Wednesday, May 27, 2026
Home "ধারাবাহিক গল্প বাইজি কন্যা বাইজি কন্যা পর্ব-১৪

বাইজি কন্যা পর্ব-১৪

0
1628

#বাইজি_কন্যা
#লেখা_জান্নাতুল_নাঈমা
#পর্ব_সংখ্যা_১৪

( শেষাংশ )

[২০]
পাঁচফোড়ন গৃহঃ
ঠিক দুপুর বারোটায় রোমানা আর অঙ্গন ফিরলো পাঁচফোড়ন গৃহে। সমবয়সী হওয়ার কারণে দু’জন একই বিশ্ববিদ্যালয়ের একই বিভাগে পড়াশোনা করছে। রোমানার বয়স যখন সাত বছর তখন রোমানার মা অর্থাৎ প্রেরণার বড়ো বোনের রক্তে ক্যান্সার ধরা পড়ে। এক বছর চিকিৎসা চলাকালীনই মৃত্যু ঘটে তার। খালাতো বোনের মেয়ে হওয়ায় ভালোবাসা, স্নেহ, দায়িত্ববোধ সবদিক থেকে বাঁধা পড়ে রোমানা’কে নিজেদের কাছে রেখে দেয় অলিওর এবং প্রেরণা। রোমানার বাবা প্রবাসী, স্ত্রী’র মৃত্যুর পর মেয়ে’কে অলিওর এবং প্রেরণার হাতে তুলে দিয়ে সেই যে চলে গেছেন আর দেশমুখী হননি। রোমানা হোস্টেলে থেকে পড়াশোনা করে। ছুটির দিনগুলোতে অঙ্গনই বেশীর ভাগ বাড়ি নিয়ে আসে তাকে। মায়ের আদেশে কখনো কখনো প্রণয়ও আনতে যায়। ওরা ফিরতেই প্রেরণা দুজন’কে গোসল সেরে খেতে আসতে বললো। রোমানা চুপচাপ চলে গেলো গোসলে। খালামুনির সঙ্গে তেমন কোন কথা বললো না, আর না স্বভাবসুলভ তার ওষ্ঠাধরে হাসিটির দেখা মিললো। বিচলিত হয়ে প্রেরণা অঙ্গনের দিকে ভ্রু কুঁচকে তাকালো, বললো,
-‘ কি হয়েছে ওর? ‘
অঙ্গন দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বললো,
-‘ আম্মা আপনি এবার ভাইয়ার সঙ্গে ওর বিয়েটা দিয়ে দিন। আপনিতো জানেন রোমানা ভাইয়া’কে পাগলের মতো ভালোবাসে অথচ ভাইয়া রোমানার ব্যাপারে খুব উদাসীন, বিয়েটা হয়ে গেলে দু’জন একসাথে থাকলে সব ঠিক হয়ে যাবে। আশা করি আপনি আব্বার সাথে আজই কথা বলবেন। ‘
কথাগুলো বলেই মায়ের সামনে থেকে চলে গেলো অঙ্গন। দুঃশ্চিন্তাগ্রস্থ হয়ে পড়লো প্রেরণা। আজ বৃহস্পতিবার প্রণয় আসবে তাই সিদ্ধান্ত নিলো আর দেরি নয় এবার দুটো’কে এক করেই ছাড়বে। দুপুরে আহার শেষে জমিদার অলিওর এবং পল্লব চৌধুরী’র সঙ্গে অরুণা, প্রেরণা দু’জনই প্রণয়ের সঙ্গে রোমানার বিয়ের কথাবার্তা তুললো। দুই পত্নীর মতামত শুনে দুই পত্রের দিকে তাকালো অলিওর। পূর্বে কথাবার্তা হলেও আজ চূড়ান্ত আলোচনায় বসেছে সকলে। বংশের রীতি অনুযায়ী ছেলে,মেয়েদের বিয়ের পূর্বে পরিবারের বয়োজ্যেষ্ঠদের মতামত’কেই অধিক গুরুত্ব দেয় অলিওর চৌধুরী। সে এবং তার পত্নী’রা রাজি এবার বড়ো দুই পুত্র এবং পুত্রবধুদের সম্মতি পেলেই আগামীকাল বাগ্দান সেরে ফেলবে। পরিবারের সকলেরই সম্মতি মিললো। কেবল রোমানা আর প্রণয়ের সঙ্গেই কোন কথা হয়নি