তুমিহীনা_আমি_যে_শূন্য #Nushaiba_Jannat_Arha #পর্ব : ১

0
1717

কলেজের সবার সামনে থেকে আরহাকে টানতে টানতে নিয়ে এলো আভান। এনেই গাড়িতে একপ্রকার ছুড়েই ফেলে দিল আরহাকে। আভানের এমন আচরণে আরহা অবাকের চরম পর্যায়ে পৌঁছে গেল। সে বুঝতে পারছে না কি হলো আভানের যে তার সাথে এমন আচরণ করছে। আরহা এসব ভাবতে ব্যস্ত তখনই আভান ওর কাছে এসে শক্ত করে চেপে ধরলো তার গাল।আর দাতে দাত চেপে বলল

`- তোমার সাহস হলো কি করে? তুমি আমার অবর্তমানে আরেক জনের সাথে হেসে হেসে কথা বলো। তার থেকেও বড় কথা সে তোমার হাত ধরে কোন সাহসে? যেখানে আমি কাল অবধিও তোমার হাত পর্যন্ত স্পর্শ করলাম না।

`- আ আসলে আ আভান আ আপনি ভুল বুঝছেন। এমন কিছুই না। আ আমি তো ও ওনার সাথে খ খুব জরুরী একটা বিষয়ে ক কথা বলছিলাম। বিশ্বাস করুন এ ছাড়া আর ক কিছুই না।

`- জাস্ট সাট আপ। আর একটাও কোনো কথা না। অনেক বাড় বেড়েছো তুমি। আজ থেকে তুমি দেখবে এই আভান চৌধুরী কি জিনিস।

`- আভান প্লিজ, বিশ্বাস করুন আমায়। আপনি ভুল বুঝছেন….. কথা শেষ করার আগেই আরহাকে থামিয়ে দিল আভান। আগের তুলনায় আরও জোরে শক্ত করে চেপে ধরলো ওর গাল। ফর্সা গালে পাঁচ আঙ্গুলের দাগ বসে গেছে, গাল লাল হয়ে গেছে সেইসাথে করছে অসহ্য যন্ত্রণা। ব্যথায় আরহার চোখ দিয়ে গড়িয়ে পড়ছে অশ্রু। তবে যে আভান আরহার চোখে বিন্দুমাত্র জল দেখলে বিচলিত হয়ে পড়ত। আজ সেই আভানের মধ্যে নুন্যতম ভাবন্তর নেই এই নিয়ে। অনেক কষ্ট করে আভানকে বোঝানোর চেষ্টা করে বললো

`- আভান, প্লিজ। আপনি…..

আরহার কথা না শুনেই ওকে কষিয়ে থাপ্পর মারলো। আর দাতে দাত চেপে বলল

`- অনেকক্ষণ থেকে তোমাকে চুপ করতে বলছি। কথা কি কানে যায় না। এবার কিন্তু তুমি তোমার লিমিট ক্রস করে ফেলছো। আমাকে রাগিও না। আমি রাগলে কিন্তু আমি আমার মাথা ঠিক রাখতে পারিনা।

`- কিন্তু আভান আপনি কেন বুঝতে চাইছেন না যে…

আর কিছু বলার আগেই আভান ওর পকেট থেকে একটা রুমাল বের করেই আরহার মুখে চেপে ধরলো। মুহূর্তেই আরহার চারিদিক আস্তে আস্তে অন্ধকার হয়ে গেল।

—————

পিটপিট করে চোখ খুলে চারিদিকে চোখ বুলাতেই দেখতে পেলো একটি অন্ধকার রুমের মাঝে আরহা অবস্থান করছে। এতো অন্ধকার দেখে বেশ কিছুটা ভয় পেয়ে গিয়েছে সে। কারণ আরহা অন্ধকারে ভীষণ ভয় পায়।

`- কি অন্ধকারে ভয় পেয়ে গেলে বুঝি? বলেই বাঁকা হাসলো সামনে থাকা ব্যক্তিটি।

এমনিও অন্ধকার তার উপর কারও কণ্ঠস্বর পেয়ে চমকে উঠলো আরহা। যখন বুঝতে পারলো যে এটা আভানের কণ্ঠ তখন বেশ রাগ নিয়েই চিৎকার করে বললো

`- এসবের মানে কি আভান? আপনি তো ভালো করেই জানেন আমি অন্ধকারে ভীষণ ভয় পাই।

লাইট জ্বালাতে জ্বালাতেই আভান বলল

`- উহু কথা আস্তে। নেক্সট টাইম যেন এমন উঁচু গলায় আমার সাথে কথা বলতে না দেখি। তাহলে কিন্তু ফল ভালো হবে না। মাইণ্ড ইট।

