Monday, June 15, 2026
Home "ধারাবাহিক গল্প ইট পাটকেল ইট পাটকেল পর্ব-২২

ইট পাটকেল পর্ব-২২

0
5048

#ইট_পাটকেল
#সানজিদা_বিনতে_সফি
#পর্ব_২২

কনফারেন্স রুমে মুখোমুখি বসে আছে আশমিন আর নূর।তার পাশেই আমজাদ চৌধুরী অমি আর সানভি বসে আছে। সবার মুখে চিন্তার ছাপ থাকলেও নূর স্বাভাবিক ভাবে কিছু একটা ভেবে যাচ্ছে।আজ সকাল থেকেই শেয়ারবাজারে তাদের শেয়ারের রেট কমছে।এভাবে চলতে থাকলে কোম্পানি অনেক বড় লসের মুখে পড়বে। বড় বড় কোম্পানি গুলো তাদের প্রোডাক্ট কম দামে ছেড়ে দিচ্ছে। সবার কোম্পানি তেই ইনভেস্ট করেছে আর এস কোম্পানি।তাই আজ সবাইকে মিটিং এ ডেকেছে নূর। চৌধুরী গ্রুপ অব ইনডাস্ট্রিজের এম ডি হিসেবে আশমিন আর আমজাদ চৌধুরী এখানে উপস্থিত হয়েছে। আশমিন একটু পর পর হাই তুলছে। আজ একটা সমাবেশ আছে তার। এভাবে বসে থেকে সময় নষ্ট করার সময় নেই তার।বিরোধী দল আজ একটা ঝামেলা পাকাবেই।সেভাবেই প্রস্তুতি নিয়ে যাচ্ছে সে। নিজের হিংস্রতা যতটা সম্ভব লুকিয়ে রাখে সে। আবার এক বেওয়ারিশ বাদর ছানা এসে জুটেছে।নাহ! আর ভালো হওয়া হলো না। আফসোসের শিষ তুললো আশমিন।আমজাদ চৌধুরী প্রচুর ক্ষেপে আছে কামিনী চৌধুরীর উপর। ভালোবাসায় অন্ধ হয়ে আজ এই দিন ডেকে এনেছে সে।প্রথম দফায় লাগাম টেনে ধরলে বুড়ো বয়সে এসব দেখতে হতো না।

আশমিন সপ্তম বারের মতো হাই তুলে জোরে বললো,

— আস্তাগফিরুল্লাহ।

আমজাদ চৌধুরী ভ্রু কুচকে তাকালো ছেলের দিকে। আশমিন সরল হেসে বললো,

— নতুন বর যে!কি খবর আপনার?দিনকাল কেমন চলে?

আমজাদ চৌধুরী বিরক্ত হয়ে চোখ সরিয়ে নিলেন। নূর অমি কে কিছু কাজ বুঝিয়ে দিয়ে নিজের কেবিনে দেখা করতে বললো।অমি মুচিকি হেসে সায় জানিয়ে চলে গেলো।

হঠাৎ আশমিন গম্ভীর গলায় নূর কে ডাকলো,, নূর।

— কি হয়েছে?(ভ্রু কুচকে)

— তুমি আশিয়ানের কথা আগে থেকেই জানতে?(শীতল গলায়)

আশমিনের প্রশ্নে তপ্ত শ্বাস ছাড়লো নূর।ভরাট গলায় বলল,

— নাহ।কিছুদিন আগে জেনেছি।

— মামা কে ভুল বুঝো না নূর।আমরা সবাই পরিস্থিতির স্বিকার।

চোয়াল শক্ত হয়ে গেলো নূরের।শক্ত গলায় বলল,

— নাহ মন্ত্রী সাহেব। আমরা আপনার মায়ের লোভের স্বীকার,আপনার মায়ের হিংসার স্বীকার, আপনার মায়ের জেদের স্বীকার। আপনার মায়ের পাপ কে পরিস্থিতির উপর চাপিয়ে দিবেন না।

আশমিনের চোখ ঘোলাটে হলো। মলিন গলায় বলল,

— আমাকে ঘৃণা করো নূর?

নূর থমকালো। উত্তর না দিয়ে শান্ত দৃষ্টিতে তাকালো আশমিনের দিকে। আশমিন মলিন হাসলো। চোখ বন্ধ করে আমজাদ চৌধুরী কে উদ্দেশ্য করে বললো,

— আমি মিসেস চৌধুরী কে কিভাবে ক্ষমা করবো আব্বু?সে যে আমার মমতাময়ী মায়ের খু*নি।তার মধ্যে বাস করা আমার আম্মুকে সে মেরে ফেলেছে। সে এখন শুধু কামিনী চৌধুরী। তার আর কোন পরিচয় নেই।

বিশাল কনফারেন্স রুমে তিনজন মানুষের নিরবতা তাদের হারানোর বিশালতা জানিয়ে দিচ্ছে।

— এতো কিছুর পরেও তুমি তাকে কিভাবে এতো ভালবাসো আব্বু?

