বাবুই নীড়ে তারা দু’জন-০৪
-মেহরিমা আফরিন
বাবা সেদিনের ঐ কথাটা বেশ সিরিয়াস ভাবেই নিল।সে সত্যি সত্যিই জেদ করে বসলো যে আমাকে সে একাই পালবে।মায়ের কোনো দরকার নেই।মায়ের সাহায্য ছাড়াই আমার সবকিছু বাবা একা হাতে সামলাবে।
শুরুতে বাড়ির লোকজন ভাবলো,এটা বাবার কথার কথা।রাগের মাথায় বলেছে।এমন কি আর হয় নাকি?মা থাকতে বাচ্চা এমন বাবার কাছে বড়ো হবে কেন?
কিন্তু বাবা যখন আমাদের শোয়ার ঘর থেকে বালিশ এনে গেস্ট রুমে থাকার প্রস্তুতি নিলো,তখনই সবার টনক নড়লো।দিদুন ছুটে এসে বলল,”এসব কি ইশতিয়াক?কথা কাটাকাটি হতেই পারে।তাই বলে তুই এসব করবি?”
বাবা বালিশটা খাটের উপর রেখে খাট ঝাড়তে ঝাড়তে বলল,”না মা।কথা কাটাকাটি হতেই পারে।আমি জানি।কিন্তু আমাদের মধ্যে যা হচ্ছে,সেটা স্রেফ কথা কাটাকাটি না।আমাদের মধ্যে বিশাল একটা গ্যাপ আছে।তুমি বুঝবে না।প্লিজ মা।যাও।”
বাবার এই পাগলামি কেউ থামাতে পারলো না।দাদুভাই,দিদুন,পিপি,চাচ্চু কেউ না।আর মা?মা তো কেমন যে জমে গেল।হীনমন্যতায়,লজ্জায়,কিংবা কিছুটা অনুশোচনায়।
বাবা গেস্টরুমে থাকতে শুরু করলো আমাকে নিয়ে।আমি খাই বাজারের কৃত্রিম পাউডার দুধ।আমাকে গোসল করায় বাবা,যত্নও করে বাবা।গোসলের পর আমার সারা শরীরে লোশনও মেখে দেয় বাবা।
প্রথমদিন বাবা আমাকে রেখে অফিসে গেল।আমাকে দিয়ে গেল দিদুনের কাছে।দিদুন আমাকে মায়ের কাছে নিয়ে গেল।মা তখন চুপচাপ শুয়ে কি যেন ভাবছিলো।দিদুন গিয়ে চাপা স্বরে বলল,”বড় বউ! ইশতিয়াক চলে গেছে।তুমি একটু ওকে খাওয়াও তো।আমার ছেলে পাগল হয়ে গেছে।এসব কোনো কথা?ঘরে মা থাকতে বাচ্চা নাকি বাইরের কেনা দুধ খাবে।তুমি একটু ওকে খাওয়াও তো।”
মা হাত বাড়িয়ে আমাকে কোলে নিল।দিদুন ঘর থেকে বের হতেই মার দু’চোখ ভরে এলো।সে আমাকে বুকের সাথে চেপে ধরে বলল,”ইশু! আমার মা! তোমার খিদে পেয়েছে?বাবা ঠিক মতো খাওয়ায় নি তোমাকে?”
