বাবুই নীড়ে তারা দু’জন-০২
-মেহরিমা আফরিন
মা রাতের মাঝামাঝি সময়ে উঠে গেল।আমি তার অনুপস্থিতি বুঝতেই নড়েচড়ে উঠলাম।আমি ঠোঁটজোড়া ভেঙে কান্না শুরু করার আগেই মা চলে এলো আমার কাছে।আমাকে কোলে তুলে ফিডার ধরিয়ে দিলো মুখের সামনে।
চুক চুক করে তুতু খাই,আর মা কে দেখি।কি সুন্দর আমার মা! উজ্জ্বল গায়ের রং,ছিমছাম পাতলা শরীর,খোলা চুল,গলার পাশে একটা খয়েরি রঙের তিল।চোখের মণি কালো।মা আমাকে কোলে নিলো।কিন্তু আমার দিকে তাকালো না।তার চোখ অন্য কোথাও।আমি একহাতে তার আঙুল ধরে গোল গোল চোখে তার দিকে তাকাই।
মা আর সারারাত ঘুমালো না।আমাকে ঘুম পাড়িয়ে মা পায়চারি করলো পুরো ঘর জুড়ে।তার ফোন বন্ধ।সে ই ইচ্ছে করে বন্ধ করে রেখেছে।বাবা যেন ফোন করে তাকে না পায়,এজন্য।
আমি জানি,বাবাও আজ সারারাত ঘুমাতে পারবে না।বাবা মন খারাপ করে খাটে বসে থাকবে।বসে আনমনে হাত রাখবে বালিশের কাছে।রেখে আমার বালিশটা ছুঁয়ে দেখবে,মায়ের বালিটা ছুঁয়ে দেখবে।এরপর আমাদের কথা ভাববে।ভেবে তার মন খারাপ হবে।তখন সে মা কে ফোন দিবে অনেক গুলো।কিন্তু মায়ের ফোন বন্ধ থাকায় প্রত্যেকবারই যান্ত্রিক স্বরে একটা মেয়ে কথা বলবে বাবার সাথে।বলবে,”আপনার কাঙ্ক্ষিত নম্বরে এই মুহূর্তে সংযোগ দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না।কিছুক্ষণ পর আবার ডায়াল করুন।”
মায়ের ফোনটা বন্ধ পেয়ে সে ফোনটা খাটের উপর ছুড়ে মেরে চুপচাপ শুয়ে থাকবে।এরপর মাঝরাতে বাবা উঠে বসবে।ড্রয়ার থেকে একটা কাগজ এনে লিখবে-
“আই অ্যাম সরি রিধি।প্লিজ আমাকে মাফ করে দাও।আমি তোমাকে কখনো আঘাত করতে চাই না।তবুও কিভাবে যে করে ফেলি।প্লিজ আর রাগ থেকো না।আই লাভ ইউ।আমি তোমাকে ভীষণ ভীষণ ভালোবাসি।আমি তোমাকে কিভাবে বুঝাই,তোমার আগে আমি আর কাউকে ভালোবাসি নি।আমি জানি না,মেয়েদের মন কেমন হয়।তাদের আবেগ অনুভূতি নিয়ে আমার পূর্বের কোনো ধারণা নেই।তোমাকে দেখেই শিখছি।তুমি যদি একবার মুখ ফুটে বলতে,তুমি কি চাও,আমি কি তোমায় দিতাম না বলো?
