প্রেম_তুমি (দ্বিতীয় খণ্ড) পর্ব ১৬

#প্রেম_তুমি (দ্বিতীয় খণ্ড)
ফাবিহা নওশীন
পর্ব-16

দিশা আর আয়ানের এনগেজমেন্ট ডেট ফিক্সড হয়ে গেছে। এই বাহানায় দর্শন বেশ কয়েকবার আয়ানের বাড়িতে আশা যাওয়া করেছে। নিজেরও ব্যস্ত সময় কাটছে। অল্প কিছুদিন হলো হাসপাতালে জয়েন করেছে। কাজের অনেক প্রেসার। আজও এসেছে আয়ানের বাড়িতে। এই রাতের বেলায় অর্ষা বাড়ির সামনে ছোট বাগানটাই বসে অফিসের কাজ করছে। টেবিলের উপরে কফির মগ। তাতে ধোঁয়া উড়ছে। অর্ষা কাজে এতটাই মগ্ন যে দর্শনকে খেয়াল পর্যন্ত করেনি।
দর্শন পা টিপে টিপে ওর পাশের চেয়ারে গিয়ে বসল। অর্ষার গালের উপরে আঁকাবাঁকা চুলের সামান্য গোছা বিরক্ত করতেই অর্ষা কানের পেছনে গুজে দিল। ওর চোখেমুখে ক্লান্তি। কাজের প্রেসার আর ভালো লাগছে না। মন মেজাজ বিগড়ে আছে।
দর্শন গলা খাকাড়ি দিল,
“এহেম! এহেম!”

অর্ষা আকস্মিক আওয়াজে চমকে উঠে। ওর দিকে চকিত দৃষ্টি দিয়ে বলল,
“এগুলো কী?”

“ভয় পেয়েছো?”

অর্ষা নিজেকে সামলে আমতা আমতা করে বলল,
“না, প্লিজ এখন বিরক্ত করো না। আমি অলরেডি ডিস্টার্ব।”
অর্ষা ল্যাপটপের বাটনে আবারও হাত রাখল আর চোখ রাখল ল্যাপটপের স্কিনে।
তারপর আবারও দর্শনের দিকে চেয়ে বিরক্তি প্রকাশ করে বলল,
“প্লিজ লিভ। এভাবে সব সময় ঘুরঘুর কেন করো? ভালো লাগে না। আর এসব ছ্যাচড়ামি তোমাকে মানায় না। তুমি প্লিজ তোমার মতো থাকো। আমাকে আমার মতো থাকতে দেও, বাঁচতে দেও। তুমি কি বোঝো না আমি বিরক্ত হই?”

“বিরক্ত কেন হবে? আমি কি তোমাকে বিরক্ত করেছি?”

“তাহলে কী করছো?”
অর্ষা বসা থেকে উঠে দাঁড়াল।
দর্শন চুপ করে থেকে অর্ষার দিকে তাকাল। হঠাৎ ওর চোখে চোখ রাখতেই বুক ধুক করে উঠল। এই চাহুনি অর্ষার সহ্য হয় না। কেমন বুকের মধ্যে চিনচিন ব্যথা করে।
“আমেরিকার ছেলের সাথে তোমার বিয়ের কথা আগাও। আর বিয়ে করে নেও। তাহলেই পিছু ছেড়ে দেব।”

“তোমার পিছু ছাড়াতে কাউকে বিয়ে করার প্রয়োজন পড়বে না আমার।”

দর্শন কন্ঠে কাঠিন্য এনে বলল,
“ওহ রিয়েলি? খুব দেমাক না তোমার? আমি তোমার পেছনে ঘুরছি তোমার তো আকাশ সমান ডিমান্ড হয়ে গেছে। একদিন তুমিও আমার পেছনে ঘুরেছো এত দ্রুত কি করে মানুষ সব ভুলে যায়? আমি তো ভুলতে পারিনি। এদিকে বলছো আমেরিকার ছেলেকে বিয়ে করার প্রয়োজন নেই, ডাক্তার ছেলে পছন্দ নয় আর অন্যদিকে তোমার বাসার মানুষ আমার মায়ের কাছে দিশা আর আমার ফ্যামিলির খোঁজ খবরের চেয়ে ওই আমেরিকার ছেলের খোঁজ নিচ্ছে। ওই আমেরিকার ছেলেকে নিয়ে সমস্যা নেই। সমস্যা এই( নিজেকে উদ্দেশ্য করে) ডাক্তারকে নিয়ে। আরে সরাসরি বলো না? এমন ভাব ধরে থাকো কেন? যাও আর ওই ছেলেকে বিয়ে করে আমেরিকা স্যাটেল হয়ে যাও। তোমার স্বপ্ন কি-না।”
একে তো অর্ষার অফিসের প্রজেক্ট নিয়ে সমস্যায় পড়েছে। তার উপর ওর পেছনে ওর বাসার মানুষ ওই ছেলের সাথে বিয়ে দিতে চাইছে। আর কত বুঝাবে সবাইকে? রাগ উঠে যাচ্ছে। এছাড়া দর্শন ওকে বিরক্ত করছে। মিথ্যা অপবাদ দিচ্ছে। অর্ষার মাথা হঠাৎ গরম হয়ে গেল।
“দর্শন, প্লিজ চলে যাও। নয়তো কোন অঘটন ঘটিয়ে ফেলব৷ রাগ হচ্ছে প্রচুর।”
অর্ষা চেঁচিয়ে বলল।

