Saturday, April 4, 2026
Home "ধারাবাহিক গল্প """না চাহিলে যারে পাওয়া যায় না চাহিলে যারে পাওয়া যায়, শেষ পর্ব

না চাহিলে যারে পাওয়া যায়, শেষ পর্ব

0
3

না চাহিলে যারে পাওয়া যায়,
শেষ পর্ব


আট দশটা বিয়ে বাড়িতে যেমন লোকজন গমগম করে,এই বিয়ে বাড়িতে তা নয়। সাদেক আলী খুব বেছে কিছু লোকজনকে দাওয়াত করেছে। আত্মীয়-স্বজন খুব কম, বেশিরভাগ সাদেক আলীর ব্যবসায়ী বন্ধু আর দুএকজন প্রতিবেশী। সাথীর কোন বান্ধবী এই বিয়েতে দাওয়াত পায়নি, তবে যুথির দুজন বান্ধবী এসেছে।বিয়ে বাড়ির প্রচলিত কিছু আনুষ্ঠানিকতার জন্য হলেও দুএকজন নারী অতিথি লাগে, তাই।

যারাই এসেছে বিয়েতে,তারা এতক্ষণ নতুন বর কনেকে নিয়ে মেতে ছিল। এখন সকলে মিলে রাহেলা বানুকে ঘিরে রয়েছে।তিনি অজ্ঞান হয়ে গেছেন।

কবুল হয়ে যাবার পর, বর আর কনেকে পাশাপাশি বসানো হয়েছিল। মিষ্টি মুখ, মালাবদল করবে বলে। এরমধ্যেই রাহেলা বানু অজ্ঞান হয়ে গেছেন।বেশ অনেকটা সময় পার হয়ে গেছে, কিন্তু উনার জ্ঞান ফিরার কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না।

যুথি তার মায়ের অবস্থা দেখে গলা ছেড়ে বিলাপ শুরু করেছিল, কিন্তু সাদেক আলীর এক ধমকে সে একদম চুপ হয়ে গেছে।দু একজন বেশ কয়েকবার পানি ছিটিয়েছে চোখে মুখে, কোন লাভ হয়নি। একটা পাখা নিয়ে যুথি তার মা’কে বাতাস করছে জোরে জোরে।

এই বাড়িতে তিনটা ঘরে এসি রয়েছে, যুথিদের শোবার ঘরে, তার মেয়েদের ঘরে আর বসার ঘরে।তবে রাহেলা বানু অজ্ঞান হয়েছেন ডাইনিং এর সামনে। বসার ঘরে মেয়ে আর জামাইকে মিষ্টি খাইয়ে বের হয়ে এসেছিলেন। ডাইনিং এর সামনে এসে পড়ে গেছেন। উনাকে কোলে করে এসি রুমে নিয়ে গেলে হয়, সেটা না করে সবাই চারপাশে ঘিরে দাঁড়িয়ে আছে।

বিয়েতে সাদেক আলী বেছে বেছে এমন লোকজন দাওয়াত করেছিল ,যারা তার খুব বিশ্বস্ত। যারা এই বিয়ের অসামঞ্জস্যতা নিয়ে কোন কথা বলবে না। এতক্ষণ অবশ্য কেউ কিছু বলেও নি। কিন্তু রাহেলা বানু অজ্ঞান হয়ে যাবার পর, সাদেক আলীর অগোচরে মোটামুটি সবাই ফিসফাস করছে।

বিয়ের সাজ বলতে যা বোঝায় তার কিছুই সাথী করেনি। কেবল বিয়ের শাড়ি গয়না আর চোখে কাজল। এতেই সাথীর উপর থেকে কারো চোখ সরছে না। বিয়ের দিন বরের সাজে, সব ছেলেকে কেমন একটু কালো লাগে। জরির কাজ করা বাদামী শের‌ওয়ানীতে, মোজাম্মেলের গায়ের রং অন্ধকার হয়ে আছে।

বিয়ে উপলক্ষে মোজাম্মেল সম্ভবত ডেন্টিস্টের কাছ গিয়েছিল, দাঁতের হলদে ভাবটা একটু কম মনে হচ্ছে ।টুপি পরার জন্য মাথার টাকটাও ঢেকে রয়েছে। তবু সাথী আর মোজাম্মেলকে বড্ড বেমানান লাগছে।