অলিওরের। এ পর্যায়ে রোমানার তরফের সকল কথাই অঙ্গন এবং প্রেরণা ব্যক্ত করলো। সবশেষে অপেক্ষায় রইলো প্রণয়ের ফেরার। পাঁচফোড়ন গৃহের পরিবেশটাই বদলে গেলো। রোমানার বক্ষঃস্থলে যেনো জলের মতোন ছলাৎছলাৎ শব্দ করছে। একদিকে আনন্দ অপরদিকে লজ্জা আষ্টেপৃষ্ঠে রেখেছে তাকে। সকল বিষণ্নতা দূর হয়ে মনে এবার কাঙ্ক্ষিত মানুষটির জন্য অনুভূতি জাগ্রত হচ্ছে। নিজ কক্ষে চুপটি করে বসে অপেক্ষা করছে প্রণয়ের৷ সে আসবে, আগামীকাল তাদের বাগ্দান হবে তারপর, তারপর তাদের বিয়ে। সবটা ভাবতেই কেমন এলোমেলো লাগছে রোমানার। খুশিতে বোধহয় সে আজ পাগলই হয়ে যাবে। এমন মূহুর্তে কক্ষে শাড়ি গহনা নিয়ে হাজির হলো শবনম আর মুনতাহা। রোমানার দু’পাশ থেকে দুজন উঁকি দিলো তারপর শবনম মুনতাহা’কে বললো,
-‘ মুন, রোমানা তো এখনি লজ্জায় শেষ। ‘
মুনতাহা রসিকতার সুরে বললো,
-‘ হ্যাঁ গো ভাবি তাই তো দেখছি এবার কি হবে? ‘
-‘ কি আর হবে বাসর রাতে বউয়ের লজ্জা দেখে দেবর সাহেব ভাবি’দের কাছে এসে কাঁদবে। ‘
খিলখিল করে হেসে ওঠলো দু’জনই। লজ্জায় চোখ বন্ধ করে ঘন নিঃশ্বাস ছাড়তে ছাড়তে রোমানা বললো,
-‘ ধ্যাত তোমরা চুপ করবে…’
ঢং করে শবনম বললো,
-‘ এই চুপ করো চুপ করো ননদিনী’কে শাড়ি গহনা দেখানোতে মনোযোগ দাও। ‘
কথাটা শেষ করে আবারো হাসতে হাসতে বিছানায় গড়াগড়ি খেতে শুরু করলো শবনম। মুনতাহা মুচকি মুচকি হেসে শবনম’কে ধরে বললো,
-‘ ভাবি থামো এবার ওকে শাড়ি গহনা দেখাও। রোমানা আপা দেখোতো এখান থেকে কাল কোন শাড়ি আর কোন গয়না গুলো পরবে? ‘
শবনম বললো,
-‘ কিসের আপা ফুপাতো বোন সম্পর্ক বাদ। ননদ আর দেবরের বউয়ের খাতিরে যতো পারো রসিকতা করো। ‘
রোমানা মুনতাহা’কে চোখ রাঙালো। মুনতাহা মাথা নিচু করে মুচকি মুচকি হাসতে লাগলো। বললো,
-‘ আচ্ছা আচ্ছা আমি আর একটা কথাও বলবো না। তাও রাগ করোনা তুমি শাড়ি গয়না পছন্দ করো। ‘
শাড়ি, গয়না পছন্দ করে তিনজন মিলে হাসাহাসি, রসিকতা করতে করতে প্রায় সন্ধ্যা হয়ে গেলো। অবশেষে রোমানা প্রণয়ের বউ হতে যাচ্ছে। মায়ের থেকে সুখবরটি শুনে রোমানার সঙ্গে দেখা করতে এলো রঙ্গন। এদিকে সন্ধ্যা হয়ে যাওয়ায় মুনতাহা তড়িঘড়ি করে রোমানার রুম থেকে বের হতে যাচ্ছিলো। কিন্তু রঙ্গনের মুখোমুখি হয়ে গেলো। মুনতাহার হাস্যজ্জ্বল মুখশ্রী’তে দৃষ্টি পড়তেই অবাক হলো রঙ্গন। কতোদিন পর এই হাসিমুখটার দেখা মিলছে মনে পড়লো না তার। তবে বুকের ভিতর প্রশান্তি ঠেকলো খুব। পলকহীন চোখে চেয়েই রইলো মুনতাহার দিকে৷ কিন্তু মুনতাহা ভীষণ বিব্রতবোধ করলো। অকস্মাৎ ভয়ে চোখমুখ শুষ্ক হয়ে ওঠলো তার। মুখোভঙ্গি পরিবর্তন হয়ে গেলো রঙ্গনেরও। তৎপর হয়ে সে বললো,
