অতিরিক্ত চাওয়া { ২ } ৩৭|

অতিরিক্ত চাওয়া { ২ }
৩৭|

হঠাৎ বড় এক পাথর কোথা থেকে ছুটে এসে বেলীর কপালে বারি খেল। ভীতু বেলী চিৎকার দিয়ে মাথা চেপে ধরল। গরগর করে রক্ত পড়ছে। বেলীর হাত রক্তে ভিজে যাচ্ছে। শীলা ‘ আল্লাহ গো ‘ বলে বেলীকে নিয়ে দৌঁড়ে ঘাটে চলে যাচ্ছে। হাঁটু অবদি পানির মাঝে ঢুকিয়ে নৌকার পেছনে লুকাল। ওদিকে শীলার চিৎকার শুনে ছেলেগুলো আওয়াজ-ধারী ব্যাক্তিকে খুঁজছে। শীলা হন্তদন্ত হয়ে নিজের ওড়না দিয়ে বেলীর মাথা পেঁচিয়ে দিচ্ছে। বেলী ব্যথায় কুঁকড়ে যাচ্ছে৷ আশেপাশে ভালোভাবে তাকাল। এই এরিয়া থেকে বের হবার কোনো সুযোগ দেখা যাচ্ছে না। মাটিতে যোয়ান এক ছেলে পরে। মাথা দিয়ে রক্ত বেরোচ্ছে। পুরো এরিয়া ঘিরে চিল্লাফাল্লা। ষোলো-সতেরো জন ছেলে হাতে বড়বড় যন্ত্র নিয়ে দাঁড়িয়ে। দোকানীরা দোকান ভেতর থেকে বন্ধ করে দিয়েছে। এমন পর্যায়ে মানুষ দৌঁড়িয়ে উল্টাপাল্টা রাস্তায় চলে গেছে। এর মধ্যেই বারো-তেরো জনের আরেক গ্রুপ আসে। এসেই আরেকদফা চূড়ান্ত রকমের মারামারি শুরু হলো। হুন্ডা নিয়ে এসে কিছু ছেলেরা সামনে যাকে পাচ্ছে কোপ দিচ্ছে। বেলী কেঁদে দিলো। এখান থেকে স্পষ্ট রক্তাক্ত অবস্থায় নিচে পরে থাকা ছেলেটাকে দেখতে পাচ্ছে। কয়েকবার ছেলেটা দোফাল। তারপর একদম শান্ত হয়ে গেলো। শীলা কান্না জড়িত কন্ঠে ফিসফিসিয়ে বলল,
— চেয়ারম্যান পদে ভোটের আজকে শেষ দিন ছিলো। ঘোষণা হয়েছে। তৃষ্ণা ভাইয়ার আব্বু জিতেছেন এবারও। এটা নিয়েই গন্ডগোল মনে হচ্ছে।
বেলীর শরীরে মনে হলো ঠান্ডা স্রোত বয়ে গেলো। ইচ্ছে করলো ভয়ংকর এক চিল্লানি দিতে। বাড়িতে কাউকে বলে আসেনি। বললে নিশ্চিত তাকে আসতে দিতেন না। আর জানতেও পারতো এপারের অবস্থা আজ ভালো হবে না। তৃষ্ণা বারন করেছিলো অথচ বেলী বুঝতেই পারে নি। বেলী তো ভেবেছে এটা তো তৃষ্ণা সদা বলে। তৃষ্ণা জানলে তাকে দাফন করে দিবে। একদম দাফন করে দিবে। বেলী অসহায় চোখে তাকাল শীলার দিক। শীলা শক্ত করে বেলীর হাত ধরলো,
— আমার একটুও মনে ছিলো না রে। এপারে তো আন্দোলনের সময় কখনোই আসিনি। তাই জানিও না যে ভোটের শেষ দিনে এমন ভয়ংকর ঘটনা ঘটে।
