Tuesday, April 7, 2026

বাবুই নীড়ে তারা দু’জন-০৩

0
8

বাবুই নীড়ে তারা দু’জন-০৩
-মেহরিমা আফরিন

বাবা তারপর সেদিন রাতেই বাড়ি থেকে চলে গেলেন।এরপর আর মায়ের সাথে তার কোনো যোগাযোগ হয়নি।যেতে যেতে সে বলল,”তোমার যতদিন ইচ্ছে তুমি থাকো।কিন্তু আমার মেয়ে কে দুই দিন পরেই এখান থেকে নিয়ে যাবো আমি।”
পরদিন তুনু খালামণির বাড়িতে এলো আমার সবচেয়ে প্রিয় দু’জন মানুষ।
খালামণি তখন রান্নাঘরে,কাজ করছিল।দরজা খুলল মা।মায়ের কোলে আমি একটা পুতুল হাতে বসেছিলাম।
দরজা খুলতেই দেখলাম,দরজার বাইরে দু’জন মানুষ দাঁড়ানো।তাদের দেখেই মুখখানা উজ্জ্বল হলো আমার।আমি দু’হাত নেড়ে হাত থেকে পুতুলটা ফেলে দিয়ে চিৎকার করে ডাকলাম,পিইই পিইই চা চু চা।

দরজার বাইরে পিপি আর চাচ্চু দাঁড়িয়ে ছিলো।পিপি আমার ফুফু।বাবার ছোটো বোন।বাবাদের তিন ভাই বোন।সবার বড় বাবা।তারপর ইয়াশ চাচ্চু।আর সবার শেষে তনুশ্রী ফুফু।তাকে আমি বড়ো হয়েও পিপি ই ডাকলাম,কারণ সে ই চাইতো আমি যেন তাকে এই নামে ডাকি।

পিপির নাম তনুশ্রী।তনুশ্রী মানে সুন্দর নারী।রূপবতী নারী।আমার ফুফু সুন্দর তো ছিলো।কিন্তু তনুশ্রী না হয়ে তার নাম ব্যাটাশ্রী হলে আরো বেশি ভালো হতো।কারণ তার মধ্যে নারীসুলভ কোনো কিছু আদতে নেই।

সে পরে প্যান্ট শার্ট।মাথায় সবসময় থাকে একটা কালো অথবা সাদা রঙের ক্যাপ।চুলগুলো সর্বোচ্চ কাঁধ ছাড়িয়ে একটুখানি নিচে নামে।তারপরই ছুরি কাঁচি এনে সে তড়িঘড়ি করে সেগুলো কেটে নেয়।
পিপি মা কে দেখে চিৎকার করে বলল,”ভাবিইইই!কি হয়েছে?তুমি কেন চলে এলে বাড়ি থেকে?”

চাচ্চু ততক্ষণে আমাকে কোলে তুলে নিয়েছে।আমি তার আঙুল ধরে মায়ের দিকে তাকালাম।
মা ফাঁকা মুখে বলল,’চলে আসি নি।আমি কেবল দু’দিনের জন্য বেড়াতে এসেছি।”

“বেড়াতে এসেছো।তাহলে বলে আসো নি কেন?”

“তোমরা কেউ তো বাড়িতেই ছিলে না সেদিন।কিভাবে বলতাম?”

চাচ্চু আমার গালে ঠেসে ঠেসে কয়েকটা চুমু খেল।আমি হাত নাড়াতে নাড়াতে কতোরকম কথা বলি।ওরা বোকা মানুষ।আমার কথা বুঝতে পারে না।

চাচ্চু আর পিপি খুব মা ভক্ত।সারাদিন ভাবি ভাবি করে।মা ভক্ত হওয়ার কারণ হলো মায়ের স্বভাব।বাবা ব্যতীত মা কারো সাথে উঁচু আওয়াজে কথা বলে না।মা তার দেবর ননদের সাথে সবসময় সুন্দর করে কথা বলে,তাদের সব কথা শুনে।
তারাও দেখা যায় বাড়ি ফেরার পর বেশির ভাগ সময় মায়ের আশে পাশেই ঘুরতে থাকে।

মা ঘরে চলে এলো।তারা দু’জনও মায়ের পিছু পিছু ঘরে এলো।পিপি শার্টের হাতা গুটাতে গুটাতে গম্ভীর স্বরে বলল,”ভাবি।খুলে বলো তো কেস কি?ভাইয়া কিছু করেছে তোমার সাথে?শোনো।আমি কিন্তু তোমার পক্ষে।”

মা হাসলো।মাথা নেড়ে বলল,”কিছুই করে নি তোমাদের ভাইয়া।”

“তাহলে?তুমি রাগ কেন?”

