Thursday, April 9, 2026
Home "ধারাবাহিক গল্প """ফেরারী বসন্ত ফেরারী বসন্ত পর্ব- বারো

ফেরারী বসন্ত পর্ব- বারো

0
3

#বড় গল্প
#ফেরারী বসন্ত
পর্ব- বারো
মাহবুবা বিথী

একসময় হাসনার চোখে একটু ঘুম নামে। হঠাৎ ওয়াশরুমের দরজা খোলার শব্দে হাসনার চোখের ঘুম টুটে যায়। ও ধড়মড় করে বিছানার উপর উঠে বসে। এরমাঝে রাজ ওজু করে এসে নামাজে বসে । হাসনা খুব সাবধানে বিছানা থেকে নেমে ওয়াশরুমে যায়। বাথরুমে রাখা প্রেগনেন্সি কীডটা কাঁপা কাঁপা হাতে ইউরিনে ডুবিয়ে দেয়। সাথে সাথে স্ট্রিপে দুটো লাল দাগ ভেসে উঠে। হাসনার হাতের আঙ্গুলগুলো থরথর করে কাঁপতে থাকে। ওয়াশরুম থেকে স্ট্রীপটা হাতে নিয়ে বের হয়ে আসে। রাজ তখন কেবল নামাজ শেষ করে জায়নামাজ ভাঁজ করে রেখে হাসনার দিকে তাকায়। দৌড়ে এসে ওর হাত থেকে স্ট্রীপটা নিয়ে নিজেও ভালো করে দেখে নেয়। পাশাপাশি এক হাত দিয়ে হাসনাকে জড়িয়ে ধরে। স্ট্রীপটা বিনে ফেলে দিয়ে হাসনার কপালে চুমু খায়। এরপর অশ্রুসজল চোখে হাসনার দিকে তাকিয়ে বলে,
—আল্লাহপাক আমাদের দোয়া কবুল করেছেন। তোমার গর্ভে অবশেষে আমার সন্তান আসছে। ভাবতেই আমি শিহরিত হয়ে যাচ্ছি।
হাসনার আজ যেন কিছু বলার ভাষা নাই। চোখ ছাপিয়ে শুধু আনন্দঅশ্রু অঝোরে গড়িয়ে পড়তে থাকে। কি রিয়্যাক্ট করবে ও বুঝতে পারছে না। এই খবরটা পেয়ে ও যেন অনুভূতি হীন হয়ে পড়েছে। বিয়ের তিনবছর পার হতে চললো। সন্তান না হওয়াতে কতো মানুষের কত কটুকথা ওকে হজম করতে হয়েছে। যদিও ঐসব দিনের কথা ও মনে করতে চাইছে না তবুও যেন মনের পর্দায় ভেসে উঠে। প্রথমে যখন লাল দাগ দুটো চোখে পড়ে ও যেন নিজের চোখকেই বিশ্বাস করতে পারছিলো না। প্রথম সন্তান জন্মের প্রায় বারোবছর পর আল্লাহপাকের অমুল্য উপহার ওর জীবনে আবারো এসেছে এটা ভাবতেই হাসনা যেন ভাষা হারিয়ে ফেলে। হাসনাকে বুকের মাঝে জড়িয়ে ধরে রাজ কাঁদতে থাকে। রাজের কান্না দেখে হাসনার দুচোখে বাঁধভাঙ্গা জোয়ার নেমে আসে। দরজা নক করার শব্দে হাসনা আর রাজ সম্বিত ফিরে পায়।
রাজ হাসনার কাছ থেকে সরে এসে দরজা খুলে দেখে ওর মা দাঁড়িয়ে আছে। উদভ্রান্তের মতো রাজের দিকে তাকিয়ে বলে,
—-হাসনা কি কনসিভ করেছে?
রাজ মায়ের সামনে দাঁড়িয়ে সিক্ত চোখে বলে,
—হা মা আল্লাহপাক আমাকে খালি হাতে ফিরিয়ে দেননি।
মরিয়ম বেগম ঘরে ঢুকে হাসনাকে জড়িয়ে ধরে বলেন,
—আল্লাহপাকের কাছে শোকরিয়া আদায় করো। আলহামদুলিল্লাহ, আল্লাহপাক আমার ঘরে নতুন অতিথি পাঠিয়েছেন। তুমি একটু পর তোমার দাদীকে গিয়ে খবরটা জানাবে। তোমাকে এখন আর কিচেনে যেতে হবে না। সাবধানে থাকো। আগের বারের মতো ভুল করো না।

