প্রেমাচার কলমে: #অপরাজিতা_মুন #পর্ব_৮

0
197

#প্রেমাচার
কলমে: #অপরাজিতা_মুন
#পর্ব_৮
[কপি করা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ]

ধরণীর বুকে আলো ঠেলে অঁধার নেমেছে ঘন্টা খানেক হলো। রাতের নিকষ কালো আঁধার দূর করতে শহর জুড়ে কৃত্রিম আলো জ্ব’লছে, আকাশে উঁকি দেওয়া গোলাকৃতির মস্ত বড় চাঁদ টার রুপালি আলো ফিকে হয়েছে এসব বিভিন্ন রঙ এর কৃত্রিম আলোতে।
সৈয়দ শামসুল হক বসে আছেন তার প্রাণের জায়গায়, তার নিজ হাতে গড়া “ভোজনরসিক এর ভোজনালয়” রেস্তোরাঁয়। আজ প্রায় এক সপ্তাহ পর আসলেন এখানে। বয়স বেড়েছে, এখন আর আগের মতো শরীরে বল পান না। নিজ হাতে গড়া রেস্তোরাঁ অবশ্য খুব বেশি দূর না, এই তো সৈয়দ সাহেবের রং বেরং এর বাসাটার বিপরীতেই। মাঝে শুধু পিচঢালা ব্যাস্ত রাস্তাটুকু। দূরত্ব এতো কম হওয়া সত্বেও প্রতিদিন আসা হয় না। আজ আর উনার মন টিকলো না কিছুতেই। চলে আসলেন ছোট নাতী মুবিন এর সহায়তায়।

সৈয়দ সাহেব বছর কয়েক পূর্বে প্রায় প্রতিদিন এখানে আসতেন। সময় নিয়ে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে রেস্তোরাঁর সব পর্যবেক্ষণ করতেন। কিচেনে ঢুকে কুক দের রান্না পর্যবেক্ষণ করতেন, রান্না বিষয়ক বিভিন্ন উপদেশ এবং কৌশল শেখাতেন নিজ হাতে। এখন আর সেটা সম্ভব হয় না। এই আসেন, একটু এদিক সেদিক পর্যবেক্ষণ করে এক কোনায় বসে এক কাপ চা পান করে চলে যান। এতো টুকু সময় অবশ্য শেফ এবং কুক দের আনাগোনা সৈয়দ সাহেবের চারিদিকে থাকে সবসময়। কেউ কেউ সৈয়দ শামসুল হককে গুরু মানেন, পাশে দাঁড়িয়ে সম্মান দেখিয়ে দোয়া আর্শিবাদ গ্রহন করেন তো কেউ কেউ রান্না সুস্বাদু করার বিভিন্ন পন্থা। নেবেন ই বা না কেনো? সৈয়দ সেহেবের হাতে যে কি জাদু তা তো এই মহল্লার সবারই জানা। উনার রান্না করা খাবার দেখতে যেমন সুন্দর, ঠিক তেমনি ঘ্রাণ, আর খেতে কয়েক গুণ বেশি মজা। উনার একেকটা পরিবেশন যে কারো জিভে জল নিয়ে আসে। এক বার খেলে যে কারো মুখে প্রশংসামূলক শব্দ উচ্চারিত হতে বাধ্য করে।

সৈয়দ বাড়ির বড় নাতী সৈয়দ আব্দুল্লাহ আল মাশরিফ জায়ান অফিস শেষে মাত্র এসে কালো রং এর রেন্স রোভার কার থামিয়েছে নিজ বাসার গেটে। বাসায় ঢোকার পূর্বে সচারাচর সে এক পলক তাকায় রেস্টুরেন্টের দিকে । আজ ও তাকালো, দেখতে পেলো মুবিন কে। কি মনে করে ড্রাইভার কে গাড়ি পার্কিং করতে বলে নেমে পরলো। সাবধানতার সহিত রাস্তা পার হয়ে সোজা রেস্তোরাঁর ভেতর প্রবেশ করলো। আশেপাশে তাকিয়ে ক্রেতাদের বেশ ভালো উপস্থিতি দেখতে পেলো জায়ান। অধিকাংশই তরুণ। কেউ বন্ধুদের সঙ্গে, অনেকে পরিবারের সাথে আর কেউবা প্রিয় মানুষটির হাত ধরে।
জায়ান কাঙ্ক্ষিত কর্ণারে চলে আসলো যেখানে দাদাভাই বসা। এটা এমন এক কর্নার যেখানে কোনো ক্রেতা বসে না। ফ্যামেলি কর্নার, যা শুধুমাত্র সৈয়দ পরিবারের জন্য নির্ধারিত এবং বিশেষ ভাবে সজ্জিত।

দাদাভাই এর সাথে চোখাচোখি হতেই মুচকি হাসলো জায়ান। সালাম দিয়ে করমর্দন করে বসলো সৈয়দ সাহেবের মুখোমুখি হয়ে। হাত ঘড়িটা খুলে টেবিলের উপর রেখে বলল,

“দাদাভাই, আপনাকে তো খুব ফুরফুরে লাগছে আজ। মনে হচ্ছে শরীরটা আপনার ভালো।”

“হুম। কিছুটা। তোমার কি অবস্থা বলো?”

