Monday, September 14, 2026
Home "ধারাবাহিক গল্প মন_বাড়িয়ে_ছুঁই মন_বাড়িয়ে_ছুঁই পর্ব-১৩ লেখা: ফারজানা ফাইরুজ তানিশা

মন_বাড়িয়ে_ছুঁই পর্ব-১৩ লেখা: ফারজানা ফাইরুজ তানিশা

মন_বাড়িয়ে_ছুঁই
পর্ব-১৩
লেখা: ফারজানা ফাইরুজ তানিশা
.
“আপু, লাইট অফ করে অন্ধকারে দাঁড়িয়ে আছিস কেন?”
বলতে বলতে প্রত্যাশা ঘরের লাইট জ্বেলে দিল। অন্ধকার ঘরটা মুহূর্তেই আলো ঝলমল করে উঠলো। প্রত্যাশা পেছন থেকে পৃথুলাকে জড়িয়ে ধরলো।

“জানিস আপি, আমি আজ ভীষন খুশি। শুধু আমিই না, মা, বাবা সবাই খুব খুশি। সেদিনের পর থেকে বাবাকে তো কখনো হাসতেই দেখিনি। কিন্তু এখন বাবা হাসছে, আনন্দের হাসি। আর অভ্র ভাইয়াও মানুষটা খুব ভালো। তোর পাস্ট জেনেও নির্দ্বিধায় তোকে বিয়ে করতে চাইছে। আমি তো বিষ্মিত। এমন মানুষও হয়। আল্লাহ’র কাছে অনেক শোকরিয়া, যে এমন একজন মানুষকে তিনি আমার আপির ভাগ্যে মিলিয়ে দিয়েছেন। আল্লাহ যা করেন ভালোর জন্যই করেন। দেখবি, তুই খুব সুখী হবি আপি। অভ্র ভাইয়া তোকে অনেক সুখে রাখবে।”

এরমধ্যে পৃথুলার ফোন বেজে উঠল। প্রত্যাশা পৃথুলাকে ছেড়ে বলল,
“নিশ্চয়ই তোমার সাহেব তোমাকে ফোন করেছেন।”

বলতে বলতে বেডসাইড টেবিল থেকে ফোনটা হাতে নিল প্রত্যাশা। ফোনের স্ক্রিণে অভ্রর নাম দেখে স্মিত হেসে বলল,
“দেখলি তো আমি ঠিকই ধরেছিলাম। তোর উনি তোকে মিস করছেন। নে কথা বল।”
পৃথুলার হাতে মোবাইলটা দিয়ে বিছানায় গিয়ে শুয়ে পড়ল প্রত্যাশা।

“হ্যালো।”
ফোনের ওপাশ থেকে মিষ্টি রিনরিনে কণ্ঠটা শুনে বুকের মধ্যে এক অদ্ভুত প্রশান্তি ছড়িয়ে গেল অভ্রর। পৃথুলার কণ্ঠে মাদকতা আছে। পৃথুলার সাথে প্রথম কথা বলেই অভ্র আসক্ত হয়ে গেছে এই মাদকতায়। শুধু কণ্ঠে নয়, অভ্র আসক্ত হতে চায় পুরো পৃথুলাতে৷ এই আসক্তি কখনো যেন না কাটে!

কি দিয়ে কথা শুরু করবে ভেবে পেল না অভ্র। প্রথমেই জিজ্ঞেস করল,
“খেয়েছো?”
“হুম।”
“এখন কী করছো?”
“কিছু না।”
“আমি কি করছি জানতে চাইবে না?”
পৃথুলা জবাব দিল না। অভ্র নিজেই বলল,
“আমাদের এনগেইজমেন্টের ছবিগুলো দেখছি। এই ছবিগুলোই আজ আমার নির্ঘুম রাতের সঙ্গী হবে।”
পৃথুলা এবারও কিছু বলল না। অভ্র নিজেই আবার বলল,
“আজ তোমাকে দারুণ লাগছিল। হোয়াইট কালার ড্রেসে একদম অপ্সরীর মত লাগছিল। আমার তো চোখ ফেরানোই দায় হয়ে গিয়েছিল।”
পৃথুলা নিশ্চুপ। ওর সাড়া না পেয়ে অভ্র বলল,
“পৃথা..”

