মন_তুমি_ছুঁয়ে_দেখো_না পর্ব ৮

#মন_তুমি_ছুঁয়ে_দেখো_না
#সাদিয়া_জাহান_উম্মি
#পর্বঃ০৮
অথৈর ভীষণ মন খারাপ।কারন গতকাল ইহান বাড়িতে আসেনি।আর সেটা যে ওর সাথে রাগ করেই আসেনি।তা বেশ ভালোভাবেই বুঝতে পেরেছে অথৈ।অথৈকে মন খারাপ করতে দেখে পিহু বলে উঠল,
‘ এভাবে মুখটা হুতুম পেঁচার মতো করে না থেকে।গিয়ে রুদ্রিক ভাইয়া আর ইহান ভাইয়ার কাছ থেকে ক্ষমা চেয়ে নেহ।তাহলে দেখবি সব ঠিক হয়ে গিয়েছে।’

অথৈ গোমড়ামুখে বলে,
‘ কিভাবে যাবো তাদের সামনে?কোন মুখে যাবো?আমার ভীষণ লজ্জা লাগছে।অনেক বড় অন্যায় করে ফেলেছি আমি।’

রিধি অথৈর কাঁধে হাত রেখে চোখের ইশারায় আশস্ত করে বলে,
‘ কিছু হবে না।আমরা আছি তো।’

আহিদ আর প্রিয়ানও সায় জানালো।অথৈ শ্বাস ফেলল।এখন উপায় একটাই।রুদ্রিকের কাছে ক্ষমা চাওয়া।রুদ্রিক ওকে মাফ করে দিলে ইহানও আর ওর সাথে রেগে থাকবে নাহ।মনে মনে সবটা ঠিক করে নিয়ে উঠে দাঁড়ালো অথৈ।তারপর ঘাড় ঘুরিয়ে ওদের দিক তাকিয়ে বলে,
‘ আমি যাবো।তোরাও কিন্তু আমার সাথে সাথে থাকবি।’

সবাই ঘাড় কাত করে সম্মতি দিল।

____________
নার্ভাসন্যাসে ঘামছে অথৈ।দুহাত ক্রমাগত ঘষে যাচ্ছে।এটা ওর স্বভাব।পিছন থেকে রিধি,পিহু,প্রিয়ান আর আহিদ ওকে উৎসাহ দিয়ে যাচ্ছে সামনে এগিয়ে যেতে।
ওদের জ্বালাতনে অথৈ রেগে তাকাল ওদের দিকে।তারপর বলে,
‘ এমন করছিস নে তোরা?এসব করে আমার নার্ভাসন্যাস আরোও বাড়িয়ে দিচ্ছিস বেয়া’দপ গুলো।’

প্রিয়ান ঘাড় চুলকে বলে,
‘ তাহলে কি করব?’
‘ আমি যেখানে যাবো শুধু আমার পিছনে পিছনে আসবি মাথামোটা কোথাকার।’

রিধি বলল,
‘ আর কথা বাড়াস না তো অথৈ।তুই যা।’

ভার্সিটির বড় কৃষ্ণচূড়া গাছের নিচে বাইকে বসে বসে সিগারেট টানছে রুদ্রিক।বাকিরাও ওর সাথে আছে।ইহান,নীল,সাফাত আর অনিক।সাফাত মুখ ফুলিয়ে বসে আছে।কারন কাল ওর অযথা রাগারাগির কারনে কেউ ওর সাথে কথা বলছে না।ইহানের মুড খারাপ।কারন কাল অথৈকে ওভাবে চড় মেরে এখন ওর নিজেরই যেন কলিজা ছি’ড়ে যাচ্ছে।ইহানকে এমন গোমড়ামুখ করে বসে থাকতে দেখে রুদ্রিক গম্ভীর গলায় বলে,
‘ আমার সামনে এইভাবে মুখ লটকিয়ে থাকবি না।কাল পাকনামি করে কেন গিয়েছিলি ওকে মারতে?আমি কি পারতাম না ম্যানাজ করতে?তার আগেই নিজে একেবারে মেরে ধরে রাজা ধীরাজ হয়েছে।এখন নিজেই এমন ভ্যাবলার মতো বসে আছিস।জাস্ট অসহ্যকর।’