বেলী আবারও সামনে তাকাল। মারার জন্য একজন আরেকজনের পিঁছু দৌঁড়াচ্ছে। পুরো যায়গা ঘিরে রয়েছে। বেলীর ভয়াবহ গলা,
— সে জা..জানলে? আ..আমাকে মেরে ফেলবে।
বেলী বলতে বলতে কেঁদে দিলো। সেইবার রাগে কেমন থরথর করছিলো তার সামনে তৃষ্ণা। ভাবতেও বেলীর শরীরে কাঁটা দিয়ে উঠছে। মাথাটা ধরে আসছে। কেমন চোখের সামনে সব আবছা লাগছে। ধোঁয়াটে লাগছে সব কিছু। বেলীর বসতে ইচ্ছে করলো। সে নৌকার পাশ ধরে পানিতে বসে পড়লো। শীলা বেলীর কপালে ওড়না-টা আরেকটু শক্ত করে বেঁধে দিলো। শীলা ঘাবড়ানো স্বরে বলল,
— তৃষ্ণা ভাইকে কল করা প্রয়োজন। আমি ফোন এনেছি সাথে। কল লাগাচ্ছি।
বেলী শীলার হাত চেপে ধরলো।
— না… একদম না। একদম জানানো যাবে না। সে ঢাকা।
আর এভাবেও তারা আমাদের দেখেনি। এখানে তো সর্বক্ষণ থাকছে না। চলে গেলে আমরা চলে যেতে পারবো।
শীলা কপালে চাপড় মারল,
— আল্লাহ। নিশ্চয়ই এমন গন্ডগোল হবে বলেই ভাইয়াকে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে ঢাকা। নাহলে বিয়ে বাদ দিয়ে কি কেউ ঢাকা যাবে। থাকলে তো মারামারি করতো বিদায় পাঠানো হয়েছে।
বেলী নিশ্চুপ হয়ে রইলো। গলা দিয়ে আওয়াজ আসতে চাচ্ছে না। শীলা বেলীর অবস্থা দেখে চোখ বুঝলো। তাকে কল দিতেই হবে। শীলা ফোনে নাম্বার খুঁজতেই, বেলী চেঁচাল,
— প্লিজ। দিস না।
— পাগল হচ্ছিস। আজ আর ঘাট খোলা হবেনা। এইগুলা কখন শেষ হবে জানি না। বাড়ি কিভাবে ফিরবো?
এর মধ্যেই সেখানের ছেলে একটার চিৎকার,
— শালারা গ্রামে ফিরছে। এদিকেই আসতেছে।
আরেকজনের প্রশ্ন,
— চৌধুরীর পোলারা?
— হো। যা পারবি কোপাবি। যা পারবি।
এবার ছেলেগুলো একজন আরেকজনের দিক তাকাতে লাগলো। হাতের যন্ত্রগুলোকে মুঠোবন্দী করলো। দূর থেকে দেখা যাচ্ছে আবিদ, আয়ুশকে। সাথে অনেক ছেলেরা। তারা এসেই মারতে শুরু করলো। শীলা বেলীর দিক তাকালো।
— এসে পরেছে।
বেলী আঁড়চোখে আবার তাকাল। এবার সে তৃষ্ণাকে দেখতে পেয়েছে। গাড়ি পাশে থামিয়ে রেখেছে। তৃষ্ণার এমন ভয়ংকর রূপ দেখে বেলী চোখ বড়সড় করে রইলো। যেভাবে পারছে মারছে। একেকজনের শরীর থেকে রক্ত বেরোচ্ছে। পুলিশ গাড়ি আসতেই তৃষ্ণা সরে তার দুই ভাইকেও সরিয়ে ফেলল।

