একটু_একটু_ভালোবাসি পর্ব ১৬

0
3171

#একটু_একটু_ভালোবাসি
#পর্বঃ১৬
লেখিকাঃ #শাদিয়া_চৌধুরী_নোন

সেদিন থেকে সিরাত অনেক পাল্টে গেলো। কথায় কথায় উপচে পড়া হাসি, অনর্গল কথা বলা, হালকা খুনশুঁটি এইসব ছাড়াও আরও ছোটখাটো ব্যাপার বেশ লক্ষনীয়। আগে সাবিরের কল দেখলেই এড়িয়ে যেতো কিন্তু এখন সারাদিন সাবিরের কলের অপেক্ষায় থাকে। সাবিরের কথা বলার ধরণ, হাসি, প্রতিটা কথায় রাত!রাত শব্দ উচ্চারণ করা সবকিছু সিরাত লক্ষ্য করে। কথার মাঝে হুট করে সাবির যখন বলে, ‘রাত! ভালোবাসি। প্লিজ আমাকেও একটু একটু ভালোবাসো’, সিরাত তখন লজ্জায় হাজারবার মরে যায়। সাবিরকে তার অদ্ভুত ভালো লাগে। মাঝেমধ্যে মনে হয়, ভীনদেশী কোনো প্রাণীর সাথে তার ভুল করে পরিচয় হয়ে গেলো। আগে মনে হতো, এই পৃথিবীতে সিরাত কিচ্ছু না। তার কোনো মূল্যই নেই। সে মরে গেছে, বেঁচে আছে এতে কারো কিছু যায় আসে না। এই জীবন সংসারে তার কোনো অবদানই নেই। এইসব বিষয় নিয়ে হুট করে তার মন খারাপ হতো। কিন্তু এখন মনে হয়, সে কারো কাছে খুব বিশেষ কেউ। ভীষণ স্পেশাল সে সাবিরের কাছে। তার মন খারাপে সাবিরের মন খারাপ হয়, হাসলে সাবিরের নিষ্পলক তাকিয়ে থাকা, খুঁটিনাটি বিষয়ে খেয়াল রাখা সবকিছু! সবকিছুই মনে করিয়ে দেয়, এই পৃথিবীতে তারও মূল্য আছে। নিজস্ব পৃথিবীর বাইরে কেউ তাকে খুব করে চাই। সেই ভুল করে পরিচিত হওয়া ভীনদেশী প্রাণীটা তাকে আস্তে আস্তে জীবনের মানে শেখাচ্ছে। শেখাচ্ছে, কীভাবে একটু একটু ভালোবাসতে হয়। পৃথিবীতে সব মানুষই কেউ কারো না কারো কাছে খুব স্পেশাল। শুধু সঠিক মানুষকে নির্বাচন করতে জানতে হয়। একে অন্যকে সময় দিয়ে দু’টো পৃথিবীকে একে রূপান্তর করে জীবনকে উপভোগ করতে। এইতো সেদিনের কথা, রাতে ব্যালকনিতে দাঁড়িয়ে সিরাত সাবিরের সাথে কথা বলছিলো। এমন সব কথা যার কোনো মানেই হয় না। কিন্তু এই সাধারণ কথাগুলোর দ্বারাই এক অদৃশ্য কঠিন মায়াজালে সিরাত আটকা পড়ছিলো। কথা বলার মাঝেই সাবির হুট করে বললো,
—– রাত! দেখো আমার আকাশে এক মস্ত বড় চাঁদ উঠেছে। একটা গোলাকার থালার মতো ইয়া বড় চাঁদ। তার আশেপাশে কয়েকটা মেঘ চাঁদটাকে আড়াল করার চেষ্টা করছে। আরো অনেক তারা ঝিকিমিকি করছে। তোমার আকাশেও এমন হচ্ছে রাত?

সিরাত সাবিরের কথায় ভ্রু কুঁচকে ফেললো। মানে? আমার আকাশ-তোমার আকাশ মানে কি? আকাশ আবার দুটো হয় নাকি? কিসব আজগুবি কথা! কৌতূহল দমন করতে না পেরে সে প্রশ্নটা করেই ফেললো,
—- আকাশ তো একটা তাইনা? চাঁদও একটা। তাহলে আমার আর আপনার হবে কেনো? এগুলো তো সবার, সব মানুষের।

সাবির খুব হাসলো এমন কথা শুনে। তারপর নরম কণ্ঠে বললো,
—- ভেবে নিতে দোষ কি বলো? ধরে নাও, তোমার সামনে যে আকাশটা দেখছো ওটা তোমার আর আমার সামনে যে আকাশ আছে, এটা আমার। হয়ে গেলো না, তোমার আর আমার আকাশ? খুব কি ক্ষতি হয়ে যাবে এটা ভাবলে?

