর মনে মনে বলে, বোবার মুখে দেখি কথা ফুটেছে।”ও জানতো ওর বাবা মা চলে আসবে। সে কারণে উনারা আসাতে সিতারা অবাক হয় নাই। তবে হাসেম কি বলবে সেটা শোনার জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করতে লাগলো।
—-আঙ্কেল আমি সিতারাকে অনেক ভালোবাসি।
—তাতো বুঝতেই পারছি। তা,না হলে আমার মেয়ে এভাবে ছুটে আসে?
এবার হাসেম মাথা নিচু করে বলে,
—-আমি একটা অপরাধ করে ফেলেছি।
একথা শুনে তিনজনই ওর মুখের দিকে তাকালো।
—-আপনাদের না জানিয়ে আমি ওকে বিয়ে করে ফেলেছি।
একথা শুনে সিতারা রেগে গিয়ে বলে,
—না, তুমি আমাকে বিয়ে করোনি। বরং আমি তোমাকে জোর করে বিয়ে করেছি।

চলবে

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here