Sunday, April 5, 2026

বাবুই নীড়ে তারা দু’জন-০১

0
3

সেদিন সন্ধ্যায় বাবা এবং মায়ের ভেতর একটা তুমুল ঝগড়া বেঁধে গেল।ঝগড়ার এক পর্যায়ে বাবা আক্ষেপ,রাগ আর চাপা ক্রোধটুকু ঢেলে দিয়ে বলল,”তুমি আসলে কেনোদিন আমাকে ভালোই বাসো নি রিধি।নট ফর আ সিঙ্গেল ডে।সংসার করতে হবে।তাই করেছো।কিন্তু সংসার করার পাশাপাশি যে অন্যজনকে ভালোও বাসতে হয়,সেটা তোমার এথিক্সে নেই।এজন্য কম্প্রোমাইজ করতে তোমার এতো বাঁধে।কারণ আমি তোমার প্রথম প্রেম নই।”

মা হকচকিয়ে গেল।এমন একটা মুহূর্তে বাবার মুখে এই কথাটা মা কে কেমন স্তব্ধ করে দিলো।এরপর আর কোনো কথা বলে নি মা।না কোনো শব্দ।না কোনো উচ্চ বাক্য।বোঝা পড়া আর এডজাস্টমেন্টের কোনোরকম তোয়াক্কা না করে মা সেদিন রাতেই আমাকে নিয়ে বাড়ি থেকে বেরিয়ে এলো।

তখন মায়ের এক হাতে আমি।অন্য হাতে একটা লাগেজ।ওহ হ্যাঁ।সাথে চোখ ভর্তি পানি।ঐ পানি মা সহানুভূতি পাওয়ার আশায় ফেলে নি।বাড়িতে থাকতে মায়ের চোখে কোনো বিশেষ ভাষা ছিলো না।মা কাঁদলো বাড়ি থেকে বেরিয়ে।যখন নিয়ন আলোর কৃত্রিম আভায় পিচঢালা রাস্তা বিমর্ষ হয়ে সেজেছিল,তখন মা আমাকে কোলে নিয়ে নিরবে অশ্রু ঝরিয়ে সামনে এগিয়ে গেল।আমার বয়স তখন মাত্র এক।নয়তো সেদিন আমিই মায়ের চোখ মুছে দিতাম।মা কে আলতো করে ধরে বলতাম,”কাঁদে না মা।তোমার মতো লক্ষী মানুষের চোখে এমন বড় বড় ফোঁটার জল মানায় না।”

মা আমাকে নিয়ে নানাভাইয়ের কাছে গেল না।বললাম না,মা খুব লক্ষী মানুষ।নানা ভাইয়ের কাছে গেলে তার চোখে বাবার অবস্থান খুব নিচে নেমে আসতো।মা চায় নি,তার সন্তানের বাবাকে তার পিতা ছোটো করে দেখুক,মন্দ বলে জানুক।তাই স্বামী স্ত্রীর বোঝাপড়া টুকু স্বামী স্ত্রীর ভেতরে রেখে মা উঠল তার এক বান্ধবীর বাসায়।যাকে কথা বলতে শেখার পর আমি ডাকতাম,তুনু।আসলে তার নাম-তৃণা।

আমার জন্ম হয়েছিল দু’হাজার বিশ সালে,করোনা মহামারীর ঠিক মাঝামাঝি সময়ে।তখন মায়ের স্বাস্থ্যের অবস্থা খুব বেশি খারাপ হয়ে গিয়েছিল।প্রথমবার প্রেগন্যান্সিতে মানুষ বেশ কিছু জটিলতার মুখোমুখি হয়।এর মাঝে পুরো বিশ্বে তখন কোভিডের প্রকোপ।হাসপাতালে ভালো চিকিৎসার সুযোগ সুবিধা নেই।চলাচলে নানারকম সমস্যা।এর মধ্যেই বর্ষা কালের এক বৃষ্টিমুখর দিনে ইশতিয়াক এবং রিধিমার ঘর আলো করে আমার মতো সোজা,সাপ্টা অবলা বাচ্চাটির জন্ম হলো।
জন্মের সময় অহেতুক বকা খেলাম আমি।আমি নাকি হাত পা ছুড়ে মায়ের অবস্থা খারাপ করে দিয়েছি।বাবা আমাকে দেখেই চোখ পাকিয়ে বলল,”এ্যাই বুড়ি! মা কে এতো জ্বালাতন করেছো কেন তুমি?তোমাকে আমি পিট্টি দিবো।”

