তুমিহীনা_আমি_যে_শূন্য #Nushaiba_Jannat_Arha #পর্ব ২০

0
384

#তুমিহীনা_আমি_যে_শূন্য
#Nushaiba_Jannat_Arha
#পর্ব ২০

সময় চিরবহমান। সে চলতে থাকে তার আপন গতিতে। দেখতে দেখতে কেটে গেল প্রায় এক একটি সপ্তাহ। সেদিনের পরে আজ এক সপ্তাহ হয়ে গেল আভান একবারের জন্যও আরহাকে ফোন দিয়ে তার কোনো খোঁজ নেয়নি। একবারের জন্য আরহাকে ফোন দেওয়ারও প্রয়োজন অনুভব করল না আভান।

আরহা আভানের উপর রাগ করে থাকলেও তাকে যে চিরজীবনের জন্য ভুলে থাকবে এটা কখনোই সম্ভব নয়। হয়তো উপর উপর দেখাচ্ছে কিন্তু ভেতর ভেতর সে কষ্টে জর্জরিত। কেন জানি শূন্য শূন্য লাগছে নিজেকে আরহার কাছে। এ কষ্টের কথা না কাওকে বলা যায় আর না সহ্য করা যায়।

আনমনে জানালার পাশে বসেছিল আরহা। এ কদিন ধরে আরহাকে ভীষণ মন মরা লাগছে। কারো সাথে একান্ত প্রয়োজন ছাড়া কথা বলে না আরহা।
.
.
আজ সকাল থেকেই আরহাকে দেখে আরহার মা মুচকি মুচকি হাসছেন। সেই সাথে আরহার ভাই ইহসানও। তবে কিছু বলছে না তারা। আরহা মন মরা থাকলেও এ জিনিসটা লক্ষ্য করল। তবে বুঝতে পারছে না কি হয়েছে আসলে।

আরহা নিজের রুমের বিছানায় বসেছিল এমন সময় আরহার মায়ের আগমন ঘটল। মুচকি হেসে আরহার কাছে এসে পরম যত্নে মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে দিতে আদুরে কণ্ঠে বলল

– আমার সোনা মামনি টাকে আজ কতো সুন্দর লাগছে। মাশাআল্লাহ।

আজ হঠাৎ মায়ের কাছে এমন কথা শুনে বেশ অবাক হলো আরহা। আরহাকে অবাক হতে দেখে আরও এক দফা হাসলেন তিনি। তবে মুখে কিছু প্রকাশ করছেন না। আরহা অবাক কণ্ঠে তার মাকে বলল

– আচ্ছা আম্মু কি হয়েছে বলো তো, আজ সকাল থেকে তোমাকে আর ভাইয়াকে মুচকি মুচকি হাসতে দেখছি আমায় দেখে। বলো তো আসল ব্যাপারটা কি?

– সময় হলেই বুঝতে পারবে মা। এখন ওতো বুঝতে হবে না তোমায়। এখন আসো তো আমাকে একটু রান্নায় হেল্প করো।

– আচ্ছা।

আরহার মা চলেই যাচ্ছিলেন তবে কিছু একটা ভেবে থমকে গেলেন। পিছন ফিরে তিনি বললেন

– আরহা, মা আমার সন্ধ্যার সময় একটু রেডি হয়ে নিস তো মা।

– কিন্তু কেন আম্মু? কোথাও কি ঘুরতে যাবে?

– না কোথাও ঘুরতে যাব না।

– তাহলে হঠাৎ সাজতে বলছো যে?

অনেক ভেবে তিনি বললেন

– আসলে আজ বাসায় মেহমান আসবে। আর হ্যাঁ এখন আর কোনো প্রশ্ন নয় যা বললাম তাও করবে কেমন। এমন একটু কিচেনে আসো।

আরহা আর কোনো কথা বাড়াল না, প্রতিত্তোরে শুধু হ্যাঁ সুচক মাথা নাড়াল।
.
.
রান্নাঘরে আজ প্রচুর কাজ। মাকে হেল্প করতে গিয়ে যেন হাপিয়ে উঠেছে আরহা। আরহাও টুকটাক রান্না করল। ভালোই রান্না করতে পারে সে। ওর রান্নার হাত ভীষণ ভালো। সব দিক দিয়েই পারফেক্ট সে। তবে একটা জিনিস বুঝতে পারল না সে কোন মেহমান আসছে বাসায় আর কোন মেহমানের জন্যই বা এতো আয়োজন। কই এতো আয়োজন তো কখনোই আরহার মা করেনি। আরহা মা একজন অমায়িক মহিলা, তিনি আতিথেয়তার কোনো কমতি রাখেন না, কিন্তু তাই বলে এতো আয়োজন! এসবে অবাক না হয়ে পারছে না আরহা। তবুও এসব ভাবনায় মন না দিয়ে নিজের কাজে মন দিল সে।

