Tuesday, April 7, 2026

বাবুই নীড়ে তারা দু’জন-০৫

0
7

বাবুই নীড়ে তারা দু’জন-০৫
-মেহরিমা আফরিন

মা ভুগছিলো পোস্টপার্টাম সাইকোসিস নামের একটি অতি বিরল মনোরোগে।যেটা প্রতি মুহূর্তে মা কে একটু একটু করে শেষ করে দিচ্ছিল।এটা এমন এক রোগ,যার শেষ পর্যায়ে মানুষ আত্মঘাতী পর্যন্ত হয়ে উঠতে পারে।তখন আর নিজের স্বত্তার উপরও কোনো মায়া দয়া থাকে না মানুষের।কি ভয়ংকর!

এই রোগের প্রধাণ কারণ-দীর্ঘমেয়াদী ডিপ্রেশন,হীনমন্যতা।বাচ্চা হওয়ার পর পর দুই তিন মাস স্বাভাবিক ভাবেই মানুষ অসুস্থ থাকে,মেজাজ খিটখিটে হয়।কিন্তু মায়ের ক্ষেত্রে সময়টা কেবল দুই তিন মাসে থেমে ছিলো না।মা প্রত্যেক মুহূর্তে একটু একটু করে ঐ রোগে ডুবে যাচ্ছিল।মা ভাবতো তার কেউ নেই।সবাই তাকে সবকিছু থেকে আলাদা করে দিচ্ছে।মায়ের সেই ভাবনা টা সত্যি হলো,যখন সে দেখলো বাবা সত্যিই তাকে নিজের থেকে আলাদা করে দিয়েছে।

প্রথম বিবাহ বার্ষিকী ভুলে যাওয়ার মতো বড়োসড়ো অপরাধটি বাবাকে সবার প্রথমে মায়ের চোখে দোষী সাব্যস্ত করলো।বিয়ের মতো এতো বিশেষ একটি দিন মানুষ এক বছরেই ভুলে যাবে?মা কি তাহলে এতোই তুচ্ছ তার জীবনে?
মা বাবার এই ভুলে যাওয়া স্বভাবটা মেনে নিতে পারে নি।এটা কি বাবার প্রতি মায়ের অতিরিক্ত ভালোবাসার ফল,নাকি নিজের প্রতি মায়ের অতিরিক্ত হীনমন্যতার ফল,সেটা ঠিক বোঝা গেল না।মা ই ভালো জানে।

বাবার দিক থেকে পাওয়া অবহেলা,অবজ্ঞা মা কে বিশ্বাস করাতে শুরু করলো,মা কে আসলে কেউ ভালোবাসে না,গুরুত্ব দেয় না।সেই চিন্তা থেকে মা হীনমন্যতায় ভুগতে শুরু করলো,একাকীত্বে দিন কাটাতে লাগলো,মনে মনে নিজের একটা করুণ দশা হ্যালুসিনেট করে নিল।সেই কল্পনার জগতে মা কেমন যে হিংস্র হয়ে উঠল।সেই হিংস্রতার বহিঃপ্রকাশ হিসেবে সবার প্রথমে সে আঘাত করলো বাবাকে।

তার এই রোগের চিকিৎসা তেমন সুনির্দিষ্ট কিছু না।যেহেতু সতেরো মাস সময় নিয়ে এই রোগটা তার ভেতর বাসা বেঁধেছে,অতএব এই রোগের চিকিৎসাও সময় সাপেক্ষ আর ধৈর্যের ব্যাপার।কিন্তু সেই সময় পর্যন্ত অপেক্ষা করা,কিংবা এতো বড়ো ঘটনার পরেও মা কে স্বাভাবিক ভাবে দেখা দিদুনের পক্ষে প্রায় অসম্ভব হয়ে দাঁড়ালো।
সে স্পষ্ট করে ঘোষণা করে দিলো,এই মেয়ে পাগল।তার বড়ো বউমার মাথার ঠিক নেই।এই মেয়েকে তিনি আর তার ছেলের কাছে যেতে দিবেন না।

