Wednesday, June 17, 2026
Home "ধারাবাহিক গল্প ঝরা বকুলের গল্প ঝরা_বকুলের_গল্প #পর্ব_৪ #মেহা_মেহনাজ

ঝরা_বকুলের_গল্প #পর্ব_৪ #মেহা_মেহনাজ

0
559

#ঝরা_বকুলের_গল্প
#পর্ব_৪
#মেহা_মেহনাজ
.
.
.
প্রচলিত আছে, ধুতরা ফুল অতিরিক্ত মাত্রায় খেলে লোকে পাগল হয়ে যায়। এমন বিষাক্ত ফুল গ্রামাঞ্চলে হাতের মুঠোয় থাকে সবসময়। যেকোনো জঙ্গলে একটু গভীর মনোযোগে খুঁজলেই পাওয়া যায় সহজেই। শাহজাদি সকালেই দেখেছিল এদিকটায়। রাতের আঁধারে তাই খুঁজে পেতে অসুবিধা হলো না খুব একটা। খুব দ্রুততার সঙ্গে সে কাজগুলো করে ফেললো। কিছু ফুলের নিলো, গাছের পাতা নিলো, তারপর নিজের ঘরে এসে দরজার খিল আঁটকে সেগুলো হাত দিয়ে নেড়েচেড়ে দেখল। আগামীকাল সকালে দুধের সাথে বকুলের পেটে যাবে এগুলো। তারপর এই সংসারে শুধুমাত্র ওর একার রাজত্ব চলবে।

অন্যান্য দিনের তুলনায় আজ একটু বেশি সময় ধরে ঘুমালো বকুল। একেবারে বেহুশ ঘুম। কখন ভোরের আলো ফুঁটেছে, কখন হাঁস-মুরগিদের কলতান শুরু হয়েছে, সে বলতে পারে না। যখন তার চোখ খুললো, তখন রোদের তেজ মাথার উপর। যদিও সেই তেজ পরিপূর্ণ ভাবে শীত সরাতে ব্যর্থ। প্রকৃতিতে শুষ্কতা বিরাজমান।

বকুল প্রথম কিছু সেকেন্ড সময় নিয়ে নিজেকে ধাতস্থ করে। তারপর যখন বুঝতে পারল, আজ বেলা গড়িয়েছে অনেকটা, তখন পড়িমরি করে ছুটে বাইরে বেরিয়ে এলো। দুটো রান্নাঘর। একটা টিন দিয়ে তৈরি, আরেকটা খোলা আকাশের নিচে, উঠোনের এক পাশে। টিনের তৈরি রান্নাঘরটা বৃষ্টি-বাদলের সময় ব্যবহার করা হয়ে থাকে। বাদবাকি সময় উঠানেই রান্না করা হয়। বকুল দেখল, রুনু বেগম রান্না চড়িয়েছেন, পাশেই শাহজাদি বসে আলু ছুলছে। মোরশেদ একটু অদূরে দড়ি ধরে দাঁড়ানো। বকুলের উপস্থিতি ওদের তিন জনকেই সচকিত করে তুলল।

রুনু বেগম নরম গলায় বললেন,

“ঘুম ভাঙছে?”

মোরশেদ প্রশ্ন ছুঁড়ে দিলেন,

“শইলডা কেমুন?”

শাহজাদি কাজ ফেলে রেখে উঠে এলো,

“পেটে পাঁক দেয়? ক্ষিদা লাগছে না?”

বকুল অবশের মতোন মাথা দোলালো। হ্যাঁ ক্ষিদে লেগেছে তার। প্রচুর পরিমাণে ক্ষিদেই পেটের ভেতর জ্বালাপোড়া করছে।

শাহজাদি শাড়ির আঁচলে হাত মুছতে মুছতে ভেতর ঘরের দিকে এগিয়ে গেল।

“মুখ ধুইয়া আও। দুধ দিয়া কয়ডা ভাত চটকাইয়া খাও। দুধ খাইবার পারবা তো? নাকি পেডে পাঁক দিবো আবারও?”

বকুল উত্তর করে না। সে জানে না, কোন খাবারটা তার সহ্য হবে এই মুহূর্তে। শুধু জানে, অসম্ভব ক্ষিদেয় জান অতিষ্ট। এই মুহূর্তে সামনে যা আনা হবে, তাই সাবাড় করে ফেলবে।

বকুল চুপচাপ কলপাড়ের দিকে এগিয়ে চলে। শাহজাদি ঠোঁট টিপে ভাতের গামলা ধরল। মোরশেদ আর রুনু বেগম চেয়ে চেয়ে দুই সতীনের কথোপকথন দেখেন। রুনু বেগমের মনের অবস্থা বলা যায় না, তবে মোরশেদ খুশি হয়। শাহজাদির উপর থেকে ওঁর তিক্ততা খানিকটা কমে গেল।