শীলার মোবাইল বেজে উঠলো। শীলা বেলীর দিক তাকালো,
— তৃষ্ণা ভাইয়া।
বেলী কিছু বলার আগেই শীলা রিসিভ করে ফেলল। তৃষ্ণার ছটফট কন্ঠের আওয়াজ,
— বেলী কোথায়? ইজ সি অলরাইট?
— হ্যাঁ। আমরা ঘাটের নৌকার পেছনে লুকিয়ে।
— বেরিয়েও না। আসছি।
আবিদ দ্রুত পায়ে কাছে আসলো তৃষ্ণার ,
— ভাই কোথায় বেলী?
তৃষ্ণা দ্রুত নেমে ঘাটের দিক দৌঁড়।

বেলী তৃষ্ণাকে দূর হতে দেখা মাত্রই, শীলার ওড়না মাথা থেকে সরিয়ে পানি দিয়ে কপাল ধুতে লাগলো। রক্তে ভিজে যাওয়া গলা পরিষ্কার করতে লাগলো। কপাল ফুলে আছে৷ রক্ত পানিতে ধুয়ে দিলেও সেই আবার বেরোচ্ছে। কামিজের গলার দিক রক্তে ভিজে। বেলী কোনো কূল না পেয়ে পানিতে চুপ দেয়। গায়ের রক্ত যাওয়ার জন্য কামিজ ঘষছে। শীলা চেঁচাল,
— কীসব করছিস?
বেলী পানি থেকে উঠে কাঁপা এবং আধস্বরে বলল
— কামিজে রক্ত বোঝা যাচ্ছে?
— কপাল থেকে রক্ত বেরোচ্ছে। ফুলে এবং ছুঁলে আছে। ভাই এভাবেই বুঝে যাবে।
বেলীর ভয়ে রীতিমতো কাঁপছে। সে এতো ভয় নিজের পরিবারে কথা ভেবেও কখনও পায়নি। এবার বেলী ওড়না ভালোভাবে শরীরে ছড়িয়ে দিল। ঝুটি করা চুলগুলো ছেড়ে সামনে নিয়ে আসলো। কপাল ডেকে ফেলল। ব্যথায় বেলী আঁতকে উঠছে। এর মাঝেই তৃষ্ণার আওয়াজ,
— বেলীইই?
শীলা বেলীর হাত ধরে টেনে বেরোচ্ছে,
— ভাইয়া এখানে। এইযে।
তৃষ্ণা বেলীকে দেখতে পেয়ে সেখানেই দাঁড়িয়ে গেলো। তৃষ্ণার দ্রুত শ্বাস নেওয়া বেলী আঁড়চোখে দেখে আর তাকানোর সাহস করেনি। বরং তার পা এগোচ্ছে না। সবকিছু কেমন ধোঁয়াটে। তৃষ্ণার পায়ের বেগতিক ঝপ ঝপ আওয়াজ। পরমুহূর্তেই দুগাল চেপে তৃষ্ণা বেলীর মুখ উঁচু করে ধরলো। বাম হাত দিয়ে মুখ থেকে চুল সরাতেই তার হাত থেমে। কপাল দিয়ে এখানও রক্ত বেরোচ্ছে। বেলীকে পা থেকে মাথা পর্যন্ত খেয়াল করতেই কামিজে হালকা ভাবে এখনও রক্তের ছপছপ দাগ দেখতে পাচ্ছে। শীলা নিজেই বলল,
— কোথা থেকে যেনো পাথর ছুটে আসে।
আবিদ এসেই বেলীর হাত ধরলো। তার চিন্তিত কন্ঠ,
— আল্লাহ। এখনও রক্ত বেরোচ্ছে। হসপিটাল নিতে হবে। ভাইয়া?
আবিদ তৃষ্ণার দিক তাকিয়ে চুপ মেরে গেলো। তৃষ্ণা এখানও বেলীর দিক তাকিয়ে। আবিদ সাহস নিয়ে বলল,
— ভাই বেলীকে হসপিটাল….
তৃষ্ণা তার আগেই বেলীকে এক ধাপে কোলে তুলে নিল। বেলীর মুখ দিয়ে কোনো শব্দ বেরোলো না। তৃষ্ণা আবিদকে বলতে বলতে গাড়ির দিক যাচ্ছে,
— শীলাকে বাড়িতে দিয়ে আয়। কোনো সমস্যা না হয় তার জন্য ওর বাড়িতে কথা বলিস।
আবিদ এর জবাব আর তৃষ্ণার কানে আসে নি। গাড়িতে বেলীকে রেখে তৃষ্ণা বেলীর ওড়না টেনে খুলে ফেলল। সেটা বেলীর মাথায় পেঁচিয়ে দিল। ক্লিনিক পৌঁছানো অবদি বেলী তৃষ্ণার একটা শব্দ ও শুনতে পায়নি। বেলীর চোখে পানি টলমল করছে। সে এখনই কেঁদে ফেলবে। কাছাকাছি ক্লিনিকে পৌঁছাতেই তৃষ্ণা গাড়ি থেকে নেমে বেলীর পাশে গেলো। শরীরের শার্ট খুলে বেলীকে সামনে দিয়ে পড়িয়ে দিল। আবার কোলে নিতে নিলে বেলী লজ্জা পেয়ে যায়। তৃষ্ণার খালি শরীরে সাথে মিশতে তার লজ্জা লাগছে। সে ভীতু স্বরে বলল,
— হাঁটতে পারব।
তৃষ্ণার জবাব নেই। বরং আরও শক্তি প্রয়োগ করে সে বেলীকে কোলে তুলল। বেলী ব্যথায় ‘ আহ ‘ আওয়াজ করে ফেলল। টলমল করা চোখ থেকে এবার জল গড়িয়ে পরছে। আবার তৃষ্ণার স্পর্শে তার মুখ গরম হয়ে উঠছে। বেলী কান্না জড়িত কন্ঠে বলেই ফেলল,
— এ..এমন আর কখনও হবে না। সত্যি।
তৃষ্ণার জবাব নেই। সে দ্রুত পায়ে বেলীকে নিয়ে ক্লিনিক পৌঁছাল। বেলী আঁড়চোখে তৃষ্ণার শক্ত হয়ে থাকা চেহারার দিক তাকাচ্ছে।