আমাদের দেশে চিকিৎসা সেবার অবস্থা খুবই খারাপ।শারিরীক নানারকম রোগের চিকিৎসাই এখানে পাওয়া যায় না সহজে।সেখানে মনোরোগর চিকিৎসা আশা করা তো দিবা স্বপ্নই বটে।আমাদের দেশের মানুষ মানসিক রোগ গুলোকে তেমন গুরুত্ব সহকারে নেয় না।এতে তাদের কোনো দোষ নেই।হাত পা কেটে ক্ষতস্থান পঁচে যাওয়ার পরেও যে দেশে সময় মতো চিকিৎসা পাওয়া যায় না,সেই দেশে মনের রোগ নিয়ে মানুষ মাথা ঘামাবে,এটা আশা করাই বোকামি।

এধরনের বিষয় বাঙালিরা তেমন গুরুত্ব দিয়ে ভাবে না।এরা যা ভাবে তা হলো-এই মেয়ে তো পাগল।একে আর এক বাড়িতে রাখা যাবে না।ব্যাস এদিকেই ল্যাটা চুকে গেল।কিন্তু কেন মেয়ে পাগল হলো,কি করলে মেয়ে ভালো হবে-সেই চিন্তা প্রায় সময়ই আলোচনা থেকে দূরে সরিয়ে রাখা হয়।

মা কে ভর্তি করানো হলো হাসপাতালের একটা কেবিনে।চাচ্চু কোনোরকমে তাকে ভর্তি করিয়েই বাবার কাছে ছুটে গেল।বাবার তখন অবস্থা খারাপ।তিনটা সেলাই পড়েছে কপালে।বাবার আর সেন্স নেই।সেন্স হারানোর আগে সে পিপি কে বলে গেছে,”তনু! রিধিকে একটু দেখিস।”

রিধিকে আসলে সেদিন কেউ দেখলো না।পিপি খুব ক্লান্ত ছিলো।মায়ের কেবিনের সামনে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে সে দিদুনের পাশের চেয়ারে গিয়ে বসলো।বাবা তখনও ছটফট করছিলো যন্ত্রনায়।
চাচ্চু আর দাদুভাই মিলে রিসেপশন থেকে কেবিন,কেবিন থেকে রেসেপশনে দৌড়াদৌড়ি করলো।আর দিদুন আমাকে কোলে নিয়ে বসে থাকলো।

মা কে সবার প্রথমে যে দেখলো,সে আমার নানুভাই।সে থাকে চট্টগ্রামে।তাকে দিদুন ফোন দিয়ে বলল,”বেয়াই সাহেব,আপনার মেয়ে আজ যেই কান্ড করেছে।দয়া করে তাকে নিয়ে যান এসে।”

নানুভাই এলো।চট্টগ্রাম থেকে ঢাকার এই পথটা সে প্রায় পাগল পাগল হয়ে পাড়ি দিলো।এসে সে সোজা মায়ের কাছে গেল।মায়ের তখন জ্ঞান ফিরেছে।সে মাথা নামিয়ে মূর্তির মতো বসেছিল হাসপাতালের বেডে।নানুভাই যেতেই সে আঁতকে উঠল।প্রচন্ড অস্থির স্বরে বলল,”বাবা! বাবা! আমার সব শেষ হয়ে গেছে।”

নানুভাই শক্ত করে তাকে জড়িয়ে ধরলো।কাঁপা হাতে মায়ের মাথায় হাত বুলাতে বুলাতে বলল,”রিধি! মা।কি হয়েছে বাবা?বলো।”

মা মাথা নেড়ে বলল,”বাবা! আমি….আমি ইশতিয়াক কে মেরেছি বাবা।একদম জানে মারতে চেয়েছি।”

নানুভাই স্তব্ধ স্বরে বলল,”কেন?”

“আমি জানি না বাবা।আমি কিচ্ছু জানি না।আমি সব শেষ করে ফেলেছি।ইশতিয়াক আর কোনোদিন আসবে না আমার কাছে।ইশরাও না।বাবা,ও বাবা।আমার সব শেষ বাবা।”

মা খুব অপ্রকৃতস্থ হয়ে উঠল।সহজে কান্না না করা মা সেদিন কেবল হু হু করে কেঁদেই গেল।নানুভাই তাকে জড়িয়ে ধরে বলল,”কাঁদে না লক্ষী মা আমার।আমি পরে সব শুনবো।এখন আর কেঁদো না।”

মা চোখ মুছলো।নানুভাই বলল,”বেশি খারাপ লাগে রিধি?”

