অমানিশা❤️ #লেখিকা_মালিহা_খান❤️ #পর্ব-১৪

0
129

#অমানিশা❤️
#লেখিকা_মালিহা_খান❤️
#পর্ব-১৪

সেদিন রাতে মাহতাব সাহেব ফিরতে বেশ দেরি করলেন। ঘড়ির কাঁটা রাত সাড়ে এগারোটার ঘর পেরিয়ে গেলো চোখের পলকে, তবু তিনি ফিরলেননা।
বারান্দার রেলিংয়ে ঝুঁকে দাড়িয়ে আছে মুনতাহা। যতটুকু দেখা যায় ততটুকুতেই চোখ বুলিয়ে যাচ্ছে চাতকের মতো। মুখে তার প্রকট উৎকন্ঠা, ভীত দৃষ্টি। চোখজুড়ে একটাই প্রশ্ন, “বাবা আসছেনা কেনো?”
আরশাদ দীর্ঘশ্বাস ফেললো। কোল থেকে ল্যাপটপ নামিয়ে বিছানা ছেড়ে মুনতাহার পাশে যেয়ে দাড়ালো। মুনতাহা ঘাড় ঘুরিয়ে দেখলো একবার। মূহুর্তেই একটা অসহায় চাহনীতে বুক কাঁপিয়ে আবার মনোযোগ দিলো রাস্তার কালো পিচে।
আরশাদ আবারো গোপনে একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়লো। মেয়েটা বাবাকে এতো ভালোবাসে।। এই যে বিয়ের পড়েও একটা দিন তার সাথে থাকেনি। তবু কিছু বলেনি। তার সাহস-ই হয়না কিছু বলার।
মাথায় হাত বুলিয়ে দিলো আরশাদ। বলল,

—“চলে আসবে মুনতাহা। হয়তো কোনো কাজে আটকে গিয়েছে।”

মুনতাহা মাথা ঝুঁকিয়ে ফেলল ধপ করে। ঠোঁট কামড়ে ধরে বলল,”কাজ থাকলে ফোন ধরছেনা কেনো?” এটুকু বলতেই চাপা স্বরে ডুঁকরে উঠল চিকন কন্ঠ। বাধা দিতে চোখ বুজে ফেলতেই কান্নাগুলো চিপড়ে চিপড়ে বের হয়ে গেলো যেনো। ঘন পাপড়ি ভিজলো। এক দু’ফোটা জায়গা করতে না পেরে গালেও গড়ালো। আরশাদ অস্হির হয়ে উঠলো,”আহা! এটুকুর জন্য কাঁদতে হয় নাকি? ফোন সাইলেন্ট হয়ে থাকতে পারে। শুনেননি হয়তোবা। চলে আসবে এক্ষুণি।”

মুনতাহা হেঁচকি তুললো। কান্না বাড়লো বই কমলোনা। আরশাদ জোর করে গাল ধরে মুখ তুললো। চোখ মোছালো। বলল,
—“আপনি ঘুমান যেয়ে। আংকেল আসলে আমি ডেকে দিবো। ঠি কাছে?”

মুনতাহা মাথা নাড়ায়। সে যাবেনা। আরশাদ অপ্রতিভ হয়ে বলে,”কি না?”

মুনতাহা হাতের পিঠে ঠোঁটের কাছে জমা হওয়া পানি মুছে। চোখের দিকে তাকিয়ে বলে,”ঘুমাবোনা।”

আরশাদ জোর করলোনা। করেওনি কখনো। মেয়েটার জোর নেয়ার অভ্যাস নেই ছোট থেকে। মাহতাব সাহেব বলেছিলেন সেদিন। তিনি কখনো জোর করেননি মেয়েকে। সে কেনো করবে?

রাত বারোটার পর যেয়ে একটা রিকশা ভিড়িলো গেটের কাছে। মুনতাহা তখনো ঠাঁই দাড়িয়ে আছে। আরশাদ একটু রুমে এসেছিলো ফোন নিতে। মুনতাহা হুড়মুড় করে ঢুকলো ভেতরে। বালিশের পাশে রাখা ওড়নাটা তুলে গায়ে জড়াতে জড়াতে বলল,”আব্বু এসেছে।”

আরশাদ হাসলো। যাক, অমাবস্যার অন্ধকার সরেছে চাঁদের মুখ থেকে। আলমারি খুলে পাতলা গেন্জি বের করতে করতে সে হাঁক ছাড়লো,
—“দাড়ান, আম্মারা ঘুমিয়ে পড়েছে। বাইরে অন্ধকার। আমি দিয়ে আসি।”

মুনতাহা শ্বাস আটকে অপেক্ষা করলো। আরশাদ দু’সেকেন্ডের মাথায় টি-শার্ট চাপিয়ে বেরোলো তাকে নিয়ে। মাহতাব সাহেব সিঁড়ি বেয়ে উঠছিলেন। আরশাদ দরজা খুললো তখনই। সিঁড়ির লাইট জ্বালানো নেই। মুনতাহা বেরিয়ে দাড়ালো অন্ধকারেই। মাহতাব সাহেব উঠেই হাত বাড়িয়ে বুকে টেনে নিলেন তাকে। মাথায় ছোট্ট একটা চুমু খেয়ে পাশে দাড়িয়ে থাকা আরশাদকে বললেন,”কান্না করেছে?”