বিয়ের সব আনুষ্ঠানিকতা শেষ করার জন্য সাদেক আলী বড্ড তাড়া দিচ্ছিল। কবুল পড়ানো শেষ হতে না হতেই সে যুথিকে বলল, বর আর কনেকে একসাথে বসিয়ে দিতে। দু একজন অতিথি বর কনেকে মিষ্টিমুখ করালেই হলো।তারপর সবাইকে বিদায় করে দিবে।

কবুল হয়ে যাবার পর ,মাওলানা সাহেব দোয়া করেছেন, সাথে মোনাজাত। মোজাম্মেল যে মোনাজাত ধরে কাঁদছিল সেটা আর কেউ খেয়াল না করলেও যুথির দুই বান্ধবী ঠিক খেয়াল করেছে।মেয়েদের চোখে সব ধরা পড়ে যায়। বিয়ের দিন বর কেন কাঁদবে, ওরা ভেবে পাচ্ছিলো না।

যুথি তার বান্ধবীদের ইশারা করা মাত্র ওরা দৌড়ে ভিতরে চলে এসেছে, সাথীকে বরের কাছে নিয়ে যাবে বলে।

:কিরে সাথী তুই কি বুঝতে পারছিস না নাকি, তোর যে বিয়ে হয়ে গেল?একদম শক্ত হয়ে আছিস দেখছি।একফোঁটা চোখের পানি অন্তত ফেলতে পারতি, সুন্দরী। এতো জলদি কবুল বলে ফেললি, একটু সময়‌ও নিলি না, একটু কাঁদলিও না।কেনো রে? বিয়েতে লোক দেখানোর জন্য হলেও তো একটু কাঁদতে হয়।হিহিহি… এদিকে তোর বর বিয়ে করে কেঁদে কেটে একসারা।

:আরে, তুই ছাই বুঝেছিস। বেচারা আনন্দে কেঁদে ফেলেছে। সাথীর মতো ডানাকাটা পরী পেয়ে জীবন ধন্য হয়েছে, জামাই বাবুর।

যুথির বান্ধবী দুজন নিজেদের মধ্যে হাসাহাসি করতে করতে, সাথীকে ভিতরের ঘর থেকে বরের পাশে এনে বসিয়েছে।এই কাজগুলো করার জন্যই দুজনকে আনা হয়েছে। রাহেলা বানুকেও ওরাই জোর করে সাথে এনেছে।বাবা যেহেতু উঠে আসতে পারবে না, তাই সবার আগে মেয়ের মা মিষ্টি খাওয়াবেন।

সারাটা দিন রাহেলা বানু কেমন একটা ঘোরের মধ্যে ছিলেন।যেন কোন দুঃস্বপ্ন দেখছেন তিনি।সাথীকে দেখে তার মনে হচ্ছিল, একটা চাবি দেয়া পুতুল।যেন শরীরে কোথাও কোনো প্রানের ছোঁয়া নেই।যে যা করতে বলছে, তাই করে যাচ্ছে। কবুল বলে ফেলেছে অথচ এক ফোঁটা পানি চোখ থেকে ফেলেনি মেয়েটা।মেয়েটার মনে কি যে চলছে ভেবে পাচ্ছিলেন না রাহেলা বানু।

রাহেলা বানু মনে প্রাণে বিশ্বাস করতেন, সাথীর মতো এতো চমৎকার একটা মেয়ের জীবনে খারাপ কিছু হতেই পারে না। মেয়েটা দেখতে যতটা না সুন্দর তার চেয়ে অনেক বেশি সুন্দর তার মনটা।

দিনে রাতে সৃষ্টিকর্তার কাছে প্রার্থনা করেছেন সাথীর জন্য।না ,কোনো রাজপুত্র নয়। একটা সাধারণ সাদামাটা ছেলে।যে সাথীকে সুখে দুঃখে, বিপদে আপদে একলা ছেড়ে দিবে না। সবসময় সাথীর পাশে থাকবে।

এখন মোজাম্মেলের পাশে মেয়েকে দেখে, তার বুকটা কেমন ভারী হয়ে গেল হঠাৎ। ছেলেটা অসুন্দর বলে নয়, সাদেক আলীর বন্ধু বলে। ছেলেটার স্বভাব যদি সাদেক আলীর মতো হয়!সাথী তো চিৎকার করে যুথির মতো কাঁদতেও পারে না।