আমজাদ চৌধুরী হাসলো। ছেলের দিকে তাকিয়ে ক্লান্ত গলায় বলল,

— তোমরা তার বিনাশিনী রুপ কেই চেনো। আর আমি তাকে নিজের একমাত্র কাছের মানুষ হিসেবে চিনি।যে বিদেশের মাটিতে আমার একমাত্র আশ্রয় ছিল। আমার কান্নায় যে কাদতো,আমার হাসি তে যে হাসতো, আমার উদাসীনতায় যে বিষন্ন হয়ে যেত।আমার খারাপ সময়ে এক মিনিটের জন্য যে আমার হাত ছাড়েনি তার প্রতিশোধের আগুনে উন্মাদ হওয়ায় আমি কিভাবে তার হাত ছেড়ে দিতাম বলো? প্রত্যেকটি ঘটনার দুটো দিক আছে বাবা।কারণ ছাড়া এই পৃথিবীতে কিছুই ঘটে না।তোমার মা তার জায়গায় ঠিক। আবার তোমরা তোমাদের জায়গায় সঠিক। তবে যা ঘটছে তা ঠিক নয়। আমি শুধু তোমাকে একটা কথাই বলতে পারি বাবা,তোমার আম্মু যতো অন্যায় ই করুক না কেন আমি তাকে ভালবাসি।আমার এই ছোট্ট জীবনের চেয়েও বেশি ভালোবাসি। সে আমার বেচে থাকার অনুপ্রেরণা। যাকে দেখে আমার আরো একটা জীবন বেচে থাকতে ইচ্ছে করে। আমার এই জীবন আমার নয়।তাকে ভালবেসে নিজের ভিতর নিজেকে অনুভব করতে পারিনা আমি।আমার পুরোটা জুরেই শুধু সে।তোমরা ছাড়া আমার আর কে আছে বলো? তুমি হয়তো ভাবছো আমি কেন তোমার মা কে সঠিক পথে নিয়ে এলাম না।তাহলে শুনে রাখো বাবা,তোমার মা বেচে আছে এই প্রতিশোধের তাগিদে। রাফসান ভাই তার নিজের কর্মফল ভোগ করেছে। ভাবি ও বাদ যায়নি।কামিনী ও করবে। আমি ও করছি।একটা কথা জেনে রাখো বাবা, একসময়ের আঘাত গুলো ই কামিনী এখন ফিরিয়ে দিচ্ছে।

— সে সুস্থ নয় আব্বু।

— আমি জানি(হালকা হেসে)।সামনে ঝড় আসছে।সামলে নিতে পারবে আমি জানি। যাকে ভালোবাসবে তাকে শত চেষ্টার পরেও ঘৃণা করতে পারবে না।হোক সে উন্মাদ, পাগল,ভয়ংকর অপরাধী। আর এখানেই আমার ব্যর্থতা। অতীত খুজতে যেয়ো না বাবা।অতীত খুজতে গেলে আমাকে হারাবে।

আমজাদ চৌধুরী নিঃশব্দে চলে গেলেন।নূর আমজাদ চৌধুরীর কোন কথা ই বুঝতে পারেনি। কি এমন করেছিল তার বাবা যার জন্য কামিনী চৌধুরী আজ এভাবে হিংস্র হয়ে উঠেছে? আশমিন চোখ বন্ধ করে গা এলিয়ে বসে আছে। এতো ক্ষমতা, এতো টাকা, আভিজাত্য দিয়ে কি হবে? যেখানে দম বন্ধ হয়ে আসে।চারিদিকে শুধু কষ্টের হাতছানি।

সানভি নক করে বললো,

— সবাই চলে এসেছে ম্যাম।

— ভিতরে পাঠিয়ে দাও।

— ওকে।

সানভি চলে যেতেই সোজা হয়ে বসলো আশমিন।নূর পেপার গুলো চেক করে আশমিনের দিকে এগিয়ে দিলো।

— অফিসের মধ্যে কি শুরু করলে।এখানে ও লাভ লেটার দিতে হবে? তোমাকে নিয়ে আর পারি না,কেন যে এতো ভালোবাসো আমাকে!