রান্না শেষে নিজের রুমে রেস্ট নিতে গেল আরহা। গরমে ঘেমে নেয়ে একশা। তাই ফ্রেশ হতে গেল ওয়াশরুমে। ওয়াশরুম দিয়ে বেরিয়ে বিছানায় হেলান দিয়ে বসে বই পড়ছিল। বই পড়তে পড়তে চোখটা লেগে এলো খানিকটা। তখনই আরহার মা এসে আরহার মাথায় হাত বুলিয়ে বললেন

– আরহা, এই আরহা। ওঠ মা আমার।

মায়ের ডাকে ধরফরিয়ে উঠল আরহা। ঘুম ঘুম কণ্ঠে বলল

– কি হয়েছে আম্মু, ডাকছো কেন?

– তাড়াতাড়ি রেডি হয়ে নে, মেহমানরা চলে এসেছে।

– মেহমানের সাথে আমার রেডি হওয়ার কি সম্পর্ক? তুমি আপ্যায়ন করো। আমাকে একটু ঘুমাতে দাও। আমার ভালো লাগছে না।

– যা বলছি তাই কর, দ্রুত রেডি হয়ে নে। আমি গেলাম ১০ মিনিট টাইম দিলাম। ১০ মিনিটের মধ্যে নিচে আসবে।

– আচ্ছা, তুমি যাও আমি আসছি। ( গাল ফুলিয়ে বলল কথাটা)

– আচ্ছা সোনা মা আমার। লক্ষী মেয়ের মতো সুন্দর করে রেডি হয়ে নাও।

আরহা আর কোনো কথা বলল না। আরহার মা চলে গেলেন নিচে, এখনও অনেক কাজ পড়ে রয়েছে।

অনেকটা অনিচ্ছা সত্ত্বেও মায়ের কথা মতো রেডি হয়ে নিল আরহা। পরনে ওয়াইট এণ্ড নেভি ব্লু কম্বিনেশনের গাউন আর হালকা সাজ এতেই যেন পরীর মতো লাগছে আরহাকে দেখতে। আয়নায় নিজেকে একবার পরখ করে নিল সে। চোখ সরিয়ে নিয়ে ড্রয়িং রুমের উদ্দেশ্যে পা বাড়াল।

ড্রয়িং রুমে আসতেই দেখতে একটি মধ্য বয়স্ক ভদ্র মহিলা আর তার পাশেই বসে রয়েছে একজন ভদ্র লোক। সম্ভবত তারা হাসবেন্ড ওয়াইফ। কিন্তু আশ্চর্য ব্যাপার আরহা তাদের দুজনের কাওকেই চেনে না। অথচ এনাদের জন্যই আরহার মা এতো আয়োজন করেছেন। ব্যাপারটা ভাবতেই খটকা লাগল আরহার। সে ইহসানের কাছে জিজ্ঞেস করেছে এ ব্যাপারে কিন্তু ইহসান কিছুি বলতে পারল না আরহাকে। রাগ আরহা তার ভাইয়ের সাথে কোনো কথা বলেনি আজ সারা দিন।

আরহা ড্রয়িং রুমের এক কোনে দাঁড়িয়ে এসব ভাবছিল আর তখনই আরহার পাশে এসে আরহার মা এসে আস্তে করে ফিসফিসিয়ে বললেন

– কি হলো বোকার মতো দাঁড়িয়ে আছিস কেন, সালাম দে ওনাদের।

আরহার পাশ দিয়ে একটু সরে এসে আরহাকে দেখিয়ে মুচকি হেসে ভদ্র মহিলাটির উদ্দেশ্যে তিনি বললেন

– এই যে ভাবী, ও হচ্ছে আমার মেয়ে।

ভদ্রতার খাতিরে তাদের না চেনা সত্ত্বেও মিষ্টি করে সালাম দিয়ে মুখে জোরপূর্বক হাসি ফুটানোর চেষ্টা করল।

– আসসালামু আলাইকুম।

– ওয়ালাইকুম সালাম, এখানে বসো মা।

ভদ্র মহিলাটির কথা মতো আরহা গিয়ে ওনার পাশে বসল। আরহার মাথায় হাত বুলিয়ে তিনি বললেন

– তুমি তো দেখতে ভারী মিষ্টি। মাশাআল্লাহ। তা মা তোমার নাম কি?