এইসব ভেবে রাহেলা বানুর মনে হচ্ছিল ,একটা পাথর চেপে বসেছে বুকের উপর। নিঃশ্বাসটাও কেমন যেন বন্ধ আসছে তার।

ঘরভর্তি অপরিচিত লোক। সবার সামনে যতটা সম্ভব স্বাভাবিক ভাবে মিষ্টি মুখ করিয়ে, ভিতরে এসেই অজ্ঞান হয়ে গেলেন রাহেলা বানু।খবর পেয়ে সবাই বর কনেকে রেখে দৌড়ে উঠে এসেছে।

বাবার ধমক, মায়ের কান্না, নানীর অজ্ঞান হয়ে যাওয়া…এতোকিছু দেখে,টিকলি টায়রা দুজন‌ই খুব ভয় পাচ্ছিল।সাথী উঠে এসে ওদের দুজনকে নিয়ে ভিতরে বাবার কাছে গিয়ে বসেছে।

কাজী অফিস থেকে দুজন লোক এসেছে, আর সাথে মাওলানা সাহেব। ওরা পাশের ঘরে খাবার খাচ্ছিলেন। অন্যান্য অতিথি যারা রয়েছে, তাদের খাওয়া আগেই হয়ে গেছে। কেবল মাওলানা সাহেবদের খাওয়াই বাকি ছিল। শুক্রবার দিনে তাদের অনেক বিয়ের ব্যস্ততা থাকে, তাই উনারা এসেছেন কিছুক্ষণ আগে।এসে কবুলটা পড়িয়েই খেতে বসেছেন তিনজন মিলে।

কবুল পড়ানো হয়ে গেলেও কাজী অফিসের কিছু কাজ বাকি ছিল।রাহেলা বানুর অবস্থা দেখে সাদেক আলী সামান্য ঘাবড়ে গেল।বড় কোন ঝামেলা বাঁধার ভয়ে শাশুড়িকে ওই অবস্থায় রেখেই, দৌড়ে পাশের রুমে চলে এলো সে। সেখানে মাওলানা সাহেব আর কাজী অফিসের লোক দুটো খাবার খাচ্ছিলো।

:খাওয়াটা একটু জলদি শেষ করেন ,হুজুর।কাজী অফিসের কাজগুলো ফেলে রাখাটা ঠিক না।স‌ই সাবুদ হয়ে যাক,আরেকদফা না হয় খাবেন তখন। ভালো মতো কাজটা শেষ করে দেন আপনারা, ইনশাআল্লাহ সবাইকে খুশি করে দিবো আমি। টাকা পয়সা, হাদিয়া সব আছে। একটু তাড়াতাড়ি করেন আপনারা।এই বিয়েতে কোনো রকম ঝামেলা চাইনা আমি।মেয়ের মা অসুস্থ হয়ে পড়েছেন। আপনারা একটু তাড়াতাড়ি কাজ সারেন।

বিয়ে বাড়ির ঝামেলা নিয়ে কাজী অফিসের লোকজন খুব একটা মাথা ঘামায় না। ছেলে মেয়ে প্রাপ্তবয়স্ক হলে আর কিছু দেখতে যায় না তারা। ওরা আমতা আমতা করে বলছিল, “কবুল হয়ে গেছে আর কি ঝামেলা হবে?”
তারপর, একজন আরেকজনের দিকে মুখ চাওয়া চাওয়ি করতে করতে হাত ধুয়ে নিলো।

এইসবের মধ্যে,মোজাম্মেল কখন বেরিয়ে গেছে ঘর থেকে কেউ খেয়াল করে নি।
শুক্রবার দুপুরে ফার্মেসী গুলোতে ডাক্তার আসতে আসতে তিনটা চারটা বেজে যায়। মোজাম্মেল বেশ খানিকটা দূরে,একটা ক্লিনিক থেকে অনেক অনুরোধ করে, কমবয়সী একজন ডাক্তার ধরে নিয়ে এসেছে।