— হয়ে গেছে? (দাতে দাত চেপে)

আশমিন হতাশার শ্বাস ফেলে বললো,

— হলো আর কই?তুমি তো সুযোগ ই দিলে না।এরকম একটা বউ রেখে আমি শুকিয়ে মরছি।দেখো, এই মাত্র দুই গ্রাম শুকিয়ে গেলাম।আল্লাহ কে ভয় করো নূর। এমন জনদরদি মন্ত্রী কে তুমি বউ শূন্যতায় শুকিয়ে মারছো।আল্লাহ সহ্য করবে না। এখনো সময় আছে।পাশের রুমে চলো।বাসর দিনটা সেরে ফেলি।

নূর চিৎকার করে বললো,

— চুপ করুন অসভ্য লোক।আপনার মুখে আমি পিন মেরে দিবো। সারাক্ষণ আজেবাজে কথা। আরেকটা কথা বললে বেইলি রোডে দাড় করিয়ে আখের রস বিক্রি করাবো।তখন মন ভরে জনসেবা করবেন আর নিজেকে ও ভিজিয়ে রাখবেন।অশ্লীল।

নূরের রক্তিম ফেস দেখে আশমিন আর কিছু বললো না। তারাতাড়ি ফাইল দেখায় মনোযোগ দিল।

~

— আপনাদের এখানে ডাকার কারণ আপনারা সবাই জানেন। নিয়ম অনুযায়ী আপনারা আমাদের সাথে করা চুক্তি ভঙ্গ করেছেন।আমাদের কোম্পানি কে ইনফর্ম না করে নিজেদের প্রোডাক্ট নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে অর্ধেক দামে ছেড়ে দিয়েছেন। কন্ট্রাক্ট পেপারে উল্লেখ আছে যে,কোন বড় ধরনের সিদ্ধান্ত নেয়ার হলে সবার মতামত নিয়ে নিতে হবে। চেয়ারম্যান যা সিদ্ধান্ত নিবে তা ই চুড়ান্ত হিসেবে গণ্য হবে। আপনাদের কোম্পানি আমার কোম্পানির আন্ডারে আছে।আমাকে না জানিয়ে প্রোডাক্ট লঞ্জ করে দিয়েছেন।তাই আজ থেকে আপনার আর এস কোম্পানি থেকে কোন কাচামাল পাবেন না। আমদের কোম্পানি থেকে আপনাদের আলাদা করে দেয়া হলো।আগামী দশ দিনের মধ্যে আমাদের সমস্ত ইনভেস্টমেন্ট ব্যাক করবেন।না হলে আইনি ব্যবস্থা নেয়া হবে এবং আপনাদের কোম্পানি সিল করে দেয়া হবে।

সবার কপালে সুক্ষ্ম ঘামের রেখা দেখা দিয়েছে। নূরের তেজী মুখের দিকে তাকিয়ে কথা বলার সাহস হচ্ছে না কারোর।

অমি সবার হাতে একটা করে নোটিশ ধরিয়ে দিলো। এতগুলো টাকা একসাথে ফিরিয়ে দেয়া কোন ভাবেই সম্ভব না। আশিয়ানের হুমকি তে পরেই তারা প্রোডাক্ট কম দামে বাজারজাত করেছে।প্রথমেই এতো লস।এখন এতো টাকা!

— ম্যাডাম আমরা জানে মারা যাবো। একটু দয়া করুন।আমরা নিরুপায় হয়ে এই কাজটা করে ফেলেছি।

লোকটা সব কিছু খুলে বললো নূর কে।

— আপনাদের আমাদের সাথে আলোচনা করা উচিত ছিল।

— ফ্যামিলির উপর রিস্ক হয়ে যেতো ম্যাডাম।আপনার বাবার সাথে থেকে আমরা বিজনেস করছি।কখনো এমন হয় নি।

আশমিন গম্ভীর গলায় বলল,

— যা হওয়ার হয়ে গেছে। প্রোডাকশন কয়েকদিন বন্ধ রাখুন।কয়েকদিন পরে নতুন করে আগের দামে মাল বাজারজাত করবেন। আপনাদের লস পুষিয়ে দেয়া হবে।

সবাই সন্তুষ্ট হলেও নূর হতে পারলো না। তবুও চুপ করে সম্মতি দিল।আশমিন নূরের মনোভাব বুঝতে পারলো। সবাই বেরিয়ে যেতেই শান্ত গলায় বললো,

— আমাদের ব্যক্তিগত শত্রুতার জন্য তারা কেন ভুগবে নূর?সব কিছুর দায় আমাদের। মাথা ঠান্ডা রাখো। কিছুতেই মাথা গরম করবে না।এমন কি আমি এই মুহুর্তে তোমাকে চুমু খেলেও না।