পৃথুলা চমকে উঠল। বিভোর মাঝেমাঝেই পৃথুলাকে পৃথা বলে ডাকত। বিভোরের মুখে পৃথা ডাক শুনতে ভীষন ভালো লাগতো তার। বিভোর ছাড়া আর কেউ ওকে কখনো পৃথা ডাকেনি।

পৃথুলার সাড়াশব্দ পেল না অভ্র। কেবল নিঃশ্বাসের শব্দটুকু ছাড়া।
“পৃথা শুনতে পাচ্ছো?”
পৃৃথুলার কান্না পাচ্ছে ভীষন। বিভোরের কথা মনে পড়লেই ওর কান্না পায়। ঢোক গিলে কান্না আটকাল পৃথুলা। নিজেকে যথাসম্ভব স্বাভাবিক রাখার চেষ্টা করল।
বলল,
“হুম বলুন।”
“কি ব্যাপার! আমি একা একাই বকবক করে যাচ্ছি। তুমি কিছু বলছ না যে?”
পৃথুলার এবার বিরক্ত লাগছে। কানের কাছে অভ্রর এইসব প্যানপ্যানানি ওর ভালো লাগছে না একদমই। তাই বলল,
“আমার ঘুম পাচ্ছে। ঘুমোব।”
“আগে বলবে না? আচ্ছা ঠিক আছে। ঘুমিয়ে পড়ো। কাল কথা হবে। শুভরাত্রি।”
পৃথুলা ফোন কেটে দিল। ছোট্ট একটা নিঃশ্বাস ফেলে আবার জানালার সাথে হেলান দিয়ে বাহিরে তাকালো।
.
দেখতে দেখতে দুটো দিন চলে গেল। এ দুদিনে বেশ কয়েকবার অভ্রর সাথে ফোনে কথা হয়েছে পৃথুলার। পৃথুলা নিজে থেকে কিছু বলেনি। অভ্রর কথার প্রত্তুত্যরে হু হা জবাব দিয়েছে৷ অভ্রর মায়ের সাথেও দুবার কথা হয়েছে। মহিলা খুবই ভদ্র এবং মিষ্টভাষী। অভ্রর বাবা কয়েকবছর আগে প্রয়াত হয়েছেন। অভ্ররা দু ভাই আর এক বোন। অভ্র, উৎস আর অর্থি। অভ্র সবার বড়। উৎস এবার মাস্টার্সে পড়ে, ইকনোমিক্স নিয়ে। আর অর্থি পড়ে ইন্টারমিডিয়েটে, সেকেণ্ড ইয়ারে।

এনগেইজমেন্টে দু ভাইবোনের কেউই থাকতে পারেনি। অর্থির কলেজে এক্সাম ছিল। আর উৎস’র কি একটা কাজ ছিল। উৎস’র সাথে কথা হয়নি পৃথুলার। তবে অর্থির সাথে এ দুদিনে অনেকবারই কথা হয়েছে। বলতে গেলে প্রতি ঘণ্টায় ঘণ্টায়ই ফোন করে মেয়েটা। ফোন দিয়েই ভাবি ভাবি করে পৃথুলার কান ঝালাপালা করে দেয়। তারপরেও পৃথুলার অর্থির সাথে কথা বলতে ভালো লাগে। ভীষন মিষ্টভাষী অর্থি মেয়েটা।
.
বাড়িজুড়ে বিয়ের তোড়জোড় চলছে। পৃথুলাদের ছোট্ট দু’তলা বাড়িটা সাজানো হয়েছে বিভিন্ন রঙ বেরঙের আর্টিফিশিয়াল ফুল দিয়ে। বাসাভর্তি মেহমান গিজগিজ করছে।
পৃথুলাকে একটা গাঁঢ় লাল রঙের বেনারসী শাড়ি পরানো হয়েছে। সাথে স্বর্ণ ও হীরের গহনা। ওর নিতম্ব সমান চুলগুলো খোঁপা করে তার উপর ফুলের গাজরা দিয়ে দিয়েছে।

পৃথুলা মেকআপ নিতে চায়নি। মেকআপ ওর কোনোকালেই পছন্দ ছিল না। চোখে কাজল, কপালে টিপ আর ঠোঁটে হালকা লিপস্টিক, পৃথুলার কাছে সাজ বলতে কেবল এটুকুই৷ তাও সবসময় না। বিভোর যখন সাজার জন্য খুব জোরাজুরি করত কেবল তখনই সাজত। কিন্তু আজ ওর বারণ কেউ শুনলো না। বিয়ের কনে বলে কথা! না চাইতেও হেভি মেকআপ নিতে হলো পৃথুলাকে।

একটু পরেই গুঞ্জন শুরু হলো ‘বর এসেছে।’ খানিক বাদেই একটা মিষ্টি চেহারার মেয়ে দৌড়ে এসে পৃথুলাকে জড়িয়ে ধরে টুপ করে গালে একখানা চুমু খেল। পৃথুলা ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেল।
মেয়েটি উচ্ছ্বসিত কণ্ঠে বলল,
“ওহ ভাবি, ইউ আর ঠু মাচ বিউটিফুল। ছবির চাইতে বাস্তবে তুমি অনেক অনেক বেশি কিউট।”