“রাগ না।”

“তাহলে বাড়ি চলো।”

“দুইটা দিন পরে যাই?”

“এখুনি চলো।দুইদিন পরে গেলে ভাববো সত্যিই রাগ।”

অগত্যা বাধ্য হয়ে মা কে যেতে হলো তাদের সাথে।মা আর কোনো বিরোধ করে নি।কাপড় চোপড় গুছিয়ে,লাগেজটা চাচ্চুর হাতে দিয়ে আমাকে কোলে তুলে নিলো।
এরপর তুনু খালামণিকে বিদায় জানিয়ে আমরা সবাই তার বাসা থেকে বেরিয়ে এলাম।

বাড়িতে আসার পর পিপি আমাকে নিয়ে অন্য ঘরে যেতে যেতে বলল,”ইশুকে নিয়ে যাচ্ছি ভাবি।তুমি ওর খাবারের সময় হলে আমাকে ডেকে দিও।”

সে আমাকে নিয়ে তার ঘরে চলে এলো।চাচ্চু বলল,”ইশু! তুমি ঐ ব্যাটা মেয়ের কাছে যেও না।তুমি আমার কাছে আসো।”

পিপি চোখ পাকালো।ত্যাছড়া মুখে বলল,”তোর সমস্যা কি?আমি ব্যাটা।আর তুই কতো সুন্দর!আয়না দেখিস না তুই?”

আমি জানি,পিপি আর চাচ্চু দু’জনই সুন্দর।দু’জনের পছন্দ দুই রকম।চলনবলনও আলাদা।কিন্ত এতো বৈপরীত্যের পরেও তারা দু’জনই চমৎকার।
বাবা তাদের প্রিয় ভাই।এরা যেমন স্বভাবে চঞ্চল,বাবা ওমন না।বাবা খুব চুপচাপ থাকেন।ঠান্ডা মাথার মানুষ।

পিপি আমার চুলে একটা ক্লিপ বাঁধার চেষ্টা করতে করতে বলল,”ইশুকে আমি সবসময় সুন্দর সুন্দর ফ্রক পরিয়ে রাখবো।পরী বানিয়ে রাখবো সবসময়।”

“কেন?প্যান্ট শার্ট পরাবি না তোর মতো?কারাতে তাইকোয়ান্ডো এসব শেখাবি না?”

চাচ্চু গা দুলিয়ে হাসলো।পিপির টম বয়ের মতো চালচলন নিয়ে চাচ্চু তাকে প্রায়ই ঠেস মারে।পিপি ওসব গায়ে মাখে না।সে ঠান্ডা স্বরে উত্তর দিলো,”না।কারণ ওর শার্ট প্যান্ট পরার দরকার নেই।কারাতে শেখারও দরকার নেই।ওকে প্রোটেক্ট করবো আমি।তনুশ্রী প্রোটেক্ট করবে তাকে।”

চাচ্চু আর পিপির কথা কাটাকাটি হতেই থাকে।সেই দ্বন্দ্বে পানি ঢালে আমার বাবা।
বাবা অফিস থেকে এসে পিপির ঘরে আমার শব্দ শুনতেই চমকে গেল।
ঘরে এসে আমাকে দেখে আদুরে স্বরে বলল,”আরেহহহ্! আমার সোনা বাচ্চা! আমার মা!তুমি এসে গেছো?”

ব্যাস! আমাকে আর পায় কে?সব ভুলে এক লাফে আমি তার কোলে চড়ে বসলাম।বাবা আমাকে আদর দিতে দিতে বলল,”চলে এসেছো তুমি?মা কোথায়?”

চাচ্চু বলল,”ভাবি ঘরে।”

“ও।কখন গিয়েছিলি তোরা?”

“দুপুরের দিকে।”

“ওহহ।”

বাবা আমার দিকে চোখ সরিয়ে বলল,”খেয়েছো মা?চলো।বাবা আজকে খাওয়াবো তোমাকে।”

বাবা আমাকে নিয়ে ঘরে এলো।এসে দেখলো,মা কাপড় ভাঁজ করে আলমারির তাকে গুছিয়ে রাখছে।আমাদের দু’জনকে দেখে একবার আড়চোখে সেদিকে তাকালো সে।

বাবা আমাকে খাটে বসিয়ে শার্টের বোতাম খুলল।গলা থেকে টাই আলাদা করে খাটের উপর রাখলো।এরপর খুব স্বাভাবিক গলায় মা কে বলল,”রিধি! ইশরা খেয়েছে কিছু?”

