Thursday, April 30, 2026
Home "ধারাবাহিক গল্প নীল চিরকুট নীল চিরকুট’ পর্ব-৭

নীল চিরকুট’ পর্ব-৭

0
7114

# নীল চিরকুট
# লেখনীতে- নৌশিন আহমেদ রোদেলা

০৭.

শক্ত হাতের টানে রেলিং থেকে সরে দাঁড়াল নম্রতা। চোখে-মুখে আতঙ্ক। গাল বেয়ে গড়িয়ে পড়ছে অবিরাম জল। শরীরটা ভয়ানকভাবে কাঁপছে। নম্রতার ফ্যাকাশে মুখ দেখে সামনে দাঁড়ানো শ্যামবর্ণ মানুষটি আৎকে উঠল। আতঙ্কিত কন্ঠে বলল,

‘ আপনি ঠিক আছেন?’

নম্রতা হিংস্র দৃষ্টিতে সামনে দাঁড়ান মানুষটির দিকে তাকাল। শ্যামকায় দীর্ঘদেহী পুরুষ। শক্তপোক্ত গড়ন। পুরু ভ্রুজোড়ার নিচে গভীর দুটো চোখ। গায়ে বাদামী রঙের পাতলা শার্ট। হাতাদুটো কনুই পর্যন্ত গুটানো। ডানহাতে ল্যাপটপ। নম্রতা বাঘিনীর মতো ঝাঁপিয়ে পড়ল মানুষটির ওপর। হাত থেকে ল্যাপটপটা ছিনিয়ে নিয়ে রেলিং-এ দুই দফা আছাড় লাগাল। শ্যামকায় মানুষটি বিস্ময়ে হতভম্ব। নম্রতা ল্যাপটপটা নদীতে ছুঁড়ে ফেলতেই সম্বিৎ ফিরে এলো মানুষটির। খানিকটা ধাতস্থ হয়ে ভয়ানক গমগমে কন্ঠে বলল,

‘ পাগল আপনি? কী করলেন এটা? আপনার কোনো ধারণা আছে? আমার কত বড় ক্ষতি করলেন আপনি।’

ততক্ষণে নম্রতার বন্ধুরা নিচে নেমে এসেছে। নম্রতাকে এমন বিধ্বস্ত অবস্থায় দেখে বিস্মিত তারা। রঞ্জন আতঙ্কিত কন্ঠে প্রশ্ন ছুঁড়ল,

‘ নমু? ঠিক আছিস? কী হয়েছে? এভাবে কাঁপছিস কেন?’

নাদিম ক্রুদ্ধ কন্ঠে বলল,

‘ এই শালায় কিছু করছে নাকি তোরে? ক খালি। এইহানেই পু্ঁইতা ফেলুম। কি হইছে?’

নাদিম আর রঞ্জনের উঁচু কন্ঠে আরো কিছু যুবক পেছনে এসে দাঁড়াল। সামনের দিকে উঁকি দিয়ে কপাল কুঁচকে প্রশ্ন ছুঁড়লো তাদের একজন,

‘ এনিথিং রং আরফান? কি হয়েছে রে?’

রাগে স্তব্ধ আরফান রক্তলাল চোখে বন্ধুর দিকে তাকাল।

‘ শী ড্যামেজড মাই ল্যাপটপ।’

‘ মানে?’

‘ নদীতে ছুঁড়ে ফেলেছে ল্যাপটপ। ভাবতে পারছিস? আমার রিসার্চের পুরো ফাইল ছিল ল্যাপটপে।’

‘ কিহ! কিন্তু কেন? এই মেয়ে? পাগল নাকি আপনি? আপনার কোনো ধারণা আছে কী করেছেন আপনি? এসব পাগল ছাগলকে লঞ্চে উঠতে দেয় কে?’

