Friday, May 1, 2026
Home "ধারাবাহিক গল্প আমি কাউকে বলিনি সে নাম আমি কাউকে বলিনি সে নাম তামান্না জেনিফার পর্ব ২০

আমি কাউকে বলিনি সে নাম তামান্না জেনিফার পর্ব ২০

আমি কাউকে বলিনি সে নাম
তামান্না জেনিফার
পর্ব ২০
__________________________

নাদের মিয়া নিপাকে নিয়ে ফিরলেন ৷ তবে নিপা একা ছিল না , নিপার সাথে এসেছে সুমাইয়া ৷ লাকী অবাক হয়ে দেখলো সুমাইয়ার মধ্যে কোন জড়তা নাই , মনে হচ্ছে যেন নিজের বাড়িতেই এসেছে ৷ একা একাই বাড়ির এদিক সেদিক ঘুরে বেড়াচ্ছে আবার নিপার কাছে এসে গুটগুট করে কী কী যেন বলে হেসে ঢলে পড়ছে ৷ মেয়েটাকে দেখে মনে হচ্ছে ওর চেয়ে সুখী এ জগতে আর কেউ নাই ৷ জটিল সম্পর্কের এমন সরল রূপ দেখে অভ্যস্ত নয় এ বাড়ির মানুষজন ৷ মেহমানকে অনাদরও করা যাচ্ছে না , আবার নিজের ননদের সতীনকে আদরও করা যাচ্ছে না ৷

ঘরে স্বামীকে একা পেয়ে গর্জে উঠে লাকী ৷ নাদের মিয়া সারাদিন থাকে বাইরে , সংসার পুরো লাকীর কাঁধে ৷ আজকাল গাজী মিয়ার শরীরও ভালো যাচ্ছে না ৷ সংসারের কোন সিদ্ধান্তে তিনি আর থাকেন না ৷ নিজের ঘরেই থাকেন দিনের বেশিরভাগ সময় ৷ এতবড় সংসারটা এখন একা সামলায় লাকী ৷ এই অবস্থায় এমন একজন অনাকাঙ্ক্ষিত অতিথি সৎকার কিভাবে করবে তা বলবারও কেউ নাই ৷ ভেতরের টেনশন কখন যে গর্জন হয়ে বের হয় লাকী নিজেও বোঝে না ৷

—কোন আক্কেলে আপনে নিপার সতীনরে বাড়ি আনলেন ? আগার পিছার সব চুলেই তো পাকন ধরছে এখনও বোধ বুদ্ধি হয় নাই আপনের ? জীবনে কুনোদিন দেখছেন যে কেউ বইনের সতীনরে ঘরে আইনা তোলে ? মেমানগিরি আপনে কইরেন ৷ আমি পারুম না ৷

—আহ বউ ! চিল্লাইও না তো ! এমনেই মাথাব্যথা করতাছে আমার ৷

—দুনিয়ার যন্ত্রনা আমার মাথাত ফালায়া আপনের মাথা করে ব্যথা ? ঢংয়ের আলাপ করেন আপনে আমার সাথে ?

—দেখো বউ , ওরে আমি আনি নাই ৷ নিপা নিজে আনছে ৷ গাড়িত উঠির টাইমে ওর হাত এমন খামচি দিয়া ধরছে , ওর শাউরী পর্যন্ত ছাড়াইতে পারে নাই ৷

—তোমার বইনের মাথার সমেস্যা হইছে ! সতীনরে বানাইছে বোন ৷ কথায় আছে ,আন সতীনে নাড়ে চাড়ে, বোন সতীনে পুড়ায়ে মারে… তোমার বইনের শেষকালে সেই দশা হইবো ৷

—যা হইবো সে পরেরটা পরে দেখা যাইবো ৷ তুমার বাড়ি মেমান হইয়া আইছে তুমি সমাদর করো ৷ বাকী মেমান যেমন সমাদর পায় তেমনই সমাদর করো ৷ যার সতীন তার যদি অসুবিধা না থাকে , তোমার আমার অসুবিধা হওনের কথা না ৷ যাও তো , এক গ্লাস লেবুর শরবত আনো তো ৷