-‘ আমি রোমানা আপার সাথে দেখা করতে এসেছি। তোমার প্রয়োজন শেষ হলে চলে যাও তবুও ভয় পেও না। ‘
এটুকু বলে থামতেই তড়িৎগতিতে মুনতাহা কক্ষ ত্যাগ করলো। নির্লিপ্ত ভঙ্গিতে রঙ্গন তাকালো কক্ষের ভিতরে। শবনম,রোমানা দু’জনই করুণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে তার দিকে। এক ঢোক গিলে দীর্ঘ একটি শ্বাস ছেড়ে ধীরপায়ে কক্ষের ভিতরে প্রবেশ করলো রঙ্গন। শবনমের দিকে তাকিয়ে মৃদু হেসে বললো,
-‘ তোমারও কি তাড়া আছে ভাবি? ‘
শবনম জোরপূর্বক হেসে এগিয়ে এলো। রঙ্গনের মাথায় হাত বুলিয়ে বললো,
-‘ না ভাই তুমি বসো কিছুক্ষণ গল্প করি। ‘
রঙ্গন নিজেকে স্বাভাবিক করার চেষ্টা করে রোমানার পাশে বসলো। বিছানায় থাকা শাড়ি,গহনাগুলো দেখে বললো,
-‘ ভালোবাসার মানুষ’কে জীবনসঙ্গী হিসেবে পাবে, তুমি খুব খুশি তাইনা আপা? ‘
রোমানা ইতস্ততভাবে বললো,
-‘ আমি অনেক খুশিরে রঙ্গন। ‘
-‘ অভিনন্দন আপা। আশা করি নিজেদেরটা সেরে দেবর’টাকে নিয়ে একটু ভাববে। বাকিরা তো নিজেকে নিয়েই ব্যস্ত। ‘
শবনমের দিকে আড়চোখে তাকিয়ে কথাটা বলতেই শবনম রঙ্গনকে কানমলা দিয়ে বললো,
-‘ ওরে দুষ্টু খোঁচা মারা হচ্ছে তাইনা। কি ভেবেছো আমি কিছুই জানিনা সব খবর আমার কাছে আসে।’
রঙ্গন জিহ্বায় কামড় দিয়ে বললো,
-‘ নাউজুবিল্লাহ আপা ভাবি এগুলা কি বলে? ‘
-‘ তোমাদের মুখে নাউজুবিল্লাহ শুনলে শয়তানও লজ্জা পাবে। ঢং বাদ দিয়ে ঝেড়ে কাশো বাছা। ‘
রোমানা অবুঝ চোখে দু’জনের দিকে তাকাতেই রঙ্গন বললো,
-‘ আপা তুমি বিশ্বাস করো ভাবি আমাকে ফাঁসাচ্ছে। ‘
-‘ আমি ফাঁসাচ্ছি নাকি কারো রূপের জাদুতে তুমি ফেঁসে গেছো আর বাঁশির সুরে তাকে ফাঁসাচ্ছো? ‘
ধরা পড়ে গিয়ে চুপসে গেলো রঙ্গন। রোমানা ছোট ছোট চোখ করে বললো,
-‘ নিজেকে নিয়ে নতুন করে ভাবছিস ভালো কথা তাই বলে এভাবে গোপনে! ছিঃ ভাই। ‘
মহাবিপদে পড়ে গেলো রঙ্গন। শবনমের দিকে তাকিয়ে বললো,
-‘ আপনার কয়টা কান, কয়টা চোখ বলবেন ভাবি। এই খবরটাও আপনি জেনে গেলেন ? ‘
-‘ জানবো না? দেবরের মনে রঙ লেগেছে আর ভাবি জানবে না তা কখনো হয়? ‘
এক কথা দুই কথায় রোমানার কাছে প্রকাশ পেলো রঙ্গন শাহিনুরের প্রেমে পড়েছে। ওপাশ থেকে সাড়াও কমতি নেই। মেয়েটা নেহাতই বাচ্চা কিনা.. আবেগটা বড্ড বেশীই। কিন্তু বাঁধ সাধলো রোমানা। রঙ্গনের দিকে কড়া চাহনি ছুঁড়ে বললো,
-‘ রঙ্গন তুই এটা ঠিক করছিস না। একটা মেয়ের সরলতার সুযোগ নিচ্ছিস তুই। ‘
শবনম বললো,
-‘ এটাতো ওর দোষ না রোমানা, ওদের রক্তের দোষ।’