বলে মা আবার কান্নায় ভেঙে পড়লো।আমি জানি,মা আমার খাবার নিয়ে কান্না করে নি।মা কান্না করেছে একাকীত্বে।বাবার সাথে ঐ ঘটনার পর থেকে বাড়ির সবার সাথে মায়ের দুরত্ব বেড়েছে।দুরত্বটা মা ই বাড়িয়েছে।
মা সেদিন অনেকক্ষণ আমাকে আদর দিলো।আমার গালের সাথে নিজের গাল চেপে ধরে বলল,”ইশু! ইশু! তুমি জানো,তোমাকে আমি কতো মিস করেছি কাল রাতে।তোমাকে,তোমার বাবাকে-দু’জনকেই অনেক মিস করেছি আমি।বাবাকে এবার বলবে,আর যেন আলাদা না ঘুমায়।কাল রাতে আমি অনেক ভয় পেয়েছি।”
বাবা অফিসে যাওয়ার পর আমাকে মা নিজের কাছে এনে রাখে,এই খবর কানে যাওয়া মাত্র বাবা আমাকে নিয়েই অফিস যেতে শুরু করলো।ফ্রন্ট ক্যারিয়ারে করে আমাকে বুকে নিয়ে বাবা অফিসের পথে রওয়ানা হতো।
বলা বাহুল্য,বাবা মায়ের বাড়াবাড়ির সংসারে এইবার বাড়াবাড়িটা শুরু করলো বাবাই।সবকিছুতে সে মা কে এড়িয়ে যেতে শুরু করলো।
তার জেদ,তার রাগ,তার দম্ভ-সবকিছুর সামনে মা একেবারে মুখ থুবড়ে পড়লো।
বস্তুত বাবার ধৈর্যের সুতো ছিঁড়ে গিয়েছিল।বিয়ের পর থেকে মায়ের নির্লিপ্ত আচরণ বাচ্চা হওয়ার পর আকাশ ছুঁয়ে গিয়েছিল।বাবা ধৈর্য ধরতে ধরতে শেষ পর্যন্ত ধৈর্যহারা হলো,যখন বাবা দেখলো তার ভালোবাসার কোনো বিশেষ মূল্যায়ন মায়ের কাছে নেই।
সে আমার ব্যাপারটা নিয়ে জেদ করতে করতে সেটাকে বাড়াবাড়ি পর্যায়ে নিয়ে গেল।যেটা সন্তান হিসেবে আমার জন্য কষ্টকর।আর মায়ের কথা তো বাদই দিলাম।
বাবা মায়ের সাথে কথা বলা বন্ধ করে দিলো পুরোপুরি।অবস্থা এমন যে তাদের ভেতর কেবল ডিভোর্স শব্দটাই অবশিষ্ট আছে।আর কিছু না।মা কেমন যে অসুস্থ হয়ে গেল দুই দিনেই।
সেদিন রাতে সে আমাদের ঘরে এলো।গেস্ট রুমে যেই ঘরে আমি আর বাবা থাকতাম,সেখানে।বাবা ল্যাপটপে কাজ করছিলো।আমি খেলছিলাম খাটে বসে।মা দুয়ারে এসে দাঁড়ালো।গলা খাকারি দিয় বাবার মনোযোগ টানতে চাইলো।
বাবা স্ক্রিন থেকে চোখ তুলল না।মা মুমূর্ষু গলায় ডাকলো,”ইশতিয়াক! শোনো।”
বাবা টাইপিং করতে করতে বলল,”ভেতরে আসো।”
মা আসলো।দুই হাত কচলাতে কচলাতে অস্থির হয়ে বলল,”আমি একটু বসি এখানে?”
“বসো।”
মা বসে ইতিউতি করতে করতে বলল,”একটা কথা শুনো ইশতিয়াক।”
“বলো।”
মা ভাঙা স্বরে বলল,”আই অ্যাম সরি।”
“হু।”
অত্যন্ত ঠান্ডা জবাব।মায়ের মন ভেঙে গেল তখুনি।মা বাবার একটু কাছাকাছি এসে বলল,”এখন থেকে আমি আর উল্টাপাল্টা কথা বলবো না।তোমার মন মতো চলবো।”
“আচ্ছা।”
“তুমি প্লিজ আবার আগের মতো হয়ে যাও।”
বাবা ল্যাপটপ টা কোলে তুলে বলল,”রিধি তুমি কি প্লিজ একটু যাবে?আমি ব্যস্ত আছি ভীষণ।”
মা গেল না।চুপটি করে বসে থেকে মাথা নামিয়ে নিজের হাতের নখ খোঁচাচ্ছিল।বাবার মনোযোগ ল্যাপটপে।মা খুব কাতর স্বরে বলল,”ইশতিয়াক।আমি কফি করে দেই তোমাকে?তুমি খাবে?”
বাবা মাথা তুলল।ছোটো করে বলল,’না খাবো না।ইচ্ছে হলে আমি নিজেই করে নিবো।”
“আমি করে দেই না।”
“না,এখন আপাতত দরকার নেই।”
মা ভীষণ অস্বস্তি নিয়ে পুরো ঘরে পায়চারি করলো।মায়ের অসহায়,ক্লান্ত,মূর্ছা যাওয়া মুখটা দেখে আমারই কেমন লাগলো।মা এরপর চূড়ান্ত রকমের অসহায় মুখে বলল,”ইশতিয়াক! আমি সত্যি সরি বলছি।তুমি বললে পায়েও ধরবো।তাও তুমি আমার ঘরে আসো প্লিজ।রাতে আমি ভীষণ ভয় পাই।কে যেন হাঁটে আমাদের ঘরে।সত্যি!”
“তুমি পাগল হয়েছো?”