– নুসাইবা জান্নাত আরহা, আমার নাম।

– বাহ্ তোমার নামটাও অনেক সুন্দর আর আনকমন।

– আরহা, মা যাও মেহমানদের জন্য নাস্তা নিয়ে এসো। ( পাশ দিয়ে বললেন আরহার মা)

– আচ্ছা।

কথাটা বলে আরহা পা বাড়াতে নিলেই খপ করে হাতটা ধরে বসলেন পাশে থাকা ভদ্র মহিলাটি। তিনি বললেন

– আরে মা, তুমি বসো তো, এতো কাজ করতে হবে না তোমার। ভাবী আরহা মাকে দিয়ে এতো কাজ করাতে হবে না। আর এতো নাস্তার দরকার নেই আমাদের। আপনারা বসেন আমরা গল্প করি।

– না ভাবী এটা কেমন দেখায় বলেন তো?

– আচ্ছা আন্টি, কিছু মনে করবেন না, আমি এই এক্ষুনি যাচ্ছি আর আসছি।

বলেই আরহা রান্নাঘরে এসে সব খাবার দাবার নিয়ে হাজির হলো মেহমানদের সামনে। সবাইকে পরিবেশন করল নিজ হাতে। এতে ভীষণ খুশি হলেন ভদ্র মহিলাটি এবং ভদ্রলোক উভয়ই। ওনাদের দুজনেরই আরহাকে ভীষণ পছন্দও হয়েছে।

– ভাবী আপনার মেয়েটা তো ভীষণ লক্ষী একটা মেয়ে, আমার ওকে ভীষণ পছন্দ হয়েছে। ইচ্ছে করছে এখনই ছেলের বউ করে নিয়ে যাই। ( ভদ্রমহিলা)

এ কথা শুনে আরহা হতভম্বের ন্যায় দাঁড়িয়ে রইল, একবার মায়ের দিকে তো একবার ভদ্রমহিলার দিকে। ওনার বলা শেষ কথাটি এখনো কানে বাজছে আরহার। ও বুঝতে পারছে না এই মুহূর্তে আসলে কি করা উচিত।

এইবার আস্তে আস্তে সব হিসেব মিলে গেল আরহার। সকাল থেকে আরহাকে দেখে আরহার মায়ের মুচকি মুচকি হাসা, এতো আয়োজন করা, ইহসানের কিছু না বলা। তার মানে আরহাকে যে আজ দেখতে আসবে, ওরা সব জানত কিন্তু আরহাকে কিছু জানায়নি ওরা। আরহার মতামত না নিয়ে হুট করে এমন সিদ্ধান্ত নেওয়াতে ভীষণ রাগ হলো আরহার তবে আরহা কিছুই বুঝতে দিল না সবার সামনে।

– আচ্ছা আন্টি এখন আমি আসি তাহলে, ভালো থাকবেন, দোয়া করবেন আমার জন্য।

বলেই আরহা চলে গেল নিজের রুমে। আরহা চলে যেতেই ভদ্রমহিলা আরহার মাকে বললেন

– তো ভাবী যা বললাম আরকি, আপনি তো সব জানেনই। আমার আরহাকে পছন্দ হয়েছে, যদি সব ঠিক থাকে তাহলে সপ্তাহ খানিক পর না হয় বিয়ের দিন ঠিক করা হবে।

– হুম ভাবী।

– আচ্ছা ভাবী তাহলে আজ আমরা আসি। আবার দেখা হবে।

– আচ্ছা ভাবী আবার আসবেন।

বিদায় নিয়ে চলে গেলেন ভদ্রলোক আর ভদ্রমহিলা।

আরহার মা আরহার রুমে গিয়ে দেখলেন সব ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ে আছে। আরহা বিছানায় বসে কাদছে। মেয়ের এমন অবস্থা দেখে তিনি কিছুটা হলেও বুঝতে পারলেন।তাই মাথায় হাত বুলিয়ে বললেন…….

#চলবে ~

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here