বেলীর মাথায় ঔষধ ব্যাবহার করে ব্যান্ডেজ করা হয়েছে। কিছু ঔষধের নাম লিস্টও করে দিলেন। বেলীর প্রচুর রক্ত খয়েছে৷ কিছুদিন পুষ্টিকর খাবারের লিষ্ট বললেন। বেশ কিছুদিন বেড রেস্টে৷ থাকতে হবে সেটাও জানালেন। গাড়িতে বসে বেলী বারবার তৃষ্ণার দিক তাকাচ্ছে। একটা কথাও বলছে না লোকটা। বেলীর মনে হলো তার দম বন্ধ হয়ে আসছে। আজ তৃষ্ণার গাড়ি যে উল্টো রাস্তায় যাচ্ছে সেটা নিয়েও বেলী প্রশ্ন করছে না। কখন বোমা টা ফাটে বেলী সেই ভয়ে বসে। চলতি গাড়ির মধ্যেই তৃষ্ণা কল লাগাচ্ছে। বেলী আঁড়চোখে দেখে যাচ্ছে।
— আবিদ? মামা কোথায়? মামা তুই আর মামীকে নিয়ে স্টেশনের সামনে আয়৷
তৃষ্ণা কল কেটে আবারও সামনে তাকিয়ে। বেলীর এবার রুহ সুদ্ধ কাঁপছে। এই লোক এভাবে ছাড়বে না বেলীকে। এখনই শান্ত না করলে তুলকালাম করে ফেলবে৷ সাহস সঞ্চয় করে বেলী বলল,
— আমি জানতাম না এ..এমন কিছু হবে। শুনুন না৷
এবারও তৃষ্ণার জবাব নেই। বেলী ভেজা চোখ জোড়া নিয়ে তৃষ্ণার দিক তাকিয়ে রইলো।

গাড়ি থামে এক অফিসের সামনে। বেলী স্পষ্ট দেখল সেখানে লিখা ” কাজী অফিস “। বেলী ভয়ে আঁতকে উঠল। পরমুহূর্তেই তৃষ্ণা তার চুল শক্ত ভাবে ধরে নিজের দিক টেনে আনল,
— বিয়ে করবো এক্ষুনি।
বেলী হতভম্ব চোখে তৃষ্ণার দিক তাকালো। তৃষ্ণা একটু জোর প্রয়োগ করেই বেলীর চোখের পানি মুছে দিল।

চলবে,
নাবিলা ইষ্ক

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here