কথাটা কেমন একটা লাগলো রোমানার বুকের ভিতর কেমন একটা ভয় কাজ করলো। সে ভয়টুকু’কে বাড়তে না দিয়ে রঙ্গনকে বললো,
-‘ রঙ্গন নুর মেয়েটা খুব ভালো ওর সঙ্গে তুই এসব করিস না। মেয়েটা খুব ভালোরে অমন নিষ্পাপ মুখের দিকে তাকালে তো শয়তানও ফেরেশতা হয়ে যাবে। আর তুই কিনা…’
-‘ উফ আপা কি সব বলছো? তোমরা নিজেদের মতো করে ধারণা করে এসব বলছো। ‘
-‘ তাহলে সত্যি’টা কি বল? ‘
-‘ সত্যি এটাই নুর’কে আমি বিয়ে করতে চাই। একটা বাইজির মেয়ে’কে বিয়ে করে স্বাভাবিক জীবন উপহার দেবো এটুকুই কি বেশী নয়? ‘
শবনম বললো,
-‘ যতোদূর জানি পলাশ চৌধুরী’র নজর পড়েছে এর ওপর। ওর সঙ্গে টেক্কা দিতে পারবে? ‘
-‘ ভাবি নুর আমাকে ভালোবাসে আমি নুর’কে পছন্দ করি। বিয়ে আমাদের হবেই জমিদারের এক পুত্র না হয় পরিবারের অসমর্থনেই বিয়ে করলো। আর রইলো পলাশ চৌধুরী’কে টেক্কা দেওয়া, এবার তার হারার পালা। ‘
রোমানা বললো,
-‘ তোদের হার জিতে ঐ মেয়েটা’কে কেন ভোগাবি রঙ্গন? ‘
রোমানার দিকে শান্ত চোখে তাকালো রঙ্গন। মুচকি হেসে বললো,
-‘ নুরের কিছু হবে না আপা, একটা স্বাভাবিক জীবন পেয়েই সে ভীষণ খুশি হবে। ওর খুশি হতে, ভালো থাকতে বেশী কিছু লাগে না আপা। ও আমাকে ভালোবেসেই ভীষণ খুশি, ভীষণ আনন্দিত। ওর এই আনন্দ, এই খুশিটুকু আজীবন অটুট থাকুক এই প্রার্থনা করো। ‘
-‘ তোদের বোঝা খুব মুশকিল। ‘
রোমানার কথার প্রেক্ষিতে শবনম বললো,
-‘ এরা নিজেদের জেদ পূরণ করতে যা খুশি করতে পারে। তবে ভাই মনে রেখো নুরের সঙ্গে বেইমানি করলে মুনতাহার চোখের বিষ হবে তুমি। ‘
-‘ না ভাবি নুরের সঙ্গে কোন অন্যায় করবো না আমি। ওকে ভালোবাসতে পারবো কিনা জানিনা কিন্তু ওর ভালোবাসাটুকুর যত্ন নেবো। আজীবন আমরা একে অপরের বন্ধু হয়ে পাশে থাকবো। ‘
[২১]
মানুষ যেমন উদ্যেগ নিয়ে যত্মসহকারে বৃক্ষের আশায়,ফুল,ফলের আশায় বীজ বপন করে বৃক্ষ’কে বড়ো করে তেমন সে বৃক্ষ থেকে ফুল,ফল পায়। যতোটা শ্রম সে দেয় তার অধিকটাই ফেরত পায়৷ কিন্তু মানুষের বুকে প্রেমের বীজ কেউ উদ্যেগ নিয়ে বপন করতে পারেনা। অন্তঃকোণে প্রেমের বীজ আপনাআপনিই ঠাঁই পায়। সে বীজ ধীরে ধীরে বিস্তর রূপ ধারণ করতে থাকে। দু’টো মানুষের হৃদয়ে তোলপাড় সৃষ্টি করে কখনো হাসায়, কখনো কাঁদায়, কখনো বা সুখ,দুঃখ মিলিয়ে প্রেমের ভেলায় ভাসায়৷ প্রেম আপনাআপনিই আমাদের কাছে ধরা দেয় বলে একে অবজ্ঞা করতে নেই বরং যত্ন নিতে শিখতে হয়, সম্মান করতে জানতে হয়৷ রঙ্গন সেটুকুরই চেষ্টা করে। এই যেমন গত দু-মাসে রঙ্গন শাহিনুরের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তুলেছে৷ জেনে নিয়েছে শাহিনুরের অন্তঃকোণে থাকা সমস্ত কথোপকথন’কে। তার ইচ্ছা’কে তার চাওয়া,পাওয়া’কে। অবুঝ মেয়েটা’কে যতোটুকু পারে বোঝদান করার চেষ্টা করেছে। মেয়েটার সরলতা কিঞ্চিৎ কমানোর চেষ্টা করেছে। কিন্তু পারেনি। তবুও নিরাশ হয়নি সে কেন জানি এই সরলতাটুকুই তার ভীষণ ভালো লেগেছে। এই সরলতাটুকুই তাদের বন্ধুত্ব গাঢ় করেছে। এই যেমন রঙ্গন যখন শাহিনুরের সাথে তার দুঃখ, কষ্টগুলো ভাগ করে নেওয়ার চেষ্টা করলো শাহিনুর তা সাদরে গ্রহণ করে নিলো। রঙ্গন যখন তার হৃদয়ের সমস্ত যন্ত্রণাটুকু ব্যক্ত করলো শাহিনুরের দু-চোখ বেয়ে অশ্রু ঝড়তে শুরু করলো। সরল মনে ক্রন্দনরত কন্ঠে বোকাপাখিটা বললো,
-‘ তুমি কষ্ট পেওনা বাঁশিওয়ালা আমি তোমাকে খুব ভালোবাসি। তুমি পরকালে উপরওয়ালার কাছে তোমার ভালোবাসার মানুষ’টাকে চেয়ে নিও। তবুও তুমি মন খারাপ করো না। ‘
সেদিনই রঙ্গন বুঝেছিলো শাহিনুর ঠিক কতোটা সরল৷ মেয়েটা ভালোবাসার মানে বুঝে না তবুও তাকে বলে ভালোবাসি। সে ভালোবাসার মানে বুঝে তাই আজো বলেনি ‘নুর আমি তোমাকে ভালোবাসি’। কিন্তু তাদের মধ্যে বন্ধুত্ব গড়ে ওঠেছে। তারা একে অপরকে পাশে চায়,তারা একে অপরের সঙ্গ পেলে খুশি থাকে, ভালো থাকে৷ রঙ্গনের খুব ইচ্ছে করে শাহিনুরের ইচ্ছে পূরণ করতে৷ তারপর শাহিনুরের প্রচণ্ড খুশিটুকু উপভোগ করতে৷ একদিন কথার ছলে শাহিনুর বলেছিলো তার খুব ঘুঙুর পরতে ইচ্ছে করে। খুব ইচ্ছে করে আম্মা,মান্নাত বুবুদের মতো ঘুঙুর পরে নৃত্য করতে৷ বাইজি গৃহের সকলের মতো সাজতে মন চায়,কপালে টিপ পরতে মন চায়। ইশ কতো চাওয়া শাহিনুরের। অথচ এসব কোনটাই পূরণ করতে পারেনা নিজের মায়ের জন্য। শারমিন বাইজি কি জানেনা তার মেয়ে হাসলে পুরো পৃথিবী’টাই হেসে ওঠে৷ তার মেয়ের হাসি আকাশের ঐ এক ফালি চাঁদের আলোর চেয়েও অধিক দীপ্তিমান! শাহিনুরের শখ পূরণ করতেই বাইজি গৃহের কাজের মহিলা রেশমা খাতুন’কে দিয়ে ঘুঙুরের ব্যবস্থা করেছে রঙ্গন৷ বিকালে রোমানার থেকে কিছু গয়নাও নিয়ে এসেছে৷ আজ সে নিজহাতে সাজাবে শাহিনুর’কে। ইচ্ছে পূরণ করবে শাহিনুরের। অবুঝ হৃদয়ে তার জন্য এতোখানি অনুভূতি সৃষ্টি হয়েছে তার প্রতিদানে সে এটুকু দেবে না তাই কখনো হয়? বরাবরের মতো আজো রঙ্গন শাহিনুর’কে ফিসফিস করে ডাকলো৷ কারণ সে জানে আজ বাইজি গৃহের সকলে নৃত্য পরিশীলন নিয়ে বেশ ব্যস্ত। তাই শাহিনুর’কে এই কক্ষে বন্দী করে রাখা হয়েছে। রঙ্গন কয়েকবার ডাকতেই জানালা খুলে উঁকি দিলো শাহিনুর। প্রশস্ত হেসে হাত বাড়ালো রঙ্গন৷ ভীতিগ্রস্ত হয়ে হাত বাড়ালো শাহিনুরও৷ ধীরে ধীরে মই বেয়ে নেমে