অতিরিক্ত চাওয়া {২} ২২

অতিরিক্ত চাওয়া {২}
২২

সন্ধ্যার আজানের সাথে সাথে আশপাশ অন্ধকারে ছেঁয়ে যাচ্ছে। মাথায় নামাজ টুপি পরিহিত আনন্দ, আশেপাশে নজর বোলাচ্ছে মেয়ের জন্য। বাংলা বাজার থেকে দ্রুত বাড়ি ফিরে, ছোট মেয়েকে ঘরে না পেয়ে খুঁজতে বেরিয়েছে। কিছুক্ষণের মাঝে আজান দেওয়ায়, ওজু করে মসজিদের রাস্তায় হাঁটা ধরলো। নামাজ শেষে বাড়িতে পৌঁছে মেয়েকে না দেখতে পেয়ে চিন্তিত হয়ে পড়ল,
———-‘ কোথায় মেয়েটা? রাত হয়ে যাচ্ছে। ‘
খুশি চুল বাঁধতে বাঁধতে বলল,
———-‘ আমরা তৈরি হতে হতে চলে আসবে। ‘
ভ্রু কুঁচকে ফেলল আনন্দ। তা-ও মনকে বুঝ দিয়ে শার্ট চেঞ্জ করতে ব্যাস্ত হয়ে পড়ল। কিছু একটা ভেবে আনন্দ আবার মুখ খুলল,
———-‘ স্কুলে গন্ডগোল থাকায় ছেলেটাকে দেখতে ঢাকায় যেতে পারিনি। এখন যেহেতু বাড়িতে দেখতে যাচ্ছি কি নেওয়া যায়? ‘
আনন্দের কথায় খুশির মুখে ও চিন্তার ছাপ ভেসে উঠছে। সুন্দর ভাবে তৈরী হয়ে উঠানে চলে এসেছে বিমান। হালকা হেসে বলতে লাগল,
———–‘ আরে চিন্তার কী? যেহেতু তৃষ্ণা ভাই অসুস্থ তার জন্য অবশ্যই ফলমূল নিলেই চলবে। ‘
আনন্দ কিছুটা ভেবে উত্তর দেওয়ার আগেই শোনা গেল বাবলুর দুখিঃত আওয়াজ,
———–‘ এটা আমার তৃষ্ণাভাই। তার জন্য শুধু ফলমূল? আমি বলি কি বাবা। আমাদের ছোট ছাগল-টা নিয়ে যাই সাথে। সেটা দিলে তারা সবাই খুশ….
আর বলতে পারলো না বাবলু। আনন্দের ধমকে সে দ্রুত তার বোনের পেছন লুকাল। বিমান কিটকিটিয়ে হেসে বাবলুর চুল টেনে দিতে দিতে বলল,
———–‘ কামারখালি হাজার জীনস রয়েছে। ওখান থেকে কিছু নিলেই চলবে। ‘
মেয়ের কথায় কিছুটা সন্তুষ্ট হলো আনন্দ-খুশি। সবাই তৈরি হয়ে গিয়েছে। অথচ বেলী এখনও ফিরেনি। কিছুটা আন্দাজ করতেই বিমান জিব কাটলো। দ্রুত মুখে যা আসল বলে ফেলল টুপ করে,
————-‘ ওহ্ বাবা। বেলী শিলাদের বাড়ি। আমি বলতে ভুলে গেছি। আমাকে শিলা কল করে বলেছিল। আমি অভি-কে বলে দেব ওঁকে নিয়ে আসতে। ‘
খুশি বোরকা ঠিক করে স্বামীকে তাড়া লাগালো,
————-‘ আচ্ছা, রাত হয়ে যাচ্ছে। আবার দ্রুত ফিরতে হবে। বের হও সবাই। ‘
সকলের কথায় অগ্যত মেয়েকে ছাড়াই রওনা দিল আনন্দ। তা-ও মেয়ের জন্য তার মনটা আকুপাকু করছিল।