কথাগুলো বলে মরিয়ম বেগম চলে গেলেন। হাসনা ওর শাশুড়ীর দোষ দেয় না। বাচ্চা এবরশন হওয়ার পর কনসিভ না করতে পারার কারণে উনি অনেক কটু কথা হাসনাকে বলেছেন। না,হাসনা এতে কিছু মনে করেনি। শুধু ওর এটাই মনে হতে থাকে মানুষ খুব স্বার্থপর প্রাণী। নিজের স্বার্থে আঘাত লাগলেই তার স্বরুপ প্রকাশ পেয়ে যায়। যাইহোক হাসনা আজকে এই সুখের দিনে সেসব আর মনে করতে চায় না।
বুকের মাঝে এতোদিন ধরে সন্তান না হওয়ার জন্য জমে থাকা বেদনার পাথরটা বোঝা হয়ে ছিলো। তা আজ এই প্রাপ্তির আনন্দে এক লহমায় সরে গেল। এই ক’বছর শাশুড়ী মায়ের কাছে ভালোই গালমন্দ শুনতে হয়েছে। হাসনা অবশ্য সেগুলো মনে রাখেনি। রাশেদকে ভালোবাসতে চেয়েও হাসনা ওর আচরণে পারেনি মন প্রাণ উজাড় করে ওকে ভালোবাসতে। কেননা ওর ব্যবহার ছিলো পশুর মতোন। অপরদিকে রাজ একজন ভালোবাসার মতোন মানুষ। যে কোনো মেয়েই ওর সঙ্গ ধারণ করলে ওকে ভালোবাসতে চাইবে। সেদিক থেকে হাসনাও এর ব্যতিক্রম নয়। ও তো এই সুসংবাদ শোনার জন্য উম্মুখ হয়েছিলো। হাসনা প্রথমে প্রেগনেন্সির স্ট্রীপে লালদাগ দুটি দেখে বিশ্বাস করতে পারছিলো না। ওর ধাতস্থ হতে সময় লেগেছে। কেনই বা হবে না কেননা এই দুবছর ওতো এই সংবাদটার জন্য তীর্থের কাকের মতোন অপেক্ষা করে থেকেছে। অপয়া অলক্ষী থেকে শুরু করে হেন কথা শুনতে এই সংসার বাকী রাখে নাই। সে কারণে মাঝে মাঝে নিজের কাছে নিজেকে অপাংতেয় মনে হতো। হাসনা সাজগোজ করতে ভুলে গিয়েছে। ও অগোছালো থাকা শুরু করে। যদিও রাজ ওর মানসিক অবস্থা বুঝতে পেরেছিলো সে কারণে ওকে কখনও কিছু বলেনি।