রুদ্রিকের এমন কথায় ইহানের মুখটা আরও ছোট হয়ে গেল।বিরক্তর মুডে একটানে সিগারেটটা টেনে শেষ করে আবার একটা ধরালো।ওর বিরক্তিকে আরোও বাড়িয়ে দিতে এসে হাজির হলো জেনি,সিয়া,মারিয়া।জেনি গিয়েই রুদ্রিকের কাছে গিয়ে দাঁড়াল।তারপর বলে,
‘ কাল কোথায় ছিলে তুমি রুদ্র?আমি তোমায় কোথায় কোথায় খুঁজেছি।’

রুদ্রিক ওর দিকে না তাকিয়ে ভারি স্বরে বলে,
‘ আমার নাম রুদ্রিক।যদি আমার নাম ভালোভাবে ডাকতে না পারিস।তাহলে ডাকবি না।’
‘ বাট এটা তো আমি আদর করে ডাকি।’
‘ বাট আই হেইট দিস।’

জেনি মুখটা একটুখানি করে বলে,
‘ আচ্ছা ডাকবো না।এখন শোনো মম না তোমায় একবার আমাদের বাড়িতে যেতে বলেছে।’
‘ পারব না যেতে।’
‘ ওহ কাম ওন রুদ্রিক।এমন করে বলছ কেন?’

রুদ্রিক চোয়াল শক্ত করে বলে,
‘ জেনি এমনিতেই মন মেজাজ খারাপ।আর আমাকে বিরক্ত করো নাহ।জাস্ট লিভ।’

জেনি আবার কিছু বলতে নিবে তার আগেই রুদ্রিক ধমকে উঠল,
‘ জাস্ট গো এওয়ে।’

জেনি ভয়ে পেয়ে সরে গেল।সিয়া এসে জেনির পাশে দাঁড়াল।জেনি আর সিয়া প্রায় একই ধাঁচের।তবে মারিয়া ওদের থেকে ভিন্ন।ওদের সাথে বন্ধুত্ব করেছে।এখন না চাইতেও ওদের সজ্ঞ ছাড়তে পারে না।মারিয়া চুপচাপ আরেক পাশে দাঁড়িয়ে আছে।নীল এসে ওর পাশে দাঁড়াল।মারিয়া সেটা টের পেতেই পিটপিট করে তাকাল।নীল মুঁচকি হেসে বলে,
‘ কাল আসো নি কেন?’

নীল ওর এতোটা কাছে দাঁড়াতে মারিয়ার বুক ধুকপুক করতে লাগল।হৃদস্পন্দন বেড়ে গিয়েছে।কাঁপা গলায় মারিয়া বলে,
‘ এম..এমনি ভা..ভালো লাগ..লাগছিলো নাহ।’
‘ কাঁপছ কেন?’
‘ কোথায় কাঁপছি?’

নীল মুঁচকি হাসল।ও কাছে আসলেই যে মেয়েটার কাঁপাকাঁপি বেড়ে যায় তা খুব ভালোভাবেই জানে।নীল ধীর স্বরে বলে,
‘ কাল ফ্রি আছ?’

হঠাৎ এমন প্রশ্নে অবাক হয়ে তাকায় মারিয়া।প্রশ্ন করল,
‘ কেন?’
‘ আগে বলো ফ্রি আছ কিনা।’
‘ আছি।’
‘ কাল সকাল সকাল তৈরি থেকো।তোমাদের বাড়ির সামনে আসব আমি তোমায় নিতে।ঠিক সকাল নয়টায়।মনে থাকে যেন।’