শীতল আবহাওয়া হালকা ভাবে ছেঁয়ে আসছে বাতাসের সাথে! হাতে জ্যাকেট নিয়ে মোড়ের দোকানের পাশে দাঁড়িয়ে আবিদ। ফুল হাতার গেঞ্জি-টা শরীরের সাথে টানটান হয়ে আছে। সিগারেটের ধোঁয়া বাতাসের সাথে আকাশে উড়ে যাচ্ছে। দোকানের ড্রিম-লাইটের আলোয় চারপাশ আলোকিত। আলোকিত পরিবেশে স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে ঠান্ডায় নাকমুখ লাল আবিদের। সিগারেট আবার ফুঁকতে গিয়ে, অনুভব করল তাঁর ঘাড়ে কেউ হাত ছোঁয়াল। তা-ও সামনে মোড়ে নি আবিদ। সিগারেটে শেষবারের মতো কয়েকটা টান মেরে, সামনে ফিরলো আবিদ। একটি মেয়ে দাঁড়িয়ে ফর্সা রঙের। গোলগাল চেহারা। সোজা-সাপটা চেহারার হলেও বলতে হবে সুন্দরী। শরীরে সাদা গেঞ্জির উপড় কালো রঙের জ্যাকেট, সাদা জিন্স আর পেয়ে কালো রঙের উঁচু হিল। এবং হাতে ফোন নিয়ে আবিদের দিক মিষ্টি হেসে তাকিয়ে। মিষ্টি হাসির কারণে কিছুটা বেশি মারাত্মক লাগছে। আশেপাশে তাকিয়ে দেখল রাত গভীর হচ্ছে। মেয়েটির দিক আবার চোখ যেতেই দু-ভ্রু নাচাল আবিদ। গ্রামে ওয়েস্টার্ন , তা-ও এতো রাত্রে। ইন্ট্রেসটিং…
———–‘ ইয়েস মিস? ‘
মেয়েটি বড় হাসি দিলো,
———–‘ হ্যালো। আমি আরিকা খান। এখানে আমার কেউ নেই। ‘
আরিকার শর্টকাট কথায় কিছুটা ভ্রু কুঁচকালো আবিদ। জিহ্বা দিয়ে ঠোঁট ভিজিয়ে প্রশ্ন করল,
———–‘ আমি কি করব? ‘
আরিকা একটু ভেবে বলল,
———–‘ দ্যাটস ট্রু। ‘
তারপর ন্যায়নীতি আবারও আবিদের দিক তাকিয়ে রইলো। আবিদ চিন্তিত ভাবে মেয়েটির দিক তাকিয়ে,
———–‘ কেউ না থাকলে আপনি এতো রাত্রে এখানে কি করছেন? ‘
———–‘ তোমার পিছু পিছু আসলাম যে। ‘
ভরকে গিয়ে ড্যাবড্যাব চোখে আবিদ আরিকার দিক তাকালো। এ-ই মুহুর্তে মেয়েটিকে আবিদের পাগল ভাবতে ইচ্ছে করছে। কিন্তু পরক্ষণে মেয়েটি ড্রেসিং দেখে ভাবনা-টা হাড়িয়ে গেল,
————‘ এক্সকিউজ মি? ‘
————-‘ বললাম তোমার পিছু পিছু এতদূর আসলাম। বলতে হচ্ছে তোমাদের গ্রামটি সুন্দর। আর হ্যাঁ, তোমার ভাবী মামী গুলো বেশ সুন্দর। আর বাড়িটা তো আরও সুন্দর। ‘
এইবার মাথা চক্কর দিয়ে উঠল আবিদের। থমথমে গলায় বলল,
————-‘ আম নট গেটিং ইউ। ‘
ছোট বিড়ালের মতো চেহরা করে ফেলল আরিকা। ছোট শ্বাস ফেলে আবারও মিষ্টি হাসলো। হাত নাড়িয়ে খুলে বলতে লাগলো,
———–‘ ঢাকা ম্যাডিসন হসপিটাল। যেখানে তোমার ভাই-কে এডমিট করা হয়েছিল।
তোমার ভাইকে যেই ডক্টর ট্রিটমেন্ট করাচ্ছিলেন? তিনি আমার বড় ভাই। ডক্টর আয়েজ খান। এবং আমি সেখান থেকেই তোমাকে ফলো করছিলাম। ‘
ঝটকার সাথে মাথায় বড় এক বাশ পড়লো আবিদের। স্তব্ধ হয়ে রইল কিছুক্ষণ। তারপর ছোট-ছোট চোখ করে তাকালো আরিকা-র দিক,
———–‘ এনি রিজন? ‘
মাথা কিছুটা দুলিয়ে আবিদের দিক আরচোখে তাকাল,