ডাক্তার সঙ্গে নিয়ে মোজাম্মেল যখন ঘরে ঢুকলো, রাহেলা বানুর মুখ দিয়ে তখন ফেনা বের হচ্ছে। ডাক্তার ছেলেটা ঘরে ঢুকে রাহেলা বানুকে দেখেই চেঁচিয়ে উঠলো।
:এই রোগী নিয়ে আপনারা ঘরে বসে রয়েছেন কেন? অদ্ভুত তো! উনাকে এক্ষুনি হাসপাতালে নিতে হবে। সবাই মিলে উনাকে ঘিরে রয়েছেন কেন আপনারা।সবাই সরে দাঁড়ান, প্লিজ। আপনাদের তো গাড়ি আছেই। এম্বুলেন্সের জন্য অপেক্ষা করা ঠিক হবে না।যত দ্রুত পারেন হাসপাতালে নিয়ে চলেন।

মোজাম্মেল সবাইকে সরিয়ে, রাহেলা বানুকে কোলের মধ্যে তুলে নিলো। মোজাম্মেল ছোট খাট মানুষ, তবু এক ঝটকায় উঠিয়ে নিলো সে রাহেলা বানুকে।

সারাদিন ধরে বিয়ের তোরজোর চলেছে, তাজুল ইসলামের দিকে কেউ সেরকম খেয়াল করেনি। বাড়ির পরিস্থিতি বুঝে তাজুল ইসলাম‌ও একেবারে চুপ হয়ে ছিলেন। রাহেলা বানুকে নিয়ে সবাই যখন হৈচৈ করছে, তিনি ঠিক তখনই কেমন উত্তেজিত হয়ে গোঙাতে শুরু করেন। তার হাড্ডিসার শরীরে, বুকের পাঁজরের উঠানামা তীব্র হয়ে উঠে।

টিকলি টায়রাকে সাথে নিয়ে,সাথী তার বাবার শরীরটা টেনে, মাথাটা জানালা বরাবর উপরের দিকে উঠিয়ে দিলো। বাবার নিঃশ্বাস নিতে কষ্ট হলেই মাকে এরকম করতে দেখেছে সাথী।

জানালার সামনে দাঁড়িয়ে উপর থেকে সাথী দেখতে পেল, নিচে বেশ কিছু লোক গাড়িতে উঠছে, সাথে কাঁদতে কাঁদতে যুথিও উঠছে।মোজাম্মেল তার মাকে খুব শক্ত করে জাপটে ধরে, গাড়িতে উঠে বসেছে। মনে হচ্ছে সাথীর মা যেন মোজাম্মেলের কতো আপন। মনে হচ্ছে সাথীর মাকে বাঁচানোর কি একটা তাগিদ মোজাম্মেলের।এতো বছরে কখনো কোনদিন‌ও এরকম তাগিদ, দুলাভাইয়ের মধ্যে দেখেনি সাথী।

পিছন ফিরে সাথী দেখলো, দুলাভাই দাঁড়িয়ে আছে।
হাতে কাজী অফিসের রেজিস্ট্রার খাতা।


রান্নাঘরে খুটখাট শব্দে ঘুম ভেঙ্গে গেল সাথীর।

গতকাল সন্ধ্যায় মোজাম্মেলের বাড়িতে এসেছে সাথী।

এক সপ্তাহ হাসপাতালে থাকার পর, গতকাল বিকেলে রাহেলা বানুকে বাসায় আনা হয়েছে। উনার হার্ট অ্যাটাক হয়েছিল। হাসপাতালে নিতে আরেকটু দেরি হলে ,বাঁচানো কষ্ট হয়ে যেতো।

বিয়ের দিন রাতেই সাদেক আলী নিজের বাড়ি আর জমিজমার কাগজপত্র, মোজাম্মেলের কাছ থেকে বুঝে নিয়েছে। সেজন্য মোজাম্মেল একবার হাসপাতাল থেকে বাড়ি গিয়েছিল। এটা বাদে এই এক সপ্তাহে ,চা নাস্তা, ঔষধ কেনা আর বাথরুমে যাওয়া ছাড়া… পুরো সময়টা, রাহেলা বানুর সাথে হাসপাতালে ছিল মোজাম্মেল।

যুথি থাকতে চেয়েছিল, কিন্তু মেয়েদের থাকার সেরকম ভালো ব্যবস্থা নেই।আই সি ইউ পেশেন্টদের বাড়ির লোকদের বেশিরভাগ চেয়ারেই ঘুমাতে হয়।তাই মোজাম্মেল নিজেই জোর করে থেকেছে।