সেই সময় তো আমি জানতাম না কিছু।যদি সেই সময় এখনের অবস্থানে থাকতাম,তাহলে আমিও বিনিময়ে চোখ পাকিয়ে বলতাম,”এ্যাই ইশতিয়াক! আমি না হয় বাবু মানুষ।বুঝি না কিছু।কিন্তু তুমি তো এত্তো বড়ো লোক।তুমি কেন আমার মা কে জ্বালাতন করো?তোমাকে আমি পিট্টি দিবো না।তোমাকে আমি কামড় দিবো ধরে।”

আমার মা চট্টগ্রাম প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ম্যাকানিকাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের উপর অনার্স আর মাস্টার্স শেষ করেছে।মাস্টার্স শেষ হতে না হতেই পারিবারিক ভাবে বাবার সাথে তার বিয়ে হয়ে গেল।বাবা ততদিনে সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের উপর পিএইচডি শেষ করে একটা বড়ো মাপের সফটওয়্যার ফার্মে চাকরি করছিলো।

যেদিন তাদের বিয়ে হলো,সেদিন খুব বৃষ্টি হলো।তুমুল ঝড়।চারদিকে পৎপৎ বাতাসের শব্দ।এর মধ্যেই ইশতিয়াক নামের লোকটি আমার মা কে অর্জন করে নিলো।বিনা কোনো সাধনায়,বিনা কোনো কসরতে।

মেয়েদের কম বেশি চাপা দুঃখ থাকে।বুকের ভেতর দুই তিনটে বিশালাকার দীর্ঘশ্বাস লুকানো থাকে।আমার মায়েরও ছিলো।সেই দুঃখকে এক পাশে সরিয়ে মা বিয়ে তে রাজি হয়ে গেল।মায়ের সেই গোপন দুঃখ কি আমি জানি না।সবকিছু জানতে হবে,এমন কোনো কথা নেই।জগদ্বিখ্যাত বিজ্ঞানী আলবার্ট আইনস্টাইন বলেছিলেন,”দ্যা মোস্ট বিউটিফুল থিং উই ক্যান এক্সপেরিয়েন্স ইজ দ্যা মিস্টিরিয়াস।”
অর্থাৎ জগৎের সবচেয়ে সুন্দর জিনিসটি আমাদের না জানার ভেতরেই লুকিয়ে আছে।

যাই হোক,মূল গল্পে আসা যাক।
মা গেল তুনু খালামণির বাসায়।তুনু খালামণির বর পেশায় চিকিৎসক।বহুদিনের প্রেম তাদের।বিয়ের পর খালামণি তার মতো পড়াশোনা চালিয়ে যাচ্ছিল।আর খালু থাকতো নিজের ক্লিনিক নিয়ে ব্যস্ত।

তুনু দরজা খুলতেই অবাক হলো।বলল,”রিধি! তুই?”

মা খুব ঠান্ডা পায়ে ভেতরে গেল।বসার ঘরের এক পাশে তার লাগেজটা রেখে বলল,”তৃণা! আমাকে এক গ্লাস পানি দে।”

খালামণি পানি এনে দিলো।মা কোনো তাড়াহুড়ো ছাড়া পানিটা শেষ করলো।তারপর আমাকে সোফার উপর বসিয়ে নিজেও আমার পাশে বসলো।
তৃণা খালামণি উদ্বিগ্ন হয়ে বললেন,”কি হয়েছে রিধি?মুখ এতো শুকনো কেন তোর?”

মা ফ্যাকাশে মুখে বলল,”তোরা সবাই বলেছিলি প্রেমের বিয়ে থেকে সম্বন্ধের বিয়ে বেশি ভালো হয়।আমি তোদের বলতে চাই,কথাটা একদম ভুল।বিয়ে তারই ভালো হয়,যার কপালে থাকে।আমার কপালে ওসব নেই।”

তুনু ভীত স্বরে বলল,”রিধি কি হয়েছে রে?ভাইয়া কিছু বলেছে?”