———–‘ ইয়াহ। আই ওয়াজ জাষ্ট ক্যাজুয়েলি ওয়াকিং অ্যান্ড দেয়ার ইন দ্যা হসপিটাল আই স্যও ইউ ফর দ্যা ফার্স্ট টাইম ইন মাই লাইফ। অ্যান্ড অলসো ফর দ্যা ফার্স্ট টাইম রানভীর সিং এ-র পর কাউকে ভালোলেগেছে। ভালোলেগেছে বলতে অনেক ভালোলেগেছে। তারপর এইযে তোমার পিছু নিতে নিতে এখন তোমার সামনে। অ্যান্ড টু বি ভেরি অনেস্ট আমি এ-ই গ্রামের কিছুই জানিনা এবং চিনি না। ‘
এইবার আবিদ পুরো দমে ঠান্ডা হয়ে গেল। ভালোভাবে মেয়েটির দিক নজর বোলালো। পাগল তো মনে হচ্ছে না। মেয়েটির মুখে মিথ্যের কোনো চিহ্ণ ও দেখছে না।
———–‘ কি দিয়ে এসেছেন? আই মিন কার সাথে? ‘
আরিকা মিষ্টি হেসে দূরবর্তী স্থানে দাঁড়িয়ে থাকা কালো রঙের গাড়িটা দেখিয়ে দিলো। আবিদ চোখ পিটপিট করল,
———–‘ একা-একা গাড়ি চালিয়ে এসেছেন? ‘
———–‘ না তো। ড্রাইভার কাকা আছে গাড়িতে। ‘
আরিকার হাতের ইশারা অনুসরণ করতেই দেখল। মাঝবয়েসী এক লোক ড্রাইভার ড্রেসে গাড়ির অন্যপাশে দাঁড়িয়ে। যার নজর আপাতত তাঁদের দিকই। আবিদ হালকা কাশি দিল,
———–‘ আপনার ড্রাইভার কাকা আপনায় এতো দূর নিয়ে আসল? ‘
আরিকা কিটকিটিয়ে হেসে উঠলো,
———–‘ কাকাকে আমি ব্ল্যাকমেইল করেছি যে। আমি কাকার ছোট একটা সিক্রেট জানি। বলেছি সেটা আমার বাবাইকে বলে দেব। সে-ই ভয়ে কাকা আমার কথাতে তোমাদের গাড়ির পিছু নিতে রাজি হয়ে গেল। ‘
আরেকবার স্তব্ধ হয়ে আশেপাশে তাকাতে লাগলো আবিদ। সে কি বলবে বুঝতে পারছে না। এমন ম্যাটার সে জীবনে হ্যান্ডেল করেনি। বড় এক শ্বাস ফেলে আরিকার ড্রাইভারকে এদিকে আসতে ইশারা করল। ড্রাইভার সামনাসামনি আসতেই ধমকে উঠলো আবিদ,
———–‘ এমন বোকামি কিভাবে করলেন? এ-ই বোকা মেয়ের কথায় নেচে-কুঁদে আমার পিছু নিচ্ছিলেন যে? এখন যদি আমরা বাজে লোক হতাম। ‘
ড্রাইভার কাচুমাচু করতে করতে বলল,
———–‘ আসলে দাদা মহামুনি আমার কথা শুনতেই চাইছিল না। এইযে দেখুন বড় স্যার, ছোট স্যার আমায় সমানে কল করে যাচ্ছে। আমি এখন কি বলব। ‘
শেষের দিকে বেশ কান্না জড়িত কন্ঠে বলল ড্রাইভার। আবিদ এবার চোখ রাঙিয়ে তাকাল আরিকার দিক। যিনি মিষ্টি হেসে আবিদের দিক তাকিয়ে। হঠাৎ আরিকা বলে উঠলো,
———–‘ তুমি রাগলে তোমায় অদ্ভুত সুন্দর
দেখায়। ‘
আবিদ খুকখুক করে কেশে উঠলো। চোখ পিটপিট করে আরিকার দিক কিছুক্ষণ তাকিয়ে অন্যদিকে ফিরে গেল। ঠোঁটে হাসি আসতে চাইছে। কোনো ভাবে নিজেকে সামলিয়ে আবারও আরিকার দিক ফিরলো। আরিকা কয়েকবার চোখের পলক ফেলে বলল,
———–‘ হাসলে আরও অদ্ভুত সুন্দর দেখায়। ‘