`- এভাবে একটা মেয়েকে তুলে আনতে লজ্জা করে না আপনার মি. আভান চৌধুরী। এটা কোন ধরনের ভদ্রতার পরিচয় শুনি। তারপর আবার থ্রেড দিতে আসেন। বেশ করেছি উঁচু গলায় কথা বলেছি আপনার সাথে। কি করবেন আপনি আমার? ( এবার আগের তুলনায় আরও জোরে চেচিয়ে বলল)

এতোক্ষণ শান্ত থাকলেও এখন আর শান্ত থাকতে পারলো না আভান। একেই তো আরহা অনেক বড় একটা ভুল করেছে তার উপর আবার তার মুখে মুখে তর্ক। রাগে তার ঘাড়ের রগ ফুলে উঠলো আর মাথায় রক্ত চড়ে বসলো। চেষ্টা করছে নিজেকে শান্ত করার কিন্তু সে ব্যর্থ কারণ রাগ হলে সে নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না। অনেকক্ষণ ধরে আরহাক সে সহ্য করেছে কিন্তু এখন আর কিছুতেই সম্ভব নয়। মুহূর্তের মাঝেই আভানের ফর্সা মুখ রক্তিম আকার ধারণ করলো। রাগ সামলাতে না পেরে তেড়ে আসলো আরহার দিকে। আরহা ভয়ে চোখমুখ খিঁচে একপা একপা করে পেছাতে লাগলো। আর ভাবতে লাগলো যে সে কি এমন করেছে যে আভান এতোটা রেগে গেলো? কই এর আগে তো আভানের এমন ভয়ংকর চেহারা দেখেনি সে। আরহা এসব ভাবতে ব্যস্ত তখনই আভান এসে একহাত দিয়ে আরহার গাল শক্ত করে চেপে ধরল আরেক হাত দিয়ে আরহার ডানহাত শক্ত করে দেয়ালের সাথে চেপে ধরলো। দাঁতে দাঁত চেপে রাগান্বিত কণ্ঠে আভান বলল

– এই তোর সাহস হলো কিভাবে আমার সাথে এইভাবে কথা বলার? তোকে না বলেছি তুই উঁচু গলায় কথা বলবি না আমার সাথে।

আরহারও ভীষণ রাগ হলো আভানের উপর সেইসাথে অবাকও হলো। যে আভান আরহার সাথে আজ পর্যন্ত তুই করে কথা বলেনি, সে কিনা আজ তার সাথে তুই করে কথা বলছে। ভাবতেও অবাক লাগছে আরহার। তাই রেগে গিয়ে আরহা বলল

– আমার মা বাবাও আমার সাথে এমন করেনি। ইভেন কেউই এমন বিহেভ করেনি। যদি আমি আগে জানতাম যে আপনি এমন অসভ্য একটা লোক, তো জীবনে কোনোদিন আমি আপনার সাথে কথাও বলতাম না।

– কি বললি তুই? আমি অসভ্য।

– হ্যাঁ হ্যাঁ আপনি অসভ্য। যা বলেছি ঠিকই তো বলেছি। ছাড়ুন বলছি আমায়। যেতে দিন। আমি বাসায় যাবো। আমার মা বাবা আমার জন্য টেনশন করছে। আর একটা কথা মনে রাখবেন আপনার ছায়াও যেন আমার চারপাশে না দেখি।

এ কথা শুনে আভান আগের তুলনায় আরও শক্ত করে চেপে ধরলো আরহাকে। আরহা ব্যথায় চিৎকার করে উঠল।

– তুই কি ভেবেছিস তোকে ছেড়ে দেওয়ার জন্য এখানে এনেছি আমি। তুই আমাকে চিনিস না। এতোদিন আমার ভালো চেহারা দেখেছিস এখন থেকে তুই আমার আসল চেহারা দেখবি। আর কি বললি, আমি অসভ্য তাইনা? এবার থেকে দেখবি তোর সাথে ঠিক কি কি করি আমি। এখনও তো কিছুই করলাম না। রেডি থাক তোর জন্য এর থেকেও ভয়ংকর কিছু অপেক্ষা করছে। জাস্ট ওয়েট এণ্ড ওয়াচ। বলেই বাঁকা হাসলো আভান।

আর কিছু না বলেই আরহাকে ছেড়ে দিয়ে বাইরের দিকে অগ্রসর হলো আভান। আভানের এরূপ কর্মকাণ্ডে কথাবার্তায় শূন্য মস্তিষ্ক হয়ে গেলো আরহা। কি করবে সে কিছু বুঝতে পারছে না। তাই আভানের চলে যাওয়ার দিকেই ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রইল আরহা। আর হারিয়ে গেলো তার ভাবনার জগতে।

—————————-

বেশ কিছুক্ষণ পর এলো আভান। হাতে তার গরম লোহার রড জাতীয় জিনিস। মুখে তার রহস্যময় হাসি। ধীর পায়ে অগ্রসর হতে লাগল আরহার দিকে। অজানা এক আশঙ্কায় আরহাকে গ্রাস করে ফেলেছে যেন।

