#বড় গল্প
#ফেরারী বসন্ত
পর্ব-সতেরো
মাহবুবা বিথী
সায়মা রেগে গিয়ে ফিরোজকে বলে,
—-তোমার আহ্লাদ পেয়ে ওর আজ এই দশা। লজ্জা শরমের বালাই নেই। এতোদিন শুনেছি ছেলেরা জোর করে মেয়েদের বিয়ে করে। এখন শুনলাম মেয়ে জোর করে ছেলেকে বিয়ে করেছে। সেই রত্নটি আবার আমার মেয়ে। ভাবতেই অবাক লাগছে এরকম নির্লজ্জ্ব একটা মেয়েকে আমি পেটে ধরেছিলাম।
সিতারা ফোঁস করে বলে,
—-কেন তোমার বড় মেয়ে তো প্রেম করে বিয়ে করেছে। তার বেলা তোমার নির্লজ্জ্ব মনে হয়নি? আমার বেলায় তোমার যত সমস্যা।
—আমার বড় মেয়ে জোর করে অন্তত কোনো ছেলেকে বিয়ে করেনি। আমাদের দুপক্ষের অভিভাবক মিলে বিয়ের আয়োজন করেছে।
একথা শুনে হাসেম বলে,
—-খালামনি, ও আমাকে জোর করে বিয়ে করেনি। আমি স্বেচ্ছায় স্বজ্ঞানে ওকে বিয়ে করেছি।
—-এই বলদ তোকে এখানে কথা কে বলতে বলেছে?
সিতারার কথা শুনে ফিরোজ বলে,
—সিতারা, এ তোমার কেমন মুখের ভাষা? হাসব্যান্ডকে বলদ বলাটা ভালো দেখায় না।
হাসেম আবারও ফিরোজের দিকে তাকিয়ে বলে,
—খালু,আমি কিছু মনে করিনি।
হাসেম একটু লাজুক টাইপের মানুষ। সিতারার মুখে নিজের বলদ বিশেষণ শুনে কুঁকড়ে যেতে লাগলো। ছেলেটার আরো একটা গুন আছে। প্রচন্ড বিনয়। সে কারণে ফিরোজ একটু বিরক্তিসূচক ভাব এনে বললো,
—তুমি মনে না করলেও আমার গায়ে লাগে। তোমার খালা যদি আমাকে বলদ বলতো তাহলে কেমন লাগতো?
সিতারা সাথে সাথে ফোড়ন কেটে বলে,
—তুমি তো বলদ না যে আম্মু তোমাকে বলদ বলবে। আমি যাকে বলদ বলেছি সে আসলেই একটা বলদা।
এবার হাসেমের মনে মনে সিতারার উপর রাগ হলো। নিজের স্বামীকে বার বার বলদ বলছে। অথচ বলদের স্ত্রী লিঙ্গ গাই সেটা কি ও জানে না? সেই সুত্রে ওকে তো গাই গরু বলা যায়। এমন সময় সায়মা বলে,
—গাই গরুর স্বামী তো বলদ হওয়ারই কথা, তাই না?
এবার ফিরোজ বিরক্ত হয়ে বলে,
—একটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয়কে তোমাদের হালকাভাবে নেওয়াটা কি ঠিক হচ্ছে। যেখানে দুটো জীবন জড়িয়ে আছে। সায়মা, ওদের বাসায় নিয়ে এবার আসল বিয়ের ব্যবস্থা করতে হবে।
সিতারা বেশ শান্তভাবে বলে,
—-আমি ওকে আর বিয়ে করবো না।
—ঠিক আছে। এবার বাসায় গিয়ে আমাদের ধন্য করো।
সিতারার মুখে বিয়ে করবো না শুনে হাসেম চমকে উঠে। অথচ আজ রাতে স্বপ্নে সে সিতারার সাথে বাসর করেছে। অবশ্য সিতারাকে যখনি বাহুডোরে জড়াতে যাবে অমনি সিতারার পায়ের শব্দে ঘুমটা ভেঙ্গে যায়৷ অবশ্য ঘুমটা খুব একটা গাঢ় ছিলো না। তবে ঘুম ভেঙ্গে যাবার পর একটা ভালো লাগা ওকে আচ্ছন্ন করে রেখেছিলো। আহা,স্বপ্নেই যদি এতো ভালো লাগা বিরাজ করে বাস্তবে তাহলে কতনা মধুর হবে সে কথা ভাবতেই রোমাঞ্চিত হলো। আর এখন বলছে ও বিয়ে করবে না। হাসেমের ভীষণ খারাপ লাগছে।