লাকী নিজের মনে গজগজ করতে করতে লেবুর শরবত করতে যায় ৷ গিয়ে অবাক হয়ে দেখে সেখানে সুমাইয়া কী যেন খুঁজছে ৷ নিজেকে সামলে নিয়ে কোনমতে জিজ্ঞেস করে

—আপনে এইখানে যে ? কিছু লাগলে আমারে বুলাইতেন ৷

—নিপারে একটু শরবত দিতাম ৷ বাড়িতে তো আমিই দেই , অভ্যাসবসেই চইলা আসছি ভাবি ৷ আর আপনে আমারে তুমি কইরা কন ৷ আপনে আপনে শুনতে ভালো লাগে না ৷

—নিপার ভাইয়ের জন্য শরবত বানাইতেই আসছি , যাও নিপারেও দিতেছি ৷

—চিনি একটু কম দিয়েন ভাবি , বেশি চিনি খাওন ভালা না এই সময় ৷

—হ , ঠিক আছে ৷

—আপনের যেকোন সাহায্য লাগলে আমারে ডাইকেন ভাবি ৷

—আইচ্ছা

লাকী ইচ্ছে করেই সংক্ষেপে উত্তর দেয় ৷ কথা বাড়াতে ইচ্ছে করছে না তার ৷ নিজের মনেই বিড়বিড় করে
“নিম তিত, নিশিন্দে তিত, তিত মাকাল ফল,
তার চেয়ে তিত কন্যে বোন সতীনের ঘর”… সতীনরে বানাইছে বোন , ঢং দেখে মরে যাই

*************

আলেয়া বেগম রূপার অবাধ্য চুলগুলোকে বেঁধে দেবার জন্য কাছে নিয়ে বসেছেন ৷ রূপার মাথায় ঘন কালো চুল , ওর মায়েরও এমন চুল ছিল … আজকে রূপাকে ঘটক দেখতে আসবে ছেলের মামাকে সাথে নিয়ে ৷ নিপার এমন সময়ে মেয়ে দেখানোর মত বড় আয়োজনে যেতে চায়নি আলেয়া বেগম ৷ মেয়েটার পেট নেমে গেছে , নয়মাসে পড়ছে কিন্তু মনে হয় নয়মাস শেষ হবে না , আগেই বাচ্চা হবে ৷ তারা অভিজ্ঞ মানুষ , পেট দেখেই বুঝতে পারেন ৷ তিনি খেয়াল করেছেন নিপা হাঁটার সময় বাম পা টেনে টেনে হাঁটে ৷ তার নয়ন যখন পেটে ছিল বাম পায়ে এমন ব্যথা হয়েছিল যে পা টেনে টেনে হাঁটতো , দেখে তার শাশুড়ি বলেছিল “মনে হয় তোমার পোলাই হইবো , পোলার মায়ের বাম পা ভারি ” … আলেয়া বেগমের মন খারাপ হয়ে যায় ৷ চোখের সামনে কতগুলো মানুষ দুনিয়া ছেড়ে চলে গেলো ৷ আজকাল তার নিজেরও শরীর ভালো থাকে না ৷ হয়তো সময় চলে এসেছে ৷

পাত্রপক্ষের সামনে শাড়ি পড়ে মাথায় কাপড় দিয়ে বসে আছে রূপা ৷ পাত্রের মামা প্রশ্ন করছেন একের পর এক … সুরা ফালাকের অর্থ বলো .. ইলিশ মাছ কাটতে কতটুকু ছাই লাগে … এসব নানান প্রশ্ন ৷ রূপা সব ঠিকঠাক উত্তর দিচ্ছে আর দরজার দিকে দেখছে … নয়ন বাড়িতে নেই , কোথায় গেছে কখন আসবে রূপা জানে না ৷ সে শুধু মনে মনে একটাই প্রার্থনা করছে “ইয়া মাবুদ নয়ন ভাইরে পাঠায়ে দেও …”