ওর চেয়ে দ্বিগুণ চেঁচিয়ে দর্শন বলল,
“কী করবে মার্ডার করে ফেলবে? আরে বেঁচে আছি কোথায়? আমি তো বুঝতেই পারছি না আমার অন্যায়টা কোথায়। আমাকে ছাড়া বাকি সবাইকে তোমার কেন ভালো লাগে? কেন আমাকে তোমার সহ্য হয় না?”

অর্ষার হাত মুঠো করে নিজের রাগ কন্ট্রোল করছে।
দর্শন তাচ্ছিল্য হেসে বলল,
“ওহ, আমি তো ভুলেই গেছি তুমি তো আর সেই অর্ষা নেই। সিরিয়াস মুড, ক্যারিয়ারে ফোকাস, এত বড় পোস্টে আছো। বিখ্যাত আর্কিটেক্ট। এখন দৃষ্টি থাকবে উপরের দিকে। নিচের দিকে নয়।”
দর্শন ওকে অপমান করছে। অর্ষা হাতের কফির মগটা ছুড়ে মারল। সেটা ফ্লোরে পড়ে ভেঙে গেল। ভাঙা একটা অংশ ছিটকে দর্শনের হাতের উপর গিয়ে পড়ল। এমনটা দুজনের কেউ-ই আশা করেনি। অর্ষা হতবাক দৃষ্টিতে ওর দিকে চেয়ে আছে। দর্শন আউচ শব্দ করে হাত ঝারা মারল। হাতে দিয়ে গলগল করে রক্ত পড়ছে। অর্ষা ভয় পেয়ে গেল। আতংকিত চোখে ওর হাতের দিকে চেয়ে ডান হাতে মুখ চেপে ধরল। আর মনে মনে বলছে এটা আমি কি করলাম। দর্শন অর্ষার দিকে ব্যথিত চোখে তাকাল। অর্ষা দ্রুত গিয়ে ওর হাত চেপে ধরল। রক্ত বন্ধ করা দরকার। আশেপাশে চেয়ে কিছু না পেয়ে জামার কোণার অংশ তুলে হাতে চেপে ধরল। রক্ত কিছুটা বন্ধ হলো।
অর্ষা অশ্রুসিক্ত চোখে অনুতাপের সুরে বলল,
“আমি ইচ্ছে করে করিনি। সরি।”

দর্শন এতক্ষণ অর্ষার দিকে চেয়ে ছিল। ওর কথার উত্তরে বলল,
“ইচ্ছে করে তো আমরা অনেকেই অনেক কিছু করি না তবুও শাস্তি পেতে হয়।”

অর্ষা ওর ইঙ্গিত বুঝতে পেরেও না বোঝার ভান করে ওর হাতের দিকে চেয়ে কাঁদতে কাঁদতে বলল,
“আমি আসলেই বুঝতে পারিনি।”
ওর গাল বেয়ে পানি পড়ছে। দর্শন নির্বাক ওর গালের উপরের মুক্ত দানার উপরে মোহনীয় দৃষ্টিতে চেয়ে রইল।
“আমি এখুনি ব্যান্ডেজ করে দিচ্ছি।”
অর্ষা তাড়া দেখাল।

দর্শন নিজের হাত ছাড়িয়ে নিয়ে কঠিন গলায় বলল,
“যে আঘাত তোমাকে কাঁদায়, তোমাকে কষ্ট দেয় সে আঘাত কেন দেও?”
অর্ষা নিরুত্তর। দ্রুত চোখের পানি মুছে নিল। দর্শন নিজের হাতের পরোয়া না করে হনহন করে হেঁটে চলে গেল। ওর গাড়ি গেটের বাইরে যেতেই অর্ষা ধপ করে বসে পড়ল। বসে বসে কাঁদতে লাগল। কান্না ছাড়া যেন জীবনে কিছুই নেই।
“আমি তোমাকে অফুরন্ত ভালোবাসা দিতে পারব কিন্তু….. আমি যে নিরুপায়।”
অর্ষা আবারও ডুকরে কেঁদে উঠল।