নীরা ফুঁসে উঠে বলল,

‘ একদম ফালতু কথা বলবেন না। নমু অযথা হাঙ্গামা করার মেয়ে নয়। আপনার বন্ধু কী করেছে সেটা আগে বিবেচনা করুন। লঞ্চে উঠেও থার্ডক্লাস স্বভাব যায় না আপনাদের? দেখে তো ভদ্রলোকই মনে হচ্ছে। কী করেছেন আমার ফ্রেন্ডের সাথে? বলুন।’

দুই দলের মধ্যে তুমুল হট্টগোলের মধ্যেই হাউমাউ কান্নায় ভেঙে পড়ল নম্রতা। মুহূর্তেই থেমে গেল হট্টগোল। সবাই বিস্ফারিত চোখে তাকিয়ে রইল কান্নারত মেয়েটির চোখে-মুখে। নম্রতার বন্ধুরা অস্থির হয়ে উঠল। লঞ্চের পাটাতনে হাঁটু গেঁড়ে বসে থাকা নম্রতার পাশে ধপ করে বসে পড়ল নীরা-ছোঁয়া। নম্রতা দু-হাতে মুখ ঢেকে ডুকরে ডুকরে উঠছে। কান্নার শব্দটা বিশাল জলরাশিতে ঘুরেফিরে প্রতিধ্বনিত হচ্ছে। কী বিষাদময় সে কান্না! আরফানের বন্ধুরা কিছুক্ষণ হতবুদ্ধি হয়ে দাঁড়িয়ে থেকে দ্বিধা নিয়ে প্রশ্ন করল,

‘ কী হচ্ছে এসব দোস্ত? কাহিনীটা কী? কাঁদছে কেন এই মেয়ে?’

আরফান বিপন্ন কন্ঠে বলল,

‘ আমি কী করে বলব? কেবিনে যাচ্ছিলাম হঠাৎ ইশতিয়াক ধাক্কা দিল। ধাক্কাটা সামলে উঠতে পারি নি। উনার সাথে শরীরটা একটু লাগতেই দেখি নিচের দিকে ফিরে চিল্লাপাল্লা করছেন। ভাবলাম পড়ে যাচ্ছেন। হাত টেনে সরিয়ে আনতেই নাটক শুরু করল। উফ! আমার রিসার্চ রিপোর্ট!’

নীরা অশ্রুরুদ্ধ কন্ঠে বলল,

‘ এই নমু? এভাবে কাঁদছিস কেন? কী হয়েছে? বল আমাদের।’

কান্নায় শ্বাস আটকে আসছে নম্রতার। জোরে জোরে শ্বাস টেনে আবারও কান্নায় ভেঙে পড়ল নম্রতা। জড়ানো কন্ঠে বলল,

‘ আম আমার ডায়েরি!’

এটুকু বলেই গগনবিহারী চিৎকারে কান্নায় ভেঙে পড়ল নম্রতা। অন্তু কপাল কুঁচকে বলল,

‘ কী হয়েছে ডায়েরির?’

‘ পা পা পানিতে ফেলে দিয়েছে এই লোক।’

আরফান অবাক হয়ে বলল,

‘ আমি! কখন!’

আরফানের বন্ধু কড়া মেজাজে বলল,

‘ ফাজলামো পাইছেন নাকি? একটা ডায়েরির জন্য আপনি গোটা ল্যাপটপ ছুঁড়ে ফেলবেন? ল্যাপটপের দাম জানেন? একটা ল্যাপটপে কত ইম্পোর্টেন্ট ডকুমেন্টস থাকতে পারে ধারণা আছে?’