হাসনা নিজেকে অনেক ভাগ্যবতী মনে করে। আল্লাহপাকের কাছে শোকরিয়া আদায় করে। কেননা পরমকরুনাময় আল্লাহপাক ওকে এমন একজন স্বামী দান করেছেন। ভালোস্বামী পাওয়া আল্লাহপাকের বিশেষ রহমত। রাজ বুঝতো মরিয়ম বেগম ওর সাথে খারাপ ব্যবহার করে। বিশেষকরে আরশী আসার পর আগের বাচ্চাটস এবরশন হওয়ার কারণে হাসনার উপর খুব ক্ষিপ্ত ছিলো। কিন্তু এখানে হাসনারই বা কি করার ছিলো। কিন্তু রাজ কখনও হাসনাকে গালমন্দ কিংবা কটু কথা বলেনি। বরং পাশে থেকে ভালোবেসে জীবন এগিয়ে নিতে সহায়তা করেছে। হাসনার শরীরটা খুব দুর্বল। বিছানা থেকে উঠে বসতেই পারছে না। মাথাটা প্রচন্ড ঘুরছে। হাসনা বিছানায় শুয়ে পড়লো। এমন সময় সায়েরা এসে হাসনার কাছে বায়না করে বলে,
—,আম্মু আমি তোমার হাতে খাবো।
আরশীও চলে আসে। হাসনা সায়েরাকে আদর করে বলে,
—আজ একটু কষ্ট করে নিজের হাতে খেয়ে নাও। মামনির শরীরটা বেশী খারাপ।
সাথে সাথে আরশি বলে,
—ঠিক আছে আমি তোমাকে খাইয়ে দিবো।
রাজ সে সময় ঘরে ঢুকে বলে,
—আরশী,তোমাকে খাওয়াতে হবে না। টেবিলে নাস্তা দেওয়া আছে। খেয়ে নিয়ে পড়তে বসো। মনে রেখো সামনে তোমার পরীক্ষা।
আরশীর প্রতি রাজের কেয়ারিং দেখে হাসনার ভীষণ ভালো লাগে। সাইট টেবিলে হাসনার সুপটা রেখে সায়েরাকে বলে,
–আজ আমি তোমাকে খাইয়ে দিবো।
রাজ আরশী আর সায়েরাকে নিয়ে চলে যায়। সুপটা গরম থাকাতে সাইট টেবিলে ঢেকে রাখে। রাতে ঘুম না হওয়াতে এখন যেন দুচোখ ভরে ঘুম নামতে চাইছে।

বসার ঘরে সিতারা গাল ফুলিয়ে বসে আছে। ওর মা ওকে মিথ্যা কথা বলে ডেকে এনেছে। বলেছে ওর বাবার খুব অসুখ। কিন্তু বাড়ী এসে দেখতে পায় ওর বাবা বহাল তবিয়তে আছে। বরং ওর কপালে শনি লেগেছে। আগামীকাল ওকে নাকি পাত্রপক্ষ দেখতে আসবে। ওর প্রচন্ড মেজাজ খারাপ। না ওকে এখুনি বাড়ি থেকে পালাতে হবে। ওর পক্ষে কিছুতেই এ বিয়ে করা সম্ভব নয়। সিতারা শোবার ঘরের দরজায় এসে দাঁড়ালো। বাবা মা দুজনে দুপুরের ভাতঘুম দিচ্ছে। ফ্যানটা মাথার উপর শোঁ শোঁ করে ঘুরছে। মায়ের চুলগুলো বাতাসে উড়ছে। দেখে মনে হচ্ছে বেশ গভীর ঘুম। সিতারা বাবা মায়ের রুম থেকে বেরিয়ে এসে নিজের ঘরে চলে আসে। একটা চিরকুটে লিখে,”আমার পক্ষে এই বিয়ে করা সম্ভব নয়। সুতরাং আমি চলে যাচ্ছি। যদি তোমরা সিদ্ধান্ত পাল্টে ফেলো তাহলে ফোনে আমাকে জানিয়ে দিও। সিতারা বাড়ীর চর্তুদিকে দৃষ্টি বুলিয়ে নেয়। চাচীও বাড়ীতে নেই। মীরা আনতে স্কুলে গিয়েছে। চাচী ওকে নিজেই আনা নেওয়া করে। মীরা এখন ক্লাস এইটে পড়ে। ক’দিন আগে একজন ছেলের সাথে ভিন্নজগতে ঘুরতে গিয়েছিলো। এই খবর বাড়ীর ড্রাইভার ওর বাবাকে জানিয়েছিলো। সেই থেকে চাচী একমুহুর্ত মেয়েকে চোখের আড়াল করে না। বাসা থেকে বের হয়ে বাসস্ট্যান্ডে চলে আসে। রাজশাহী গামী একটা বাসে উঠে পড়ে। বাসের জানালা দিয়ে শীতল বাতাস পুরো শরীরটাকে শীতল করে দিচ্ছে। কাল বৃষ্টি হওয়াতে আজকে আকাশটা বেশ পরিস্কার। কোথাও এক ফোঁটা মেঘ জমে নেই। এখন বেলা তিনটা বাজে। রাজশাহী পৌঁছাতে রাত আটটা বেজে যাবে।

