Sunday, April 19, 2026
Home "ধারাবাহিক গল্প ভুলবশত প্রেম ভুলবশত প্রেম পর্ব-৩৭

ভুলবশত প্রেম পর্ব-৩৭

0
1689

#ভুলবশত_প্রেম
#লেখনীতে:সারা মেহেক

৩৭

আদ্রিশের শেষোক্ত কথা শুনে আমি কিছুক্ষণ ভাবলাম। খুব ভাবলাম। অতঃপর অনুধাবন করলাম, লোকটা খুবই সুযোগ সন্ধানী মানুষ। সুযোগ পেলে আমাকে লজ্জা দিতে মোটেও পিছ পা হবেন না উনি। ইশ! উনার কাছ থেকে কিভাবে লুকিয়ে থাকবো আমি? উনি আমার কাছাকাছি ঘেঁষলেও যে আমি লজ্জায় একদম মিইয়ে পড়ি!

আদ্রিশ চলে যেতেই আমি বিছানা থেকে নেমে দরজা আটকে সুদীর্ঘ কয়েকটা নিঃশ্বাস ছাড়লাম। অতঃপর নিজেকে পুরোপুরি সামলে নিয়ে অগোছালো রুমটা গোছানো শুরু করলাম। আমার পরনের শাড়ীটা সকালের রোদে দেওয়ার জন্য বারান্দায় ছাড়িয়ে রেখে আসলাম। পরনের গহনাগুলো বক্সে ভরে আপাতত আমার আলমারিতে রেখে দিলাম৷ আগামীকাল সকালে আম্মুর হাতে সবগুলো গহনার বক্স দিয়ে এই ঝামেলা থেকে মুক্ত হবো।
এভাবে আমার সকল জিনিসপত্র গুছিয়ে আদ্রিশের শেরওয়ানি গুছানো শুরু করলাম। উনার পরনের শেরওয়ানি গুছাতে বেশ বেগ পেতে হলো আমাকে৷ তবে বেশ কষ্টেসৃষ্টে শেরওয়ানিটা গুছিয়ে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললাম। অতঃপর শেরওয়ানিটা হাতে নিতেই আদ্রিশের ব্যবহারকৃত পারফিউমের ঘ্রাণ আমার নাকে এসে বাড়ি খেলো। কি মনে করে আমি এক ধ্যানে আদ্রিশের শেরওয়ানিটির দিকে চেয়ে রইলাম। মনের অজান্তেই উনার শেরওয়ানির উপর হাত বুলিয়ে দিলাম। উপলব্ধি করলাম, আমার ঠোঁটের কোনে এক চিলতে হাসি ফুটে উঠেছে। ভাবতেই ভীষণ অবাক লাগছে, আজ থেকে এই মানুষটি শুধু আমার। উনার উপর একজন স্ত্রী হিসেবে শুধুমাত্র আমার কর্তৃত্ববোধ থাকবে। হাজার মানুষের ভীড়ে আদ্রিশকে আমি আমার আপন বলতে পারবো। আজ থেকে উনার সাথে সকল সুখ দুঃখ ভাগ করবো। উনার মাঝে নতুন করে নিজের অস্তিত্ব খুঁজে নিবো। আমার সকল ভালোবাসা, ইচ্ছা-অনিচ্ছা উনাকে ঘিরেই আবর্তিত হবে। অদ্ভুত! কবুল বলার মাধ্যমেই উনি সম্পূর্ণরূপে আমার হয়ে গেলো! আমার বাকিটা জীবনের সাথী হয়ে গেলো। আমার বুড়ো বয়সের সঙ্গী হয়ে গেলো। আচ্ছা? উনি যে আমায় এতো ভালোবাসেন,আমি কি উনাকে এতো ভালোবাসতে পারবো? হয়তো হ্যাঁ বা হয়তো না। আচ্ছা? উনাকে কতোটা ভালোবাসতে পারি, তা কি চেষ্টা করা উচিত? উচিত হয়তো। তবে এ চেষ্টায় হয়তো আমি এক পর্যায়ে হেরে যেতে পারি৷ কারণ আদ্রিশের ভালোবাসা আমাকে জিততে দিবে না মনে হয়।