এবার রেগে উঠল নাদিমও। খেঁকিয়ে উঠে বলল,

‘ একটা ডায়েরি মানে কী? আপনার ল্যাপটপ থেকে ওর ডায়েরি কম দামী নয়। ফিল দ্যা ইমোশন।’

রাগে মাথার ভেতরটা ধপধপ করছে আরফানের। নাদিমের কথায় রাগটা যেন দপ করে জ্বলে উঠল তার। অত্যন্ত তাচ্ছিল্যের কন্ঠে বলল,

‘ আচ্ছা! আপনাদের কাছে নিজেদের বস্তাপঁচা আবেগ এতোটাই গুরুত্বপূর্ণ যে অন্যের…. ‘

এটুকু বলতেই অদ্ভুত এক ঘটনা ঘটে গেল। সবাইকে অবাক করে দিয়ে হিংস্র বাঘিনীর মতো আরফানের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ার চেষ্টা করল নম্রতা। হতভম্ব আরফান দু’পা পিছিয়ে দাঁড়াল। নম্রতার হাঁতের আচঁড়ে কব্জির ওপর দিকটার চামড়া উঠে জ্বালাপোড়া করছে। রঞ্জন দু’হাতে জাপটে ধরে নম্রতাকে নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা চালাল। নম্রতা চেঁচিয়ে উঠে বলল,

‘ খবরদার বস্তাপঁচা আবেগ বলবেন না। আমার ডায়েরি আমার আবেগ নয়, ভালোবাসা।’

নীরা দু’হাতে মুখ চেপে হতভম্ব চোখে তাকিয়ে আছে। এই প্রথম নম্রতাকে এমন উদ্ভট আচরণ করতে দেখছে সে। নম্রতার মতো বিচক্ষণ, প্রাণোবন্ত মেয়ে এমন গেঁয়ো, অসভ্য আচরণ কী করে করতে পারে? বিশ্বাস হয় না নীরার। কয়েকটা চিঠি আর কয়েকটা বছরে কী থেকে কী হয়ে গেল মেয়েটা? রঞ্জন নম্রতাকে জোরপূর্বক পাঁজাকোলে নিয়ে নিজেদের কেবিনের দিকে হাঁটা দিল। যেতে যেতে আরফানকে উদ্দেশ্য করে বলল,

‘ সরি ভাইয়া। আসলে ও একটু ডিপ্রেসড।’

আরফান জবাব দিল না। আরফানের পাশে থাকা বন্ধুটি ঝাঁঝ নিয়ে বলল,

‘ নিজের ডিপ্রেসড গার্লফ্রেন্ডকে সামলায় রাখেন মিয়া। লঞ্চ না তো নাট্যশালা। নাটক শুরু করে দিছে একেকজন। আজাইরা।’

নাদিম খেঁকিয়ে উঠে বলল,

‘ তুই সরি কইলি ক্যান? নমুর এই অবস্থা না থাকলে শালাগো দেইখা দিতাম আজকে।’

অতঃপর আবারও কথা কাটাকাটির সূত্রপাত হলো। রঞ্জন দাঁড়িয়ে না থেকে নম্রতা, নীরাকে নিয়ে তিন তলায় নিজেদের কেবিনের দিকে রওনা দিল।

কেবিনের পাটাতনে হাঁটু ভাঁজ করে বসে আছে নম্রতা। মাথাটা হাঁটুর ওপর নুয়ানো। কান্নার দামকে কিছুক্ষণ পর পরই কেঁপে উঠছে শরীর। কেবিনের দরজায় হাত ভাঁজ করে দাঁড়িয়ে আছে রঞ্জন। তারপাশে চিন্তিত অন্তু। ছোঁয়া-নীরা বিছানার উপর বসে আছে। নাদিম বারান্দার রেলিং-এ ঠেস দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। সবার মুখই থমথমে। স্তব্ধ নীরবতাকে ঠেলে দিয়ে কথা বলে উঠল ছোঁয়া। হতাশ কন্ঠে বলল,

‘ কী একটা কাহিনী করে ফেলল নমু। ছিঃ মানুষ কী ভাবছে! এতোটা সীনক্রিয়েট করার কী প্রয়োজন ছিল? এমন গেঁয়ো আচরণ কী নমুর সাজে? আমাদের কতটা লো ম্যান্টালিটির ক্ষেত ভাবছে তারা।’