হঠাৎ গরম কিছুর স্পর্শ পাওয়ায় চমকে উঠলো আরহা। আভান আরহার হাতে গরম রড শক্ত করে চেপে ধরেছে, ঠিক সেই হাতটা যেটা সকালের সেই লোকটা ধরেছিল। মুহূর্তের মাঝেই আরহার ফর্সা হাতটা রক্তিম বর্ণ ধারণ করলো। ব্যথা আর অসহনীয় যন্ত্রণা সহ্য করতে না পেরে দিলো এক চিৎকার। আর গলা কাটা মুরগির মতো ছটফট করতে লাগলো। কাঁদতে কাঁদতে আরহা বলল আভানকে উদ্দেশ্য করে

– কি করছেন কি আপনি? পাগল হয়ে গেছেন নাকি? জ্বলে যাচ্ছে আমার হাতটা।

– কি খুব ব্যথা লাগছে তাইনা? আহারে খুব কষ্ট হচ্ছে তাইনা জান। ইস্। তুমি জানো যখন ঐ ছেলেটা তোমার হাত ধরে কথা বলেছিল তখন আমার ঠিক এমন হয়েছিল। আমি তোমায় বলে বুঝতে পারবো না আমার তখন ঠিক কেমন লেগেছিল।

– আপনি কোনো মানুষের ভিতরেই পরেন না। অমানুষ একটা আপনি। তা না হলে কেউ এমন করে, কারোর শত্রুর সাথেও তো কেউ এমন করে না। আবার আমায় জান বলে ডাকেন কোন সাহসে। লজ্জা করে না আপনার।

– এতোও কাজ হয়নি। খুব সাহস হয়েছে তাইনা। ওয়েট। বলেই পাশে থাকা বেত দিয়ে আরহাকে এলোপাতাড়ি মারতে শুরু করলো। আরহাও জোরে জোরে চিৎকার করতে লাগল। একটা সময় নিস্তেজ হয়ে ফ্লোরে লুটিয়ে পরলো আরহা। আরও কিছুক্ষণ মারার পর যখন আরহার আর কোনো সাড়াশব্দ পাওয়া গেলো না তখন আভানের হুশ ফিরলো।

– আরহা, এই আরহা। কি হয়েছে জান আমার, বলো আমায়। এই আরহা কথা কেন বলছো না তুমি। আরহাআআআ

————–

আরহাকে আভান নিয়ে সোজা চলে এলো হসপিটালে। আরহাকে নিয়ে একপ্রকার পাগলামি শুরু করে দিলো। আভানের এমন পাগলামি দেখে এক পর্যায়ে ডক্টর বেরিয়ে এলো।

– আরেহ্ মি. আভান আপনি এখানে এসময়ে।

– ডক্টর দেখুন না, আমার জানপাখিটা কেন কথা বলছে না। দেখুন না প্লিজ।

– মি. আভান শান্ত হন আপনি। আমরা দেখছি।

– তাড়াতাড়ি ডক্টর ওর যেনো কিছু না হয়।

আভানের এমন পাগলামো দেখে কিছুটা খারাপ লাগলো ডক্টরের।

বেশ কিছুক্ষণ পর…

– মি. আভান। এখন রোগী মোটামুটি সুস্থ। আমি মেডিসিন দিয়েছি আর এই মেডিসিন গুলো আনতে হবে। বলেই ডক্টর প্রেসক্রিপশন গুলো হাতে ধরিয়ে দিলো আভানের।

আভান যত দ্রুত সম্ভব প্রেসক্রিপশন অনুযায়ী সব ওষুধ নিয়ে এলো। এসেই আরহার কেবিনে প্রবেশ করলো আভান। আরহার ঘুমন্ত নিষ্পাপ চেহারাটার এই হাল দেখে বুকটা মোচর দিয়ে উঠলো আভানের।
সবকিছুর জন্য তো সে নিজেই দায়ী। একথা ভাবলেই কষ্টে বুকটা ফেটে যাচ্ছে তার। না পারছে কাউকে কিছু বলতে আর না পারছে সইতে।

আরহার এমন হাল দেখতে ইচ্ছা করছে না তাই বেলকনিতে চলে গেলো আভান। রাতের আঁধার এবং অজস্র তারার মেলা আর মিষ্টি মনোরম হাওয়ায় সবকিছু মাতিয়ে তুলছে, পরিবেশটা বেশ অন্যরকম।
এতোকিছুর মাঝেও বিন্দুমাত্র অনুভুতি নেই আভানের। তার মনে যে বয়ে চলেছে এক তুফান। এই রাত তাকে মনে করিয়ে দিচ্ছে নানা স্মৃতি। একটা চেয়ার টেনে বসে চোখটা বুজে ডুব দিলো তার অতিতের কিছু স্মৃতিতে।

#চলবে ~

#তুমিহীনা_আমি_যে_শূন্য
#Nushaiba_Jannat_Arha
#পর্ব : ১

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here