বিরক্ত হয়ে প্রশ্ন ছুঁড়লো বাবা।মা আগের মতো করেই বলল,”সত্যি ইশতিয়াক।খুব ভয় হয় আমার।”
বাবা আগের মতোই ল্যাপটপের কিবোর্ডে আঙুল চালিয়ে যাচ্ছিলো।মা একটু রয়ে সয়ে বলল,”ইশু কে আমি নেই?তোমার কষ্ট হবে ওকে নিয়ে কাজ করতে।”
বাবা একটানে আমাকে তার কাছে নিয়ে এলো।চোখ তুলে মায়ের মুখের দিকে তাকিয়ে ঠান্ডা স্বরে বলল,”সমস্যা নেই।আমি পারবো।”
মা আর কথা বাড়ালো না।বাবার সামনেই কেঁদে ফেলবে,এই ভয়ে সে তাড়াতাড়ি ঘর থেকে বেরিয়ে গেল।
মায়ের দুঃখ নাকি মেয়েরা সবচেয়ে ভালো বোঝে।এই কথাটা কতোটা সত্য আমি জানি না।কিন্তু আমি যদি বয়সে পিপির সমান হতাম,আর আমার সামনে বাবা মায়ের সাথে এমন আচরণ করতো,তাহলে খুব রাগ হতো আমার।এটা কেমন কথা?এভাবে অসহায় মুখে আসার পরেও বাবা কেমন করে মা কে ফিরিয়ে দিলো?
মায়ের অবস্থা সামনের দুই দিনে আরো বেশি করুণ হলো।চোখের নিচে মোটা কালির স্তর পড়লো।মুখ হলো আগের চেয়েও বেশি থমথমে,নিষ্প্রাণ আর বেজার।বাবার আশেপাশে সে মৌমাছির মতো ঘুরে বেড়ালো।বাবা প্রতিবারই অনুভূতিশূন্য কায়দায় তাকে এড়িয়ে গেল।
মা যেন দিন দিন কোনো গোলকধাঁধায় হারিয়ে যাচ্ছিল।আগে বিকেলে সে পিপির ঘরে এসে বসতো।কথা বলতো,আড্ডা দিতো।বাবার সাথে ঝামেলা হওয়ার পর থেকে সে সেখানে যাওয়াও বন্ধ করে দিলো।আমার সাথেও তার দেখা হতো কম।আর বাবার সাথে তো একদমই না।
এক মুহূর্ত বাবার সাথে কথা বলবে বলে মা ছটফট করতো সারাক্ষণ।অথচ ধৈর্যচ্যুত হয়ে,সংসারের গুষ্টি উদ্ধার করা বাবা তার এই ছটফটানো কে বিন্দু পরিমান পাত্তা দিলো না।
বাবা বুঝিয়ে দিতে চাইলো,অভিমান তারও হয়।রাগ দেখানোর অধিকার তারও আছে।মা একাই মুখ সরিয়ে নিতে পারে না।বাবাও পারে।
এর মধ্যে একদিন মা বাবার ঘরে এলো প্রতিদিনের মতো।বলা বাহুল্য,সে প্রতিদিনই আসে।বাবার সাথে কথা বলার চেষ্টা করে।বাবাকে নিয়ে আবার সবকিছু আগের মতো করে ফেলতে চায়।কিন্তু বাবা এবার অনড়।সে কিছুতেই মায়ের সাথে সহজ হবে না এতো অল্প দিনে।
সেদিন মা বলল,”তুমি আমার সাথে কথা না বললে,আমি মরে যাবো ইশতিয়াক।”
বাবা ম্লান হেসে বলল,”কিসব বলো রিধি! অবান্তর কথাবার্তা।”
“সত্যি।আমি মরে যাবো।আমি ছাদ থেকে লাফ দিবো।”
“তুমি পাগল হয়েছো।”
“ইশতিয়াক শোনো।”
“কি?”
মা বাবার মুখোমুখি এসে বসলো।বাবার হাতটা একটানে নিজের বুকের সাথে চেপে ধরে বলল,”এই দেখো।বুকটা একদম ফাঁকা হয়ে গেছে আমার।কিছু নাই।একদম ফাঁকা।অনেক কষ্ট হয় ইশতিয়াক।”
বাবা বোধ হয় সেই জায়গাতেই একটু দুর্বল হয়ে পড়লো।
মা বলতে থাকলো,”তুমি কি আর কখনোই সহজ হবে না আমার সাথে?কোনোদিনই না?”
