আম্মা, তোমার ছোট মেয়ের হাবভাব কিন্তু আমার মোটেও ভালো লাগছে না । তুমি জিজ্ঞেস করো ওকে, কি ঘোঁট পাকাচ্ছে সে মনে মনে। সে বাড়ি থেকে পালিয়ে যাবার মতলব করছে। আমার সর্বনাশ না করে তোমার মেয়ের শান্তি নেই… বলতে বলতে, যুথি হাউমাউ করে কেঁদে দিল।
যুথির আম্মা রাহেলা বানু, বিছানায় বসে সুর করে কোরআন পড়ছিলেন। যে কোন বিপদে আপদে, মন অস্থির হলেই সারাদিন তিনি কোরআন পড়েন।গত কয়দিন ধরেই, ছোট মেয়ে সাথীর বিয়ে নিয়ে রাহেলা বানুর মন সাংঘাতিক রকমের উদ্বিগ্ন হয়ে আছে।
যুথির হৈচৈ বা কান্নাকাটি শুনে রাহেলা বানু সাধারণত খুব একটা বিচলিত হন না। যুথির স্বভাবই হলো অল্পতে অস্থির হয়ে, হৈচৈ শুরু করা। তার বোকাসোকা স্বভাবের জন্য, এ বাড়িতে কখনোই তার কথা খুব একটা গুরুত্ব পায় না। তবে আজকের বিষয়টা আলাদা।
রাহেলা বানু সামান্য সময় নিয়ে আয়াতটা শেষ করে, কোরআন বন্ধ করলেন।
:তোকে কে বললো, সাথী বাড়ি থেকে পালিয়ে যাবে?
যুথি রাহেলা বানুর প্রশ্নের জবাব না দিয়ে, কান্না আরো বাড়িয়ে দিল।
“তোমাদের জামাই কিন্তু আমাকে আস্ত রাখবে না, আম্মা। সাথীর কি কোন বিচার বিবেচনা নাই ?এতগুলো বছর ধরে আমাদের সংসারটা তোমাদের জামাইয়ের কাঁধে।সে যেমন মানুষই হোক, তোমাদের কে তো সে ফেলে দেয়নি। আজকে তার এতো বড় একটা বিপদ…তার দিকটা তো দেখতে হবে। তুমি সাথীকে একটু বোঝাও ,আম্মা। এখানে বিয়েটা হয়ে গেলেই, তোমাদের জামাইয়ের সব সমস্যা মিটে যাবে। বিয়ের বাজার সদাই সব হয়ে গেছে। এখন যদি তোমার মেয়ে কোনরকম ঝামেলা করে…
যুথি তার কথা বলেই যাচ্ছে। রাহেলা বানু একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। যুথিকে থামানোর চেষ্টা করে লাভ নেই ।
যুথির চেঁচামেচিতে রাহেলা বানুর স্বামী তাজুল ইসলাম অদ্ভুত স্বরে গোঙাতে শুরু করলেন। তাজুল ইসলাম গত দশ বছর যাবত প্যারালাইজড হয়ে বিছানায় পড়ে রয়েছেন। প্রথমদিকে শরীরটা প্যারালাইজড হলেও, সামান্য কথা বলতে পারতেন।কয়েক বছর হলো ,কথাও বলতে পারছেন না।বাড়িতে কোনো রকম ঝামেলা হলে, তাজুল ইসলাম বিছানায় শুয়ে শুয়ে অদ্ভুত শব্দ করে গোঙাতে থাকেন আর কিছু একটা বলতে চেষ্টা করেন। কি বলতে চেষ্টা করেন, সেটা একমাত্র রাহেলা বানুই বুঝতে পারেন।