পৃথুলা বুঝল এটাই অর্থি, অভ্রর বোন। অর্থি ভীষণ প্রাণচঞ্চল ও চটপটে একটা মেয়ে। চেহারা অনেকটা অভ্রর চেহারার আদলে গড়া। দুজনের গায়ের রঙও এক, উজ্জল শ্যামলা বর্ণের। শ্যামলা হলেও দু ভাইবোনের মুখে সীমাহীন মায়া। আল্লাহ তা’আলা সমস্ত মায়া যেন কালো আর শ্যামলা মানুষের মধ্যেই ঢেলে দিয়েছেন।

প্রত্যাশা বলল,
“শুধুই কি ভাবির সাথে কথা বলবে? আমাদের সাথে কথা বলবে না?”
অর্থি ভ্রু কুঁচকে বলল,
“তুমি কে?”
“তোমার ভাইয়ের একমাত্র শ্যালিকা।”
“ও মাই গড! তাহলে তো আমরা বেয়ান। আসো হাগ করি।”

বলেই অর্থি পৃথুলাকে ছেড়ে প্রত্যাশাকে জড়িয়ে ধরল।
প্রত্যাশা জিজ্ঞেস করল,
“কী নাম তোমার?”
“অর্থি। তোমার?”
“প্রত্যাশা।”
“প্রত্যাশা, বাহ্ দারুন নাম তো। পৃথুলা-প্রত্যাশা দুটো নামই সুন্দর। তোমরা দেখতে যেমন কিউট তোমাদের নামগুলোও তেমন কিউট।”
“তুমিও তো অনেক কিউট।”
অর্থি মুখ কালো করে বলল,
“আমি তো কালো।”
“কালো কোথায়! তুমি তো শ্যামলা, উজ্জ্বল শ্যামলা।”
“ওই একই হলো। তোমাদের মত অতো ফর্সা তো না।”
প্রত্যাশা কিছু বলার আগে পৃথুলা বলল,
“ফর্সা দিয়ে কি করবে! ফর্সা হলেই সুন্দর হলো! তুমি জানো তোমার মুখে কত মায়া আছে! তুমিতো মায়াবতী। সুন্দরী মেয়েরা রূপবতী হলেও মায়াবতী হয় না একদমই৷ তুমি এমনিতেই কিউট! আর তোমার মুখের এই মায়াটা তোমাকে আরো কিউট বানিয়ে দিয়েছে।”
অর্থি দাঁত বের করে হেসে বলল,
“তাহলে তো অভ্র ভাইয়াও অনেক কিউট, তাইনা ভাবি?”

পৃথুলা থতমত খেয়ে গেল৷ অর্থিটা ইন্টার পড়ুয়া ছাত্রী হলেও ওর কথাগুলো একদম বাচ্চাদের মত। মেয়েটা দেখতেও বাচ্চা বাচ্চা। পৃথুলার জবাব না পেয়ে অর্থি আবারও একই প্রশ্ন করল। এবার প্রত্যাশা জবাব দিল।
“কিউট মানে! অনেক কিউট। আমার দুলাভাইয়ের মত হ্যাণ্ডসাম ছেলে আর আছে নাকি! তোমরা দুজনেই অনেক সুন্দর।”
অর্থি দু’হাতে প্রত্যাশার গাল টিপে দিয়ে বলল,
“তুমিও অনেএএএক কিউট। পৃথুলা ভাবিকে বড় ভাইয়ের বউ বানিয়েছি। তোমাকে ছোট ভাইয়ার বউ বানাব। কেমন?”
তারপরেই জিভ কেটে বলল,
“এইরে, আমি একাই ভাবির সাথে দেখা করতে আসছি। দাঁড়াও উৎস ভাইয়াকে ডেকে নিয়ে আসি।”

বলে ঝটপট রুম থেকে বেরিয়ে গেল অর্থি।
প্রত্যাশা হেসে পৃথুলাকে বলল,
“আপি, এই বকবকানি ম্যাডাম তো সারাক্ষন বকবক করে করে তোর কান ঝালাপালা করে দেবে।”
দু মিনিটের মাথায়ই একটা ছেলের হাত ধরে টেনে রুমে নিয়ে আসলো অর্থি। আর বলতে লাগল,
“ছবি পরে তুলবি। আগে ভাবির সাথে দেখা করবি। আমাদের ভাবিটা কি কিউট দেখ।”

সবাই চোখ তুলে তাকালো ওদের দিকে। উৎস’র পরনে খয়েরি রঙের পাঞ্জাবি-পাজামা। চুলগুলো ব্রাশ করা। গায়ের রঙ অভ্র আর অর্থির মত না। উৎস হয়েছে তার মায়ের মত। আঞ্জুমানের মত ধবধবে ফর্সা গায়ের রঙ উৎস’র। উৎস’র একটা বাঁকা দাঁত আছে৷ ওই দাঁতটার কারণে ওকে আরো বেশি কিউট লাগে।
.
চলবে___

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here