অতঃপর_প্রেমের_গল্প❤ পর্ব___২৮

অতঃপর_প্রেমের_গল্প❤
পর্ব___২৮
#কায়ানাত_আফরিন
সাতগাঁওয়ের এই রাস্তাটি সম্পূর্ণ পিচঢালাই পথ না। অল্প একটু এগোনোর পরেই কাচা রাস্তা চোখে পড়ে। ফারহানকে অগত্যাই একটা নিরাপদ জায়গায় নিজের গাড়ি থামিয়ে দিতে হলো। সামনে বনপথ। দু’ধারে নানাজাতের গাছের মাঝ দিয়ে প্রশস্ত মাটির রাস্তা। সেও যেন এক অনন্য দৃশ্য। ফারহান গাড়িটা থামালো পিচঢালাই রাস্তার শেষ সীমানায় ঠিক একটি টং দোকানের সামনে। এখানে বনপথের অন্তিমে একটা সুন্দর বিল আছে বিধায় প্রায়শই নানা ধরনের লোকজন এখানে আসে। তবে পথটি দুর্গম পথ হওয়াতে বেশিরভাগ সময়ই আসে যুবকরা।তাই দোকানটা দুর্দান্তভাবে না চললেও বাংলাদেশ পর্যটন কেন্দ্রের নির্দেশনায় দোকানটি নিয়মিত চালু রাখা হয়। ফারহান গাড়ি থেকে নামলো এবার। সেই সাথে নামলো আফরাও। গাড়ি থেকে এক সুঠাম দেহের শ্যামবর্ণের যুবককে বেরিয়ে আসতে দেখে দোকানে থাকা মধ্যবয়ষ্ক লোক অবাক চাহিনী নিক্ষেপ করলো তাদের দিকে। যুবকটির চেহারা পরিচিত মনে হলো তার কাছে। স্মৃতিচারণ করার পর যেই না তাকে চিনতে পারলো উঠে বসলো লোকটি। সসম্মানে বললো,

-‘সালাম নিবেন ভাই! কেমন আছেন?’

-‘এইতো ভালো। আপনি?’

ফারহানের কাছে এমন সাক্ষাত নতুন কিছু না। নিয়াজি সাহেবের সাথে পার্টিতে যুক্ত হওয়ার পর থেকে গোটা শ্রীমঙ্গল , মৌলভীবাজার , সুনামগন্জের আনাচে কানাচে সবজায়গাতেই ‘কমরেড ফারহান জুবায়েরকে’ এক নামে চিনে সবাই। সেই শ্রদ্ধাভক্তির সাথে ভয়ও আছে সবার মনে। কেননা একজন কমরেড হিসেবে ফারহান যেমন উদার , পলিটিশিয়ান হিসেবে ততটাই সে দাম্ভিক। মধ্যবয়স্ক লোকটি এবার জিঙ্গেস করলো,

-‘আইজ হঠাৎ এখানে আইসেন যে ভাই? কোনো দরকারে আইসেন?’

-‘এখানে সচরাচর মানুষ যে কারনে এসেছে সে কারনেই এসেছি।’

গম্ভীর কন্ঠে বললো ফারহান। মধ্যবয়স্ক লোকটি এবার আফরার দিকে তাকালো। আফরার সেদিকে খেয়াল নেই। সে একমনে আশপাশ দেখছে আর তা ক্যামেরাবন্দী করছে। রৌদ্দুরের তাপ থেকে বাচার জন্য মাথায় পড়ে নিয়েছে কালো ক্যাপ। লোকটি মেকি হেসে বললো,

-‘এটা কে ভাইজান? আপনার বউ নাকি?’

শুকনো কাশি কাশলো ফারহান এ কথা শুনে। আফরাও এবার তাকারো বিস্ময়ে। এটাই ভাবছে যে লোকটি এমন ধারনা পোষণ করলো কেনো? পরে নিজ থেকে অনুসন্ধানের পর দেখলো যে ফারহানের সচরাচর মেয়েদের সাথে মেলামেশাটা কম । তাই হয়তো এমন ভেবেছে। ফারহান এবার বললো,

-‘সেটা আপনার না ভাবলেও চলবে। এই চাবিটা নিন।আমরা বিলে যাচ্ছি। ফিরে আসতে ঘন্টাখানেক সময় লাগবে। ততক্ষণ গাড়ি পাহারা দিবেন।’

কথাটি বলেই ফারহান নিজের প্রয়োজনীয় সরন্জাম নিয়ে মাছ ধরার উদ্দশ্যে গেলো। আফরাও সাহায্য করলো ওকে। লোকটি আফরাকে দেখে মিনমিনয়ে বললো,