আরশাদ মুখে কিছু বললোনা। তবে চোখের ইশারায় মৃদু মাথা দুলালো। মাহতাব সাহেব বুঝলেন, মেয়ে কেঁদেছে। হায় আল্লাহ! মেয়েটা একটু সময় থাকতে পারেনা তাকে ছাড়া। এতদিন কিভাবে থাকবে?

আরশাদ বসে আছে সোফায়। মাহতাব সাহেব বসতে বলেছেন। কি জরুরি কথা বলবেন। মুনতাহা ঘরে গেছে। দরজা ভেজানো। আরশাদ একবার বন্ধ দরজায় চোখ বুলিয়ে টেবিলে তাকালো। খাবার দাবার সব সাজিয়ে ঘরে গিয়েছে। সবদিকে খেয়াল থাকে এতটুকু মেয়ের।
মাহতাব সাহেব হাত মুখ ধুয়ে আসলেন। সোফায় বসতেই আরশাদ বলল,
—“আপনি খেয়ে আসেন আংকেল। আমি অপেক্ষা করছি। সমস্যা নেই।”

—“না, ঠি কাছে। রাত হয়েছে। অনেকক্ষণ যাবত বসে আছ।” আরশাদ দিরুক্তি করলোনা। মাহতাব সাহেব একটু সময় নিয়ে আবার বলতে শুরু করলেন,
—“যেটা বলছিলাম আরকি। আমার একটু ঢাকার বাহিরে যেতে হবে বাবা। অবশ্য একটু বললে ভুল, যেতে হবে প্রায় সাতদিনের জন্য। আগে কখনো এতদিন কোথাও থাকিনি। হয়তো গিয়েছি, দু’ একদিনে কাজ সেড়েই চলে এসেছি। কারণটা জানোই, মুন একা থাকতে ভয় পায়। খুব বেশি জরুরি না হলে আমি কোথাও থাকিনা। কিন্তু এবার ব্যাপারটা একটু জটিল। তবু তুমি না থাকলে হয়তো আমি দ্বিতীয়বার ভেবে দেখতাম, হয়তোবা শেষমেষ যেতামও না। কিন্তু তুমি থাকায় চিন্তাটা একটু কম। মুন তো প্রায় সময়ই তোমার আম্মার কাছে থাকে, ওর তেমন সমস্যা হবার কথা নয়। তাই বলছি, এই সাতটা দিন ও তোমার কাছে থাকুক। একা খুব ভয় পায়তো রাতে।”

আরশাদ বিনীত ভঙ্গিতে মাথা নাড়ালো। ছোট্ট করে বলল,”আচ্ছা ঠি কাছে আংকেল। আপনি চিন্তা করবেননা।”

মুনতাহা বেরিয়ে এলো তখনই। পরণে কামিজটা বদলে এসেছে। দুপাশে ঝুলছে লম্বা দুই বেণি। আরশাদ হাসলো মনে মনে। মেয়েটা সবসময় পরিপাটি হয়ে ঘুমায়। গুছিয়ে গুছিয়ে চুল বাঁধে। পাতলা আরামদায়ক জামা পরে। সবতেই যেনো পরিচ্ছন্নতা।
মুনতাহা স্বভাবতই প্রশ্ন ছুঁড়ল,”আব্বু খাওনি?”

মাহতাব সাহেব ছোট্ট করে বললেন,”এখানে আয়। বস।”

সবটা শুনতেই মুখটা শুকিয়ে গেলো মুনতাহার। কন্ঠে স্পষ্ট মন খারাপের আভাস নিয়ে বলল,”কেনো? তুমি কেনো যাবে?”

—“কাজ আছে আম্মা। আচ্ছা, তুই মানা করলে যাবোনা।”

মুনতাহা চুপসে গেলো। মন খারাপ হলেও ঠেলেঠুলে বললো,”না যেও। আমি থাকতে পারবো।”

—“আরশাদের কথা শুনবি। কেমন?”

আরশাদ চেয়ে আছে তার মুখের দিকেই। মুনতাহা মাথা কাত করলো। অর্থ্যাৎ,”সে শুনবে।”

[কাল বিকেলেই পর্ব দিবো।]

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here