“না।”
মায়ের মুখটা হঠাৎ পাল্টে গেল।বাবা মজা করে বলল,”আর আমি ইশরাকেও কখনো তোমার কাছে দিবো না।সে শুধু আমার কাছেই থাকবে।”
মা এক ঝটকায় উঠে দাঁড়ালো।ঢোক গিলে বিক্ষুব্ধ স্বরে বলল,”কি বললে তুমি?”
বাবা মাথা না তুলেই বলল,”বলেছি,ইশরাও এখন থেকে আমার।শুধু আমার।”
মা চেঁচিয়ে উঠে বলল,”কেন তোমার?ও আমার মেয়ে।তুমি একা কেন ওকে নিবে?”
বাবা মাথা নামিয়ে হাসলো।মুখটা গম্ভীর করে বলল,”কারণ তুমি একটা পাগল।”
“ইশতিয়াক!”
“কি?”
“তুমি আমার মেয়েকে কেন নিবে?আমি দিবো না ওকে নিতে।ও আমারও মেয়ে।আমি মেরে ফেলবো তোমাকে যদি তুমি আর এই কথা বলো।”
বাবা ফিক করে হেসে দিলো।আমাকে কোলে তুলে মা কে বিরক্ত করার জন্য বলল,”আমিও দিবো না মেয়েকে তোমার কাছে।এটা আমার মেয়ে।আমার আমার আমার।”
বলা শেষ করে বাবা আবার হাসলো।মা ফুঁসতে শুরু করলো ধীরে ধীরে।বাবা সেই অস্বাভাবিকতা টুকু খেয়াল করলো না।রাগে,ক্ষোভে এক সময় মা আর্তচিৎকার করে বলল,”ইশরা শুধু আমার।শুনছো তুমি?”
বাবা আগের মতোই মজার ছলে বলল,”না।ইশরা আমার।”
মায়ের পুরো শরীর থর থর করে কাঁপতে শুরু করলো।ধীরে ধীরে হিংস্র হলো দু’টো চোখ।বাবা হয়তো কল্পনাও করতে পারে নি মায়ের মনে তখন কি চলছে।
একটু পরে মা একটা কাঁচের শো পিস এনে বাবার মুখ বরাবর ছুড়ে মারলো।
এক চিৎকারে বাবা ছিটকে গেল খাটের উপর।মুহূর্তের ব্যবধানে তার নাক ফেটে রক্ত বেরিয়ে এলো,তাজা রক্তে গড়াগড়ি খেল আমাদের বিছানার চাদর।মা এগিয়ে এসে বাবার মুখোমুখি দাঁড়ালো।বাবা যন্ত্রনায় ছটফট করতে করতে বলল,”রিধি…রিধি।তুমি….আমি ইশ..ইশতি….রিধি।”
বাবার কথা জড়িয়ে যাচ্ছিল।এর মাঝে মা ঝুকে গিয়ে দুই হাতে বাবার গলা চেপে ধরলো।বাবা দুর্বল হাতে তার হাতটা চেপে ধরলো।বহু কষ্টে নিজেকে ছাড়িয়ে নিয়ে চিৎকার করল,”তনুউউ! মা!”
মায়ের দু’টো হাত বাবার গলা পেঁচিয়ে ধরলো।বাবার নিঃশ্বাস আটকে এলো প্রায়।মায়ের সেদিকে খেয়াল নেই।মা কটমট করে বলল,”বলো তুমি আমার মেয়েকে কেড়ে নিবে না আমার থেকে।বলো।”
দিদুন ঘরের দুয়ারে এসে এই দৃশ্য দেখতেই বিকট স্বরে চেঁচিয়ে উঠলো।
পিপি এসে মা কে আগলে ধরে বলল,”ভাবি ভাবি কি করছো এগুলা? মরে যাবে ভাইয়া।”
“মরে যাক।ও মরে যাক।”
পিপি টেনে ছিঁচড়ে তাকে বাবার কাছ থেকে সরালো।চার পাঁচ মিনিট ধস্তাধস্তির পর মা নিজেই জ্ঞান হারিয়ে পুরো শরীরের ভার ছেড়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়লো।
বাবা নিজের কপালের দিকটা চেপে ধরে আর্তনাদ করে বলল,”তনু ওকে ধর।ও ঠিক নেই।ও একদম ঠিক নেই।”
চলবে-


![বাবুই নীড়ে তারা দু’জন-০৯[শেষ পর্ব]](https://golperlibrary.com/wp-content/uploads/2026/04/FB_IMG_1775381075289-218x150.jpg)