রাহেলা বানু উঠে গিয়ে স্বামীর বুক আর মাথাটা হালকা হাতে মালিশ করে, ফু দিয়ে দিলেন।কানে কানে কি একটা বললেন ,তারপর একটু পানি খাওয়ালেন। তাজুল ইসলাম বেশ অনেকটাই শান্ত হলেন।
এই বাড়িটা রাহেলা বানুর বড় মেয়ে জামাই সাদেক আলীর। পুরনো আমলের বেশ বড়সড় বাড়ি।রাহেলা বানু যে ঘরটাতে রয়েছেন , সেটাও বেশ বড়। মাঝখানে একটা শোকেস আর পর্দা দিয়ে দুইভাগ করা হয়েছে ঘরটাকে। একপাশে রাহেলা বানুর ছোট মেয়ে সাথীর বিছানা আর কিছু জিনিসপত্র,আরেকপাশে রাহেলা বানু আর তাজুল ইসলামের বিছানা সাথে তাদের প্রয়োজনীয় কিছু জিনিসপত্র।
রাহেলা বানু অবশ্য বরাবর সাথীর সঙ্গেই ঘুমান। অসুস্থ স্বামীর বিছানায় তার ঘুম আসেনা। কখনো সখনো শুলেও, নড়াচড়া করতে হয় বেশ সাবধানে… কখন আবার অসুস্থ স্বামীর ঘুম ভেঙ্গে যায়। সারাদিন বিছানায় পড়ে থেকে থেকে, তাজুল ইসলামের ঘুম একদমই কমে গেছে। তিনি আবার ঘুমের মধ্যে ,নাক দিয়ে মুখ দিয়ে অদ্ভুত সব শব্দও করেন।সেই শব্দ শুনে, গভীর রাতে গায়ে কাঁটা দিয়ে ওঠে বাড়ির সবার।
তাজুল ইসলামের বিছানার পাশে একটা টেবিল আছে, সেখানে রাজ্যের সব ঔষধপত্র রাখা।এই টেবিলের উপর সবসময় একটা ছোট্ট আয়না থাকে । আয়নাটা সাথীর।
সাথীর নিজের বিছানার পাশেও একটা টেবিল রয়েছে, তবুও সাথী এই টেবিলেই তার আয়নাটা রাখে। কারণ, এই টেবিলটা ঘরের একদম কোনায় রাখা। শোকেসের কারনে এই টেবিলটা ঘরে ঢুকেই চট করে কারো চোখে পড়ে না।এই বাড়িতে এটাই সাথীর সবচেয়ে পছন্দের জায়গা।মন ভালো কিংবা মন খারাপের দীর্ঘ সময়, এখানে বসে আয়না দেখে দেখে কাটিয়ে দিতে পারে সাথী।
এখনও চেয়ারে বসে,সেই আয়নাটা সামনে রেখে, সাথী গুনগুন করে গান গাইছে আর চোখে কাজল লাগাচ্ছে।সাথীকে দেখে মনে হচ্ছে, এই ঘরের এতো হৈচৈ কিছুই যেন সে শুনতে পাচ্ছে না। জীবনে অনেক দুঃখ কষ্ট দেখে ফেলেছে সাথী, কোন অস্থিরতাই আজকাল তাকে স্পর্শ করতে পারে না।
পিছন থেকে সাথীর মুখটা দেখা যাচ্ছে না, তবে স্বামীকে পানি খাইয়ে উঠে দাড়াতেই ,আয়নায় সাথীর মুখটা স্পষ্ট দেখতে পেলেন রাহেলা বানু। নিজের মেয়েকে দেখে মাঝে মাঝে নিজেই চমকে উঠেন তিনি। এতো অসহায় বাবা মায়ের ঘরে, এমন রূপবতী মেয়েকে কেন যে পাঠালেন সৃষ্টিকর্তা!