ছোঁয়ার কথার জবাবে টু শব্দটি পর্যন্ত করল না কেউ। কেবল কড়া চোখে তাকাল। কিছুক্ষণ চুপ থেকে ভয়ানক রাগে ধমকে উঠল নাদিম,

‘ তুই তো জন্মগত ক্ষেত ম্যান্টালিটির মহিলা। বন্ধুর দুঃখে তোর মানসম্মানের প্রশ্ন আসছে। তোরে এই মুহুর্তে লঞ্চ থেকে ছুঁড়ে ফেলতে ইচ্ছে করছে। নদীতে হাবুডুবু খেতে খেতে ম্যান্টালিটি বিচার করবি। বেয়াদব।’

নাদিমের কথায় নিভে গেল ছোঁয়া। বেচারী এতোদিক ভেবে বলেনি কথাগুলো। কী থেকে কী হয়ে গেল! বিরবির করে বলল,

‘ লোকটা তো আর ইচ্ছে করে ডায়েরি ফেলে দেয় নি। ধাক্কা লেগে পড়ে গিয়েছে। নমু যে তার ল্যাপটপটাই ফেলে দিল।’

নাদিম কপাল কুঁচকে বলল,

‘ তো? যেভাবেই ফেলুক। ফেলেছে তো? আর নমুই বা ইচ্ছে করে ফেলল কোথায়? রাগের মাথায় ফেলে দিয়েছে। রাগ উঠলে মানুষ যেকোনো কিছু করতে পারে। অত ধরতে আছে? ওই শালাদের উচিত নমুর পা ধরে মাফ চাওয়া। এদের নামে আমি মামলা করব। মানহানির সাথে ডায়েরিহানির মামলা।’

এমন একটা পরিস্থিতিতেও নাদিমের কথায় ঠোঁট চেপে হেসে ফেলল সবাই। নাদিম সব সময়ই এমন। বন্ধুরা হাজার দোষ করলেও সব দোষ মাফ। এমনকি পরীক্ষায় নাম্বার কম পেয়ে বন্ধুদের মন খারাপ হয়ে গেলেও সব দোষ স্যারের। বন্ধুরা তো পরীক্ষা দিয়েছিলই শালার স্যার যদি নাম্বার না দেয় তাহলে বন্ধুদের কী দোষ? এসব স্যারকে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বহিষ্কার করে দেওয়া উচিত। নম্রতাকে হাজার বুঝানোর পরও যখন তার কান্নার গতি কমলো না। তখন সবার মিলিত সিদ্ধান্তে একা ছেড়ে দেওয়া হলো তাকে। পাঁচজনে গিয়ে বসল বারান্দায়। কীভাবে নম্রতাকে স্বাভাবিক করা যায় তা নিয়ে চলল তুমুল আলোচনা। আধঘন্টা- একঘন্টার মাঝে কান্নার বেগ কিছুটা কমে এলো নম্রতার। বামপায়ে থাকা সাদা পায়েলটির দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে খুলে নিল হাতে। পায়েলটাকে খুব যত্ন করে বুকের সাথে চেপে ধরে চোখ বোজল। দীর্ঘসময়ের কান্নায় মাথাটা ধপধপ করছে তার। চোখদুটো ভয়ানক জ্বলছে। সেই সাথে জ্বলছে অবুঝ, অভাগা মন।