রূপার প্রার্থনা স্রস্টা কবুল করলেন ৷ রূপা যখন একরাশ অর্থহীন প্রশ্নে জর্জরিত তখনই ঘরে ফিরলো নয়ন ৷ ফিরেই ঘটকের সামনে রূপাকে মাথায় কাপড় দিয়ে বসে থাকতে দেখে একদম মুহূর্তের মধ্যে মেজাজ সপ্তমে চড়ে গেলো তার ৷ রাগ নিয়ন্ত্রন করার অনেক চেষ্টা করেও না পেরে সে গিয়ে ঘটকের কলার ধরে তাকে উঠালো ৷ তারপর দাঁত কিড়মিড় করে বলতে লাগলো “মানা করছি না ! মানা করছি না এই বাড়িত আসতে … এক্ষন বাইর হন নিজের মান সম্মান লইয়া ! এক্ষন বাইর হন ! ” ঘটকের কলার ছেড়ে তাদের সামনে রাখা খাবার পানি সব এক ধাক্কা দিয়ে ফেলে দেয় ৷ মাটির মেঝেতে এক জগ পানি পড়ে গড়াতে থাকে … ছেলের এমন ভয়ঙ্কর রাগ দেখে আলেয়া বেগম , মানিক মিয়া দুজনেই ভয় পেয়ে যায় ৷ তাড়াতাড়ি ঘটক বিদায় করতে পারলে তারা বাঁচে …

ঘটক চলে যাবার পর বাবা মাকে সামনে বসিয়ে দৃঢ় গলায় নয়ন বলে ” রূপার পড়ালেখা শেষ হবার আগে বিয়ের কথা কেউ মুখে আনবা না ৷ এত ভালো রেজাল্ট করছে একটা মাইয়্যা আর ওরে পড়ার সুযোগটা দিবা না ! ক্যান দিবা না ? অয় মাইয়্যা তাই ! অয় পড়বো , দেখি কে ঠেকায় ….”

রাত গভীর হয় ৷ পুরো গ্রামটা ঘুমের অতলে ৷ শুধু জেগে আছে রূপা … তার বুকের খাঁচায় আটকে থাকা হৃদয়টা বের হয়ে আসতে চাচ্ছে ৷ আজকে নয়ন যেভাবে তাকে ঘটকের সামনে থেকে উদ্ধার করেছে সেই কথাগুলোই বারবার মনে পড়ছে ৷ বারবার ইচ্ছে করছে মানুষটাকে একটাবার একটু দেখতে ৷ সাহস করে নিজের ঘর থেকে নয়নের ঘরের দিকে পা বাড়ায় রূপা …

ভাগ্য সুপ্রসন্ন , ঘরের জানালা খোলা ৷ মানুষটা এখনও জেগে আছে ৷ ঘরের মধ্যে হাঁটাহাটি করছে ৷ ঘরের মধ্যে পরিষ্কার দেখা যাচ্ছে না , তবুও রূপা যেন নয়নের প্রতিটি পদক্ষেপ অনুভব করছে ৷ ইচ্ছে করছে দরজা খুলে ভেতরে ঢুকে আলো জ্বালিয়ে মানুষটাকে এভাবেই হাঁটতে দেখে ৷ একটুও বিরক্ত করবে না তাকে , শুধু নয়ন জুড়িয়ে তার নয়নকে দেখবে সে ….

মানুষটাকে ছুঁতে না পারার কষ্টে মরমে মরে যায় রূপা ৷ শুধু একটাবার , একটাবার একটু ছুঁয়ে দেখতে পারলে জনম জনম সেই স্পর্শে বিভোর হয়ে কাটিয়ে দেওয়া যেতো ! একটু হাতটা ধরে দু’মিনিট বসে থাকতে পারলে , সেই দু’মিনিটের বিনিময়ে জীবন দিতেও দ্বিধা থাকতো না তার …

ভাবনার জগতে রূপা যখন ভাসছে তখনই নয়নের গলা ভেসে আসে …. জানালার গ্রীল ধরে থাকা রূপার হাত দুটো ধরে নয়ন বলে “রূপা , ঘরে যা ..”

সৃষ্টিকর্তাকে ধন্যবাদ দিতে দিতে নিজের ঘরে ছুটে পালায় সে ৷ নিজের হাত দুটো বুকের কাছে নিয়ে চোখ বন্ধ করে ফেলে ৷

এই হাত দুটোতে নয়নের ছোঁয়া লেগে আছে , এদের জায়গা তাই আজ বুকের মধ্যেখানে…

চলবে–

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here