কথা,শেষ করেই নূরের অধরে অধর মিলিয়ে দিয়েছে আশমিন। হাত পা ছোড়াছুড়ি করেও যখন কাজ হলো না তখন শান্ত হয়ে গেলো নূর।নিজেও হালকা জরিয়ে ধরলো আশমিন কে। নূরের আলিঙ্গনে উন্মাদ হয়ে গেলো আশমিন। এক হাতে সুইচ টিপে সমস্ত রুমের ইলিক্ট্রেসিটি বন্ধ করে দিলো। কোমড় টেনে নূর কে নিজের সাথে চেপে ধরে কোলে বসিয়ে দিল।

বিশ মিনিট পর দরজায় নক করলো সানভি।ততক্ষণে সবকিছু অনেকটা হাতের বাইরে চলে গেছে। ঘনঘন শ্বাস টেনে নিজেকে শান্ত করার চেষ্টা করলো আশমিন। নূরের অবস্থা নাজেহাল। পরিপাটি করা চুলগুলো এলোমেলো হয়ে মুখের সামনে পরে আছে।আশমিনের শুভ্র পাঞ্জাবি ফ্লোরে লুটপুটি খাচ্ছে। নূর কে কোলে তুলে পাশের বিশ্রামের জন্য বরাদ্দকৃত রুমের দিকে অগ্রসর হলো আশমিন। বেডে শুয়িয়ে দিয়ে এলোমেলো চুল গুলো হাত দিয়ে ঠিক করে দিলো। পোশাক ঠিক করে দিয়ে নেশালো গলায় বলল,

— যেতে হবে বউ। আজ রাত টা আমাদের হবে।আর কোন দূরত্ব চাই না আমি। আই নিড ইউ ব্যাডলি।

নূর চোখ বন্ধ করে আছে। আশমিন নূরের ঠোঁটে হালকা চুমু খেয়ে বললো,

— এখানে কিছুক্ষণ থাকো।আমি আসছি।রাতে দেখা হবে।অপেক্ষা করবে তো আমার জন্য?

নূর জরিয়ে ধরলো আশমিন কে। ধীর গলায় বলল,

— করবো।

হালকা হেসে বেরিয়ে গেল আশমিন। পাঞ্জাবি গায়ে দিয়ে নিজেকে পরিপাটি করে বেরুলো রুম থেকে। সানভি মুখ লটকিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। আশমিন সেদিকে পাত্তা না দিয়ে সরাসরি সিসিটিভি কন্ট্রোল রুমে চলে গেলো। কিছু ফুটেজ ডিলিট করে গটগট করে বেড়িয়ে গেলো অফিস থেকে। সানভি দৌড়ে এলো আশমিনের পিছু।

— আজকে সারা রাত তুমি সুইমিংপুলে দাঁড়িয়ে থাকবে সান।এটা তোমার শাস্তি।

সানভি অবাক হয়ে গেলো। ভয়ার্ত গলায় বলল,

— আমি কি করেছি স্যার।

আশমিন কটমট করে তাকালো সানভির দিকে। দাতে দাত চেপে বললো,

— আমার ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে পৃথিবীতে আসতে বাধা দিয়েছো।এতো বড় সাহস তোমার! নাহ!সুইমিংপুলে না তুমি হাতিরঝিলের নর্দমায় দাড়িয়ে থাকবে সারা রাত।আমি নিজে পাহারা দিবো তোমায়।

সানভির মুখটা কাদো কাদো হয়ে গেলো। সে বুঝতেই পারছে না সে কি ভুল করে বসেছে।

চলবে,,,

(কাউকে কিছু বলার নেই। কিছু কিছু মানুষের মন্তব্য দেখে আমি শিহরিত। যাই হোক,তবুও সবাকে ভালোবাসা। কটু কথা শোনালেও আমি তাদের ভালবাসি।কারন তারা আমার গল্প পড়ে।গল্পের প্রতিটি চরিত্র গুরুত্বপূর্ণ। খারাপ চরিত্র টি খারাপ ভাবেই উপস্থাপন করতে হবে। খারাপ লাগলেও কি করার আছে বলুন।এটা অনেক বড় একটি গল্প হবে।আমি ছাড়া কেউ জানে না আগামী তে কি হবে।আমাকে আমার মতো লিখতে দিন। সব চরিত্রের ই আলাদা আলাদা গল্প আছে।একটু ধৈর্য রাখুন।নিরাশ হবেন না।)

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here