বড় মেয়ে যুথিও ভীষণ সুন্দর দেখতে, তবে বুদ্ধিসুদ্ধি একটু কম। রাহেলা বানুর মতে , এটা একদিক থেকে ভালো।বোকা মেয়েরা জীবনে কষ্ট কম পায়। বুদ্ধিমতী মেয়েদের চেয়ে বোকাসোকা মেয়েরা সংসার জীবনেও বেশি সুখী হয়। ছোট মেয়ে সাথী যেমন সুন্দরী তেমনই বুদ্ধিমতী।এই বুদ্ধিমতী মেয়েকে নিয়েই রাহেলা বানুর যত চিন্তা।
যুথির বর সাদেক আলী, তার বন্ধু মোজাম্মেলের কাছ থেকে অনেক বড় অংকের টাকা ধার এনে ব্যবসায় লাগিয়েছিল।কবে টাকা এনেছিল,কি ব্যবসায় লাগিয়েছে …সে সম্পর্কে পরিবারের কেউ কিছুই জানে না। অবশ্য সাদেক আলীর অনেক কিছুই পরিবারের অজানা।
রাহেলা বানুর ধারণা, সাদেক আলী খুনখারাবিও করে। এমন ছেলের সঙ্গে যুথির বিয়েটা মেনে নিতে আজও কষ্ট হয় রাহেলার।
ব্যবসায় বেশ বড়সড় লস খেয়েছে, সাদেক আলী। মোজাম্মেলের কাছ থেকে নেয়া টাকার অংকটা বেশি বলে, সময়মতো ফেরত দেয়া নাকি সম্ভব হয়নি। টাকা নেবার সময়, মোজাম্মেলের কাছে সাদেক আলীর বাড়ি আর জমিজমার কাগজপত্র বন্ধক রেখেছিল।সুদে আসলে সেই টাকা বেড়ে এমন জায়গায় এসেছে যে, মোজাম্মেল যেকোনো সময় বাড়ির মালিকানা দাবি করতে পারে।
মোজাম্মেলের সঙ্গে সাথীর বিয়েটা দিলে, টাকা পয়সা কিচ্ছু আর ফেরত দিতে হবে না। সাথীকে দেখেই মোজাম্মেলের মাথা নষ্ট হয়ে গেছে। বন্ধুর প্রস্তাবে সাদেক আলীও মহাখুশি । এতো সহজে ঋণ মুক্ত হবার রাস্তা খুঁজে পেয়ে, তড়িঘড়ি করে দুই দিনের মধ্যেই বিয়ের আয়োজন করে ফেলেছে সে। আগামীকাল শুক্রবার বাদ জুমা ঘরোয়া আয়োজনে কবুল হবে। মোজাম্মেল চাইলে, পরে বড় আয়োজন করে আত্মীয়-স্বজনকে খাওয়ানো হবে।
মোজাম্মেল বয়সে সাদেক আলীর থেকে ছোট হলেও, সাথীর সঙ্গে বয়সের বিস্তর ব্যবধান। তাছাড়া ছেলেটি যেমন কালো, তেমন বেটে… মাথায় টাক, সারাদিন পান খেয়ে খেয়ে সবগুলো দাঁত একেবারে লাল করে ফেলেছে। আর যেহেতু সে সাদেক আলীর সাথে ব্যবসা করে, তাই স্বভাব চরিত্রও ভালো হবে না এটা নিশ্চিতভাবে বলা যায়। ছেলেটার মুখের ভাষাও ভালো না। একবারই ছেলেটাকে দেখেছেন রাহেলা বানু। সাথী কে ওই ছেলের হাতে তুলে দিতে হবে ভাবলেই, দুই চোখে অন্ধকার দেখেন রাহেলা।
বিছানার সঙ্গে লেপ্টে থাকা স্বামী আর ছোট মেয়ে সাথীকে নিয়ে, গত একযুগ ধরে বড় মেয়ের সংসারে রয়েছেন রাহেলা বানু।মেয়ে জামাইর মতের বিরুদ্ধে যাবার মতো তার জোর কই?
এদিকে বিয়ে নিয়ে কোন রকম আপত্তিই শুনতে রাজি নয় সাদেক আলী।সে পরিস্কার জানিয়ে দিয়েছে, মোজাম্মেলের সাথে বিয়েতে রাজি না হলে, বাড়িতে কারো জায়গা হবে না। নেশা করে বাড়ি ফিরে, গত দুই রাতে যুথিকে কয়েকদফা মেরেছে সাদেক আলী।
যুথিকে দেখে বোঝার উপায় নেই,সে রাতে কতটা মার খেয়েছে। সকালে উঠে হাসিমুখে সাদেক আলীর সাথে বিয়ের বাজার সদাই করে এনেছে।
বিয়ের বাজার সদাই করে, যুথিকে বাড়িতে পৌঁছে দিয়ে, সাদেক আলী বাবুর্চি ঠিক করতে গিয়েছে। বাড়ি ফিরেই যুথি রাহেলা বানুর ঘরে ঢুকে, হৈচৈ কান্নাকাটি শুরু করে দিয়েছে…সাথী পালিয়ে যাবে।
যুথির নিজের দুই মেয়ে রয়েছে। সংসারটা বাঁচাতেই মোজাম্মেল আর সাথীর বিয়ের জন্য সে উঠে পড়ে লেগেছে।বেচারি আর কি ই বা করতে পারে?