____________

বকুল খেলো। ধুতরা ফুলের রস মাখানো দুধ-চিনি দিয়ে ভালোই পেট ভরে ভাত খেলো। এবং অদ্ভুত ভাবে তার কোনো বমিও হলো না এবার। শরীরটা ভালো লাগতে শুরু করেছে। খাদ্য গ্রহণের পর অনেকটা শক্তি অনুভব হলো। মন ফুরফুরে লাগল। বকুল শাহজাদিকে আর কাজে বসতে দিলো না। নিজেই দৌড়ে দৌড়ে কাজ গুছিয়ে ফেলল। রুনু বেগমের ভালো লাগল এবার। শাহজাদির উপর সামান্য কৃতজ্ঞতাও প্রকাশ পেল। হতে পারে সময়ের নদী সব ঘাঁ শুকিয়ে দেবে! হতে পারে ধীরে ধীরে সবকিছু ঠিক হয়ে যাবে। কতই তো আছে একসাথে দুই বউ নিয়ে সংসার করে যায়। মোরশেদ ও করল। বকুল নরম মেয়ে। মুখে রাঁ নেই। ওর সঙ্গে মিশে খাওয়া অনেক সহজ। শাহজাদি পারলেও পারতে পারে। রুনু বেগম মনে মনে মহান রবকে ডেকে দোয়া করে উঠেন, সবার যেন ভালো হয়!

দুপুরের পর হাতে কোনো কাজ থাকে না। গতকাল থেকে শরীর খারাপ থাকায়, মানসিক ভাবে চাপ যাওয়ায় সারাদিন অদ্ভুত বিষন্নতায় সময় কেটেছে। তাই আজ আর বিছানাতে মন বসছে না। ঘুম আসছে না। ইচ্ছে করছে পায়ে নূপুর পরে উঠোন জুড়ে কলতান তৈরি করার জন্য।

বকুলের নূপুর নেই। অনেকবার আবদার করেও মোরশেদ একটা ধমকের বদলে চুপ করিয়ে দিয়েছেন। তাই তার এই শখ, শখই রয়ে গেছে। সে বিছানা ছেড়ে উঠে পড়ে। রুনু বেগম ঘুমোচ্ছেন। মোরশেদ ও শুয়েছেন। শাহজাদি কই, কি করছে, জানা নেই। বকুল পা টিপে টিপে পেছনের দরজা দিয়ে বেরিয়ে গেল। এই সময়ে উত্তরের খান চাচার ক্ষেতটায় সব রোদ জড়ো হয়। ছেলে-মেয়েরা, অনেক বাড়ির বউ-শ্বাশুড়িরা হৈহৈ করে আসে। জমায়েত বসে। গল্পগুজব হয়। খেলাধূলা হয়। সন্ধ্যের মুখে মুখে সবাই আবার যার যার মতো চলে যায়। মোরশেদ সেসব পছন্দ করেন না। তাঁর কথা, বউ মানুষ, সবসময় থাকবে চার দেয়ালের ভেতরে। বছরের মাথায় একবার বাপের বাড়ি যাবে। ওইটুকুই শেষ। বউ মানুষের এত ঘোরাঘুরি কীসের? এত গালগল্প কীসের?

বকুলকে অনেকবার অনেক রকম শাসনের মুখোমুখি হতে হয়েছে এসব নিয়ে। তবুও সে শুনত না। তার মন শুনত না। বুঝতে চাইতো না। কিশোরীর চপল পায়ে শিকলের লাগাম টানা বড় কঠিন কাজ! সব পা অতে ভয় পেয়ে থমকে যায় না। বরং দুরন্তপনা বাড়ে। আরও ছুটতে ইচ্ছে করে। মাট পেরিয়ে, ঘাট পেরিয়ে, পেরিয়ে সাত সমুদ্দুর! কত দূর গিয়ে যে থামতে ইচ্ছে হয়! ওর উত্তর কে জানে?

সাজুরা বৌচি খেলছে। বকুল গিয়ে আবদারের সুরে বলল,

“আমিও খেলবাম।”

সবাই হাসিমুখে ওকে সাদরে গ্রহণ করল। খেলার মাঝখানেই কেমন যেন করে উঠল শরীরটা। মাথা চক্কর কা*টে। বকুল তবুও পাত্তা দেয় না। খেলায় মজে রয়েছে। খানিক বাদে নিজেকে সামলানো দায় হলে গোলাপির গায়ের উপর ভার ছেড়ে দিয়ে দাঁড়াল। গোলাপি অবাক চোখ মেলে প্রশ্ন ছুঁড়লো,

“ও কাকী, তুমি ঠিক আছো?”