মায়ের কথা শুনে সিতারা মনে হয় একটু হোঁচট খেলো। মনে মনে ভাবলো কোথায় একটু সাধাসাধি করবে। অথচ সেটা না করে ওর কথাতেই সায় দিলো। ফিরোজের মুখটাও থমথমে হয়ে গেল। সায়মা অবশ্য মনে মনে খুশী হয়েছে। ও কিছুতেই চায় না সিতারা দেশের বাইরে চলে যাক। জারা গিয়েছে তাই বলে ওকেও যেতে হবে নাকি? দেশে থেকেও সুন্দর ক্যারিয়ার তৈরী করা যায়। তাছাড়া হাসেমের রেজাল্ট ভালো। ওকে বলবে বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে ওর একটা সিভি জমা দিতে। বলা যায় না রিজিকে থাকলে চাকরি হয়ে যেতে পারে। কিন্তু এই মনোভাব প্রকাশ করা যাবে না। যতটা সম্ভব মুখে বিরক্তি ভাব সাজিয়ে রাখতে হবে। ওরা সবাই নাস্তা করে রংপুরের উদ্দেশ্যে রওয়ানা হলো।
মীরা বসারঘরের জানালা দিয়ে দেখলো সিতারা সহ সবাই আসছে। হাসেম ভাইকে দেখে মনে হচ্ছে উনি যেন জেলখানার কয়েদি। পুরো শরীর ঘেমে ভিজে আছে। শার্টটা গায়ের সাথে চিপকে লেগে আছে। ডোরবেল বাজার আগেই মীরা দৌড়ে গিয়ে দরজা খুলে দেয়। ওরা সবাই বসার ঘরের সোফায় বসে। সায়মা মীরার দিকে তাকিয়ে বলে,
—তোমার আম্মুকে চার গ্লাস শরবত বানাতে বলো।
মীরা ভিতরে চলে যায়। হাসেমের ভীষণ অস্বস্তি লাগছে। সিতারার চাচীর মুখের জবানের যে ধার ছুড়ি দিয়ে কাটলেও মানুষ এতো ব্যথা পাবে না যতটা পাবে উনার কথা দিয়ে। ফিরোজ হাসেমের দিকে তাকিয়ে বলে,
—-শরবত খেয়ে তুমি গেস্টরুমে গিয়ে কাপড়চোপড় ছেড়ে হাতমুখ ধুয়ে ফ্রেস হও।
এরপর সিতারার দিকে তাকিয়ে বলেন,
—তুই ও নিজের ঘরে গিয়ে ফ্রেস হয়ে নে।
এমন সময় রুবা চার গ্লাস শরবত নিয়ে বসার ঘরে ঢুকলেন। হাসেমের হাতে শরবত তুলে দিয়ে বলে,
—তুমি কি আজ এখানেই থাকবে নাকি?
সিতারা ওর রুমের দিকে যাচ্ছিলো। চাচীর কথা শুনে ঘাড় ঘুরিয়ে বলে,
—কেন,থাকলে আপনার কি সমস্যা?
—ওমা,আমি এখানে খারাপ কি বললাম? ওর বোনের বাসায় তো যেতে পারে? সেটা জানতে চাওয়া কি দোষের? তাছাড়া—-
—-তা ছাড়া কি? কথাটা শেষ করেন।
—-আমার মীরা এখন বড় হচ্ছে। সুতরাং এই বিষয়গুলোতে আমার এখন সাবধান থাকতে হবে।
ফিরোজ কঠিনস্বরে রুবাকে বললো,
—এতো সাবধান থাকার দরকার নেই। ও বিবাহিত। তুমি কিচেনে ভালো কিছু রান্নার ব্যবস্থা করো। ও আজ এখানেই থাকবে। আর টেবিলে খাবার দিয়ে দাও।
হাসেম গেস্টরুমে চলে গেল। রুবা মনে মনে প্রচন্ড বিরক্ত হয়। কিন্তু কিছু করার নেই ভাসুর বলে কথা। বিয়েটা কার সাথে হয়েছে সেটা জানার কৌতুহল ছিলো। কিন্তু ওকে আর কিছু বলার সুযোগ না দিয়ে ফিরোজ সায়মাকে নিয়ে নিজের রুমে আসলেন। তাদের গোপন কিছু আলোচনা আছে। সায়মার সাথে আলাপ করে হাসেমের মা বাবাকে ফোনে আগামীকাল বাসায় আসতে বললেন। কেন আসতে বলা হলো সেই কারণটা অবশ্য গোপন রাখলেন।
হাসনা আজ একটু ভোরে ঘুম থেকে উঠেছে। দুপুরে ওর খালার বাসায় ওদের সবার দাওয়াত আছে। ওর কাছে বিষয়টা যেন কেমন লাগলো। হঠাৎ করে খালা এই দাওয়াতের ব্যবস্থা কেন করলেন বুঝতে পারছে না। কিচেনে গিয়ে শাশুড়ী মায়ের সাথে কাজে হাত লাগায়। ও পরোটা বানিয়ে দেয়। শাশুড়ী মা ভেজে নিতে লাগলেন। আজ জারার শাশুড়ী জমিলা বেগমের প্রেসারটা বাড়ার কারণে উনি শুয়ে আছেন। সবজিটা হয়ে এসেছে। পরোটাগুলো ভাজা হয়ে গেলেই টেবিলে বেড়ে দেওয়া যাবে। শাশুড়ী মনোয়ারা বেগম পরোটা ভাজতে ভাজতে হাসনাকে বলেন,