ইচ্ছামতো বিলাপ শেষ করে,চোখ মুছে,ধূপধাপ করে উঠে গিয়ে,সাথীকে হাত ধরে টেনে মায়ের সামনে এনে দাঁড় করালো যুথি। কান্না থামলেও রাগে ফোঁস ফোঁস করছে যুথি।
:মোজাম্মেলের মতো একটা ছেলের সাথে বিয়ে হচ্ছে জেনেও তুই এরকম চুপ করে আছিস কিভাবে, ভেবে পাচ্ছিলাম না আমি। এতো ভালো মেয়ে তো তুই না সাথী। দ্যাখ ভালো করে,আম্মার সামনে কিন্তু কোরআন শরীফ রাখা। ঠিক করে বল সাথী,তুই বাড়ি থেকে পালিয়ে যাবার প্ল্যান করছিস না? টিকলি, টায়রা তো এই বয়সে বানিয়ে কথা বলবে না।
রাহেলা বানু বুঝতে পারলেন এবার,দুই নাতনি টিকলি আর টায়রার কাছেই কিছু একটা শুনেছে যুথি।
রাহেলা বানুর হঠাৎ মনে হলো, তিনি নিজেও যেন চাইছেন…সাথী কোথাও পালিয়ে যাক।বড় মেয়ের জীবনটা তো নষ্ট হয়েই গেছে। এখন ছোট মেয়েটার জীবনও নষ্ট হবার পথে।
এরকম একটা ছেলের সঙ্গে বিয়ের কথা পাকা হয়ে যাবার পরও, সাথী একবারও এ নিয়ে কোনো আপত্তি করে নি। একফোঁটা চোখের পানিও ফেলেনি মেয়েটা। তাহলে কি বাড়ি থেকে পালানোর চিন্তা করে রেখেছে সাথী? এজন্যই কি এতোটা স্বাভাবিক দেখাচ্ছে সাথী কে?
সাথীর হাত দুটো নিজের হাতে টেনে নিয়ে রাহেলা বানু বললেন,
“কিরে সাথী?যুথি কি বলছে এইসব? কোথায় পালানোর কথা বলেছিস তুই, টিকলি টায়রাকে?”
সাথী মাথা নিচু করে মায়ের পাশে বসে পড়লো।এই প্রথম সাথীর চোখের পানি গাল গড়িয়ে নিচে নেমে যাচ্ছে। রাহেলা বানু সাথীর চোখের পানি মুছে দিলেন না। মেয়েটাকে জড়িয়েও ধরলেন না। শুধু বরফের মতো ঠান্ডা গলায় বললেন,
“সাথী,আমিও চাই তুই পালিয়ে যা। তবে এখন নয়। বিয়েটা হয়ে যাক, তারপর যা করার করিস। বিয়েটা হয়ে গেলেই তো সাদেকের সঙ্গে দেনাপাওনা মিটে যাবে সব। বিয়ের পর মোজাম্মেলের বউ পালিয়ে গেলে সেই দায় সাদেকের নয়।পালাবি যখন বড় বোনের সংসারটা বাঁচিয়ে দিয়ে, তারপর পালা। বোনের ঋণ শোধ করে যা।”
যুথি আর সাথী অবাক হয়ে মায়ের মুখের দিকে তাকিয়ে রইল। পাশের বিছানায় শুয়ে শুয়ে তাজুল ইসলাম আবারো ভয়ানক স্বরে গোঙাতে লাগলেন।
চলবে…
না চাহিলে যারে পাওয়া যায়
প্রথম পর্ব
রুচিরা সুলতানা





