Wednesday, June 17, 2026
Home "ধারাবাহিক গল্প প্রিয় দিও বিরহ প্রিয় দিও বিরহ ” পর্ব-২৮

প্রিয় দিও বিরহ ” পর্ব-২৮

0
1128

“প্রিয় দিও বিরহ”

২৮.

বাসের উৎকটে ধোঁয়ার গন্ধ। সঙ্গে অনবরত হর্ণ আর উঁচু নিচু ধাক্কা। সব মিলিয়ে বোরকার ভেতর থেকেই বমি পেয়ে যাচ্ছে মেহতিশার। পেটে মোচড় দিয়ে দিয়ে উঠছে। দুপুরের মৃদুমন্দ রোদও খুব বাজে লাগছে। ফজুল মির্জার বাড়ি থেকে বের হওয়ার পর থেকেই শরীরটাও খারাপ লাগছে। চলে আসার সময় অবশ্য তুলি নামের মেয়েটার হাতে হাজার পাঁচেক টাকা ধরিয়ে দিয়েছে। চোখদুটো ছলছল করছিলো মেয়েটার৷ মেহতিশা বুঝেছিলো ঘরের অবস্থা দেখেই, যে তারা খুব একটা ভালো নেই।
দারোয়ানের কাজ করা অব্দি ভালোই চলছিলো। কিন্তু, এখন তুলি এই বয়সেই পড়াশোনা খুব কষ্টে চালিয়ে দিনরাত টিউশনি করে। চেহারাটা দেখেই মেহতিশার ভীষণ মায়া লেগে গিয়েছে। তবে, ফেরার সময় তুলি মেহতিশাকে যখন বলল,

‘আপু, তুমি না খুব সুন্দর! খুব ভালোও। ‘

মেহতিশা তখন হেঁসে ফেললো। বোরকা পড়ায় প্রথমে মেহতিশার বয়স বা চেহারা বুঝতে না পারলেও। মেহতিশা যখন নিকাবটা খুলে পানি খাচ্ছিলো তখন হা করে তাকিয়ে কথাটা বলে ফেললো তুলি। মেহতিশা কোনোমতে ফজলুর মুখ থেকে কিছু তথ্য বের করে এনেছে। তিনি নাম বলার পর আর কিছু বলতে চাইছিলেন না। খুব চেষ্টা করে দুই তিনটা কথা বের করেছে। যদিও তথ্য গুলোও কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। অনেক কিছুই জেনেছে মেহতিশা। ঘটনার কিছুটা হলেও বুঝেছে। ফজলু মির্জা সেসময় যা বললেন তা হলো,

‘ফ্যাক্টরিতে আগুন লাগার প্রায় ছয় মাস আগে একদিন ফ্যাক্টরির অফিসে একটা ডিল হয়। যেখানে মেহতিশার চাচা ও বাবা দুজনেই ডিল করেন অনন্য শায়েরের সঙ্গে। মাঝে মাঝে বিভিন্ন কাজে তারা ফ্যাক্টরিতে আসতেন। হঠাৎ করেই কোনো কিছুর জের ধরে অনন্য শায়েরের মেহতিশার বাবার সঙ্গে তুমুল কথা কাটাকাটি হলো। অনন্য শায়ের বয়সে শামীউল্লাহ জামানের অনেক ছোট হলেও তেজ ও ব্যাক্তিত্বে চরম অহমিকা প্রকাশ পায়। বাহিরে মানুষরা তো আর অতকিছু জানতো না। কিন্তু,
আগুন লাগার সাত দিন আগে মারামারিও হয় দুপক্ষের। অনন্য শায়ের হুমকি দিয়ে যায় যে সে সবকিছু ধ্বংস করে ছাড়বে। ‘

এছাড়াও হয়তো ফজলু মির্জা আরও কিছু জানতেন কিন্তু বহু জোড়াজুড়ির পরও মুখ খুললেন না। তাই বাধ্য হয়ে বেরিয়েই আসলো মেহতিশা। এছাড়া দর্পণ যদি এসে পড়ে। যদিও এখন কোনো সময় না আসার। তবু্ও ভয় লাগে। দর্পণ ভালোর সময় অনেক ভালো। ভালোবাসার সময় একেবারে উজার করে দিবে।
কিন্তু, একবার রেগে গেলে কিছুর তোয়াক্কা করেনা। মানুষকে কনফিউজ করে দেয়, যে লোকটা আসলে ভালো নাকি খারাপ! আদৌতে, এরা হুটহাট রেগে যাওয়া পাবলিক৷ রাগে খিটমিট করলেও ভালোবাসাটা অসীম। মেহতিশার এতো দিনের অভিজ্ঞতা তো তাই বলে। মেহতিশা বুঝেছিলো, দর্পণ সত্যিই তাঁকে ভালোবাসে কিন্তু সেদিন বলেছিলো সে প্রতিজ্ঞাবধ্য। তারমানে হতে পারে, দর্পণ কাউকে কিছু বলতে পারবেনা। বড় কোনো কারণ আছে পেছনে।

মোবাইলে রিংটোনের আওয়াজে কেঁপে উঠলো মেহতিশা। বাস এখনো চলছে। আসার সময় গাড়ি পাচ্ছিলো না বলে বাধ্য হয়ে বাসেই উঠলো। তখন বাসটাও মোটামুটি খালিই ছিলো। এখন দর্পণের কল দেখে ঘাবড়ে গেলো মেহতিশা। দর্পণ কী বাসায় ফিরে এলো! দর্পণ যদি ফিরে আসে কী করে সামলাবো! ভেবেই অস্থির হলো মেহতিশা। কল একবার কেটে গিয়ে দ্বিতীয়বার কল আসতেই মেহতিশা ভয়ে ভয়ে রিসিভ করলো। দর্পণের স্বাভাবিক কন্ঠ –

‘কী করছেন বউজান?’