আমি কিছুক্ষণ আদ্রিশের শেরওয়ানিটির দিকে চেয়ে থেকে চোখজোড়া বন্ধ করলাম। অতঃপর উনার শেরওয়ানিটা জড়িয়ে ধরে উনাকে অনুভব করার চেষ্টায় মত্ত হলাম।

সকালে ঘুম থেকে উঠতে অনেক দেরি হয়ে গেলো আমার৷ এ কারণে আম্মুর বকা শুনতে শুনতে কোনোরকমে নাকেমুখে নাস্তা দিয়ে কলেজের উদ্দেশ্যে বেরিয়ে পড়লাম। পথিমধ্যে আদ্রিশের হালচাল জিজ্ঞেসের জন্য দুবার কল করলাম। কিন্তু উনি কল রিসিভ করলেন না। তৃতীয়বারে কল করার সিদ্ধান্ত নেওয়ার পূর্বেই আমি কলেজে চলে এলাম৷ অতঃপর ফোনটা সাইলেন্ট করে ক্লাসে ঢুকে পড়লাম।
.
আজ ঠিক ঠিক দুটো ত্রিশে ক্লাস শেষ হয়েছে৷ গতকাল রাতের অপর্যাপ্ত ঘুম, আজ সকালে মস্ত তাড়াহুড়ো করে আসা, সব মিলিয়ে আবারো আজকে ক্লান্ত হয়ে গেলাম। ধীরেসুস্থে হাঁটতে হাঁটতে কলেজ গেটের সামনে দাঁড়ালাম। রাস্তার ওপারে দৃষ্টি দিয়ে কেনো যেনো মনে হলো, আদ্রিশ হয়তো আমাকে নিতে আসবেন। আচ্ছা? সত্যিই কি উনি আমাকে নিতে আসবেন। না কি শুধু শুধু আমি উনার উপর প্রত্যাশা করে আছি?
এ মনে করতে করতে আমি ব্যাগ থেকে ফোন বের করে উনাকে ফোন দিতে উদ্যত হলাম। এজন্য যে, উনি আমাকে সত্যিই নিতে আসবেন না কি এটা আমার কোনো প্রকারের ভ্রম?
ফোনের স্ক্রিন অন করতেই দেখলাম, আদ্রিশ সকাল দশটার দিকে আমাকে একবার কল করেছিলেন। উনার কল দেখে আমি উত্তেজিত হয়ে তৎক্ষনাৎ কল ব্যাক করার সিদ্ধান্ত নিলাম এবং কল ব্যাকও করলাম। কিন্তু ওপাশে আদ্রিশের কোনো সাড়া পাওয়া গেলো না৷ একবার, দুবার, তিনবার। অতঃপর আমি আশাহত হয়ে ফোনটা তার যথাস্থানে রেখে দিয়ে রিকশায় উঠলাম। অনুধাবন করলাম, কিছুক্ষণ পূর্বের ভাবনাটা আজকের জন্য অপূরণীয় একটা ভাবনা ছিলো, ভ্রম ছিলো। অতিরিক্ত প্রত্যাশা ছিলো।

