তুমিহীনা_আমি_যে_শূন্য #Nushaiba_Jannat_Arha #পর্ব ২১

0
388

#তুমিহীনা_আমি_যে_শূন্য
#Nushaiba_Jannat_Arha
#পর্ব ২১

আরহার মা আরহার রুমে গিয়ে দেখলেন সব ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ে আছে। বিছানায় বসে কাদছে আরহা। মেয়ের এই অবস্থা দেখে কিছুটা হলেও বুঝতে পারলেন তিনি। মেয়ের কাছে এগিয়ে গিয়ে মাথায় হাত বুলিয়ে শান্ত কণ্ঠে বললেন

– আমি জানি তুই কেন কাঁদছিস। আমায় তুই ভুল বুঝেছিস তাই না আরহা?

প্রতিত্তোরে আরহা কোনো কথা বলল না, হাতটা সরিয়ে খানিকটা দূরে সরে বসল। কিন্তু চোখ দিয়ে এখনও অশ্রু সমানে বিসর্জন দিয়ে চলেছে। এভাবেই কিছুক্ষণ চুপ থেকে কান্না মিশ্রিত কণ্ঠে ফুপিয়ে ফুপিয়ে তার মাকে উদ্দেশ্য করে বলল

– আমি যে তোমাদের বোঝা এটা আগে বললেই তো পারতে, চলে যেতাম এ বাড়ি ছেড়ে। কিন্তু তাই বলে কথা নেই বার্তা নেই আমার জীবনের এতো বড় একটা সিদ্ধান্ত নিলে, তাও আবার আমাকেই না জানিয়ে।

কথাটা সময় বলার সময় বারবার কথা আটকে যাচ্ছিল আরহা, অতিরিক্ত কান্না করলে ও ঠিক মতো কথা বলতে পারে না।

মেয়ের কথা শুনে এবার সবটাই বুঝতে পারল আরহার মা। অভিমানের সুরেই কথাগুলো বলেছিল আরহা। আরহা যে বড্ড অভিমান করছে তার উপর। তাই এবার তিনি আরহার গালে হাত দিয়ে বললেন

– ধুর বোকা মেয়ে, তোকে দেখতে এসেছে বলেই কি তোর বিয়ে হয়ে যাচ্ছে নাকি। এমন কাদছিস জানি এখনই বিয়ে দিয়ে দিচ্ছি। তোকে বলতে চেয়েছিলাম কিন্তু বলেনি, তুই ছোটবেলা থেকেই বিয়ে পাগলী ছিলি তাই আর বলেনি।

মায়ের এমন কথা শুনে বেশ রাগ হলো আরহার। সুযোগ বুঝে মাও তার সাথে মশকরা করে নিল। আরহার এমন অবস্থা দেখে তিনি মুচকি হাসলেন। হাসি থামিয়ে বললেন

– ওনাদের আচার ব্যাবহার, ছেলের আচার আচরণ দেখে আমার ভীষণ পছন্দ হয়েছে। তোকেও ওনাদের ভীষণ পছন্দ হয়েছে। আচ্ছা ছেলের ছবি দেখবি?

– এখন ইচ্ছে নেই কারও ছবি দেখার।

– আর শোন আমরা কিন্তু সবাই রাজি এ ব্যাপারে, এখন তুই বল তুই রাজি কিনা? রাজি হলে এ ব্যাপারে আগাব, নইলে না। তোর ইচ্ছা।

এটা শুনে অনেকক্ষণ চুপ থেকে আরহা কিছু একটা ভেবে বলল

– আমাকে কি ভাবার জন্য সময় দেওয়া যাবে?

– হুম যত সময় চাই ভাব। ভেবে চিন্তে সিদ্ধান্ত নে। কারণ এটা তোর জীবন তুই ভালো বুঝবি।

– হুম।

– আচ্ছা এখন আমি যাই, অনেক কাজ পড়ে আছে।

বলেই চলে গেলেন আরহার মা। আরহা ওর মায়ের যাওয়ার দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়েছিল। এসব বাদ দিয়ে বেলকনিতে চলে গেল সে। মনোনিবেশ করল রাতের আকাশের অসংখ্য তারার মাঝে। ভাবতে লাগল সে কি করা যায়।