কিন্তু কিছু না বলে তুমি চলে কেন গেলে?অপমানে,অনুশোচনায় আমার এখন কান্না আসছে রিধি।”
বাবা চিঠিটা পড়বে।আর নাক মুখ কুঁচকে একটু পরে চিঠিটা ছিঁড়েও ফেলবে।এতো বাজে লিখা!কোনো মাধুর্য নেই,আবেগ নেই।এরপর ছেঁড়া চিঠির টুকরো গুলো হাতে নিয়ে বাবা শুকনো মুখে বসে থাকবে।
এরপর রাতে বাবার পছন্দের ক্যাসেট প্লেয়ার থেকে একটি গান ছাড়বে।
“তুমি আসবে বলেই আকাশ মেঘলা,বৃষ্টি এখনো হয়নি।
তুমি আসবে বলেই কৃষ্ণচুড়ার ফুলগুলো ঝরে যায় নি।”
এমন করেই ইশতিয়াক আর রিধিমার বিবাহিত জীবন থেকে একটি রজনী হারিয়ে যাবে।
পরদিন সকালে মা আমাকে ঘুম থেকে তুলে খাবার খাওয়ালো।আমি পিট পিট করে পলক ফেলি আর তার দিকে তাকাই।মায়ের মুখ একদিনে আরো বেশি নিষ্প্রাণ আর মলিন হয়ে উঠেছে।
তুনু খালামণি এসে মা কে খাবার খাওয়ার জন্য ডাকলো।কিন্তু মা ভালো না লাগার দোহাই দিয়ে খেতে গেল না।তুনুই জোর করে এসে তাকে একটুখানি খাইয়ে দিয়ে গেল।
মা এরপর থেকে কেমন চুপচাপ বসে আছে।এই গল্পের সবজান্তা চরিত্র হিসেবে আমি মায়ের মনের খবরও জানি।মায়ের মনের খবর ভালো না।
মা আশা করেছিল,রাতেই বাবা আসবে তার কাছে।এসে তাকে জড়িয়ে ধরবে।ক্ষমা চাওয়ার পর্বটা যেন মুঠোফোনেই না হয়,সেজন্য মা মুঠোফোন বন্ধ করে রেখেছিল।যেন বাবাকে বাধ্য হয়ে তুনুর বাড়ি আসতে হয়।এসে যেন বাবা শক্ত করে মা কে জড়িয়ে ধরে।ঐ একটা মুহূর্তের জন্য যেন মায়ের মনে হয়,মা একা না।মা একজনের জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মানুষদের একজন।তার অভিমানও কারো মাথাব্যথার কারণ।
আলিঙ্গন হলো ভালোবাসার সবচেয়ে শক্তিশালী রূপ।কেবল স্বামী স্ত্রীর জন্য না।পৃথিবীর প্রতিটা সম্পর্ক একটা শুদ্ধতম আলিঙ্গনে পূর্ণতা পায়।মায়ের সাথে সন্তানের সম্পর্ক,ভাইয়ের সাথে বোনের সম্পর্ক,নাতি নাতনিদের সাথে নানা-নানি,দাদা দাদির সম্পর্ক-সব সম্পর্ক।
ঐ রকম একটা শুদ্ধ আলিঙ্গনের জন্য মা বসেছিল সারা রাত।কিন্তু বাবা আসে নি।হয়তো মায়ের মতো একজন মানুষের একদিন না থাকা তার জন্য বিশেষ কিছু না।
দুপুরের দিকে মা আমাকে ঘুম পাড়িয়ে বারান্দায় গিয়ে বসলো।তারপর আধঘন্টা কেঁদে চোখ মুখ মুছে স্বাভাবিক হয়ে আবার ঘরে চলে আসলো।এর মধ্যে নানুভাই কল দিলো।মা খুব সহজভাবে তার সাথে কথা বলল।মাঝ দিয়ে তার সাংসারিক টানাপোড়েনের দিকটি উহ্য রাখলো পুরোপুরি।
মা চেয়েছিল বাবাকে কাল রাতেই।কল্পনা করেছিল,বাবা খুব ব্যস্ত হয়ে ছুটে আসবে।এসে মায়ের কপালে কপাল ঠেকাবে।মায়ের হাতটা ধরে করুণ মুখে বলবে,”আই অ্যাম সরি।”
মা সরি ফরি শুনতে চায় না।মা শুনতে চায় অন্যটা।মা শুনতে চায়,”আমি তোমাকে ভালোবাসি রিধি।”
বাবা লোকটা এতো বোকা!এতো অবুঝ! কোথায় কি বলতে হয় সেটাও জানে না।
বিকেলে বাবা এলো।অফিস করে,ক্লান্ত হয়ে।তুনু খালামণি তাকে বসার ঘরে বসিয়ে এক গ্লাস পানি এনে দিলো।বাবা পানিটা খেয়েই কাচুমাচু মুখে আমাদের ঘরের সামনে গিয়ে দাঁড়ালো।মা প্রথমে তাকে খেয়াল করে নি।যখন খেয়াল করলো,তখন শূন্য চোখে তার দিকে তাকালো।
ধীর পায়ে বাবা ঘরে এলো।মা বলল,”তুমি কেন এসেছো?”