সন্ধ্যা পেরিয়ে রাত আটটা বাজতে চললো। অথচ আদ্রিশের কোনো খোঁজ খবর নেই। প্রবাহমান সময়ের সংখ্যা বৃদ্ধির সাথে সাথে বৃদ্ধি পেতে লাগলো আমার অভিমান৷ আদ্রিশের প্রতি আমার অভিমান। যা আমার জন্য একদম নতুন৷ হয়তো
অভিমানের এ অনুভূতিটা নতুন বলেই অভিমানের পাল্লাটা ভারী হলো। ভীষণ ভারী। প্রচণ্ড অভিমানে সিদ্ধান্ত নিলাম, উনাকে আর কল করবো না৷ এমনকি উনি কল করলেও রিসিভ করবো না৷ রিসিভ করবোই বা কেনো? বিয়ের দ্বিতীয় দিনেই কাজের চাপে যে মানুষটা সদ্য বিবাহিতা বউকে ভুলে যায় তার কল কেনো রিসিভ করবো আমি? তার সাথে কেনো কথা বলবো আমি?
আজ আদ্রিশের এ উপেক্ষায় হাড়ে হাড়ে টের পেলাম সেই বাণীর সত্যতা, ‘প্রেম ভালোবাসা বিয়ের আগেই সুন্দর। বিয়ের পরে মানুষটা তোমার হয়ে গিয়েছে৷ এখন তাকে ভালোবাসা দাও বা না দাও। সে তো তোমার কাছেই থাকবে। ‘
তাহলে কি আদ্রিশও আমাকে আর ভালোবাসবেন না? কাজের চাপে আমাকে ভুলে যাবেন? না কি আমি বেশিই ভেবে ফেলছি? উফ! আজ যা হওয়ার হয়ে যাক। আদ্রিশের সাথে আমি কথা বলবো না মানে কথা বলবো না। আজ উনার মিষ্টি কথায়ও আমি গলবো না।

আকাশসম অভিমান ও ক্ষোভ নিয়ে জোরপূর্বক পড়ার টেবিলে বসলাম। কিন্তু লাভ হলো না কিছুই। আমার সামনে ঠিকই বইটা খোলা রইলো। কিন্তু আমার মাথায় চলতে লাগলো আদ্রিশের কাজ ও কথা। সত্যিই উনি আমাকে পাগল বানিয়ে ছাড়বেন। উনি আমাকে এমন বানিয়ে দিয়েছেন যে, উনার জ্বালা সহ্য করার ক্ষমতাও আমার নেই। আবার উনার এই জ্বালা ছাড়া বেঁচে থাকার উপায়ও জানা নেই। কি মুসিবত! আমাকে উনি উভয় সংকটে ফেলে দিয়ে গেলেন!

এই ভাবতে ভাবতে আচমকা আমার ফোনটা বেজে উঠলো। তৎক্ষনাৎ আমার ঠোঁটের কোনে হাসি ফুটে উঠলো। মনে জানালায় উঁকি দিলো প্রজ্জ্বলিত একটি নাম, আদ্রিশ। নিশ্চয়ই আদ্রিশ ফোন করেছেন। অবশেষে উনার সদ্বুদ্ধি হলো। হলে কি! আমি কল রিসিভ করে চুপটি করে বসে থাকবো। উনার উপর বিশাল অভিমান দেখাবো। তারপর কিছু সময়ে গেলে আমি স্বাভাবিক হবো। এই ভেবে আমি ফোনটা হাতে নিলাম। কিন্তু এ কি! স্ক্রিনে তো আদ্রিশের নাম উঠেনি। আননোন একটা নাম্বার থেকে কল এসেছে। মুহূর্তেই আমার সব প্রত্যাশা ভেঙে চুরমার হয়ে গেলো। উদাস মুখে উপায়ন্তর না পেয়ে কল রিসিভ করলাম আমি। ওপাশে ভদ্রতার সহিত একজন বলে উঠলো,
” ম্যাম, আপনার নামে একটি পার্সেল এসেছে। আপনার দরজার সামনেই দাঁড়িয়ে আছি আমি। অনুগ্রহ করে পার্সেলটা রিসিভ করুন। ”

ডেলিভারি বয়ের এহেন কথায় আমি ভীষণ অবাক হলাম। কারণ আমি তো কোনো ওর্ডার করিনি৷ তাহলে পার্সেল এলো কোথা থেকে?
এ নিয়ে অংক কষতে কষতে আমি দরজা খুলে পার্সেল রিসিভ করলাম। ডেলিভারি বয় আমার হাতে একটি ভারী বক্স এবং একটি বুকে ধরিয়ে দিয়ে চলে গেলো। এদিকে আব্বু রুম থেকে জিজ্ঞেস করলো, কে এসেছে। আমি ছোট্ট করে উত্তর দিলাম, ডেলিভারি বয়। আব্বু প্রত্যুত্তর করলে না।