-‘আজকাল মাইয়া মাইনষে গো পোষাক আশাক বুঝিনা। সিনেমার নাইকা গো মতো পোষাক পইরা আইসে।’
.
.
___________________________

নীল আকাশটা স্বচ্ছ। সাদা মেঘের ভেলা সমগ্র বিলটাকে এক অনন্য সৌন্দর্যে মাতিয়ে তুলছে। অদূরেই বিশাল বিশাল গাছ। বর্ষাকাল হওয়াতে একধারে শাপলা ফুলগুলো অপরূপ লাগছে। ফারহান ঘাসের নরম আস্তরণে বসে বড়শি সেট করতে ব্যস্ত হয়ে পড়লো। হাটু ভেঙে বসে আফরাও তা দেখতে থাকলো মনোযোগ সহকারে। হঠাৎ আফরা আঙুল দেখিয়ে বিশাল গাছগুলোকে দেখিয়ে বললো,

-‘এগুলো কি গাছ ফারহান?’

ফারহান বড়শি থেকে চোখ সরিয়ে তাকালো সেদিকে। তারপর আবার কাজে মনোনিবেশ করে বললো,

-‘আপনার তো এটা পারার কথা। কেননা আমি যতটুকু জানি এ ধরনের গাছ অ্যামেরিকাতেও আছে।’

আফরা চোখ বড় বড় করে ফেললো এ কথা শুনে। বললো,

-‘কি বলছেন আপনি? আমি তো কখনোই এমন গাছ দেখিনি।’

ফারহান হাসলো কিঞ্চিত। তারপর মৃদু স্বরে বললো,

-‘এগুলো এক ধরনের পাইন গাছ। পাইন গাছের অনেক ধরনের জাত আছে। অ্যামেরিকায় যেগুলো আছে ওই জাত আর এই জাত এক না। এই গাছগুলো মূলত সাউথ এশিয়াতেই বেশি দেখা যায় যেমন বাংলাদেশ , মিয়ানমার , শ্রীলঙ্কা।’

-ওহ্ আচ্ছা।

ফারহান এবার ব্যাগ থেকে ছোট পলিথিন বের করলো। সেখানে বেশ কিছু ধরনের পোকা দেখা যাচ্ছে। ফারহান সেটা বড়শির আগায় লাগানোর চেষ্টা করতেই আফরা আৎকে বললো,

-‘এই ধরনের বড়শিগুলো কোথা থেকে কিনেছেন আপনি?’

-‘কেনো ? আমি নিজে বানিয়েছি এটা।’

আফরা তাজ্জব হয়ে গেলো এ কথায়।যেন ফারহানের এ কথাটা সে বিশ্বাস করতে পারছে না। তাই আবার বললো,

-‘ইজ ইট ট্রু? আই কান্ট বিলিভ।’

-‘বিলিভ না করার মতো কি আছে। এই ধরনের বড়শি তো আর কোনো সুপারশপে পাওয়া যায় না। তাছাড়া এখানে আশেপাশে কোনো মাছ ধরার সরন্জামের দোকানও নেই। কিনতে গেলে সিলেট রেলওয়ে স্টেশনের কাছে যেতে হয়। তাই আমি ছোটবেলা থেকেই এসব বানানো শিখে নিয়েছি।’

কথাবার্তার এক পর্যায়ে ফারহান বললো,

-‘নৌকায় উঠলে ভয় পাবেন না তো?’

-‘নওকা কি?’

ফারহান থম মেরে বসে রইলো। এই মেয়ে নৌকা নাম বোধহয় এই প্রথমই শুনেছে। ফারহান কিছুটা ভাবুক না হয়ে পারলোনা। কেননা আফরার মাদার ল্যাঙগুইজ ইংরেজী হলেও বাংলাতে ও যথেষ্ট দক্ষ। তাই এই ছোট শব্দটা না পারাতে ফারহান তপ্তশ্বাস ছেড়ে বললো,

-‘নওকা না আফরা নৌকা। আই মিন টু সে বোট , BOAT । বুঝেছেন?’