মেহতিশা হাফ ছেড়ে বললো,

‘এইতো খাবার খেলাম মাত্র। ‘

‘কী খেলে?’

‘ইয়ে..ওই ডিম খেলাম ডিম! ‘

দর্পণ অবাক হয়ে গেলো। মেহতিশা তো ডিম একটুও পছন্দ করেনা। ডিম দেখে একদিন বমি করে ভাসিয়েছিলো।দর্পণ হেঁসে বললো,

‘মজা করছেন বউজান!’

‘না তো কেনো?’

‘আপনি তো ডিম দুচোখে দেখতেই পারেন না। তাহলে! ‘

মেহতিশা বুঝতে পারলো বোকার মতো একটা কথা বলে ফেলেছে। এবার কথার মোড় ঘুরিয়ে বললো,

‘উহ! কীসব ডিম নিয়ে বসেছেন! আপনি খেয়েছেন? ‘

মেহতিশা সাধারণত দর্পণকে জিজ্ঞেস করেনা কী খেয়েছে বা কী করছে। কারণ মেহতিশার সঙ্গে সেইদিন কথা কাটাকাটি হওয়ার পর আগ বাড়িয়ে কথা বলা ছেড়ে দিয়েছে। দর্পণ বাহিরে থাকাকালীন একা একাই খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে কথা বলে। তবে, আজ দর্পণ সেসবে পাত্তা না দিয়ে খুশিই হলো। অভিমানীর বুঝি অভিমান কমলো। দর্পণও আগ্রহ নিয়ে এটা ওটা বলছে আবার গম্ভীর গলায় আদেশ দিচ্ছে ঘর থেকে খুব বেশি প্রয়োজন ছাড়া বের না হতে। মেহতিশা তখন মোবাইলের দিকে তাকিয়ে শুকনো ঢোক গিলছে। দর্পণ যদি জানে মেহতিশা শুধু ঘরই না বাড়ি থেকেই বেরিয়ে গেছে তাহলে, কী যে করবে ওকে! ভেবেই বুকটা দুরুদুরু করে কাপছে। কোনোভাবে মেনেজ করে মেহতিশা যেই না কলটা রাখবে তখনই বাস কন্টাক্টর এসে বলল,

‘ভাড়া দেন আপা। ‘

বাসের তীব্র বেগের হর্ণটাও তখনি বেজে উঠলো। মেহতিশার প্রাণপাখি উড়ে যাওয়ার উপক্রম। দর্পণ ওপাশ থেকে হ্যালো হ্যালো করে বলছে,

‘এটা কীসের আওয়াজ হলো? ‘

‘ওইতো বাস্তায় গাড়ির আওয়াজ। আমি বারান্দায় দাঁড়িয়েছি তো তাই।’

বলেই ফোনটা কেটে দিলো মেহতিশা। ভাড়াটা দিয়ে বাসায় ফিরলো। তখন বেলা বারোটা গড়িয়েছে। পেটে চিনচিন করছে। ক্ষুধায় হয়তোবা। লালিমা শেখ তখন ড্রইংরুমে নেই। ঘর ফাঁকা। সুবিধাই হয়েছে। মেহতিশাকে ঢুকতে দেখে রান্নাঘর থেকে মালা ছুটে আসলো। ফরফর করে বলতে লাগলো,

‘আফনে এতো দেরি কইরা আইলেন ক্যান আফা! আমি যে ভয়ডা পাইসি! যাই হোক, ভাইজানরে সারপেরাইজ দিসেন ছুডু আফা? ‘

মেহতিশা বেজায় ক্লান্ত। কথা বলার শক্তি পাচ্ছেনা। ভরা পেটে এতদূরে অনেক দিন হয়েছে জার্নি করা হয়নি। তাই, খারাপ লাগছে। এখন কিছু না খেলে অজ্ঞান হতে বেশী সময় নিবেনা। মেহতিশা ঘোলা চোখে তাকিয়ে বললো,

‘মালা, আমার শরীরটা খারাপ লাগছে। তুমি দ্রুত খাবারটা ঘরে নিয়ে এসো। তোমার ভাইজান এলে ভুলেও আমার বাহিরে যাওয়ার কথাটা বলবেনা। খেয়াল রেখো। ‘

মালা কিছু বুঝতে না পেরে মাথা কাত করে হ্যা বললো। তারপর দৌড়ে ছুটে গেলো খাবার আনতে। মেহতিশা ঘরে এসে বোরকাটা খুলে আলমারিতে রেখেই খাটে শুয়ে পড়লো। নাহ! দুপুরে যাওয়া উচিত হয়নি। কিন্তু এছাড়া সময়ও তো ছিলোনা। দর্পণ তো বিকেল হওয়ার আগে আগেই চলে আসে। এরপর অন্য কোনো উপায় বের করতে হবে। নাহলে, অসুস্থ হয়ে বিছানায় পড়ে গেলে এতো এতো রহস্য গুলোর সমাধান করবে কী করে!

পাঁচ মিনিট পরই খাবারের প্লেট হাতে ছুটে এলো মালা। মেহতিশা উঠে দূর্বল হাতে খেতে খেতে বললো,

‘নিশি আপু খেয়েছে? ‘

মালা এক চিলতে হাসি ফুটিয়ে বলল,

‘হ, জানেন আইজতো চমৎকার হই গেছে। ‘

মেহতিশা ভ্রু কুচকে বলল,

‘কীসের চমৎকার! ‘

‘খালাম্মা নিজের হাত দিয়া নিশিতা ভাবিরে খাওয়াই দিসে। ‘

‘কীহ! সত্যি বলছো! ‘

‘আমি ভাত নিয়া গেলাম খাওয়াইতে। ওমা! আমার হাত থিকা প্লেট নিয়া খালাম্মা কয় সেই নাকি খাওয়াইবো। আমি তো পুরাই বেআক্কল হই গেলাম। কী আর কবো! ‘

মেহতিশার খুশিতে চোখ ঝলমল করে উঠলো। এতদিনের চেষ্টা সফল হলো তাহলে। স্বস্তির নিশ্বাস ফেললো। যাক, এবার থেকে নিশিতা একটু হলেও যত্নে থাকবে। মেহতিশা খাওয়া শেষ করে শুয়ে রইলো ঘরের পর্দা দিয়ে।

সন্ধ্যার ফুল ফুটছে। আকাশে লালাভ রঙ সরে গিয়ে আস্তে আস্তে নীলিমাতে রূপান্তরিত হচ্ছে। অপূর্ব সুন্দর পাখিগুলো নিজ নিজ বাসায় ফিরে যাচ্ছে। সবারই তো একটা আশ্রয়স্থল আছে। যেখানে আর কিছু করা যাক আর না যাক শান্তিতে চোখ বুজে শুয়ে মাথার উপরের ছাদটা দেখে বলা যায় আমারও একটা নীড় আছে। আমি নীড়হীনা নই। শীত যেহেতু শেষের পথে তাই হঠাৎ করেই বৃষ্টি শুরু হলো। ইলশেগুঁড়ি বৃষ্টি আরকি। রাস্তাঘাটকে পরিষ্কার করছে বলা যায়। মেহতিশা শুয়ে শুয়ে হাতে একটা বই নিয়ে পরিবেশটা উপভোগ করছিলো।

ঘরের দরজা খুলে ভেতরে আসলো দর্পণ। আজ সারাদিনে প্রচুর ব্যস্ত ছিলো সে। নাওয়াখাওয়া ভুলে গিয়েছিলো একপ্রকার। রোজ বিকেলের একটু আগে ফিরলেও আজকে ক্লায়েন্টদের সঙ্গে কথা বলতে বলতে অনেকটাই দেরি হলো। মেহতিশা ওকে দেখে উঠে এলো। গায়ে ওড়ে জড়িয়ে এগিয়ে আসলো। দর্পণের শরীরটা ভিজে গেছে। বৃষ্টি হয়তো বেড়েছে। চুলগুলো থেকে টুপটাপ ফোঁটা ঝড়ছে। মোহনীয় লাগছে দেখতে। হাতে কোর্টটা ঝুলছে। কাঁধ থেকে ব্যাগটা নিয়ে পাশে রাখলো মেহতিশা। নিঃশব্দে টাওয়াল এগিয়ে দিয়ে বললো,

‘মুছে নিন। ‘

দর্পণ একদৃষ্টিতে তাকিয়ে কী যেনো দেখছে। মেহতিশা দূরে সরতে নিলে হেঁচকা টানে বললো,

‘মুছে দিন। ‘

‘আপনাকে লাগুর পাইনা আমি। ‘

দর্পণ মুচকি হাসলো। খাটে বসে মেহতিশা হাতে টাওয়াল ধরিয়ে দিলো। মেহতিশাও বিনাবাক্য প্রদানেই যত্ন নিয়ে টাওয়াল দিয়ে চুল, হাত, মুখ মুছে দিলো। দর্পণ এতক্ষণ তাকিয়েই ছিলো। হঠাৎ বললো,

‘মেহতিশা, জানো আমি মিথ্যা পছন্দ করিনা?’

মেহতিশা ভড়কে গেলো। তবে কী জেনে গেলো দর্পণ, মেহতিশা যে মিথ্যা বলে ঘর থেকে বেরিয়েছিলো! এবার কী হবে?

চলবে-
লেখনীতে-নাঈমা হোসেন রোদসী।
শব্দসংখ্যা-১১৬৬।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here