হঠাৎই কিছু একটা মনে পড়ল আরহার। আচ্ছা ওর কি এখন ঠিক হবে আভানকে ফোন দেওয়া। কিন্তু বিষয়টা ওকে জানানো যে ভীষণ দরকার। তারপরও যেন ওকে ফোন দিতে ভীষণ ইতস্তত বোধ করছে আরহা। অনেক ভেবে চিন্তে আর সাত পাচ না ভেবে হাতে থাকা ফোনটা নিয়ে আভানকে ফোন দিল আরহা।
.
.
.
এসময় এতো রাতে ফোন আসায় কিছুটা বিরক্ত বোধ করল আভান। অর্ধ পূর্ণ ঘুমটা ভেঙে গেল তার। অন্যান্য দিন অনেক রাতেই ঘুমায় সে কিন্তু আজ শরীরটা ক্লান্ত লাগায় চোখটা বুজতেই ঘুমিয়ে পড়েছিল সে, কখন ঘুমিয়েছে তা সে নিজেও জানে না। পাশে থাকা ফোনটা অনবরত বেজেই চলেছে। ঘুম ঘুম ভাব নিয়ে চোখ ডলতে ডলতে ফোনটা হাতে নিল সে। ফোন হাতে নিতেই ফোনের স্ক্রিনের দিকে তাকাতেই চোখটা ছানাবড়া হয়ে গেল আভানের। এতোক্ষণ ঘুম ঘুম ভাব থাকলেও এটা দেখার পর মুহূর্তের মাঝেই ঘুমের রেশটা নিমেষেই কেটে গেল আভানের।

ধড়ফড়িয়ে উঠে বসে ফোনটা রিসিভ করল সে। ঘুম ঘুম কন্ঠ নিয়ে বলল

– হ্যালো

– আমি আরহা বলছি।

– হুম, তো এতো রাতে ফোন দিয়েছো কেন আমায়?

– নিশ্চয়ই কোনো কারণে ফোন দিয়েছি। প্রেমালাপ করতে তো আর ফোন দেই নি আপনাকে, তাই না।

– কি বলবে তাড়াতাড়ি বলো। আমার এতো তোমার আজাইরা কথা শোনার মতো টাইম নেই।

– আমি এখন যেটা বলবো, আপনি কি এখন সেটা শোনার জন্য প্রস্তুত তো?

– হুহ।

– আমার বিয়ে ঠিক হয়েছে বাসা থেকে। আজ দেখতে এসেছে আমায়।

– ওহ ভালো কথা তো, কংগ্রাচুলেশনস।

আভানের কথা শুনে স্তব্ধ হয়ে গেল আরহা৷ পাগল টাগল হয়ে গেল নাকি আভান। আরহার মোটেও আশা করে নি যে আভান এমন উত্তর দিবে। আরহা কিছুক্ষণ স্তব্ধ হয়ে থাকে, আর ফোনের অপর পাশ দিয়ে আভানের ঘন ঘন নিশ্বাসের শব্দ শুনতে পাচ্ছে। কিছুক্ষণ চুপ থেকে আরহা আবার বলল

– যারা আমায় দেখতে এসেছেন তারা অনেক ভালো। আমাকে তাদের ভীষণ পছন্দ হয়েছে। তারা তো বিয়ের কথা ফাইনাল করেই গেছেন। হয়তো এক সপ্তাহের মাঝেই আমার বিয়েটা হয়ে যাবে।
( আভানকে জেলাস করার জন্য এটা একটু বাড়িয়ে বলল আরহা)

– ওহ আচ্ছা ভালো তো। গুড।

আভানের এমন বেপরোয়া ভাবে কথা বলতে শুনে আরও এক দফা অবাক হলো আরহা। এবার আরহা অবাকের চরম পর্যায়ে চলে গেল। এ কোন আভানকে দেখছে সে। এই ছিল আভানের ভালোবাসা। তার মানে কখনো ভালোই বাসেনি আরহাকে। এটা তার মানে এক পাক্ষিক ভালোবাসা ছিল। যেটা শুধু আরহাই বেসেছিল আভান নয়। ভাবতে বুকটা চৌচির হয়ে গেল আরহা। এবার আভান বলল

– তো ছেলে দেখতে কেমন?

– অন্নেক সুন্দর দেখতে।

– কি করে?