সেদিনের পর থেকে দর্শনকে আর দেখেনি অর্ষা। একবারের জন্যও আয়ানদের বাড়িতে আসেনি। এনগেজমেন্টের কেনাকাটা করার সময় আসার কথা থাকলেও আসেনি। অর্ষা জানে কেন আসেনি। এভাবে দিন যেতে যেতে এনগেজমেন্টের দিন চলে এল। অর্ষা আজ মন খুলে সাজবে। শপিং মল খুঁজে খুঁজে নিজের জন্য পারফেক্ট একটা ড্রেস এনেছে৷ পার্লার থেকে সেজে এসেছে। খোলা চুলে ওকে বেশ লাগছে। এত মানুষের ভীড়ে চেনা, অতি কাঙ্খিত মুখটা দেখতে না পেয়ে ব্যথিত হলো। ও এক দিকে চায় দর্শন দূরে থাকুক কিন্তু মন মানে না। দর্শনের অনুপস্থিতি ওকে ভীষণ পীড়া দিচ্ছে। মনের ভেতর যে দহন সৃষ্টি হয়েছে তা কেবল মাত্র দর্শনই নেভাতে পারে। অর্ষা বেশ হতাশ হলো যখন দিশার বাড়ির সবাইকে দেখার পরেও দর্শনকে দেখল না৷ এমনকি দর্শনের বন্ধুরাও এসেছে। অর্পা ওকে দেখে চমকে গেলে অর্ষা জানায় আয়ান ওর খালাতো ভাই।
হঠাৎ করে গান অফ হয়ে গেল। তারপর স্লো মিউজিক বাজতে লাগল। সবাই মিউজিক সেকশনের দিকে তাকাল। বিয়ে বাড়ি, কোন পার্টতে সাধারণ এত স্লো মিউজিক বাজে না। অর্ষা ঘুরে হঠাৎ দর্শনকে দেখল। ও হাত দিয়ে চুল ব্রাশ করছে।
হঠাৎ বেজে উঠল ~~~~

কে তুমি? কেন এখানে?
কেন এতদিন পরে?
কে তুমি? কেন এখানে?
কেন এতদিন পরে?
তুমি কী দেবী আমার?
পেছনে ফিরে দেখো তুমি
অপ্রত্যাশিত কোন অতিথি
চোখ ফেরালে বল কেন?
ভয় পেয়েছো, নাকি আরতি
জানি প্রতিটা স্বপ্নে তুমি দেখেছো আমায়
নিরন্তর ছিলে আমারই ছায়ায়
তবে চোখ মেলাতে কী বিরোধ?
ভুল করে একটা বার প্রাচীরটা ভেঙে দেখো
জমে আছে কত কথা ভুল করে বলে দিও
জন্মান্তর যদি মিথ্যে হয়, এই হবে শেষ দেখা
ভালোবাসি কেন যে তোমায় হবে না কখনো বুঝা!
…………

গানের ফাঁকে ফাঁকে অর্পা রুশানের দিকে তাকাচ্ছিল। রুশান অর্পাকে দেখছিল। অর্ষা মাথা নিচু করে বসে ছিল। দর্শন ওর নিচু মাথার দিকে চেয়ে অনেক কিছুই ভাবছিল। মনে হচ্ছে এই গানটা ওর জীবন গাঁথা। ওর কথাই বলছে। অর্ষা হঠাৎ বের হয়ে গেল। ওয়াশরুমে গিয়ে আয়নার সামনে গিয়ে দাঁড়াল। কাঁদতে কাঁদতে বলল,
“আমি কীসের শাস্তি পাচ্ছি? কেন আমাকে এত শাস্তি পেতে হচ্ছে? কেন ভালোবাসার মানুষকে সামনে পেয়েও ছুতে পারছি না বলতে পারছি না ভালোবাসি? এর চেয়ে বড় যন্ত্রণা আর কিছুতে আছে? কেন আমাকে নিঃস্ব করে দিয়েছো? কেন?”
অর্ষা কাঁদতে কাঁদতে ফ্লোরে বসে পড়ল। অনেকটা সময় পাড় হওয়ার পারে অর্ষা মুখ ধুয়ে সবার আড়ালে বের হয়ে গেল। ও আর এক মুহুর্ত এখানে থাকতে পারছে না। ও কাউকে কিছু না জানিয়ে বাড়িতে চলে গেল। এদিকে দর্শন ওকে খুঁজে না পেয়ে অস্থির হয়ে পড়ল। ওয়াচ ম্যানকে জিজ্ঞেস করে জানতে পারল ও চলে গেছে। দর্শন কাউকে কিছু না জানিয়ে অর্ষাকে খুঁজতে চলে গেল। অর্ষা একা বাড়িতে পৌঁছাতে পেরেছে কি-না। ওর জন্য চিন্তা হচ্ছে।
দর্শন আয়ানের বাড়িতে গিয়ে পৌছাল। পুরো বাড়ি নীরব, নিস্তব্ধ। কাজের দুজন লোক ছিল ওরাও প্রোগ্রামে গিয়েছে। দর্শন সোজা অর্ষার রুমে চলে গেল। ওর রুমের দরজা খোলা, আলো জ্বলছিল। দর্শন ভেতরে যেতেই বিছানার উপরে ডায়েরি দেখতে পেল। আর তখনই বাথরুমের ভেতরে ওর উপস্থিতি টের পেল। বুঝতে পারছে না ডায়েরিটা ধরবে কি না। কি ভাবতে ভাবতে ডায়েরিটা তুলে পাতা উল্টাতে লাগল। একটা পাতায় ওর লেখা দুটো লাইন দেখে থমকে গেল।

চলবে……

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here