কথাগুলো বলেই সরে গেল নীল।নাহলে দেখা যাবে এই মেয়ে কাঁপতে এখানেই পরে যাবে।এইদিকে মারিয়ার সারা মুখে লালাভ আভা ছড়িয়ে পরেছে।ঠোঁটের কোণে লজ্জাতুর হাসি।ও জানে নীল ওকে ভালোবাসে।ও নিজেও নীলকে ভালোবাসে।কিন্তু লজ্জার কারনে ও বলতে পারে না ওর মনের কথা।তবে নীল আজ যা বলল তাতে মনে হচ্ছে কাল নীল ওকে প্রপোজ করবে।এতোদিন এই দিনটারই অপেক্ষায় ছিল মারিয়া।অবশেষে কাঙিত সময় এসেই পরেছে।উত্তেজনায় বুক কাঁপছে ওর।শুধু কালকের জন্যে এখন অপেক্ষা।
—–
কাচুমাচু করে রুদ্রিকের সামনে এসে দাঁড়াল অথৈ।পিছনে রিধি,পিহু,প্রিয়ান আর আহিদ।এদিকে ইহান,সাফাত,নীল আর অনিক তাকিয়ে আছে ওদের দিকে।ইহান বোনের কান্ড কারখানা দেখছে।তবে কিছু বলছে না।ও দেখতে চায় অথৈ ঠিক কি করতে পারে।
অথৈ অনেকক্ষন যাবত হাশফাশ করছে রুদ্রিকের সাথে কথা বলার জন্যে।কিন্তু বলতে পারছে না।রুদ্রিক ওর এমন মোচড়ানো দেখে গম্ভীর গলায় বলে,
‘ আমার সামনে দাঁড়িয়ে এইভাবে সাপের মতো মোচড়াচ্ছে কেন?’

রুদ্রিকের এহেন কথায় অথৈ আরোও নড়েচড়ে দাঁড়ায়।তারপর আঁড়চোখে ইহানের দিকে তাকায়।ইহান এতোক্ষন ওর দিকেই তাকিয়েছিল।অথৈ তাকাতেই ইহান দ্রুত দৃষ্টি সরিয়ে নেয়।এদিকে ইহানকে এইভাবে ওর থেকে মুখ ঘুরিয়ে রাখতে দেখে অথৈ করুন চোখে তাকায় ভাইয়ের দিকে।যেভাবেই হোক রুদ্রিকের কাছে ক্ষমা চাইতেই হবে।অথৈ মনে মনে সাহস জোগাড় করে বলে উঠল,
‘ আস..আসলে…ভাইয়া। আসলে হয়েছে কি…!’

অথৈকে থামিয়ে দিয়ে রুদ্রিক ভ্রু-কুচকে বলল,
‘ আসলে নকলে না করে সোজা কথায় আসো।এভাবে আমার সামনে তোতলাবে নাহ।’

অথৈ রুদ্রিকের এমন এটিটিউট দেখে ওর রাগ লাগছে।এইভাবে তিতা করলার মতো কথা বলার কি আছে আজব?একটু ভালোভাবে কথা বলা যায় নাহ?পরক্ষণে আবার ভাবে রুদ্রিকের থেকে ভালো ব্যবহার আশা করা আসলে বোকামি।ও যেই জঘন্য ব্যবহার রুদ্রিকের সাথে করেছে।সেই তুলনায় রুদ্রিক বেশ ভদ্র ব্যবহারই করছে ওর সাথে।অথৈ কণ্ঠে জোড় এনে বলল,
‘ আসলে ভাইয়া সেদিন কিছু না জেনেই আপনার সাথে ওরকম ব্যবহার করা আমার উচিত হয়নি।আমি নিজের ব্যবহারের জন্যে খুবই লজ্জিত।আমাকে ক্ষমা করে দিবেন ভাইয়া।আমি ভীষণ লজ্জিত।’

রুদ্রিক বাঁকা চোখে তাকাল অথৈর দিকে।পরক্ষণে ভ্রু উঁচু করে বলে
‘ আর যদি বলি আমি তোমায় ক্ষমা করব নাহ,তাহলে?’