মা থামলো।মাথা নেড়ে বলল,”না।এখানে আসার পর কিছু খায় নি।”

“খাবে না?”

“হ্যাঁ।আমি করে দিচ্ছি।”

বাবা হাত উঁচু করে বলল,”থাক।আমিই করে নিচ্ছি।তুমি থাকো।”

বাবাই কোলে নিয়ে আমাকে খাওয়ালো।
এর মধ্যে না সে মায়ের সাথে কোনো কথা বলল,না আগ বাড়িয়ে কোনো প্রশ্ন করলো।
মা সন্ধ্যা থেকে তার আশেপাশে ভিড়ার চেষ্টা করছিলো।ইতস্তত করতে করতে কিছু বলতে গিয়েও আর বলতে পারে নি।

একটু পরে যখন আমি ঘুমালাম।বাবাও নামাজ শেষ করে অবসর হয়ে বসলো,তখন মা জানতে চাইলো,কফি দিবো ইশতিয়াক?খাবে তুমি?”

বাবা ডানহাতটা কপালের দুই পাশে চেপে ধরে নিচু স্বরে বলল,”না।আমার প্রয়োজন হলে আমি করে খাবো।”

মা থমথমে স্বরে বলল,”কেন আমি করে দিলে কি হবে?”

“কিছুই হবে না।”

“তাহলে কেন খেতে চাইছো না?”

“খিদে নেই আমার।”

মা আর কথা বলল না।বিবাহিত জীবনে বাবার এমন নিষ্প্রভ,নিরুত্তাপ,অনুভূতিহীন মুখ সে আগে কখনো দেখে নি।বাবার ব্যবহারও ছিলো অত্যন্ত শীতল,ভাবলেশহীন।সে মা কে কোনো কটু কথা বলল না।কোনো বাজে ব্যবহারও করলো না।ভালো মন্দ কিছুই বলল না।সে এক নাগাড়ে নিজের কাজ করে গেল।
কিন্তু তার নির্বিকার ভাব দেখে মা নিজেই কেমন যে দিশেহারা হয়ে উঠল।

মা কিছুক্ষণ তার সাথে কথা বলার চেষ্টা করে পরে কেমন হাঁপিয়ে উঠল।সবেতেই বাবার আচরণ ঠান্ডা।যেকোনো প্রশ্নে সংক্ষেপে উত্তর দিচ্ছে।মা দুপুরে কিছু খায় নি।আশা করেছিল,বাবা তাকে খাবারের কথা জিজ্ঞেস করবে।কিন্তু বাবা জানতে চায়নি একবারো।একবারো জিজ্ঞেস করে নি,রিধি তুমি খেয়েছো?

অভিমানে মার চোখ ভরে এলো।রাতে বাবা কাজ শেষ করে হাত মুখ ধুয়ে বাড়ির সামনের বাগান থেকে হেঁটে এলো।মায়ের পুরো সন্ধ্যা আর রাত গেল খাটের এক কোণায় বসে,বাবার একটু যত্ন পাওয়ার আশায়।

রাত দশটায় বাবা খাবার হাতে ঘরে এলো।তাকে দেখতেই মায়ের চোখ দু’টো দ্বপ করে জ্বলে উঠল।বাবা বসলো মায়ের সামনে।তার মুখ হাসি হাসি।মনে হলো,এখন আর কোনো অভিমান নেই তার।

একটা লোকমা তুলে মায়ের মুখের সামনে বাড়িয়ে দিয়ে বাবা গম্ভীর মুখে বলল,”দুপুরে খাও নি তাই না?দেখি হা করো তো।খেয়ে নাও এটা।”

মা খেল না।মুখ সরিয়ে কাট কাট স্বরে বলল,”আমি খাবো না।”

“খাও রিধি।তুমি না আমার লক্ষী বউ?”

মা নাক টানতে টানতে বলল,”আমি কারো লক্ষী বউ না।”

বাবা এগিয়ে এলো।প্লেট টা খাটের উপর রেখে অন্য হাতে মায়ের গালে হাত রেখে বলল,”উহু।জেদ করে না।খেয়ে নাও।খেলে তোমাকেও তক্কেত দিবো ইশুর মতো।”

“যাও ইশতিয়াক।ভালো লাগছে না আমার।”

“নাহ্।খেতে হবে।”

“কেন খাবো?খিদে নাই আমার।”

বাবা চোখ পাকিয়ে বলল,”কচু।তোমার খিদে না ই থাকতে পারে।কিন্তু তবুও খেতে হবে।তুমি না খেলে আমার মেয়ে খাবে কি?আমি আমার মেয়েকে না খাইয়ে রাখতে পারবো না।নাও,খাও।”