“তোমাকে দেখবো বলে।”
ইশশ রে! কি কথা।মা কে দেখবে বলে এসেছে।আর ইশরা?ইশরা কি দোষ করেছে?তাকে কেন দেখতে এলে না?বপ বপ।মা! তুমি এখুনি এই লোককে বের করে দাও।
কিন্তু মা তাকে বের করলো না।আমিও তার সাথে রাগ হলাম না।উল্টো তাকে দেখেই হাসলাম আমি।বাবাও হাসলো সামান্য।
মা বলল,”আমাকে দেখার কিছু নাই।আমি ভালো আছি।তুমি যাও।”
“কোথায় যাবো আমি?”
“কোথায় যাবো মানে?অফিসে যাও।নিজের কাজে যাও।তোমার কি কাজের অভাব আছে নাকি?”
“তোমায় ছাড়া থাকতে পারছি না আমি।”
মা তাচ্ছিল্য করে হাসলো।
“গতকাল তো ছিলে।আজও অফিস করলে দিব্যি।তোমার তো কোনো সমস্যা হচ্ছে না।”
“ভেতরে ভেতরে সমস্যা হচ্ছে।তুমি বাইরে থেকে বুঝবে কেমন করে?”
মা উত্তর দিলো না।বাবা এবার আমার দিকে তাকালো।হাত বাড়িয়ে হাসি মুখে ডাকলো,”ইশু! বাবার কোলে আসো তো মা।”
আমি তখন কোল বাছতে শিখেছি।পরিচিত মানুষ বাদে কারো কোলে সাচ্ছন্দ্য বোধ করি না।বাবা ডাকতেই এক লাফে আমি তার কোলে গেলাম।এক হাত তুলে বাবার গালের দিকে খাবলে ধরলাম।আধো আধো স্বরে নিজের মতো করে বললাম,”তি তি তিইই।”
বাবা আমাকে উঁচু করে তুলে আমার দুই গালে চুমু খেল।ঐ মুহুর্তে আমি বুঝলাম,মেয়েদের প্রথম প্রেম হলো তাদের বাবা।আশ্চর্য ব্যাপার! নয় মাস পেটে রাখার পর পৃথিবীর মুখ দেখামাত্র আমারা বাবাদের আদরে গদো গদো হয়ে যাই।আমিও হচ্ছিলাম।বাবা যখন আমার ছোট্ট হাতটা ধরে মাথা নামিয়ে চুমু খেল দুইটা,তখন খুশিতে আমি আবার তি তি তিইই করে চেঁচিয়ে উঠলাম।
বাবা বলল,”ইশুউউ! তুমি নাকি মা কে খুব জ্বালাতন করেছো?”
আমি গোল গোল চোখে তার দিকে তাকাই।মনে মনে বলি,”না তো।তুমিই না জ্বালাও মা কে?আমি কেন জ্বালাবো?আমি তো মায়ের লক্ষী মেয়ে।”
মুখে বললাম,”তা তা পা পা।”
বাবা আমার নাকের সাথে নাক লাগিয়ে বলল,”ইশু! আমার জান।আমার কলিজা।আমার মা।তোমাদের খুব মিস করেছি আমি।তোমরা ছাড়া আমি কোথায় যাবো বলো?”
বলতে বলতে বাবা খুব উদাস হয়ে পড়লো।মা বলল,”ছিলে না তুমি একদিন আমাদের ছাড়া?এমন করে থাকো।আমরা কবেই বা এতো গুরুত্বপূর্ণ ছিলাম তোমার কাছে?”
বাবা কিছু বলল না।আমাকে খাটের উপর রেখে মায়ের কাছাকাছি গিয়ে বসলো।এক হাতে মায়ের হাতটা টেনে নিয়ে বলল,”রিধি! এদিকে তাকাও।”
“তুমি যাও।আমার বিরক্ত লাগছে।”
“রিধি! শুনো না।কাল রাত আমি একটুও ঘুমাতে পারি নাই।”
“এটা শুনে আমি কি করবো?”
“তুমি প্লিজ চলো।”
“আমি যাবো না।”
বাবা ক্লান্ত হয়ে বলল,”তুমি কেন এমন করো সবসময় আমার সাথে?”