“আলহামদুলিল্লাহ। একটা বড় প্রজেক্ট হাতে আসছে। এটা নিয়েই ব্যাস্ত আপাতত।”

এতোক্ষণে সৈয়দ সাহেবের পাশে আরাম করে বসে কোল্ড কফিতে চুমুক দিতে থাকা মুবিন মুখ খুলল। আগ্রহের সাথে মাশরিফ জায়ানকে শুধালো,

“দেশের বাহিরে যাবা নাকি ভাইয়া?”

“নট শিওর। যাওয়া লাগতেও পারে।”

“গেলে আমাকেও নিও”

“আচ্ছা।”

মুবিনের থেকে মুখ ফেরালো জায়ান। দাদাভাই এর দিকে তাকিয়ে বলল,

“কতোক্ষণ হলো এসেছেন দাদাভাই?”

“বেশিক্ষণ না। পাঁচ দশ মিনিট।”

“খাইছেন কিছু? চা আনতে বলি? নাকি কফি?”

সৈয়দ শামসুল হক বড় নাতীর অফার শুনে কিছু যেনো ভাবলেন। বেশ গাঢ় ভাবনা বলা চলে। চা তো তিনি খাবেন ই, কিন্তু সেটা যদি নাতি নাতনীর হাতের হয় তাহলে মন্দ হয় না। পিঠ টানটান করে বসে থাকা জায়ান এর দিকে তাকিয়ে দাদাভাই তার গম্ভীর মুখেই অগোচরে রহস্যময় এক হাসি হাসলেন। রাশভারী কন্ঠে মুবিন কে ডেকে বললেন,

“মেহনুভাকে কল দাও তো দাদুভাই। এখানে আসতে বলো পাঁচ মিনিটের মধ্যে।”

মুবিন অবাক চোখে তাকালো দাদার দিকে। প্রশ্ন করল,

“কেনো?”

“চা খাবো”

“ওর হাতে কেনো খাবেন? মিরাজের হাতের চা হেব্বি টেস্ট। ওকে আনতে বলি।”

“আহ, বেশি বুঝো না তো। আমার বুবুকে ফোন দাও। আসতে বলো।”

পাশ থেকে বলে উঠলো জায়ান,

“শুধু শুধু নোভাকে ডাকছেন কেনো দাদাভাই? মিরাজের হাতের চা না খাইতে চাইলে আমি করে আনি। ওকে ডাকবেন না। মাথাটা নষ্ট করে ছাড়বে।”

“তোমার হাতের ও খাবো। দুজনের হাতের ই খাবো।
চা খাবো, কফিও খাবো। অপেক্ষা করো। মুবিন, এখনও ঢ্যাং মে/রে আছো কেনো? কল দাও দ্রুত।”

দাদাভাই এর ধমক খেয়ে ফিক করে হেসে দিলো মুবিন। তড়িঘড়ি করে কল লাগালো বড় বোনের নাম্বারে।
সুন্দর মতো ফেঁসে গেছে জায়ান তা স্পষ্ট বুঝতে পারছে দাদাভাই এর শেষ কথায়। চা-কফি সে বানাতে পারে, সেটা চিন্তার বিষয় না। চিন্তার বিষয় হচ্ছে দাদাভাই এর রুচি মতো হবে কি না। ওদিকে আবার প্রতিদ্বন্দ্বী মেহনুভা কে চা বানানোর ওস্তাদ বলা চলে। মেয়েটার হাতের চা মুখে লেগে থাকার মতো। মেহনুভার চায়ের সাথে জায়ান এর টক্কর দেওয়া বেশ কঠিন হবে। কঠিন হবে এজন্য, মেহনুভা শুধু রং চা কিংবা দুধ চা না, প্রায় সব রকমের চা বানাতে পটু এবং স্বাদ অমৃত। কিন্তু জায়ান ওই রং চা আর দুধ চা তেই সীমাবদ্ধ। তবুও খুব বেশি করা হয় না। আর কফি তো কফি মেকারেই করে নেয়, রেস্টুরেন্টে এসেও পান করে কিংবা বাসায় মা করে দেয়। কিন্তু এখন তার কি হবে? এই ঝামেলা থেকে উদ্ধার করবে কে? মেহরুন কে ডাকবে? ডাকলেই কি আসবে? জীবনেও আসবে না। চা বানাতে বললে তো আরো না। অলসের ডিব্বা একটা। কি এক জ্বা’লা, চা বানাতেই মেহনুভার সামনে হয়ে না যায় মাশরিফ জায়ানের ইজ্জতের ফালুদা।

_____________

“এক কাপ কফি আর এক কাপ চা খেতে ইচ্ছা করছে আমার। জায়ান দাদুভাই আর মেহনুভা বুবু, তোমরা দুজনে কিচেনে যাও, আমার জন্য করে নিয়ে আসো। মনে রেখো এটাও তোমাদের পরীক্ষার একটা অংশ। আর মুবিন দাদা, তুমিও যাও সাথে। বোনকে সাহায্য করতে পারলে কইরো। না পারলে চুপ করে বসে থেকো।”

