তুমিহীনা_আমি_যে_শূন্য #Nushaiba_Jannat_Arha #পর্ব ১৫

0
417

#তুমিহীনা_আমি_যে_শূন্য
#Nushaiba_Jannat_Arha
#পর্ব ১৫

আভানের কথা শুনে চোখে পানি টলমল করছে আরহার। যেন এখনই টুপ করে গড়িয়ে পড়বে নোনা জল। আভান ছোটবেলাতেই সব হারিয়েছে, একাকিত্বে ভুগেছে, এতো স্ট্রাগেল করে বড় হয়েছে। এসব ভাবতে ভাবতেই কখন যে আরহার চোখ দিয়ে নোনা জল গড়িয়ে পড়েছে তা সে নিজেও জানেনা। তখনই পাশ দিয়ে আভান বলে উঠল

– এতো ইমোশনাল হলে চলে আরহা? তুমি এতোটুকু শুনেই কেদে বুক ভাসাচ্ছ। পুরোটা শুনলে কি করতে?

আরহা অবাক হয়ে চেয়ে রয় আভানের মুখ পানে। এতো বড় একটা ব্যপারকে আভান এতোটুকু বলছে আর পুরাটা শোনা মানে? কি বলছে কি আভান? এতোকিছুর পরও আভান এতো স্বাভাবিকই বা কিভাবে? আরহা হা করে আভানের দিকে তাকিয়ে এসব ভাবছে। আরহাকে এমন করে তাকাতে দেখে আভান মিটিমিটি হাসল। আরহার মুখের সামনে তুড়ি বাজাতেই চমকে উঠল সে। আভানকে একবার পরখ করে নিয়ে আরহা বলল

– আর জানি কি একটা বলতে গিয়ে থেমে গেলেন?

– কি বলবো?

– ঐ যে পুরো কাহিনী।

– না, আজ বলবো না সব, পরে কোনো একদিন বলবো। সব একসাথে বলা যায় না। যেদিন সব বলবো তোমায় হতে পারে সেদিনই আমার শেষদিন।

– শেষদিন মানে? আপনার কথা ঠিক বুঝলাম না আমি।

– ও তোমার বুঝতে হবে না, যখন বোঝার তখন বুঝবে।

আরহা আর এ বিষয় নিয়ে কথা বাড়ালো না। আভানও বললো না কিছু। কিছুক্ষণ চুপ থেকে দ্বিধা দ্বন্দ্ব নিয়ে আরহা আভানের উদ্দেশ্যে বলল

– আমি একটা কথা বলবো আপনাকে? রাগ করবেন না তো?

– আমায় দেখলে কি তোমার রাগী মনে হয়?

– না তা না, মানে…

– ও তো মানে মানে না করে বলো কি বলবা।

এবার আরহা চোখ বন্ধ করে কোনো ভঙিতা ছাড়া একবারেই বলে ফেলল

– আমি আপনাকে ভালোবাসি, আভান।

আভান শুনে হতভম্বের ন্যায় তাকিয়ে আছে আরহার দিকে। যখন বোধগম্য হলো আরহা কি বলেছে তখন কাশতে শুরু করল আভান। কাশতে কাশতে বেচারার কাহিল অবস্থা। এটা দেখে দ্রুত আরহার ব্যাগ থেকে পানির বোতল বের করে এগিয়ে দিল আভানের কাছে। পানিটা খেয়েই শান্ত হয়ে আভান বলল

– তোমার মাথা ঠিক আছে তো, আরহা? শরীর টরীর খারাপ নাকি? নাকি রাতে ঘুম হয়নি তোমার?

– আমি ঠিক আছি।

– তুমি যা বলছো ভেবে বলছো তো?

– একদম যা বলেছি ভেবেই বলেছি আমি।

– তুমি কিন্তু আমার ব্যাপারে কিছুই জানো না আরহা। শুধু শুধু নিজের সুন্দর জীবনটাকে নষ্ট করো না, আমার সাথে নিজের জীবনটাকে জড়িয়ে।

– কেন আপনি ভুত না আত্মা যে আমার জীবন ধ্বংস হয়ে যাবে?

– আমি সেইটা বলিনি আরহা। তুমি কোনো দিনও আমার সাথে ভালো থাকবা না। যার জীবনের কোনো ভবিষ্যতই নেই তার জীবনের সাথে কেন তোমার জীবন জড়াবে?

– আপনি এভাবে কেন বলছেন? আমি কি দেখতে এতোটাই খারাপ যে আপনি আমায় ইনডিরেক্টলি রিজেক্ট করছেন।

– তুমি কেন বুঝতে চাইছো না আরহা। আমি চাই না তোমার জীবনটা অন্ধকারে তলিয়ে যাক। আমি ঠিক এই কারণে তোমার সাথে কথা বলতাম না। কিন্তু পরিস্থিতি সব ওলোট পালোট করে দিল।

– তার মানে আপনি আমায় পছন্দ করেননা? আপনি আমার সাথে পরিস্থিতির চাপে পড়ে কথা বলেছেন?