বাড়িতে বাবাকে দেখার কেউ নেই বলে, সাথী থাকতে পারে নি রাতে। সে প্রতিদিন দুপুরে খাবার নিয়ে আসতো।

হাসপাতালের সাতদিন, একবারও মোজাম্মেলের সাথে কথা হয়নি সাথীর। লোকটা যেন সাথীর কাছ থেকে পালিয়ে বেড়ায়।

গতকাল রাহেলা বানু বাড়ি ফিরেই, সাথীকে মোজাম্মেলের সঙ্গে তাঁর বাড়িতে পাঠিয়ে দিয়েছেন।

:ছেলেটা সাদেকের মতো নয় রে মা।দেখলি তো, আমার জন্য কি করলো এই কয়দিন।তুই মোজাম্মেলের সাথে যা, মা। ছেলেটাকে ভরসা করে দ্যাখ একবার।তোর মতো ভালো মেয়ের কপালে, খারাপ কিছু থাকতেই পারে না।এটা আমার বিশ্বাস।

মায়ের কথায় শুধু নয়,সাথী নিজেও মোজাম্মেলের সঙ্গে যেতে চাইছিল।
সাথীকে নিয়ে বাড়ি আসার পথটুকু, গাড়িতে একদম চুপ ছিল মোজাম্মেল।

ঘরে ঢুকে সাথী বললো,

: আপনি আমার কাছ থেকে পালিয়ে বেড়ান কেন? এতো টাকার বিনিময়ে বিয়ে করেছেন, এখন আমার সাথে কথা বলেন না কেন?

: ভয়ে

সাথী হেসে ফেললো।
: আপনি আমাকে ভয় পান?

এতো সুন্দর মেয়ের হাসিমুখের দিকে তাকিয়ে মোজাম্মেলের বুকটা কেঁপে উঠলো।

: আপনাকে ভয় পাই না। আপনার ঘৃনাকে ভয় পাই। আপনার চোখে আমার জন্য ঘৃনা দেখার সাহস নাই।তাই পালিয়ে বেড়াই।সারাজীবন মানুষের কাছে অনেক ঘৃনা পেয়েছি। কিন্তু নিজের প্রিয় মানুষের চোখে ঘৃনা দেখার জন্য, অনেক সাহস লাগে। সেই সাহস সবার থাকে না।

একটুক্ষন চুপ থেকে, মোজাম্মেল বললো,
:আপনি আমাকে এতো ঘৃনা করেন কেন? আমি দেখতে কুৎসিত বলে?

মোজাম্মেল সাথীকে আপনি করে বলছে। সাথী নিজের কানকে বিশ্বাস করতে পারছে না।এই কি সেই লোক, যাকে সে আগে দুইবার দেখেছে?

: আপনাকে আগে যে কয়বার দেখেছি, মানে… আপনি তো জানেন কোথায় দেখেছি ।

মোজাম্মেল একটু হাসলো।
:ওইটুকু দেখেই আপনি আমাকে খারাপ ভাবতেন না, যদি আমি দেখতে সুপুরুষ হতাম। আমি জন্মের পর নিজের আব্বা আম্মাকে দেখি নাই।বড় হয়েছি এতিমখানায়। এতিম ছেলে যদি দেখতে কুৎসিত হয়… বড় হবার জন্য, বেঁচে থাকার জন্য, টিকে থাকার জন্য তাকে কতো যুদ্ধ করতে হয়, আপনি কল্পনাও করতে পারবেন না। আমাকে ভদ্রতা, সভ্যতা শিখিয়ে দেয়ার মতো কোনোদিন কেউ ছিল না।সব নিজে শিখেছি। অবহেলা আর অত্যাচার সহ্য করতে করতে শিখেছি। দারোয়ান সেদিন একটা গরীব,বাচ্চা মেয়ের সাথে অসভ্যতা করতে গিয়েছিল, আমি ধরে উচিত শিক্ষা দিয়েছি।

মোজাম্মেল একটু থামলো। তারপর বললো,
: আর কোথায় দেখেছিলেন আমাকে?