এইবার আবিদ মুগ্ধতা ময় হাসি দিল। ড্রাইভার কে ইঙ্গিত করে বলল,
———–‘ ইনি সদা এমন কিছু করে না-কি? ‘
ড্রাইভার দ্রুত মাথা নাড়ালো,
———–‘ জ্বী না। এমন কখনও করে নি। কখনও না। হঠাৎ আপনায় দেখে বলছে ‘ আপনাকে নাকি তার মনে ধরেছে। এবং আমায় ব্ল্যাকমেইল করে ঝামেলায় ফেলে দিলো। ‘
শেষের কথাগুলো মিনমিন করে বলল ড্রাইভার। আবিদ অদ্ভুত মুগ্ধতা নিয়ে আরিকার দিক এখনও তাকিয়ে। কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে বলল,
———–‘ কিছু খেয়েছেন? ‘
———–‘ এদিকে রেস্টুরেন্ট দেখিনি তো। ‘
আবিদ হালকা হেসে ড্রাইভারকে ইঙ্গিত করে বলল,
———–‘ ও-ই যে মাথায় সাদা রঙের গাড়িটা দেখছেন না? ওখানে আপনাদের গাড়ি নিয়ে আসুন। আর আরিকার আব্বু বা বড় ভাইকে কল করে বিষয়টা জানান। নাহলে চিন্তা করবেন। ‘
বলেই আবিদ সামনে হাঁটা ধরলো। আরিকা লাফিয়ে আবিদের পাশাপাশি হাঁটতে লাগলো। তার মুখে অদ্ভুত হাসি। যে-ই হাসির কোনো সীমানা নেই। আবিদ হাঁটছে আর আড়চোখে আরিকার দিক তাকাচ্ছে। এখনও মুগ্ধতায় ঘিরে আবিদ।
পকেটে ফোন ভাইব্রেট হচ্ছে। ফোন চেক করে দেখল বিমান কল দিচ্ছে। রিসিভ করতেই বিমানের আওয়াজ,
————-‘ বেলী কী তোমাদের সাথে? ‘
————-‘ ইয়াহ, কিছু হয়েছে? ‘
————-‘ আমরা চৌধুরী বাড়ি যাচ্ছি। বাবা বারবার বেলীকে খুঁজছেন। ওঁকে সোজা তোমাদের সাথে নিয়ে আসবে। ‘
————-‘ আচ্ছা। ‘

চিন্তিত বেলী বারবার জানালা দিয়ে বাহিরে চোখ বোলাচ্ছে । রাত গভীর হচ্ছে নিশ্চয়ই বাড়ির সবাই তাকে খুঁজছে। কথাটা ভাবতেই বেলীর ভয়ে কলিজা শুকিয়ে যাচ্ছে। এখনই বাড়িতে যাওয়া প্রয়োজন, অথচ তৃষ্ণার মাথা এখনও তার ঘাড়ে। তৃষ্ণার গরম নিশ্বাস গলায় পড়ছে আর বারবার শরীর শিউরে উঠছে বেলীর। আংটি পরিহিত হাত দিয়ে তৃষ্ণার চুল হালকা ভাবে নাড়তে নাড়তে বলল,
————‘ শু..শুনছেন রাত হচ্ছে। আমা..আমার বাড়ি যেতে হবে। ‘
তৃষ্ণার সাড়াশব্দ না পেয়ে বড় শ্বাস ফেলল বেলী। এ-ই নিয়ে বেশ কয়েকবার তৃষ্ণাকে ডেকেছে। কিন্তু তার কোনো নড়চড় নেই। সে বেশ ঘুমে বিবর। তার চুলগুলো বেলীর ঘাড় ছুঁয়ে, বেলীকে অদ্ভুত ভালোলাগার যন্ত্রণায় ফেলে দিচ্ছে। ঠোঁট দুটো এখনও গলার মাঝ বরাবর ছুঁয়ে আছে। কোমর চেপে রাখা হাত দু’টো ঢিলে হয়ে বেলীর কোলে পড়ে আছে। এমন ভাবে বেলীর উপর ঢেলে আছে যে বেলী নড়তেও পারছে না। কী করবে ভেবে পাচ্ছে না। এ-ই মুহুর্তে তার একদম ইচ্ছে করছে না তৃষ্ণাকে ঘুম থেকে জাগাতে। কিছুক্ষণ আগে তার করা আজীব কাহিনী মনে করতেই লজ্জায় লাল-নীল হতে লাগলো। ভাবতেই বেলীর গালে লাল আভা ছেঁয়ে আসছে । তৃষ্ণার ঠোঁট নড়তেই ঝলক করে কেঁপে উঠলো । ঘাড়টা তৃষ্ণার থেকে সরানোর চেষ্টায় লেগে পড়লো। কিন্তু একবিন্দু-ও সরতে সক্ষম হলো না। না চাইতেও হাত তৃষ্ণার চুলে আবারও পৌঁছে গেল। চুলগুলোর মাঝে আঙুল ছুঁইয়ে হালকা চাপ দিতে লাগল। এমন করলে নাকি ভালো ঘুম হয়। মাথায় আরাম পাওয়া যায়। টেনশন থাকলে দূর হয়ে যায়। চুল থেকে কপালে হাত চলে গেল। কপালের ব্যান্ডেজ ছুঁয়ে দিতেও হাত কাঁপছে বেলীর। হালকা রক্তের আভা ব্যান্ডেজের উপড় দিয়ে ভেসে। ধীরে ধীরে তৃষ্ণার ব্যান্ডেজ করা হাতে কিছুক্ষণ হাত বুলালো। তারপর ছোট করে চুমু খেলো ব্যান্ডেজ-এর উপড়। চুমু খেয়ে বেলী নিজে-ই ঢোক গিলল। তৃষ্ণা জেগে থাকলে নির্ঘাত খেয়ে ফেলত তাকে। ভাবতেই কিটকিটিয়ে হাসলো। আবার নিজেই নিজের মুখ চেপে ধরলো।

গাড়ির কাঁচে ঝটপট কয়েকটা টোকার আওয়াজ শুনে কেঁপে উঠলো বেলি। তৃষ্ণার পাশ থেকে দ্রুত সরে বসার চেষ্টা করলো। কিন্তু বিন্দুমাত্র নড়তে পারেনি। অসহায় দৃষ্টিতে তৃষ্ণার পিঠের দিক তাকিয়ে বিরবির করলো,
————-‘ এ-ই কোন জ্বালায় পড়লাম আল্লাহ। ‘
বেলীর কষ্ট করে দরজা খুলতে হয়নি। আবিদ-ই দরজা খুলে দুষ্টু হাসলো,
————-‘ আরে ভাবি? এখনও রোম্যান্স চলছে। ‘
বেলী লজ্জায় মাথা নিচু করে, অসহায় গলায় বলল,
————-‘ ঘুমিয়ে পড়েছেন। আর আমি তাকে সরাতে পারছি না। আমার দেরি হচ্ছে আবিদ ভাইয়া। বাড়ি পৌঁছাতে হবে। ‘
আবিদ মিষ্টি হেসে বেলীর গাল টেনে দিলো,
————-‘ আমার মিষ্টি ভাবি। এখনই এতো লজ্জা পেলে চলবে। যার পাল্লায় পড়েছ সে কিন্তু
এক-পিস এবং লজ্জাহীন মানুষ। আরও কত-কী করবে। সেগুলো কীভাবে হ্যান্ডেল করবে? ‘
বেলী আবিদের চোখ ছোট করে তাকালো। আবিদ আরেক-দফা হেসে বলল,
————-‘ চিন্তা করতে হবেনা। তুমি আমাদের সাথে যাচ্ছ। বিমান কল করে বলেছে তোমাকে আমাদের বাড়ি নিতে। কারণ তোমার পরিবার সেখানেই। ‘
বেলী মাথা দুলালো। কিছুক্ষণের মাঝে আরিকা আবিদকে চাপিয়ে উঁকি দিলো। বেলী আর তৃষ্ণাকে এভাবে দেখে চোখ বড়সড় করে ফেলল,
————-‘ ওয়াও। ই’জ দ্যে আর আ কাপল। ‘
বেলী আরেকবার লজ্জায় থম মেরে গেলো। আবিদ মাথা দুলালো,
————-‘ ইয়ে’স। ‘
আরিকা বেলি’র দিক হাত বাড়িয়ে দিলো,
————-‘ হেই। আমি আরিকা। ‘
বেলী কোনমতে হাতে হাত মিলালো,
————-‘ বেলী। ‘
————-‘ তুমি নিশ্চয়ই ভাবছ কে আমি? ওয়েল আমি..’