তখন এপ্রিল মাস চলছিল। বাংলায় বসন্ত। ঋতুরাজ সেবার রাজার মতোই দাপট নিয়ে এসেছিল নম্রতার জীবনে। ষোলো বসন্ত পেরিয়ে সতেরোতে এসে সুগন্ধি ফুলে ফুলে ভরিয়ে দিয়েছিল নম্রতার জীবন। নম্রতাদের প্রমালাপনের তখন প্রায় দেড় বছর চলে। কারো মুখে ভালোবাসার শব্দ উচ্চারিত না হলেও দু’জনেই জানে ভালোবাসাহীন শব্দগুলোর গভীরতা। ভালোবাসার স্পষ্ট প্রকাশও খুব বেশিদিন চাপা থাকতে পারল না। ওপাশের মানুষটি খামে পুড়ে পাঠাল উথাল-পাতাল প্রেম বার্তা। নম্রতার এইচএসসি পরীক্ষা শুরু হয়েছিল মাত্র। প্রথম পরীক্ষাটা দিয়েই মা-বাবাকে ছাইপাঁশ বুঝিয়ে চলে গিয়েছিল শাহাবাগ। ক্লান্ত শরীরে এক ঝাঁক আশা নিয়ে হাতে তুলে নিয়েছিল চির পরিচিত বইটি। প্রত্যাশিত চিঠিটা পেয়ে বুক ভরা উত্তেজনা নিয়ে বাড়ি ফিরেছিল সে। বাড়ি ফিরে চিঠিটা খুলেই চমকে উঠেছিল নম্রতা। লজ্জায় লাল হয়েছিল। আবেগে কেঁদে-কেটে চোখ ফুলিয়েছিল। অপরিচিত মানুষটার সেই প্রেমময় চিঠি পড়লে আজও একই রকম কেঁপে কেঁপে উঠে নম্রতা। পাগল করা অনুভূতিতে দমবন্ধ হয়ে আসে। আচ্ছা? কী এমন মেশানো ছিল সেই চিঠিতে? নম্রতা জানে না। কিন্তু সেই চিঠিটা পড়লে আজও রাতে ঘুম হয় না। চিঠির শব্দবানে আহত হয়ে ঘুম কাতর নম্রতার রাতের ঘুম হারাম হয়। সারাটা রাত ক্ষণে ক্ষণে চিঠিটা পড়ে কেঁদে বুক ভাসায়। আবার কখনো লাজুক হাসিতে মত্ত হয়। নম্রতা চিঠির লাইনগুলো মনে করার চেষ্টা করল। মুহূর্তেই মুখস্থ হয়ে যাওয়া লেখাগুলো চোখের পাটাতনে স্পষ্ট হয়,

‘ প্রিয়…..

চলো একবার প্রেমে পড়ি। অদ্ভুত নীল ব্যথায় মড়িয়া হয়ে উঠি দুটো প্রাণ। দিনশেষে তুমি একটু কাঁদো। চোখের নিচে ছড়িয়ে পড়া কাজল রেখায়, আমি একটু মুগ্ধ হই। দীর্ঘ বিচ্ছেদ শেষে হঠাৎ দেখা হলে যেভাবে ঝাঁপিয়ে পড়ে, ঠিক সেভাবেই আমার রুক্ষ বুকটিতে ঝাঁপিয়ে পড়ো। আমার বুকে চলা নিত্য দিনকার টানাপোড়েন, চেনা জানা ঝড়গুলো একবারের জন্য হলেও থেমে যাক। তোমার কান্নাভেজা ফোলা চোখে একটি বার আমি ডুবে যাই। লাল-নীল ব্যথাগুলো রক্তে রক্তে ঘুরে বেড়াক। তোমাকে পাওয়ার তীব্র বাসনায় আমি একটু ছিন্নভিন্ন হই। তোমাকে দেখার আকুতিতে চোখের ঘুমগুলো মুক্তি পাক। তোমাকে হারানোর ভয়ে গভীর রাতে আমার পুরুষ চোখে জল নামুক। চলো শ্যামলতা, আমরা একবার প্রেমে পড়ি। মারাত্মক প্রেমে আহত হয়ে যাই দুজনেই। প্রেমময় ব্যথায় কেঁপে কেঁপে উঠি।