বলার সময় আরহার চোখ দিয়ে টপটপ করে নোনাজল গড়িয়ে পড়ল। এটা দেখে আভানের খারাপ লাগল। সে চাইলেও যে মনের কথাটা বলতে পারছে না আরহাকে। তারপরও আরহার দিকে তাকিয়ে আর মনের মাঝে চেপে রাখতে না পেরে চোখ বন্ধ করে অবশেষে বলেই দিল আভান।

– আরহা, আমি তোমায় অনেক আগে থেকেই পছন্দ করতাম। ভালো লাগত তোমায় আমার।

– সত্যিই আপনিও আমায় ভালোবাসেন।

– ভালোবাসা কি জিনিস আমি জানিনা। কারণ তা আমার জীবনে কখনোই আসেনি, পাওয়ার আগেই তো সব শেষ।

– এভাবে বলবেন না আভান। অতীতকে ভুলে বর্তমান নিয়ে ভাবুন। কিন্তু এটা তো মানতেই হবে আপনার আমায় ভালো লাগে। ভালোবাসতেও সময় লাগবে না।

– ভালোবাসাতে পারি কিন্তু একটা শর্তে।

– কি শর্ত?

– আজ থেকে কোনো ছেলের দিকে ফিরেও তাকাবে না। কথাও বলবে না কারও সাথে। আমি ছোটবেলা থেকে একা একা মানুষ হয়েছি তো তাই আমি একটু হিংসুটে টাইপস্ আরকি। আমি চাই না আমার ভালোবাসার ভাগ কাউকে দিতে। তোমায় যদি আমি কারও সাথে দেখি তাহলে কিন্তু আমার থেকে খারাপ কেউ হবে না। মাইণ্ড ইট। ( প্রথম কথাগুলো ফান করে বললেও শেষ কথা গুলো বেশ করা গলায় বলল আভান)

– এ বাবা আপনি তো দেখি ভীষণ কড়া আর রাগী, আমি পালাই এখান থেকে। ( মজা করেই বলল আরহা)

– আগেই বলেছিলাম আমি। এখনও সময় আছে ভেবে দেখো।

– আরে না না আমি তো এমনিই মজা করেছিলাম। আমি আপনার শর্তে রাজি। আর কি কোনো শর্ত আছে?

– আপাতত এখন আর নেই। প্রয়োজনে নতুন শর্ত যুক্তও হতে পারে।

– বাবাহ্ কি কড়া মানুষের প্রেমে পড়লাম রে। আপনি এতো কড়া দেখলে বোঝা যায়না।

– দেখো এবার কেমন লাগে, নিজে থেকে সেধে এসেছ আমার কাছে, আমি কিন্তু আসিনি।

– আচ্ছা আজ আসি, আবার দেখা হবে।

প্রতিত্তোরে আভান শুধু হাসল আর কিছু বলল না।

এভাবেই চলতে থাকল, সবকিছু ঠিকঠিকই চলছিল ওদের মধ্যে। প্রতিদিন আভানের সাথে আড্ডা দিত আরহা। সত্যিই আভান অনেক ভালো আরহার দৃষ্টিতে। আর আভানের দেওয়া শর্ত মতোই চলতে থাকল আরহা। এভাবে দেখতে দেখতে কেটে গেল একটি মাস। এই একটি মাস খুব ভালো ভাবেই কেটেছে আরহা এবং আভান দুজনেরই। একটি মাস যে কিভাবে কেটে গেল তা ওরা নিজেরাও জানে না যেন এক সপ্তাহের ন্যায়।

———————-

আজ আরহা খুব সুন্দর করে সেজেছে। দেখতে খুব মিষ্টি লাগছে আরহাকে। সে আজ সেজেছে তার মনের মানুষের জন্য। যাক অবশেষে আরহার এক মাস আগের প্ল্যান আজ সাকসেসফুল হতে যাচ্ছে। সেদিন আরহা আরিশাকে এটাই বলেছিল। যাওয়ার আগে আরিশাকে ফোন দিল আরহা। তবে এবার আগের মতো ঠাট্টা করল না আরিশা। আনন্দের সুরে বলল

– বেস্ট অফ ল্যাক দোস্ত।

– আচ্ছা, আসি রে দেরি হয়ে যাচ্ছে। বাই।

– আচ্ছা বাই। বলেই ফোনটা কেটে দিল আরহা।

যাওয়ার আগে আয়নায় নিজেকে একবার পরখ করে নিল, নিজেকে দেখে নিজেই ফিদা হয়ে গেল সে। হাতে আরহার মায়ের দেওয়া একটা সুন্দর ব্রেসলেট পড়ে নিল। একজোড়া তাজা লাল গোলাপ ফুল হাতে নিয়ে কলেজের উদ্দেশ্যে রওয়ানা দিল আরহা।