—-শোনো, রাজের কিন্তু এবার ছেলে চাই।
হাসনার হাতের বেলুনিটা থেমে গেল। ছেলে কিংবা মেয়ে সন্তান এটাতো কারো হাতের ব্যাপার নয়। আল্লাহপাকের যা ইচ্ছা উনি সেটাই দান করবেন। সেকারনে শাশুড়ী মায়ের দিকে তাকিয়ে হাসনা বলে,
—-মা, আমি একটা সুস্থ সবল সন্তান চাই।
মনোয়ারা বেগমের মুখটা সাথে সাথে কালো হয়ে যায়। বিরক্ত হয়ে হাসনাকে বলেন,
—-,তোমার চাওয়াটা শুধু দেখলে হবে না। আমার ছেলের চাওয়াটা তোমার ভাবতে হবে। আর বাকি পরোটাগুলো ভেজে টেবিলে খাবার বেড়ে দাও।
একথা বলে হাসনাকে আর কিছু বলার সুযোগ না দিয়ে নিজের শাশুড়ীর খাবারটা নিয়ে চলে গেলেন। হাসনার খুব খারাপ লাগলো।কিন্তু কিছু করার নেই। রাজ হয়তো ওর মায়ের কাছে নিজের চাওয়ার কথা বলেছে। সে কারনে হয়তো উনি বলেছেন। ফোনটা বেজে উঠলো। স্ক্রীনে তাকিয়ে দেখে খালামনি ফোন দিয়েছে। রিসিভ করার সাথে সাথে ওপাশ থেকে সায়মা বলে,
—হাসনা তুই একটু তাড়াতাড়ি চলে আসিস। রাজ বাড়ির সবাইকে নিয়ে পরে আসলে চলবে।
হাসনা ওর খালাকে আশ্বস্ত করে বলে,
—-তুমি এতো চিন্তা করো না। আমি একটু পরেই রওয়ানা দিচ্ছি।
দ্রুত নাস্তার পর্ব শেষ করে হাসনা সায়েরা আর আরশীকে রেডী করে নিজেও একটু সাজুগুজু করে নেয়। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে শাড়ী পরা নিয়ে। পেটটা একটু ভারী হওয়াতে ঝুঁকে এখন শাড়ীর কুচিগুলো ঠিক করতে পারে না। তারপরও কষ্ট করে ঠিক করতে লাগলো। সামনে ঝুঁকতেই রাজ দৌড়ে এসে বলে,
—করছো কি? এভাবে ঝুকে পড়া ঠিক নয়। আমাকে বললেই তো পারো।
—আপনি শাড়ীর কুচি ঠিক করতে পারেন?
—-,কেন পারবো না? একসময় রশ্নির—
কথাটা রাজ আর শেষ করলো না। অসমাপ্ত থেকে গেল। কিছুটা নিরবতা। কুচিটা ঠিক করে রাজ হাসনাকে বলে,
—দেখো, ঠিক হয়েছে কিনা?
হাসনা বুঝে,রশ্নি ওর প্রথম প্রেম। তাকে ভুলে থাকা সম্ভব নয়। কিন্তু তারপরও কষ্ট হয়। তবে ভিন্ন পরিস্থিতীতে হাসনা নিজেকে মানিয়ে নিতে চেষ্টা করে। আসলে ওযে রাজকে ভালোবেসে ফেলেছে। মাঝে মাঝে ভাবে রশ্নি কিভাবে এই মানুষটাকে, সায়েরাকে ফেলে রেখে চলে গেল? আবার এও ভাবে রশ্নি চলে না গেলে ওর তো এই জায়গায় আসা হতো না। আয়নায় হাসনা তাকিয়ে দেখে অবাক হয়। আসলেই রাজ খুব নিঁখুতভাবে কুচিগুলো ঠিক করে সেফ্টিফিন লাগিয়ে দিয়েছে। হাসনার জীবনে কখনও এ ধরনের অভিজ্ঞতা হয়নি। নিম্ম মধ্যবিত্ত পরিবারে বেড়ে উঠা হাসনা কখনও ওর বাবাকে দেখেনি মায়ের শাড়ির কুচি ঠিক করে দিয়েছে। আর নিজের জীবনে তো ও একজন অমানুষের সংসার করেছে। যার কাছে এই সুন্দর চাওয়াগুলো পাওয়া মানে আকাশ কুসুম ভাবনা।
চলবে