“না,তৃণা।এক পাক্ষিক ভাইয়ার নাম টানবি না।সেও বলেছে।আমিও বলেছি।বলতে বলতে এক সময় টের পেয়েছি,আমাদের ভেতর সংসার থাকলেও কোনো প্রেম ভালোবাসা নেই।অন্তরঙ্গতা আছে।কিন্তু মায়া নেই।দোষটা ইশতিয়াকের।দোষটা রিধিমার।দোষটা এই দম্পতির।”

মা খুব চাপা স্বভাবের মানুষ।অনুভূতি আর ভালো লাগা টুকু সযত্নে চেপে রেখে মা দিব্যি চলে যেতে পারে।এমন মেয়ে মানুষ রা সমাজের চোখে ভারি বুঝদার হলেও ব্যক্তিজীবনে তারা হয় বাড়াবাড়ি রকমের দুঃখী।আমার মা ও দুঃখী ছিল।সেই দুঃখকে আড়াল করতে মা নির্বিকার হাসতো।

মায়ের উচ্চশিক্ষার শখ ছিলো।বড় বেতনের একটা চাকরির শখ ছিলো।কিন্তু বিয়ের পর পর কনসিভ করার দরুন মা পড়াশোনায় পিছিয়ে গেল কিছুটা।তুনু খালামণি সহ তার বাকি বন্ধুরা ততদিনে পিএইচডি সহ আরো নানারকম ডিগ্রি অর্জনে ব্যস্ত হয়ে পড়েছে।

আমার জন্মের পর মা প্রায় চার মাস খাট থেকেই উঠতে পারে নি।তার শরীর খুব দুর্বল হয়ে পড়েছিল।সিজারে বাচ্চা জন্ম দেওয়া মায়েরা সিজারের সময়ই নিজেদের অর্ধেক জীবনীশক্তি দান করে দেয়।আমার মায়ের সাথেও এমনটাই হলো।
একদিকে পড়াশোনায় পিছিয়ে যাওয়া।অন্যদিকে শারিরীক ভাবে দুর্বলতা।সব মিলিয়ে মা মানসিকভাবেও অসুস্থ হয়ে পড়ল।প্রজেস্টেরন আর ইস্ট্রোজেনের ঘাটতিতে মা যেই মনোরোগে ভুগছিল,তার নাম-পোস্ট পার্টাম ডিপ্রেশন।সন্তান জন্মদানের পর বেশিরভাগ মা ই যেই রোগে ভুগেন।

মায়ের মেজাজ বেশির ভাগ সময় খিটখিটে হয়ে থাকতো।কিন্তু ভেতরে ভেতরে এতো রকম যন্ত্রনা তাকে অস্থির করলেও মা মুখ ফুটে তার বহিঃপ্রকাশ খুব কমই করেছে।

বাবার সাথে তার ঝামেলার কারণ গুলো বেশ ছোটো,কিন্তু সূক্ষ্ম।
বাবা তাদের প্রথম বিবাহ বার্ষিকীর দিন ঠিক রাত বারোটায় বাড়ি ফিরে নি।সে দেরি করে বাড়িতে ফিরলো এবং গুরুত্বপূর্ণ এই দিনটির কথা বেমালুম ভুলে গেল।পরের দিন সকালে সে আবার অফিসে চলে গেল।এবং ফিরে এলো রাত আটটার দিকে।

মা তার জন্য বারান্দায় বসে অপেক্ষা করছিল।এবং বাড়িতে এসে সে যখন শার্টের বোতাম খুলতে খুলতে আদুরে স্বরে বলল,”ওখানে কি করো রিধি?ভেতরে এসো।ঠান্ডা লেগে যাবে তোমার।”