আমি রুমে এসে দরজা আটকে ভারী বক্সটা রেখে বুকেটা দেখলাম। বুকের এক কোনায় একটি বেশ ভারী ধরণের একটি কাগজ দেখলাম। কাগজটি হাতে নিতেই আমার মনে সন্দেহের সূচনা ঘটলো। নিশ্চয়ই এটা আদ্রিশ পাঠিয়েছেন।
আমি সন্দেহবশত কাগজটি খুললাম। চিঠির খামের মতো কাগজটিতে পরপর তিনটি কাগজ ভাঁজ করা। তন্মধ্যে প্রথম কাগজটি খুলতেই দেখলাম গোটা গোটা অক্ষরে লিখা,
” জলদি করে ব্যালকনিতে চলে আসো মিশমিশ। কোনো এক্সকিউজ দেখাবে না৷ আর আমার কথার অবাধ্য হওয়ার চেষ্টা তো মোটেও করবে না৷ করলে, এক্ষুণি তোমাদের বাসায় চলে আসবো।”

তীব্র অনিচ্ছা থাকা সত্ত্বেও আমি খামটি নিয়ে ব্যালকনিতে দাঁড়ালাম৷ দৃষ্টি সামনে নিক্ষেপ করতেই আদ্রিশের আবছা চেহারা দৃষ্টিগোচর হলো। উনাকে দেখে আমার মনে অভিমানের বিশাল পাহাড় এসে খাঁড়া হয়ে দাঁড়ালো। ফলে বিন্দুমাত্র হাসিও ফুটলো না আমার মুখশ্রীতে। এদিকে আদ্রিশ এরূপ আমাকে দেখে দূর হতে নিজের দু কান ধরে চেহারায় অসহায় ভাব ফুটিয়ে তুললেন। ইশারায় ভাবভঙ্গি এমন দেখালেন যে, উনাকে যেনো আমি ক্ষমা করে দেই। কিন্তু আমি এবার নাছোড়বান্দা হলাম। উনাকে যে কিছুতেই ক্ষমা করবো না। ফলে আমি ভেঙচি কেটে উনাকে না করে দিলাম। আদ্রিশ পুনরায় চেহারায় কিউট ধরনের ভাব ফুটিয়ে আমার কাছে ক্ষমা চাইলেন। কিন্তু আমি আবারো ভেঙচি কাটলাম। এবার আদ্রিশ ভান করে সুদীর্ঘশ্বাস ছাড়লেন। অতঃপর উনি ক্ষণিকের জন্য চিন্তাভাবনা করে ঠোঁটের উপর দু আঙুল চওড়াভাবে রেখে হাসির প্রতিক দেখিয়ে ইশারায় হাসতে বললেন আমায়। কিন্তু আমি ভাবলেশহীন রূপে উনার এ কীর্তিকলাপ দেখলাম। বেশ কিছুক্ষণের প্রচেষ্টার পরও যখন উনি আমায় হাসাতে ব্যর্থ হলেন তখন ইশারায় বললেন, খাম হতে এর পরের কাগজটি দেখতে। প্রথম দফায় আমি রাজি না হলেও যখন উনি দু হাত জোড় করে আমায় কাগজটি খুলে দেখতে বললেন, তখন আমি খানিক ভাব দেখিয়ে কাগজটি খুললাম। সেখানে গোঁটা গোঁটা অক্ষরে লেখা রয়েছে,
” নবীন যুগের ডাকপিয়ন হয়ে হৃদয়ে খচিত অনুভূতিগুলো পত্রে নিঙরে তোমার নামে বিলি করলাম মাধবীলতা। অনুগ্রহপূর্বক তোমার প্রেমে মত্ত এই পাগল প্রেমিকের অনুভূতিগুলো গ্রহণ করবে কি তুমি?”
®সারা মেহেক

#চলবে
( বেশ অসুস্থ থাকায় গল্প লেখা সম্ভব হয়নি আমার জন্য।
এবার আজকের পর্ব পড়ে বলুন কেমন হয়েছে। না বললে আপনাদের উপর বড্ড অভিমান করবো আমি😒)

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here