হাসেম খুব মনোযোগ দিয়ে থিসিস পেপার রেডী করছে। সামনে থিসিস জমা দিতে হবে। এটার উপর ভিত্তি করে ও বাইরে পিএইচডির জন্য স্কলারশিপের জন্য আবেদন করবে। সুতরাই থিসিসটা নিঁখুত হওয়া চাই। দরজায় কে যেন নক করছে। হাসেম নিজের মনে লিখতে থাকে। দরজা নক করার শব্দে বিরক্ত হয়ে বলে,
—কে?
—ভাইজান,আমি জহির
—ভিতরে আসো,
জহির ভিতরে এসে হাত কঁচলাতে কঁচলাতে বলে,
—আপনার সাথে একজন মেহমান দেখা করতে আসছেন।
জহিরের আচরণে হাসেম বিরক্ত হয়ে বলে,
—কথাটা স্বাভাবিকভাবে বললেই তো পারো। এতো হাত কঁচলানোর কি দরকার? চামড়া উঠে যাবে।
—একজন মেয়ে মানুষ আসছে।
জহিরের মুখে মেয়ে মানুষ কথাটা শুনে ও অবাক হলো। এই রাতে কোন মেয়ে ছেলেদের হোস্টেলের সামনে এসে ওর সাথে দেখা করতে চাইছে। গায়ে টিশার্ট জড়িয়ে তাড়াতাড়ি হল থেকে বেরিয়ে আসে। আলো আঁধারিতে প্রথমে বুঝতে পারেনি মেয়েটা কে? তাছাড়া মেয়েটা পিছনদিক করে দাঁড়িয়েছিলো। কাছে গিয়ে গলা খাঁকারি দিয়ে বলে,
—কে আপনি?
সিতারা সামনে ঘুরে হাসেমের দিকে তাকিয়ে বলে,
—হাসেম ভাই, আমি সিতারা।
—তুমি এসময় এখানে কেন?
—আমি এসময় কেন আপনার সাথে দেখা করতে এসেছি আপনি বুঝতে পারছেন না? নাকি বুঝেও না বুঝার ভান করছেন। হাসেম হয়তো কিছু আন্দাজ করতে পারছে। কিন্তু ও সেই প্রসঙ্গে না গিয়ে বলে,
—আসলেই বুঝতে পারছি না তুমি কেন আসছো?
—কাল আমাকে পাত্রপক্ষ দেখতে আসবে।
—-এতো খুব ভালো খবর।
—একথা বলতে আপনার খারাপ লাগলো না?
সিতারার মনের অবস্থা হাসেম বুঝতে পারছে। কিন্তু ওর কিছু করার নেই। প্রথমতো ও আর সিতারা সামাজিক অবস্থান রাত আর দিনের তফাৎ। সে কারণে সিতারাকে ভালো লাগলেও তা ও অন্তরে সযতনে গোপন রেখেছে। হৃদয়ের অন্তপুর থেকে তা কখনও বাইরে আসতে দেয়নি। তাছাড়া খালা খালু দুজনেই ওকে অনেক স্নেহ করেন। ও কিছুতেই উনাদের মনে কষ্ট দিতে পারবে না। এদিকে সিতারার বডিল্যাঙ্গুয়েজ দেখে যা মনে হলো, ও নিজের সিদ্ধান্তের প্রতি অবিচল। ওকেই বা এখন ফিরিয়ে দিবে কিভাবে?

চলবে

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here