: দুলাভাইয়ের অফিসে। একটা মহিলাকে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দিয়েছিলেন। খুব খারাপ ভাষায় কথা বলছিলেন।

:ও আচ্ছা, অফিসের রান্নার বুয়ার কথা বলছেন মনে হয়। বুয়ার মেয়ের শরীর খারাপের সময়, ওষুধপত্র কিনতে কিছু টাকা দিয়েছিলাম। চেহারা খারাপ তো,তাই সবাই ধরেই নেয় আমি খারাপ লোক। সেদিন সে আরো কিছু টাকা চাইছিলো আমার কাছে, হেসে হেসে,গা ঘেঁষে। বললো, অফিস খালি থাকলে ফোন করতে ।এসে আমার সেবাযত্ন করে যাবে। ধাক্কা না দিয়ে উপায় আছে?

মোজাম্মেলের জন্য বুকের মধ্যে কেমন করে উঠলো, সাথীর। তার মনে হলো,কালো মানুষটার ভিতরে কি ভীষণ ফকফকে সাদা একটা মন!

সাথীকে ফ্রেশ হতে বলে, মোজাম্মেল খাবার কিনতে বের হলো। সাথী যে আসবে,সেটা আগে থেকে জানা ছিল না। তাছাড়া বেশ কিছুদিন ধরেই মোজাম্মেল হাসপাতালে ছিল।ঘরে তাই সেরকম কোন খাবার নেই।

ফ্রেশ হয়ে বিছানায় শুয়ে কখন যে সাথী ঘুমিয়ে পড়েছে,সে নিজেও জানে না।বেশ কিছুদিন ঠিক মতো ঘুমায়নি সাথী। মোজাম্মেলের সাথে কথা বলে এতো ভালো লাগছিল সাথীর, এতো নিশ্চিন্ত লাগছিল… এতো দিনের এতো ভয়, উৎকণ্ঠা কেটে গিয়ে, গভীর ঘুমে তলিয়ে গেলো সে।

সকালে রান্নাঘরে খুটখাট শব্দে ঘুম ভাঙলো সাথীর। রাতেই রান্নাঘরটা দেখেছিল সে। উঠে গিয়ে দেখলো, মোজাম্মেল নাস্তা বানাচ্ছে। সাথী বললো,

: আমি বানাই নাস্তা?

মোজাম্মেল সাথীর দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইল। একটু এগিয়ে এসে, চোখে চোখ রেখে বলল,

:সাথী,আপনাকে কিচ্ছু করতে হবে না। আপনি শুধু আমার নিজের হয়ে, আমার কাছে থাকুন। আমার জীবনে, কোনো নিজের মানুষ নেই, আমার কোনো পরিবার নেই, নিজের লোক নেই। আমার টাকা আছে কিন্তু খরচ করার মানুষ নেই। আমার সুখে হাসবে, আমার দুঃখে কাঁদবে… এমন কেউ নেই।এমন একজন মানুষ নেই, যে আমার ভীষণ আপন। আমি বিনিময়ে কখনো কিছু চাইবো না, বিশ্বাস করেন। আমার অনেক টাকা আছে, সাথী। চাইলে প্রতিদিন নতুন নতুন নারীসঙ্গ কিনতে পারি আমি। কিন্তু এই এতো বছরের একলা জীবনে, কখনো সেসব কিছু চাওয়া ছিল না আমার। শুধু একটা নিজের মানুষ চাই। যেনো চিৎকার করে বলতে পারি, এই পৃথিবীতে আমি একা নই। আমার আপনজন আছে। অন্তত একটা আপনজন আমার আছে।

মোজাম্মেল হুহু করে কেঁদে উঠলো।

সাথী মোজাম্মেলের চোখের পানি মুছে দিলো। তারপর। কানের কাছে ফিসফিস করে বলল,
কিচ্ছু চাই না? এজন্যই বুঝি বিয়ের দিন কেঁদেছিলেন? আমার এতো ভালোবাসা তাহলে কাকে দিবো? একটা মানুষ চাই তো আমার, ভালোবাসা দেবার জন্য।নিবেন না?

মোজাম্মেল সাথীকে জড়িয়ে ধরলো।
দুটো শরীরের হৃদস্পন্দন নিমিষেই এক হয়ে গেল। মনে হলো যেন কতকাল ধরে, ওরা এক হবার অপেক্ষায় ছিলো।

সমাপ্ত
না চাহিলে যারে পাওয়া যায়
রুচিরা সুলতানা

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here