আরিকা-কে থামিয়ে দিলো আবিদ। হাতের ইশারা দিয়ে আরিকার গাড়ি দেখিয়ে বলল,
————-‘ নিজের গাড়িতে বসে, এ-ই গাড়ি ফলো করুন। ‘
আরিকা মাথা নাড়িয়ে আবিদদের গাড়ির ড্রাইভার সিটের পাশের সিটে বসে পড়লো। বেলী আবিদের এক্সপ্রেশন দেখে কিটকিটিয়ে হেসে উঠলো। আবিদ চোখ উল্টিয়ে নিজে ও আরিকার পাশে বসে গাড়ি স্টার্ট দিলো। কিছুক্ষণের মাঝে আবারও আরিকার আওয়াজ,
————-‘ আবিদ ওঁদের লাভ-স্টোরি বলো না ‘ আরিকার মুখে নিজের নাম শুনে চুপ মেরে গেলো আবিদ। কেমন অদ্ভুত ভালো লাগছে শুনতে। পুরোটা রাস্তায় আরিকাকে তৃষ্ণার অতিরিক্ত চাওয়ার বর্ননা দিতে লাগলো। যেটা শুনে আরিকা, বারবার পেছনে বেলীর ঘাড়ে মাথা রাখা তৃষ্ণার দিক তাকাচ্ছে। আনমনে-ই মিষ্টি হেসে বলল,
————-‘ বেলী অনেক ভাগ্যবতী। আমার ইচ্ছে করছে ভাইয়ার সাথে একবার কথা বলতে। ‘

চৌধুরী বাড়ির সামনে গাড়ি থেমেছে মিনিট হচ্ছে। এখনও কেউ তৃষ্ণাকে জাগায়-নি। এখনও সবাই সবার যায়গায়। বেলী ছোট শ্বাস ফেলল। হাত উঁচু করে তৃষ্ণার পিঠে ছোট ধাক্কা দিলো,
————-‘ উঠুন। পৌঁছেছি আমরা। ‘
তৃষ্ণা ‘উম’ শব্দ করলো বেলীর ঘাড়ে। ভুমিকম্পের মতো কেঁপে উঠলো বেলী। চোখ খিঁচে বন্ধ করে তৃষ্ণার চুল টেনে দিলো,
————-‘ উঠুন, উঠুন, উঠুন,। ‘
লাগাতার কয়েকবার বলার মাঝেই নড়ে উঠলো তৃষ্ণা। বেলীর ঘাড়ে লম্বা শ্বাস নিয়ে সরে আসলো। দু-আঙুল কপালে রেখে কিছুক্ষণ ধ্যান মেরে বেলীর দিক তাকিয়ে থাকলো। মাথা দু-দিকে কাত করে সোজা হয়ে বসলো। আবিদকে বলল,
————-‘ সিগারেট? ‘
আবিদ দেওয়ার আগে বেলী চোখ কুঁচকে ফেলল,
—————‘ আপনি অসুস্থ। ‘
—————‘ তো? ‘
—————‘ খাবেন না। ‘
বেলীর দিক একটু ঝুকে,
—————‘ অন্যকিছু খাওয়া তাহলে। ‘
বেলী দ্রুত অন্যপাশে ফিরে গেলো।
————-‘ আপনি সিগারেট খান। আমি কিচ্ছু বলতাম না।’
তৃষ্ণা হালকা হাসলো,
————-‘ আচ্ছা খাচ্ছি না। ‘
এইবার তৃষ্ণা সামনে নজর দিলো। চোখ গেল আরিকার দিক যে আপাতত ড্যাবড্যাব চোখে তার দিক তাকিয়ে। কয়েকবার চোখের পলক ফেলে তৃষ্ণার দিক হাত বাড়িয়ে দিলো,
————-‘ আমি আরিকা ভাইয়া। তোমাদের লাভ স্টোরি শুনলাম আবিদ থেকে। অ্যান্ড ট্রাস্ট মি আমি তোমার ফ্যান হয়ে গেছি। ‘
তৃষ্ণা আরিকার হাতে হাত মিলালো।
————-‘ থ্যাংকিউ আরিকা। ‘
আবিদ মাথা চুলকিয়ে বলল,
————-‘ ভাই ও আমাদের সাথে বাড়িতে থাকবে কিছুক্ষণ। একটু ম্যানেজ করে দাও না। ‘
তৃষ্ণা ভ্রু-উঁচু করে তাকালো,
————-‘ সিয়র। [ বেলীর হাত ধরে ] চল বেনীওয়ালি।’
আরিকা তৃষ্ণার তুই-তুকারি শুনে আরেকবার স্তব্দ হয়ে গেলো।

চলবে…..
নাবিলা ইষ্ক

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here