পড়লো দু’জনই তারপর কিছুটা দৌড়েই অরণ্যের ভিতর মিলিয়ে গেলো। ওরা যখন বনের ভিতর প্রবেশ করলো প্রণয় তখন বেশ দূরান্ত থেকে নিশানা করলো ওদের৷ বাড়ি ফেরার পর এমন কিছুর সম্মুখীন হওয়ার জন্য প্রস্তুত ছিলো সে৷ তাই খুব শান্ত ভঙ্গিতে যথাস্থানে গাড়ি রেখে পাঁচফোড়ন গৃহে প্রবেশ না করে পা বাড়ালো ঘন, বিস্তীর্ণ, নিস্তব্ধ অরণ্যের দিকে। রঙ্গনের কুটিরের সামনে কাঠের সিঁড়িতে অত্যন্ত লাজুক ভঙ্গিতে বসে আছে শাহিনুর। আর রঙ্গন তার পাশে বসে নিজ হাতে একে একে সমস্ত গয়না পরিয়ে কপালে লাল রঙা একটি টিপ পরিয়ে দিলো। সর্বশেষ দু’পায়ে ঘুঙুর পরাতেই আঁতকে ওঠলো শাহিনুর। কিন্তু পরোক্ষণেই ঘুঙুর দেখে দৃষ্টিজোড়া বড়ো বড়ো করে এক হাত মুখে চেপে ধরলো৷ নিচু কন্ঠে বললো,
-‘ ঘুঙুর! তুমি আমার জন্য ঘুঙুর নিয়ে এসেছো? ‘
রঙ্গন মাথা দুলিয়ে হাসলো তারপর শাহিনুরের একটি হাত নিজের হাতের মুঠোবন্দি করে নিয়ে দাঁড় করালো শাহিনুর’কে। বললো,
-‘ নিজ হাতে সব গয়না পরিয়ে দিলাম, হয়ে গেলো আমাদের এনগেজমেন্ট।’
অবুঝ শাহিনুর প্রশ্ন করলো,
-‘ কি হলো আমাদের? ‘
হেসে ফেললো রঙ্গন সে ভুলেই গিয়েছিলো শাহিনুর ইংরেজি জানে না। তাই বললো,
-‘ এনগেজমেন্ট মানে বিবাহের বাগ্দান। মানে তোমার আমার বিয়ের বাগ্দান। ‘
-‘ ছিঃ বিয়ে!’
পিছন ঘুরে চোখমুখ খিঁচে দাঁড়ালো শাহিনুর। রঙ্গন ভ্রু কুঁচকে শাহিনুরের সামনে গিয়ে দাঁড়ালো বললো,
-‘ আরে আরে ছিঃ কেন? ‘
-‘ আম্মা মেরেই ফেলবে আমাকে। ‘
-‘ আরে বোকা মারবে কেন আমি আছিতো সবটা সামলে নেবো। সামনে আমার ভাইয়ের বিয়ে, বিয়েটা শেষ হোক তোমায় নিয়ে পালাবো আমি। তোমার আম্মা খুশি মনেই তোমাকে আমার হাতে তুলে দেবে।’
কিছু বললো না শাহিনুর শুধু ড্যাবড্যাব করে তাকিয়ে রইলো রঙ্গনের দিকে। রঙ্গন ওর মাথায় টোকা দিয়ে বললো,
-‘ এই যে রূপসী কন্যা..আমি যে ঘুঙুর পড়ালাম সেদিকে খেয়াল আছে? ‘
চমকে ওঠে নিজ চরণদ্বয়ে তাকালে শাহিনুর৷ তারপর এপাশ ওপাশ পা নাড়িয়ে ঘুঙুরে শব্দ তুললো। আচমকাই ওষ্ঠাধরে আকর্ষণীয় হাসিটির দেখা মিললো। রঙ্গন মুচকি হেসে বললো,
-‘ তুমি কখনো নাচ শেখোনি অথচ মনে, প্রাণে ঠিক এই নৃত্য’কে লালন করো৷ পরিয়ে দিলাম ঘুঙুর এবার জমিদার পুত্র’কে নেচে দেখাও দেখি। ‘