– বিজনেস। অনেক বড়লোক।

(আরহা এ ব্যাপারে কিছুই জানে না যা বলছে মিথ্যা বলছে)

– ওয়াও ভালো তো। ইউ আর সো লাকি।

– হুম লাকিই তো। এনি ওয়েস, আমার বিয়েতে আপনার দাওয়াত রইল কিন্তু। আসতে ভুলবেন না যেন।

– হুম শিওর আসবো কেন অবশ্যই আসবো। তোমার বিয়েতে না আসলে কি হয়। ভালো খাবারের ব্যবস্থা করো, কবজি ডুবিয়ে খাব।

– হুম তা তো অবশ্যই।

– আচ্ছা আমাকে বলা হয়েছে তোমার সব কথা?

– হুম এটা বলার জন্যই আপনাকে ফোন দিয়েছি।

– হুম বুঝেছি। এখন ঘুমাও যাও। বিয়ের আগে আগে সকাল সকাল ঘুমাবা, নইলে চেহারাটা খারাপ দেখাবে তখন দেখা গেল বর দেখে ভয় পেয়ে বিয়ের আসর ছেড়ে পালিয়ে গেল।

বলেই হাসতে হাসতে লুটিয়ে পড়ল আভান। আরেকটু হলেই বিছানা দিয়ে পড়ে যাচ্ছিল। কোনো মতে নিজেকে সামলিয়ে নিল সে। আভানের এমন অসভ্য মার্কা হাসি শুনে ভীষণ রাগ হলো আরহার। যা ভেবেছিল তা আর হলো না। সব কিছু নষ্ট করে দিল আভান। আরহা আর কিছু না বলেই খট করে কেটে দিল ফোনটা।

আরহা ফোন কেটে দিতেই স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল আভান। ফোনটা বিছানায় ছুড়ে ফেলল সে। মনে মনে বিরক্তি নিয়ে বলল আভান।

– ধুর এই ফালতু নিউজের জন্য আমায় এতো রাতে ফোন দিয়ে ডিস্টার্ব করল। ডিস্টার্ব তো না আমার ঘুমের বারোটা বাজাল। অসহ্য। ওর বিয়ে হলেও কি না হলেও কি। আমার তাতে কি।

বলেই অপর পাশ ফিরে শুয়ে পড়ল আভান। মুহূর্তের মাঝেই ঘুমের রাজ্যে পাড়ি জমালো আভান।
.
.
.

আরহা হাতে ফোনটা নিয়ে হতভম্ব হয়ে দাড়িয়ে রইল। কি ভেবেছিল আর কি হলো। আভান যেমন আরহাকে কষ্ট দিয়েছিল আরহাও চেয়েছে আভানকে কষ্ট দিতে কিন্তু এর কিছুই হলো না। আভানের মধ্যে বিন্দু মাত্র প্রতিক্রিয়া দেখল না আরহা। তবে আভানের উপর প্রচুর রাগ হলো আরহার।আরহা সিদ্ধান্ত নিয়েই ফেলেছে আজ যে দেখতে এসেছে তাকেই বিয়ে করবে সে।
যে ভাবা সেই কাজ। অনেকটা জেদ করেই সে এই সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছে।

তাই সে সাত পাচ না ভেবে অগ্রসর হলো তার বাবা মায়ের রুমে। আরহার বাবা মা গুরুত্বপূর্ণ একটা বিষয় নিয়ে কথা বলছিলেন। হঠাৎ এতো রাতে দরজায় নক করাতে আরহা মা এসে দরজা খুললেন। আরহা দাঁড়িয়ে আছে মুখটা মলিন করে। চোখের পাতা ভেজা ভেজা। আরহাকে এমন চেহারায় দেখে আরহার মা উত্তেজিত কণ্ঠে বললেন

– কি হয়েছে আরহা? এরকম কেন তোর অবস্থা? কান্না করেছিস নাকি?

– না আম্মু কান্না করিনি, মুখে পানির ছিটা দিয়েছি। ডিস্টার্ব করেছি এতো রাতে এসে?

– না না ডিস্টার্ব এর কি আছে, যখন খুশি তুই আসবি কোনো সমস্যা নেই।

– একটা কথা বলতে এসেছি।

– কি কথা রে?

– আমি রাজি এ বিয়েতে।

– সত্যি? ভেবে চিন্তে বলছিস তো?

– হুম।

– আলহামদুলিল্লাহ।

– আচ্ছা আম্মু যাই, আমার ঘুম পাচ্ছে ভীষণ।

বলেই আরহা চলে গেল নিজ রুমে। বিষন্ন মনে বসে রইল সে। সে এই সিদ্ধান্ত নিয়ে কি আদৌ ঠিক করেছে? আর কিছু ভাবল না পারি জমালো ঘুমের রাজ্যে….

#চলবে ~

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here