তখন মা যন্ত্রের মতো হেঁটে ভেতরে এলো।বাবা কাপড় পাল্টে হাসি হাসি মুখ করে রাতের খাবার খেয়ে খাটে শুয়ে পড়লো।মা আস্তে ধীরে হেঁটে আলমারির এক পাশ থেকে সেদিন সন্ধ্যায় কেনা ফুলের তোড়া টা বের করে বাবার দিকে বাড়িয়ে দিলো।বাবা বোকা বোকা চোখে সেটা হাতে নিলো।
ফুলের তোড়ার সাথে একটা চিরকুটও ছিলো।
যেখানে মা লিখেছিলো,
ঠিক এমন দিনে,এমন সময়ে বিয়ে হয়েছিল তোমার আমার।আমরা খুব সৌভাগ্যবান দম্পতি।কারণ আমরা রাতে বিয়ে করেছি।যতবার আমরা আমাদের বিবাহ বার্ষিকী উদযাপন করবো,ততবার আমরা কাঁটায় কাঁটায় নিজেদের বিয়ের সময়টাতেই সবকিছু উপভোগ করবো।এই যেমন আজ রাতে তুমি আসবে।আমি তোমাকে এটা দিবো।ঠিক এই সময়েই তো তোমাকে কবুল করেছিলাম বলো?”

বাবা চিঠিটা পড়ে অনুতপ্ত হলো।মা কোনো কথা না বলে একপাশ হয়ে শুয়ে পড়লো।
ইশারায় বাবাকে বুঝিয়ে দিলো,বাবার কাছে তার কিছুই চাইবার নেই।

তুনু খালামণির বাসায় গিয়ে মা আমাকে নিয়ে একটা ঘরে গেল।গিয়ে বলল,”আজকে আর কালকে আমি তোর কাছে থাকবো তৃণা।ইনশাআল্লাহ আগামীকালই একটা নতুন বাসার খোঁজ করবো।”

খালামণি বলল,”আরো কয়েকদিন থাকলে সমস্যা কি?ফাঁকাই তো থাকে আমার বাসা।”

“সমস্যা আছে।তুই বুঝবি না।আপাতত আমার মেয়েকে রাখ।আমি একটু ঘুমাবো।”

খালামণি আমাকে নিয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল।বিছানায় পিঠ ঠেকাতেই মা আর নেই।ক্লান্তিতে চোখ ভেঙে আসছিলো তার।নরম তুললে তোষকটা পিঠ স্পর্শ করতেই চোখ লেগে আসলো মায়ের।

আমি জানি,মায়ের মন খারাপ।
কিন্তু আমি এও জানি,মায়ের চেয়ে দ্বিগুন মন আরেকজন লোকের খারাপ।যেই লোকটার নাম ইশতিয়াক।যে লোক আমি পৃথিবীতে আসার পর আমাকে ফেলে আমার মা কে দেখার জন্য পাগল হয়ে গিয়েছিল।

রাতে বাবা ফোন দিলো তৃণা খালামণির নম্বরে।আমি জানতাম সে কল দিবে।আমি এও জানি,মা চলে যাওয়ার পর বাবা পুরোটা সময় ছটফট করেছে।সন্ধ্যা থেকে এই অব্দি কিছু পড়েনি তার পেটে।ছটফট করতে করতে শেষে হাঁপিয়ে উঠে সে তুনু কে কল দিলো।

“ভাইয়া!”

“তৃণা! রিধি তোমার কাছে না?”

“জি।”

“কি করছে সে এখন?”

“ঘুমাচ্ছে।”

“ওহহ্।কিছু খায় নি ঘুমানোর আগে?”

“জি না।খিদে নেই বলল।”

“ও কি কেঁদেছে তৃণা?”

“না ভাইয়া।কাঁদে নি।সেরকম করে কিছুই বলে নি আমাকে।কি হয়েছে?”

বাবা বেজায় করুণ সুরে বলল,”দোষটা আমার তৃণা।আইজ ওয়াজ টু লাউড ট্যুডে।”

আমার নাক শুদ্দ লাল হয়ে উঠলো তার কথা শুনে।পাজি,দুষ্টু বাবা! সারাটা সময় রিধি রিধি করলে।একবারো তো বললে না,আমরা ইশরা কোথায়?ও কেমন আছে?
তোমার মতো লোকদের এমনই হওয়া দরকার।মা যেন আর কখনো তোমার আলাভোলা মুখটা দেখে তোমায় মাফ না করে।

চলবে-

বাবুই নীড়ে তারা দু’জন-০১
-মেহরিমা আফরিন

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here