কিছুক্ষণ আগে হাজির হওয়া মেহনুভা সৈয়দ সাহেবের উক্ত কথা শুনে তাকে জরুরি তলবে ডাকার কারণ উদঘাটন করতে পারল অবশেষে। আবার আরেক পরীক্ষা দিতে হবে শুনে মনের কোণে বিরক্তি ভর করলেও দাদাভাই এর মুখে চা বানানোর কথা শুনে টানাটানা চোখ জোড়া চিকচিক করে উঠলো। তড়িঘড়ি করে আগে ভাগেই বলল,

“চা আমি বানাবো দাদাভাই।”

পাশ থেকে জায়ান আদেশ সূচকে জোরালো কন্ঠে বলল,

“চা আমি বানাবো। তুই কফি বানা।

“কি আশ্চর্য মাশরিফ ভাই। আপনি বড় মানুষ, বড়লোক মানুষ। আপনি কফি বানাবেন।”

বিরক্ত হলো মাশরিফ জায়ান। কথার পৃষ্টে কথা বলা তার সবচেয়ে অপছন্দ যেটা এই মেয়ে সবসময় করে থাকে। ভ্রু জোড়া কুঞ্চিত হলো। কর্কশ কন্ঠে ধমকের সুরে বলল,

“তুই কি ছোট মানুষ? লিলিপুট? এক সাথে দাঁড়ালে তো ঠিকি আমার কান বরাবর হবি।

“সাইজে না, বয়সে। টাকা পয়সাতেও। আর এসব কি ডাক ডাকেন, একদিন পেত্নি তো আরেকদিন লিলিপুট। আরেকদিন ডাকলে কিন্তু..”

কথা অসম্পূর্ণ রেখে মুখ গোমড়া করল মেহনুভা। জায়ান অবাক হলো কিছুটা। মেয়েটার সাহস আগে থেকেই বেশ, কিন্তু এখন মনে হচ্ছে অনেক বেড়ে গেছে। কি রকম হুমকি থাকমিও দিচ্ছে। চোয়াল শক্ত করলো জায়ান। পাশ ঘুরে সোজা মেহনুভার মুখোমুখি বসে শুধালো,

“কিন্তু কি?”

“খবর আছে আপনার।” মনের কথা মনেই রাখল মেহনুভা। মুখে আর উচ্চারণ করল না। এই কথা এখন বলা মানে নিজের খবর মাশরিফ ভাই এর হাতে নিজ দ্বায়িত্বে তুলে দেওয়া। মিনমিন স্বরে বলল,

“কিছু না”

সৈয়দ সাহেব থামালেন দুজনকে। সহজে তো এই দুজন মুখোমুখি হয় না। কোনো কারণে এক হলে একে অপরকে ছাড়ে না। উঁচু আওয়াজে একটা অল্পবয়সী ওয়েটার কে ডাকলেন সৈয়দ শামসুল হক। ছোট্ট এক টুকরো কাগজ আর কলম চেয়ে নিলেন। কাগজটা দুটো টুকরো করে মুবিনের কাছে দিলেন। একটাতে চা এবং অন্যটাতে কফি লিখিয়ে ভাঁজ করলেন। এতো ঝগড়াঝাটি করার তো কোনো দরকার নেই। লটারি হোক। যার যে কুপন পছন্দ সেটা তুলুক। নিরপেক্ষতা বজায় রাখুক সকলে। দুইটা কুপন সৈয়দ সাহেব নেড়েচেড়ে টাবিলের উপর রাখলেন। নাতী-নাতনীদের মন মতো কুপন বেছে নিতে বলার সুযোগ টুকুও পেলেন না তার আগেই খপ করে একটা কুপন নিয়ে ফেলল মেহনুভা। আলাভোলা একটা হাসি ছুড়ে দিলো দাদাভাই এর হতভম্ব হয়ে তাকিয়ে থাকার বিপরীতে।
সেভাবেই হাসতে হাসতে বলল,

“আমি নিয়ে নিছি। মাশরিফ ভাই, এবার আপনি নেন একটা।”

পাশ থেকে মুবিন বলে উঠলো,

“দুইটা থেকে তো একটা নিয়েই ফেলছো। বাছাই করার মতো কি কিছু রাখছো?”

নিজ ভাইয়ের প্রতি এক আকাশ পরিমান বিরক্তি চলে আসলো মেহনুভার। বিরক্তিমাখা কন্ঠে চেতে উঠে বলল,

“তুই ভাই নাকি হিটলার?”

জায়ান টেবিলের উপর পরে থাকা ছোট্ট কুপনটা নিয়ে দাঁড়াতে দাঁড়াতে বলল,

“তোর চেয়ে শতগুণ বুঝদার।”

চলবে….

[গঠনমূলক মন্তব্য শুনতে ইচ্ছুক। কার হাতে কি খেতে চান জানিয়ে দিন ছোট করে]

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here