মা সেই কথার কোনো উত্তর দিলো না।মায়ের তখন আর নিজের ভালো মন্দে মন নেই।প্রচন্ড অনুতপ্ত হয়ে বার বার চোখ ভিজে যাচ্ছিল তার।মা খুব অসহায় মুখে বলল,”বাবা! আমি একবার ইশতিয়াকের কাছে যেতে চাই।বাবা,একবার নিয়ে যাবে আমাকে?আমার খুব দেখতে ইচ্ছে করছে তাকে।আমার বুকে খুব ব্যথা হচ্ছে বাবা।”

নানুভাই তাকে বাবার কেবিনের সামনে নিয়ে এলো।মা উদ্ভ্রান্ত চোখে চারদিক দেখে বলল,”ও কোথায়?কোন কেবিনে?”

মা অবশ্য সেদিন বাবাকে দেখতে পারলো না।দিদুন দেখতে দেয় নি।মা কে দেখতেই সে ধমকে উঠে বলল,”এ্যাই মেয়ে!তুমি কোন বুঝে এখানে এসেছো?পুরোপুরি মেরে ফেলতে চাও নাকি আমার ছেলেকে?যাও এখান থেকে।”

ধমকটা এতো উচ্চস্বরে দিলো ,যে মা ভয় পেয়ে সিটিয়ে গেল কিছুটা।নানুভাইয়ের পেছনে নিজেকে আড়াল করে কাতর স্বরে বলল,”মা আমি ওকে একটু দেখি?”

“খবরদার! তুমি আমার ছেলের কাছে যাবে না একদম।গেলে তোমার হাত পা বেঁধে রাখবো আমি।”

নানুভাই তাজ্জব হয়ে বলল,”আপা! এটা কি ধরণের আচরণ?আপনি আমার মেয়ের সাথে এতো বাজে ব্যবহার করছেন কেন?ও আপনার বাড়ির বউ।কোনো চৌরাস্তার পাগল না।”

দিদুন হাসলো।তাচ্ছিল্য করে বলল,”চৌরাস্তার পাগল থেকে আর ভালো কোথায়?চৌরাস্তার পাগলও এর চেয়ে ভালো আছে।”

নানুভাই ঐ কথাটা সহ্য করতে পারলো না।মা তার পাঞ্জাবি খাঁমচে ধরে বোকা বোকা স্বরে বলল,”বাবা! আমি কি সত্যিই পাগল?ইশতিয়াক কি আর কথা বলবে না আমার সাথে?ভালো মানুষ পাগল হয় কিভাবে?”

নানাভাই তার হাতটা টেনে ধরল।চোখ দু’টো শক্ত করে কঠোর মুখে বলল,”চলো রিধি।আর এখানে দাঁড়িয়ে লাভ নেই।যা বলার আর যা শোনার,সব শোনা হয়ে গেছে।চলো মা।বাড়ি চলো।”

“বাবা! ও এখনো কতো অসুস্থ! আমি কিভাবে যাবো?একটু থাকি বাবা।ওকে একবার বলি যে,আমি ওকে একদমই মারতে চাই নি।আমি আসলেই পাগল বাবা।আমি জানি।ওকে একবার সরি বলবো আমি।পা ধরে মাফ চাইবো।অনেক কষ্ট দিয়েছি তাকে আমি।”

নানুভাই মলিন চোখে তার দিকে তাকালো।এক হাতে মাকে জড়িয়ে ধরে ভাঙা স্বরে বলল,”আসো মা।বাসায় আসো।পরে নাহয় তার সাথে দেখা করবে,কথা বলবে।”

মা বাসায় চলে এলো।সাথে আমাকেও নিয়ে এলো।দিদুন ভয়ে দিতে চায় নি আমাকে।নানুভাই কে বলল,”বেয়াই! আপনি আমাকে ভুল বুঝছেন।আপনি তার ঐ রূপ দেখেন নি।দেখলে আপনিও অমনই করতেন।আমি আপনার মেয়েকে কিছু বলি নি।আমি বলেছি,আপাতত সে পাগল হয়ে আছে।আমি নিজের চোখে দেখেছি সব।দয়া করে ইশরা কে নিবেন না।ঐ মেয়ে আমার নাতনিকেও মেরে ফেলবে।”

নানুভাই ঠান্ডা গলায় বললেন,”আপনার নাতনি ঐ পাগল মেয়ের সন্তান।এই কথা আপনার মনে আছে তো আপা?আপনার নাতনি কে এই পাগল মেয়েটা নয়মাস নিজের গর্ভে ধরেছে।জানেন তো এই কথা?”