মা থমথমে মুখে তাকালো।স্বর নামিয়ে বলল,”কারণ তুমি আমার প্রথম প্রেম না।”
বাবা থতমত খেয়ে গেল।মন খারাপ করে বলল,”আই অ্যাম সরি ফর দ্যাট।”
“তুমি যাও ইশতিয়াক।আমাকে একটু একা ছেড়ে দাও।”
“একা থেকো।আমার ঘরে গিয়ে একা থেকো।এখানে একা থাকার প্রয়োজন নেই।”
“তোমার ঘরে যেতে ইচ্ছে হচ্ছে না এখন।”
“কি দোষ করেছি আমি?”
“আমি জানি না।”
“তুমি বলো আমায়?আমি জানি,আমি মানুষ ভালো না।কিন্তু আমি পরিবর্তন হতে জানি।তুমি বলো একবার।”
“ইশতিয়াক! প্লিজ যাও।”
বাবা গেল না।উল্টো মায়ের হাত ছেড়ে তার কপালে আর গালে আলতো করে দু’টো চুমু খেল।এরপর তার গালের সাথে নিজের গালটা চেপে ধরে বলল,”চলো রিধি।বাড়িতে গিয়ে ঝেড়ো।এখানে না।চলো প্লিজ।”
মায়ের কি হলো জানি না।এক ধাক্কা দিয়ে বাবা কে দূরে ঠেলে দিলো।ঘটনার আকস্মিকতায় বাবা নিজেই হতভম্ব হয়ে গেল।আমি ফ্যালফ্যাল করে আঙুল মুখে দিয়ে হাতের খেলনাটা ফেলে তাদের দিকে তাকালাম।
মা চিৎকার করে বলল,”যেতে বলছি না তোমাকে?সবসময় মেজাজ খারাপ করো আমার।যাও তুমি।চলে আসবো আমি।দুই তিন দিন পরই চলে আসবো।কোথায় যাবো আর?কামাই আছে আমার?চাকরি আছে?যে মন চাইলো,আর ঘর ছেড়ে দিলাম?”
বাবা একটা ঢোক গিলে বলল,”শুধু কামাই নাই বলেই তুমি ঘর ছাড়তে পারছো না?আমি কোনো ম্যাটার না তোমার কাছে?কামাই থাকলে তুমি এতোদিনে চলেই যেতে তাই না?”
“কথা ঘুরিয়ে প্যাঁচিয়ে জিলেপি বানাবে না ইশতিয়াক।”
“ঘুরাই নি।তুমি যা বললে,সেটাই তোমাকে বলেছি।”
মা মাথা চেপে ধরে বলল,”তুমি যাও।আমার মাথা ঘোরাচ্ছে।”
“যাবো।যাওয়ার আগে একটা প্রশ্ন করতে পারি?”
“বলো।”
“তুমি আমাকে একটুও কেন ভালোবাসো নি?তোমার ভালো না বাসার বিপরীতে আমি কেন এতো ভালোবাসলাম তোমায়?”
“আমি জানি না।”
বাবা আর কিছু বলল না।খাট থেকে আমাকে কোলে তুলে আবার আমার দুই গালে আদর দিলো।আমি দেখলাম,বাবার হাত কাঁপছে।কিছুক্ষণের জন্য আমাকে ফুল আর পাখি দেখানোর নাম করে বারান্দায় এসে বাবা কেঁদে ফেলল।খুবই স্বল্প সময়ের কান্না।এক ফোঁটা পানি ঝরতেই তাড়াতাড়ি পকেট থেকে টিস্যু বের করে চোখ মুছে নিল।
আকাশে একটা পাখি উড়ে যাচ্ছে।কালো রঙের পাখি।ডাকছে কা কা করে।আমি ইশরা বাবার কোলে চড়ে বাবার বুকের দিকে শার্টটা খাঁমচে ধরে আছি।বাবা নির্বিকার,নির্নিমেষ চোখে সামনে চেয়ে আছে।গোধূলির শেষ আলোয় আকাশ রক্তিম।আমিও সেই পাখিটার মতো করে ডাকলাম,”কা-কা-কা।”
চলবে-


![বাবুই নীড়ে তারা দু’জন-০৯[শেষ পর্ব]](https://golperlibrary.com/wp-content/uploads/2026/04/FB_IMG_1775381075289-218x150.jpg)