নিস্তব্ধ, গভীর রজনী’তে ঘন জঙ্গলের ভিতর জোৎস্নার আলোতে গাছের সাথে পিঠ ঠেকিয়ে বাঁশি বাজাচ্ছে এক যুবক। সেই সুরের তালে আপনমনে ঘুঙুরের শব্দ তুলে নৃত্য করছে এক কিশোরী৷ লাল শাড়িতে ঢেউ খেলানো চুলগুলো বেনুনী অবস্থায় হাঁটু ছুঁয়ে দিচ্ছে, গা ভর্তি গহনা, কপালে লাল টিপ,হরিণাক্ষ দৃষ্টিজোড়ায় মোটা করে কাজলের প্রলেপ,ওষ্টজোড়ায় টকটকে লাললিপস্টিক, রাজকুমারী না রাজরানী? নাকি বাইজি গৃহের প্রধান বাইজি কোন উপাধি মানানসই আজ শাহিনুরের জন্য ? ঝোপের আড়াল থেকে তীক্ষ্ণ একজোড়া দৃষ্টি অকস্মাৎ নিভে গেলো৷ রুদ্ধশ্বাসে সরে গেলো মানুষটা। না পারে নিজ ভাই’কে আজ জ্যান্ত পুঁতে দিতে, না পারে বাইজি কন্যা’কে নিজ হাতে খুন করে নিজের আত্মাটুকু’কে স্বান্তনা দিতে। সবশেষে নিরুপায় হয়ে মুখ থেকে বেরিয়ে এলো,
-‘ ছিঃ। আমার রুচি এতো জঘন্য! ‘
প্রচণ্ড ক্ষিপ্ত হয়ে গৃহে ফিরলো প্রণয়। অরুণা,প্রেরণা খাওয়ার জন্য বেশ তোরজোর করলো কিন্তু প্রণয় বললো সে খেয়ে এসেছে কিছু খাবে না৷ নিজ কক্ষে গিয়ে নিজের ক্রোধটুকু নিয়ন্ত্রণে আনার চেষ্টা করলো খুব কিন্তু কোনোকিছুতেই কাজ হলো না৷ শেষে লম্বা একটা গোসল দিয়ে মাথা ঠাণ্ডা করলো। রুমজুড়ে অনেকটা সময় পায়চারি করার পর খেয়াল করলো দ্বারের বাইরে মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে আছে রোমানা৷ রোমানা’কে দেখে কিছুটা স্বস্তি পেলো প্রণয় তবুও ভ্রুদ্বয় কুঁচকে গম্ভীর কন্ঠে বললো,
-‘ ওভাবে চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছো কেন কিছু বলার থাকলে রুমে এসো। ‘
দুরুদুরু বুকে রুমে প্রবেশ করলো রোমানা৷ কিন্তু যা বলতে এসেছে তার কিছুই বলতে পারলোনা৷ অতিরিক্ত লজ্জাবতী হওয়ার এই জ্বালা৷ যা মনে আসে কিছুই বলা হয়ে ওঠে না। কিন্তু প্রণয় যা সাংঘাতিক মানুষ কিছু না বললে প্রচণ্ড রেগে যাবে। তাই আমতা আমতা করে এ’কথা সে’কথা বলতে বলতে বিকালে রঙ্গনের সাথে হওয়া সমস্ত কথাই গড়গড় করে বলতে লাগলো। সকল কথা শেষে রোমানা খেয়াল করলো সে ঠিক কি অঘটনটা ঘটিয়েছে। জমিদার বাড়ির এক ছেলে বাইজি কন্যার প্রেমে মজেছে আর সে কিনা আরেক ছেলে’কে তা খুশি মনে জানাচ্ছে! এবার যদি ঝড় ওঠে সামলাবে কে? ভয়ে হাত,পা কাঁপতে শুরু করলো রোমানার৷ রোমানার অকস্মাৎ থেমে যাওয়াতে প্রণয় দৃঢ় দৃষ্টিতে তাকালো রোমানার দিকে৷ রোমানা তার সে দৃষ্টি দেখে ভয়ে থরথর করে কাঁপতে কাঁপতে বললো,
-‘ বিশ্বাস করো আমি ইচ্ছে করে কিছু বলিনি। ‘
প্রণয় ধীরপায়ে রোমানার সম্মুখে এসে দাঁড়ালো। গভীর দৃষ্টিতে রোমানার দিকে তাকিয়ে এক হাতে রোমানার গালে আলতো ছুঁয়ে প্রশ্ন করলো,
-‘ ভয় পাচ্ছো? যদি রঙ্গন’কে শাস্তি দেই। আব্বা,আম্মা’কে জানাই বা ঐ বাইজি’কে,বাইজির কন্যা’কে কঠোর শাস্তি দেই? ‘
শুষ্ক গলায় রোমানা বললো,
-‘ এসব করোনা প্রণয় প্লিজ। ‘
-‘ কিচ্ছু করবো না শুধু তুমি রুম থেকে বেরিয়ে যাও।’