দিদুন থতমত খেয়ে গেল।নানাভাই মাকে নিয়ে চলে এলো চট্টগ্রাম,ঢাকা থেকে প্রায় আড়াইশো কিলো দূরে।
বাড়িতে এসে মা কেমন যে মনমরা হয়ে গেল।একটু পর পর তার বাবার কথা মনে পড়ে।তখন সে ঠোঁট ভেঙে কান্না করে।তারপর কাঁদতে কাঁদতে ঘুমিয়ে যায়।
নানুভাই রাতে এসে তার মাথায় হাত বুলিয়ে দেয়।মা তখন ইশরার মতো বাচ্চা হয়ে যায়।সে নানুভাইয়ের কোলে মাথা রেখে ফোপাতে ফোপাতে বলে,”বাবা! ওকে আমি খুব চাই জানো? ও বাদে আর কারো সাথে অভিমান করি না আমি।আর কারো সাথে ত্যাড়ামো করি না।ও খুব ভালো।একবার নিয়ে চলো বাবা।”

নানুভাই কোনো কথা বলে না।মা ই একটার পর একটা কথা বলতে থাকে।

–বাবা! ও কি সুস্থ হওয়ার পর আমাকে খুঁজবে না?
–বাবা আমি কি সত্যিই পাগল?
–বউ পাগল হলে কি জামাই আরেকটা বিয়ে করতে পারে?
—আমি অনুমতি না দিলেও কি ও আরেকটা বিয়ে করবে?
–ইশতিয়াক আরেকটা বিয়ে করলে কি আমাকে আর ভালোবাসলে না?
–ও আরেকটা বিয়ে করলে আমি কোথায় যাবো?ইশরার কি হবে?
–বাবা পাগলের কি কোনো চিকিৎসা নাই?
–আমি কি সারাজীবন পাগলই থাকবো?
–বাবা আমি কেন মারা যাচ্ছি না এখনো?
–ইশতিয়াক যদি আরেকটা বিয়ে করে,তাহলে কি ইশরা কে আমি সারাজীবন নিজের কাছে রাখতে পারবো?
–এমন কোনো উপায় নেই,যেখানে সবাই বলার পরেও ইশতিয়াক আমাকে ছেড়ে গেল না?
–এমন কি হতে পারে না,যে ইশতিয়াক সবাইকে থামিয়ে দিয়ে বলল,এ্যাই সবাই চুপ।রিধিই আমার বউ।আর কাউকে বিয়ে করবো না আমি।তোমরা কেউ ওকে তাড়িয়ে দিবে না।এমনও তো হতে পারে তাই না বাবা?
–ও তো আমাকে ভালোবাসে তাই না?
উহু।তুমি জানো না।ও আমাকে খুব ভালোবাসে।

মা নিজে নিজেই সব কথা বলে।প্রশ্নও করে নিজে নিজে।নানুভাই দিশেহারা হয়ে পড়ে।স্বল্পভাষী,বুদ্ধিমতী মেয়ের মুখে এতো এতো কথা শুনে নানুভাইয়ের বুকে ব্যথা হয় তীব্র।কথার ফাঁকে মা কেঁদে উঠে হাউমাউ করে।বুকের সাথে বাবার একটা ছবি চেপে ধরে বলে,”বলো না বাবা,এমনও তো হতে পারে,যে ইশতিয়াক সবাইকে থামিয়ে দিয়ে বলল,ও আমাকে ভালোবাসে।ছেড়ে দিবে না আমায়।তখন তো কেউ আর আমাকে পাগল বলে ওর থেকে সরাতে পারবে না বলো?
ও বাবা।
বলো না।”

নানুভাই চোখ মুছেন।আদুরে স্বরে বলেন,”হ্যাঁ মা।অবশ্যই হতে পারে।হতে পারে কেন বলছো?আমি জানি এমনটাই হবে।”

শুনে মা খুশিতে হাসে।বলে,”হ্যাঁ।ইশতিয়াকের উপর ভরসা আছে আমার।ও খুব ভালো ছেলে।”

মা কে তখন খুব বোকা মনে হতো আমার।মা তখনও জানতো না,আর নয়দিন বাদে ডিভোর্সের জন্য মুখোমুখি বসবে মা আর বাবা।মা তখনও জানে না,মায়ের ছোট্ট ঘরটা আশ্বিনের হঠাৎ ঝড়ে ইতোমধ্যেই ভেঙে গেছে অনেকটা।

চলবে-

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here