সিরাত ভাবতে লাগলো। আমার আকাশ! শুধুই আমার! এই চাঁদ আমার। ঐ তারা আমার। আমার আকাশে চাঁদ উঠেছে। আমার আকাশে মেঘও আছে। সত্যি তো! ভেবে নিতে দোষের কিছু নেই। অদ্ভুত ভালো লাগে।

সাবিরের প্রতি ভালোলাগাটা দিনদিন যেন বেড়েই চলেছে। সাবিরের সাথে কথা বললে সময়গুলো হুট করে শেষ হয়ে যায়। কখন যে সময়গুলো পালিয়ে যায় ঠাহর করতে পারে না সিরাত। তার মা-বাবাও সাবির বলতে পাগল। সাবির পুরো পরিবারকে শপিং করে দিয়েছে কিছুদিন আগে। তারা যখন সাবিরের নাম করে, সিরাত কান লাগিয়ে শোনার চেষ্টা করে। এমন একটা ছেলেকে কার-না ভালো লাগে! কিন্তু বিয়ের কথা মনে পড়লেই লজ্জায় আটখানা হয়ে যায়। উফফ! বিয়ের পর কি হবে? সাবির তো অনেককিছু বলে। তখন তো একসাথে থাকতে হবে। এসব ভাবলে সিরাতের গাল বাদে কান পর্যন্ত গরম হয়ে যায়। সাবির প্রায়ই বলে,
— এতো লজ্জা কোথা থেকে আসে তোমার? এই লজ্জার গোপন রহস্য কি বলোতো? তোমার এই লজ্জার কারণে আমার ভবিষ্যৎ অন্ধকার দেখছি৷
সিরাতের লজ্জা তখন আরও কয়েক গুণ বেড়ে যায়।

এইযে, আজ সকালে সাবির সিরাতের মা-বাবার কাছ থেকে অনুমতি নিয়ে বাইরে ঘুরতে বের হবে এটা নিয়েও সিরাত লজ্জা পেলো। ছিহ্! ছিহ্! বাবা কি ভাবলো? মা কি ভাবছে! তানিশা আন্টি তো আজ আমাকে প্রশ্ন করতে করতে শহীদ হয়ে যাবে। এতো লজ্জার মাঝেও সিরাত সাবিরের কাছে একটা আবদার করলো। ফোন করে মিষ্টি কণ্ঠে বললো,
—– শুনুন না! আমি না কোনোদিন বাইকে চড়িনি। আপনার বাইক আছে? থাকলে আজ আমরা বাইকে যাবো ঠিক আছে?

সাবির না করলো না। সিরাতের আবদার রেখে একটা বাইক নিয়ে হাজির হলো। সিরাত কখনো ভাবতে পারেনি, তার জীবনেও এমন সুন্দর কিছু মুহূর্ত অপেক্ষা করছিল। তাকেও কেউ এতোটা গুরুত্ব দেবে। বাইকে চড়ার স্বপ্নটা আজ পূরণ হলো। হাজারো অস্বস্তি নিয়ে সে কাঁধের ব্যাগটাকে তাদের মাঝখান বরাবর রাখলো। তারপর দুইপা সমান করে সাবিরের পেছনে বসলো।
তখন খেয়াল করলো, তার হাত থরথর করে কাঁপছে। এ কেমন অনুভূতি! এ কেমন ভালোলাগা! সামনের মানুষটা কি সত্যিই এতো ভালো? সিরাত বাইকের গ্লাসে স্পষ্ট লক্ষ্য করলো, সে যখন সাবিরের কাঁধে হাত রাখলো, সাবিরের চিবুক কাঁপছিল। বারবার ঠোঁট ভিজিয়ে চোখ বন্ধ করে বিড়বিড় করে কি যেন বলছে আর বড় বড় নিঃশ্বাস ফেলছে। এসবের মানে সিরাত জানে না। কিন্তু সাবির তো জানে! তার স্বপ্ন প্রেয়সী আজ নিজ থেকে ভরসা করে তার কাঁধে হাত রাখলো। তার পাশে বসলো। শুধুমাত্র সে-ই জানে, তার মনে কেমন করে উথাল-পাতাল করছে। প্রেয়সীর মন জেতা, একটুখানি অধিকার পাওয়াটাও প্রেমিকের অনেক বড় জয়।
সেদিন সাবিরের অস্থিরতা সিরাত টের পেলো আরো কিছুক্ষণ পর। যখন সাবির কাউকে কল করতে পকেটে হাত দিলো, মোবাইলের বদলে বেরিয়ে এলো টিভির রিমোট। অন্য পকেটে হাত দিতেই বেরিয়ে এলো চাবির রিংয়ের জায়গায় বেরিয়ে এলো ইনহেলার। টাকা ছাড়া শূন্য মানিব্যাগ নিয়ে সে চলে এসেছে। এতকিছুর পর তার মুখটা দেখার মতো হলো। রাগ নিয়ে পানি খেতে গিয়ে পুরো গলা থেকে বুক পর্যন্ত ভিজিয়ে ফেললো। গলায় পানি আটকে কাশতে কাশতে হাঁপানি রোগীর মতো অবস্থা হলো। সাবির নিজেকে গালি দিলো না। কিন্তু নিজের বোকামির জন্য হালকা হাসলো। অনুভব করলো, সিরাত তার জীবনে খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এই মেয়ের কথা ভাবতে ভাবতে, দেখার করবে বলে উত্তেজনায়, সে আজ এতোগুলো ভুল একসাথে করে ফেললো। অন্যদিকে সাবিরের এহেন কান্ডে সিরাত অবাক চোখে তাকিয়ে রইলো। একে পাগল না বলে আর কাকে বলবে সে? বলেই ফেললো,
—- আপনি আসলেই একটা পাগল।

সাবির মাথার চুলগুলোকে হাত দিয়ে নেড়েচেড়ে বিড়বিড় করলো,
—- যদি তুমি জানতে রাত! যদি একটু বুঝতে……

#চলবে

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here