মোরশেদ সম্পর্কে তার দূর সম্পর্কের কাকা হয়। অথচ তার বয়স আর বকুলের বয়সের মধ্যে এক বছরের পার্থক্য মাত্র! গায়ের রংটা চূড়ান্ত রকমের ময়লা এবং বাপের সম্পত্তি নেই বলে বিয়েটা হবে হবে করেও হচ্ছে না। অথচ এই গোলাপির হাসি পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর হাসি। আহারে! সবাই শুধু উপরটাই দেখে। ভেতরের আলো কেন কেউ দেখতে পায় না?

বকুলের মনে হচ্ছে, একটা ভারী পাথর ওর তলপেটের সঙ্গে বেঁধে দেওয়া হয়েছে। দুই পা আপনাআপনি ব্যথায় কুঁকড়ে গেল। ও হাঁটু গেঁড়ে বসে পড়ল ধূলো-মাটির উপর।

গোলাপি একটা চিৎকার করে উঠে এইবার,

“ও কাকী!”

বকুল দু’হাতে পেট চেপে ধরে। দম ঘন হয়ে আসে তার। চোখ দিয়ে পানির ফোয়ারা নামে। সহ্য করতে পারে না। অস্ফুটে আর্তনাদ করে উঠে কারো নাম ধরে…

“মা.. ও মা..”

মাসিকের তীব্র ব্যথায় মুখখানা কুঁচকে একটুখানি হয়ে গেছে। চেহারায় দিশেহারা ক্লান্তি। কপাল কুঁচকে আছে। ক্ষণকাল আগেও ছটফট করছিল, অবশেষে ক্লান্ত দেহখানি শান্ত হয়েছে। বকুল ঘুমিয়ে পড়েছে।

ওর মাথার ধারে বসে রয়েছে রুনু বেগম। আরেক পাশে ঘোমটা টানা শাহজাদি চেয়ে চেয়ে দেখছে কি যেন। ঘরের কুপি বাতি টা জ্বলে, আবার নিভে নিভে যায়, আবার জ্বলে- ঠিক যেন বকুলের প্রাণ প্রদীপ। নিভতে নিভতে আবার জ্বলে উঠে। আবার নিভে যেতে চেয়েও নিভতে পারে না। তাকে জ্বলতে হয়। নিজেকে জ্বালিয়ে চারপাশ আলোকিত করতে হয়।

মোরশেদ হন্তদন্ত পায়ে ঘরের ভেতর ঢুকলেন।

“কতা কইছি। কাইলকা ওর বাপে আইয়া নিয়া যাইবো।”

রুনু বেগম অবশ কণ্ঠে কোনোরকমে বলেন,

“তুই সত্যিই মাইয়াডারে…”

তাঁর কথা শেষ হওয়ার আগেই মোরশেদ গাঁকগাঁক করে চেঁচালেন,

“একশো বার মানা করতাম,হুনে নাই। খালি বাইরে ঘুরা। এই নিয়া এতকাল সহ্য করছি আম্মা, আর কত? এবার তো দিলো আমার বংশের প্রদীপটারেই নিভাইয়া। এহন বাপের বাড়ি যাইয়া জনম ভইরা খেলুক। আমার আর দেহার বিষয় না। তুমি খবরদার বাদা দিবা না। বাদা দিলে আমি বাড়ি ছাইড়া যেমতে মুন চায়, ওমতে যামু গা। এই শাহজাদি, উইঠ্যা আহো।”

শাহজাদি বাধ্যের মতো উঠে স্বামীর পেছন পেছন বেরিয়ে যায়। রুনু বেগম ঠাঁয় বসে রইলেন। ঘুমন্ত বকুল জানেই না, আজকের রাতটাই এ বাড়িতে তার শেষ রাত্রি! আগামীকাল থেকে জীবনের মানে বদলে যাবে! হয়তো দেখা হবে, হয়তো আর কোনোদিন দেখা হবে না! মেয়েটা বড় লক্ষী…তাও ওর কপাল খানায় এত দুঃখ এসে জুটলো!

বকুলের মাথায় হাত বোলাতে গিয়ে রুনু বেগম নিজেকে ধরে রাখতে পারেন না। চোখ ফেটে কয়েক ফোঁটা জল গড়িয়ে পড়ে ওর কপালে। হঠাৎ করেই একটা দমকা হাওয়া এসে কুপি বাতি নিভিয়ে দিয়ে গেল। ওটা কি আসলেই দমকা বাতাস নাকি বকুলের আগামী জীবনের ভারী দীর্ঘশ্বাস?

(চলবে)
[ছোট বলে অভিযোগ করবেন না। প্রতিদিন দেওয়ার চেষ্টা করি।
★আজকে ২০০ মানুষের রেসপন্স চাই! 🥺]

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here