মা হঠাৎ কেমন যে দমে গেল।একটা ঢোক গিলে নিজেকে ধাতস্থ করে ব্যথিত স্বরে মা বলল,”তুমি শুধু ইশরার জন্যই আমাকে ভালোবাসো তাই না?ইশরার মা বলেই এতো যত্ন করো আমায়।আমাকে কোনোদিন ভালোবাসো নি তুমি।তুমি যত্ন করেছো তোমার সন্তানের মা কে।আজও তুমি তাকেই খাওয়াতে এসেছো।রিধিকে না।”

বাবার হাতটা থেমে গেল হঠাৎ।মুখের হাসিও উধাও হলো হুট করে।কেমন যে স্তব্ধ হয়ে বাবা তাকালো মায়ের দিকে।মা ততক্ষণে কেঁদে ফেলেছে বোকাদের মতো।

এক মুহূর্ত নিরবতা।তারপরই কাঁচ ভাঙার বিকট শব্দে পুরো ঘর ঝনঝন করে উঠলো।আমি ভয়ে কেঁপে উঠে দুই ঠোঁট ভেঙে কেঁদে ফেললাম।মা নিজেও আঁতকে উঠল।যতটা না শব্দে,তার চেয়ে বেশি বাবার আচরণে।
বাবা খাবারের প্লেট টা ছুড়ে মেরেছে ফ্লোরে।মেরেই তড়াক করে উঠে দাঁড়িয়েছে।মা হতবাক হয়ে বলল,”ইশতিয়াক।”

মায়ের সেই থমকানো সুরের বিপরীতে বাবা যেন গর্জে উঠল,
“ইউ শাট আপ।তোমার মতো ক্রিটিকাল মাইন্ডের মেয়ে আমি আমার জীবনে দেখি নাই।তুমি আমার সহ্যের সীমা ছাড়িয়ে গেছো।”

দিদুন এক দৌড়ে ঘরে এলো।এসে হাঁপাতে হাঁপাতে বলল,”কি হয়েছে?এভাবে চিৎকার করছিস কেন ইশতিয়াক?এটা কোনো কথা?বউয়ের সাথে বুঝি এভাবে কথা বলে কেউ?”

“মা তুমি যাও।যেটা জানো না।সেটা নিয়ে কথা বলবে না।”

পিপিও উঁকি দিলো ঘরের ভেতর।অবাক হয়ে বলল,”তুমি এভাবে প্লেট ভাঙলে ভাইয়া?তুমি?অথচ ইয়াশ কে সবসময় তুমি বকা দিতে এসব নিয়ে।”

“তুমি চুপ থাকো তনুশ্রী।জ্ঞান চাই নি আমি কারো কাছে।”

পিপি একদম চুপ হয়ে গেল।বাবা বড় বড় করে কয়েকটা শ্বাস ছাড়লো।ছেড়ে তাকালো মায়ের দিকে।মায়ের চোখ মুখ তখনো থমথমে,প্রতিক্রিয়াহীন।বাবার চিৎকারের বিপরীতে কি বলা উচিত,মা জানে না।মা কেবল তীব্র অবিশ্বাস নিয়ে বাবার দিকে তাকালো।ছোটো স্বরে বলল,”ইশতিয়াক!”

বাবা কিছু বলল না।এক টানে ছোঁ মেরে আমাকে কোলে তুলে নিলো।মায়ের সাথে তার চোখাচোখি হতেই ত্যক্ত স্বরে বলল,”নিয়ে যাচ্ছি আমার মেয়ে কে আমি।আজ থেকে সে আমার সাথেই থাকবে।কোনো প্রয়োজন নেই তোমার আমার।তুমি থাকো তোমার মতো।তোমার ধারণা,কেবল ইশরার মা বলেই তোমার এতো কদর।তোমার মতো মূর্খ মানুষকে আমি বুঝিয়ে দিতে চাই,ইশতিয়াক একাই পারে তার মেয়ের দেখভাল করতে।কোনো প্রয়োজন নেই তোমাকে আমার,আমার এই জীবনে।তুমি তোমার মূর্খতা নিয়ে পড়ে থাকো।আমার মেয়ের জন্য আমি একাই যথেষ্ট।”

কথাটা শেষ করেই বাবা হনহনিয়ে আমাকে নিয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে এলো।পেছনে পড়ে রইল মা,মায়ের অভিমান,আর মায়ের এক টুকরো ভাঙা সংসার।

চলবে-

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here