কলেজে গিয়েই আরহা খুঁজতে লাগল আভানকে। আরহা আভানকে আজ তাড়াতাড়ি কলেজে আসতে বলেছিল ফোনে। আভান জানতে চাইলে আরহা বলেছিল একটা সারপ্রাইজ দিবে। সারপ্রাইজের কথা শুনে আভান বেশ খুশি হয়েছিল। এতো কিছুর পরও আভানের দেখা নেই। আরহা তাই মনে মনে রাগ নিয়ে বলল

– সব বদলে গেলেও এই আভান কোনোদিনও বদলাবে না। একটু তাড়াতাড়ি আসলে কি এমন হয়। সারাজীবনই লেট করেই যাবে। মহাশয়কে জিজ্ঞেস করলেই বলবে গুরুত্বপূর্ণ কাজ ছিল। এছাড়া আর কি বলার আছে তার। ফালতু একটা। কুমড়ো পটাস। ঢেরশ।

মনে মনে এসব বলে একা একাই হাসছিল আরহা। তখনই একটা ছেলে (আরহার মতোই বয়স) এসে আরহাকে বলল

– এক্সকিউজ মি, বলছিলাম কি আপনার সাথে একটু কথা ছিল?

– জ্বি বলুন।

– আপনি কি ফার্স্ট ইয়ারে পড়েন?

– হ্যাঁ।

– ওহ আমিও ফার্ট ইয়ারে পড়ি, আমি আজ নতুন ভর্তি হয়েছি তো, বাবা ট্রান্সফার হয়ে এখানে এসেছে, তাই এখানের কলেজেই ভর্তি করিয়ে দিয়েছে।

– ওহ।

– দেখে তো মনে হচ্ছে কারও জন্য অপেক্ষা করছেন।

– আপনার কথা বলা শেষ। শেষ হলে এখন আসতে পারেন।

– না মানে, বলছিলাম কি আমাদের নাকি পরীক্ষার ডেট দিয়েছে সামনের মাসে? জানেন আপনি?

– কই না তো। আমি তো জানি না। আর কি পরীক্ষা? কখন কি কিছুই তো জানি না আমি।

– আমায় আমার এক বন্ধু বলেছিল পরীক্ষার কথা। এনিওয়েস টেনশন নিতে হবে না।

আরহার হাতের ব্রেসলেট দেখে ছেলেটি বলল

– ওয়াও আপনার হাতের ব্রেসলেটটা তো অনেক সুন্দর, আপনার হাতও কিন্তু কম সুন্দর না।

প্রতিত্তোরে আরহা কোনো কথা বলল না। সৌজন্যতার খাতিরে শুধু জোরপূর্বক একটা হাসি দিল।

হঠাৎই ছেলেটা আরহার হাত ধরে বসল। এতে আরহা চমকে উঠল। রাগী কণ্ঠে ধমক দিয়ে বলল

– ছাড়ুন বলছি আমার হাত। এটা কোন ধরনের অসভ্যতা।

– না মানে আপনার হাতে ব্রেসলেটটা খুব সুন্দর। তাই দেখছিলাম আরকি। ( ছেলেটা খারাপ দৃষ্টিতে তাকিয়ে ছিল আরহার দিকে)।

এসবই দূর থেকে দেখছিল আভান। আরহার জন্য একটা আংটি আর পায়েল আনতে গিয়ে দেরি হয়ে গিয়েছে আভানের। অনেক খুঁজে নিজের মন মতো জিনিস পেল। আরহা যখন বলেছিল আভানকে সারপ্রাইজ দিবে তখনই মনে মনে ঠিক করে রেখেছিল আরহাকেও সারপ্রাইজ দিবে সে। কিন্তু এসে তো অন্য কিছু দেখবে এটা কল্পনারও বাইরে ছিল আভানের। অন্য কেউ আরহার হাত ধরায়, আরহার হাসায় আর আরহার তার শর্ত অমান্য করায় আর সবচেয়ে বড় কথা ছেলেটা আরহার দিকে খারাপ দৃষ্টিতে তাকাচ্ছে দেখে প্রচণ্ড পরিমাণে রেগে গেল সে। সে সব কিছুর ভাগ দিতে রাজি কিন্তু ভালোবাসার ভাগ দিতে নয়। রাগে তার শরীর থরথর কাপতে লাগল। ফর্সা মুখ রক্তিম বর্ণ ধারণ করল। হাত মুষ্টিবদ্ধ করে এগিয়ে গেল আরহার কাছে। আজ আরহাকে কঠিন শাস্তি পেতে হবে। আর তারপরই….

#চলবে ~

আর তারপর কি হয়েছে তা তো সবাই-ই জানেন, প্রথম পর্বেই দেওয়া আছে। আজকের পর্বেই অতীত শেষ হলো। এর পরবর্তী পর্ব থেকে বর্তমান শুরু হবে ইনশাআল্লাহ। আর গল্পটা হয়তো বেশি বড় করবো না, আমার সামনে half yearly exam.. তাই দ্রুতই শেষ করে দিবো।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here