আফরা চট করে ধরে ফেললো শব্দটি। বলে ওঠলো,

-হুম বুঝেছি। আমি উঠবো বোট এ। ভয় পাবো না।’

নৌকায় প্রথমে ফারহান উঠে মাঝির জায়গাটিতে বসে পড়লো। এর পরই উঠলো আফরা। আলকাতরার গন্ধে কেমন যেন গা গুলিয়ে আসছে আফরার। তবুও ভালোলাগছে এখানে সময় কাটাতে।নৌকাটা বিলের ঠিক মাঝ বারবর নিয়ে এলো ফারহান। দূর দূরান্তে শুধু পানি আর পানি। নীল আকাশের সাথে বিলের ঘোলাটে পানি সর্বোপরি মাদকময় করে তুলছে সর্বত্র। বাংলাদেশের এই পরিবেশে ফিশিংয়ের আফরা এক ভিন্ন অভিজ্ঞতা অর্জন করলো। ভিন্ন দেশ , ভিন্ন সরন্জাম, ভিন্ন আবহাওয়া সাথে মোহনীয় মানুষ। যার এক নজরে নিমিষেই ঘায়েল হয়ে যাওয়ার ক্ষমতা রাখে। রৌদ্দুরের প্রভাবে দুজনের ঘেমে গিয়েছে অনেকটা। তবুও মাছ ধরাধরিটা কেউ বন্ধ করলো না। যেন দুজনে প্রতিযোগিতা শুরু করেছে।

একপর্যায়ে ক্লান্ত হয়ে আফরা নৌকায় বসে পড়লো। পুরো বিল শান্ত। ক্ষণে ক্ষণে মাছরাঙা উড়ে যাওয়ার দৃশ্যটা সুন্দর দেখাচ্ছে। ঘনঘন শ্বাস ফেলতে থাকলো ফারহান। একপর্যায়ে জিজ্ঞেস করলো,

-‘কেমন লাগলো এক্সপিরিয়েন্সটা?’

-‘দুর্দান্ত! তবে এখন আমি আরেকটা এক্সপিরিয়েন্স করতে চাই।’

ফারহান ভ্রু কুচকালো। জিজ্ঞেস করলো,

-‘সেটা কি?’

আফরা মিহি কন্ঠে বললো,

-‘এই বিলের পানিতে শরীর ঠান্ডা করার এক্সপিরিয়েন্স।’

আর একবিন্দু অপেক্ষা করলো না আফরা। সরাসরি বিলের পানিতে ঝাপ দিয়ে দিলো। ফারহান হকচকিয়ে গিয়েছে ততক্ষণে। চিৎকার করে বললো,

-‘আপনি কি পাগল? এভাবে ঝাপ দিলেন কেনো?’

আফরার চোখে মুখে আনন্দের বাহার। ডুব সাঁতার দিয়ে বলে ওঠলো,

-‘ওয়েদার ডিমান্ডস কমরেড সাহেব! এই ওয়েদারে সুইমিং না করলে পাপ হবে আমার।’

ফারহানের পা হ্যাচকা টান দিয়ে ফারহানকেও আফরা পানিতে ফেলে দিলো। শুরুতে ওর নাকে-মুখে পানি চলে গেলেও সামলে নিলো নিজেকে। ফারহানের আদ্র শরীর , চিপচিপে কালো চুল , মসৃন ত্বক সব উন্মাদ করে তুললো আফরাকে। গায়ে জড়ানো টিশার্ট শরীরে লেপ্টে থাকায় ওর সুঠাম দেহের সাথে মেদহীন কোমড় , প্রশস্ত বুক সব আফরার কাছে দৃশ্যমান। সেও এক ঘোর লাগানো দৃশ্য। ফারহান অদূর থেকেই শাপলা ফুল নিয়ে এলো আফরার জন্য। গহীন কন্ঠে বললো,

-আপনি তো আবার প্রকৃতির প্রেমিকা। এটা আপনার জন্য।’

আফরার সারা শরীর বয়ে সুখের অবাধে বিচরণ চলছে। নীল আকাশের নিচে বিলের পানিতে সিক্ত দুজন। পানির তালে শরীরে শীতলতা ছেয়ে যাচ্ছে। সেই সাথে অনুভূতি আরও প্রগাঢ় হচ্ছে ফারহানের জন্য। আজকের এই দিনটা কখনোই ভুলতে পারবে না আফরা। উফফ! ওর এত সুখ অনুভূত হচ্ছে কেনো?
.
.
.
~চলবে ইনশাআল্লাহ

সাতগাঁওয়ের এই বিলটা আমার জন্য অনেক স্পেশাল। তাই কল্পনায় ফারহান আফরার প্রতিচ্ছবি গল্পের মাধ্যমে তুলে ধরলাম। যদি কখনও আপনারা যান তাহলে এই দুইজনকে মনে রাখবেন কিন্ত।

গঠনমূলক মন্তব্যের অপেক্ষায়!

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here