নির্ঘুম একটি রাত পার করে সকাল সকাল বাগানে হাঁটতে বের হলো প্রণয়। সারারাত রোমানার কথাগুলো তার মাথায় ঘুরেছে। দু-চোখে স্পষ্ট হয়ে ওঠেছে রঙ্গন এবং শাহিনুরের হাস্যজ্জ্বল মুখগুলো। মনে প্রশ্ন জেগেছে তারপর কি হলো কতোটুক হলো? এই যে বাগানে পায়চারি করছে কিন্তু মন তার কাল রাত্রিতেই থেমে আছে। শরীরের রক্ত টগবগ করছে। তীব্র অস্বস্তি, ব্যাকুল মনে পায়চারি করা কালীন প্রেরণা এসে সামনে দাঁড়ালো। বললো,
-‘ কাল রাতে কথা বলার সুযোগ দিলে না। পরে বলবে তোমাকে না জানিয়ে আমরা সিদ্ধান্ত নিয়েছি।’
মা’য়ের দিকে চিন্তিত ভঙ্গিতে তাকিয়ে রইলো প্রণয়। প্রেরণা চটপটে গলায় বললো,
-‘ আমরা সকলে মিলে সিদ্ধান্ত নিয়েছি আজি তোমার আর রোমানার বাগ্দান সেরে ফেলবো। তোমার কোন সমস্যা নেই তো বাবা। ‘
-‘ না নেই আম্মা, এ বিষয়ে আগেই কথা দিয়েছি আপনাকে নতুন করে কিছু বলার নেই। ‘
-‘ তুমি প্রস্তুত জেনে খুশি হলাম। ‘
স্মিথ হাসলো প্রণয় প্রেরণা ঘরে ফিরে গেলো। মা চলে যেতেই প্রণয় একটি গাছের আড়ালে গিয়ে এক হাত মুঠ করে প্রচণ্ড শক্তি খাঁটিয়ে পরপর তিনটে ঘুষি মারলো গাছটিতে।

সন্ধ্যার পর উপস্থিত পরিবারের সকল সদস্য এবং আত্মীয় স্বজন সকলের সম্মুখে রোমানা’কে নিজহাতে নাকফুল পরিয়ে দিলো প্রেরণা। তারপর প্রণয়’কে বললো আংটি পরাতে। প্রণয় মৃদু হেসে রোমানাকে আংটি পরিয়ে দিলো। হয়ে গেলো তাদের বিবাহের বাগ্দান। আবেগে ঘনীভূত হয়ে কেঁদে ফেললো রোমানা। রোমানার মাথায় আলতো হাত চেপে প্রণয় বললো,
-‘ সুখের মূহুর্তে কাঁদতে নেই রোমানা। ‘
এটুকু বলেই ওঠে দাঁড়ালো প্রণয়। কিছুক্ষণ বিরতি প্রয়োজন বলে সকলের থেকে আড়ালে চলে গেলো।
কখনো কখনো একটুখানি চিৎকার করার জন্য হলেও নীরব পরিবেশ প্রয়োজন। প্রণয় সেই পরিবেশের খোঁজ করতে করতে জমিদার বাড়ির খোলা অরণ্যের শেষ সীমানায় এসে পৌঁছালো। অন্ধকারাচ্ছন্ন সারি সারি সুপারি গাছগুলোর নিচে দাঁড়িয়ে চিৎকার করে বললো,
– এই বিস্তীর্ণ, নিস্তব্ধ অরণ্যকে যদি প্রশ্ন করি, ‘জমিদার অলিওর চৌধুরী’র পুত্র হওয়া সত্ত্বেও কেন আমার মনের আরশিতে সুস্পষ্টভাবে এক বাইজি কন্যার মুখচন্দ্রিকা ভেসে ওঠে?’ কী উত্তর দেবে এই নিস্তব্ধ রাত, এই নিস্তব্ধ অরণ্য? যদি বিশাল আকাশে বসবাসরত ঐ চন্দ্র,নক্ষত্রদের প্রশ্ন করি, ‘জমিদার পুত্র হওয়া সত্ত্বেও কেন আমার হৃদয়ে অতি সাধারণ এক বাইজি কন্যার বাস? ‘ কী উত্তর দেবে এই নিস্তব্ধ শীতল প্রকৃতি’রা…

চলবে…
[কার্টেসী ছাড়া কপি নিষেধ ]
[ সকলের মন্তব্য আশা করছি ]

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here