ইতি
শ্যামলতার ব্যক্তিগত সে ‘

সেই চিঠিতেই প্রথম নিজের সম্বোধনে কিছু একটা লিখছিল সেই মানুষটি। চিঠির সাথে কসটেপে আটকে দিয়েছিল অসম্ভব সুন্দর এক পায়েল। সেই সাথে ছিল কয়েকটি চ্যাপ্টা হয়ে থাকা বেলীফুল। কী তীব্র সুগন্ধ ছিল সেই বেলীফুলের। নম্রতা সারারাত নাকের কাছে নিয়ে বসেছিল সেই চিঠি। পায়েলটা পায়ে জড়িয়ে অযথায় ঘুরে বেড়িয়েছে পুরো ঘর জুড়ে। যখনই পায়েলে রিনঝিন শব্দ উঠেছে তখনই মনে হয়েছে সেই মানুষটি হাসছে। নম্রতার পাগলামোতে ঝংকার দিয়ে হেসে উঠছে সে। সারারাত ছটফট করে পরের দিন সকালেই গ্রন্থাগারে ছুঁটে গেল নম্রতা। গ্রন্থগারের গেইটে বিশাল তালা ঝুলতে দেখে মনে পড়ল, আজ শুক্রবার। শনিবারেও বন্ধ থাকবে গ্রন্থাগার। হতাশ, চঞ্চল, অস্থির নম্রতার পরের দু’দিন পড়াশোনা কিছু হলো না। ইংরেজি দ্বিতীয় পত্রের পরীক্ষাটা সে কোনোরকম না পড়েই সমাধা করল। দিন-রাত ‘সে’ ‘সে’ করেই মন- মস্তিষ্ক জমাট বেঁধে গেল তার। রবিবার সকালে উঠেই গ্রন্থাগারের সামনে গিয়ে দাঁড়িয়ে পড়ল সে। গ্রন্থাগার খুলতেই নীল রঙা খামে নিজের পায়েল পরা পায়ের একটা ফটো রেখে দিল নম্রতা। ধুরুধুরু বুক নিয়ে গ্রন্থাগার থেকে বেরিয়েই সেকী লজ্জা তার। কে জানে? পায়ের ছবি দেখে কী ভাববে সে? ছবিটা পাঠানো কী ঠিক হলো? এমন সব দ্বিধামাখা প্রশ্ন নিয়েই কেটে গেল প্রায় একটা সপ্তাহ। অস্থিরতা আর অনিশ্চয়তা নিয়েই একের পর এক পরীক্ষা সমাধা করল নম্রতা। পুরোপুরি এক সপ্তাহ পর আকাঙ্খিত চিঠিটা এলো। টকটকে নীল রঙা দুটো কাগজ ভরে শুধু একটাই লাইন,

‘ তোমার পায়ের তিলটা নেশাতুর। ভাবনাতীত সুন্দর।’

সেই এক লাইন দিয়ে ভর্তি চিঠিটা পেয়ে গলা শুকিয়ে গিয়েছিল নম্রতার। বুকের ভেতর থাকা হৃদপিণ্ডটা কী দ্রুতই না কাঁপছিল। আজও, আজও উপলব্ধি করতে পারে নম্রতা। আজও তার শরীরে ঘাম ছুটে। মুখটা হয় লজ্জায় রক্তিম। তারপর চিঠির উল্টো পাশে লেখা ওই লাইনটা, ‘ আমি মারাত্মক প্রেমে আহত। শ্যামলতাকে না পেলে এই প্রেমিকের মৃত্যু অনিবার্য!’ ইশ! মানুষটা কী অসভ্য কথা লিখেছিল সেদিন। প্রতিটি শব্দকে লজ্জার সাগরে জিইয়ে নিয়ে ছুঁড়ে মেরেছিল নম্রতার সদ্য যৌবনপ্রাপ্ত শরীরে। এই লজ্জাবান কী মারাত্মকভাবেই না বিঁধেছিল নম্রতার প্রেমাহত মনে! নম্রতা শিউরে উঠে। ডায়েরি হারানোর ব্যথায় ভেতরটা চিনচিন করে উঠে! এই নিষ্প্রয়োজন জীবনটা নিয়ে কী করবে নম্রতা?

#চলবে…

( ১৭১৪ টি শব্দে লেখা হয়েছে এই পর্ব।)

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here