অথৈ রুদ্রিকের কথায় বেশ ঘাবড়ে যায়।ইহানের দিকে তাকিয়ে বলে উঠল,
‘ ক্ষমা আপনাকে করতেই হবে।’
‘ মগের মুল্লুক নাকি?এখন কি আমার কাছ থেকে তুমি জোড় করে ক্ষমা চেয়ে নিবে?ক্ষমা করতে হয় মন থেকে।’
‘ প্লিজ ভাইয়া ক্ষমা করে দিন না।আপনি যা বলবেন আমি তাই করব।তাও আমায় ক্ষমা করবেন।’

অথৈর এই কথায় রুদ্রিকের ঠোঁটের কোণে বাঁকা হাসি ফুটে উঠল।অথৈর দিকে তীর্ছা চোখে চেয়ে বলে,
‘ আমি যা বলব তাই করবে?’

অথৈ ভয় পেয়ে গেল একটু।লোকটা এমন করে বলল কেন?নিজের কথায় কি এখন নিজেই ফেসে যাবে না কি? অথৈ আমতা আমতা করে বলে,
‘ হ…হ্যা আপনি যা বলবেন তাই করব।’

রুদ্রিকের ইহানের দিকে তাকাল।ওকে উদ্দেশ্য করে বলে,
‘ কিরে ইহান?শুনেছিস তোর বোনের কথা?এখন আমি যা বলব ও না কি তাই করবে।কিরে কি বলিস?’

ইহান জানে রুদ্রিক এমন কিছুই করবে না যাতে ওর বোনের সম্মানহানি হয়।রুদ্রিককে ও প্রচন্ড বিশ্বাস করে।ইহান চোরা চোখে অথৈর দিকে তাকিয়ে বলে উঠে,
‘ দোষ যেহেতু ও করেছে।তাই যা শাস্তি দেওয়ার তুই দিতে পারিস।আর আমি এটাও জানি তুই এমন কিছুই করবি না যেটা আমি পছন্দ করব নাহ।’

রুদ্রিক অথৈকে উদ্দেশ্য করে বাঁকা হেসে বলে,
‘ আগামী এক সপ্তাহ আমি যা বলব তুমি তাই করবে।আজ পর্যন্ত কেউ সাহস করেনি কেউ আরিহান রুদ্রিকের কলারে হাত দেওয়ার সেটা তুমি করেছ।এখন আমি যা বলব তুমি তাই করবে।তবে ভয় নেই আরিহান রুদ্রিক এমন কোনো কিছুই করবে না যাতে তোমার সম্মানহানি হয়।এটা তোমার আর ইহানের কাছে আমার ওয়াদা।’

অথৈ হা করে তাকিয়ে আছে রুদ্রিকের দিকে।এই লোক যে এইভাবে তাকে ফাসিয়ে দিবে কল্পনাতেও ভাবতে পারেনি ও।অথৈ বলে উঠল,
‘ তাই বলে এক সপ্তাহ?’
‘ হ্যা এক সপ্তাহ।রাজি থাকলে বলো।নাহলে নেই।’
‘ আ…আচ্ছা আমি রাজি।’

রুদ্রিক শয়তানি হাসি হেসে মনে মনে বলে,
‘ এটা তো শুধু বাহানা।এক সপ্তাহ না।তোমাকে সারাজীবনের জন্যে আমার কাছে রাখার ব্যবস্থা করব আমি।একবার যে মেয়ে রুদ্রিকের চোখের দিকে তাকিয়ে রুদ্রিকের কলার ধরার সাহস দেখিয়েছে।সেই মেয়েকে আমি রুদ্রিক কোনোদিন হাতছাড়া করব নাহ।তোমাকে তো এই আমার হতেই হবে।যে করেই হোক।’

#চলবে_________
কাল অনেকটা ক্লান্ত হয়ে পরেছিলাম। তাই লিখতে পারিনি।ক্ষমা করবেন আমায়।আপনাদের অপেক্ষা করানোর জন্যে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here