অন্তর্লীন_প্রণয় সাদিয়া মেহরুজ দোলা পর্ব-১৭

#অন্তর্লীন_প্রণয়
সাদিয়া মেহরুজ দোলা
পর্ব-১৭

‘ আয়ন্তিকা তুমি কি চাচ্ছো আমি আবার তোমায় রেখে চলে যাই?’

অহর্নিশ থমথমে কন্ঠে বলল। চোখমুখে তার কিঞ্চিৎ পরিমাণ রাগ। নিভৃতে জমেছে খানিক দুঃখ! লম্বা শ্বাস টেনে নিয়ে সে আয়ন্তিকার উত্তরের অপেক্ষা করে। প্রায় আধাঘন্টা যাবৎ অহর্নিশ বহুবার চেষ্টা করেছে আয়ন্তিকার সাথে কথা বলার। কিন্তু সে ব্যার্থ প্রতিবারই। আয়ন্তিকা কথা বলছে না তার সাথে। থম মেরে চুপ করে বসে আছে। এভাবে মৌনতা পালন করার লজিক কারণ অহর্নিশ খুঁজে পেলো না।

অহর্নিশের অপেক্ষার প্রহরের ইতি টেনে আয়ন্তিকা মাথা তুলে দৃষ্টি নিক্ষেপ করে তার ওপর। প্রশান্তির শ্বাস ফেলে অগোচরে অহর্নিশ। আশা জুটেছে এবার বুঝি আয়ন্তিকা তাকে বলবে, ‘ যাবেন না আপনি দয়া করে। গেলে আমাকেও নিয়ে যান আপনার সাথে। ‘ অহর্নিশ প্রায় ধরেই নিলো আয়ন্তিকা এই কথাটিই বলবে। সেই অনুসারে মনে মনে উত্তরও গুছিয়ে নিলো সে। কিন্তু আয়ন্তিকা এবার অহর্নিশ কে পুরোপুরি ভাবে ভুল প্রমানিত করে ফিচেল কন্ঠে বলল,

‘ তো যান না। আপনাকে কি আমি হাত পা বেঁধে আটকিয়ে রেখেছি? না তো! তাহলে যাচ্ছেন না কেনো। আধাঘন্টা যাবৎ একই কথা বলছেন শুধু। ‘

অহর্নিশ সুচালো ব্যাথা অনুভূত করে তার হৃদয়ে। তার মানে কি আয়ন্তিকা কে সে এখনো ঠিক মতোন চিনতে পারেনি?হয়তো তাই হবে। অহর্নিশ তো এক কোমল, নম্র এবং শান্ত স্বভাবের আয়ন্তিকা কে চিনতো। এই কঠোর আয়ন্তিকে তার তো চেনাই হয়নি। এতো শক্ত, কঠিন কথা অনায়াসে বলা ফেলা আয়ন্তিকা কে তার যে এখনো অচেনা। অহর্নিশ অপমান বোধে একবার ভাবলো এখনি ছুটে বের হয়ে যাবে বাসা থেকে। কিন্তু না! তা যে হলোনা। এইযে প্রেম নামক অনুভূতি। সেই অনুভূতি নিভৃত হতে চেঁচিয়ে বলল, তার আয়ন্তিকা কে চাই। তাকে ছাড়া এক মূর্হতও থাকতে পারবেনা সে।

অহর্নিশ নড়েচড়ে বসলো। অতঃপর আয়ন্তিকার হাত থেকে কেমিস্ট্রি বইটাকে ছো মেরে কেঁড়ে নিয়ে পাশে রেখে দেয়। পরিশেষে সে এক মূর্হতও ব্যায় না করে ধপ করে আয়ন্তিকার কোলে মাথা দিয়ে শুয়ে পড়লো। আঁখিযুগল বন্ধ করে নিয়ে বলল,

‘ যাবোনা আমি। তোমার কথাতেই নাকি?বিয়ে করেছি বউ ছাড়া থাকবো কেনো? ‘

আয়ন্তিকা নিঃশব্দে হাসে। তার অস্বস্তি হলোনা। বরং বিশাল এক ভালোলাগার হাওয়া তার মনে দোলা দিয়ে গেলো। এইযে হুটহাট করে অহর্নিশ তার কোলে মাথা দিয়ে শুয়ে পড়লো এই কাজে সে এক বিন্দুও ভীতি বা সংকোচের মাঝে জরীয়ে পড়েনি। মনেপ্রাণে সে এটাই চাইছিলো অহর্নিশ যেনো না যায়।
ভারী নিঃশ্বাস এর আস্তরণে আয়ন্তিকা বুঝতে পারলো অহর্নিশ ঘুমিয়ে পড়েছে। ঝটপট আয়ন্তি তার একহাত গলিয়ে দেয় অহর্নিশের কুচকুচে কালো চুলে। দেয়ালে পিঠ ঠেকিয়ে সে বিড়বিড় করে বলল,

‘ জীবনটা এতো সুন্দর কেনো?’
___________

‘ ভাই আপনি নাকি এবার এমপি পদে দাঁড়াইবেন?’

অহর্নিশ বাম হাতে পানির বোতলটা নিয়ে ভ্রু বাকিয়ে তাকায় নাহিদের দিকে। নাহিদের চোখমুখে আতংকের ছাপ। তা দেখে নিভৃতেই সে মলিন শ্বাস ফেলে। পানির বোতলে অধরের ছোঁয়া লাগানোর আগে অহর্নিশ থমথমে কন্ঠে বলল,

‘ হু! হটাৎ এই কথা বলস কেন?’

নাহিদ শুকনো ঢোক গিললো। চোখমুখ কুঁচকে নিয়ে অসহায় কন্ঠে বলল,

‘ ভাই এমপি পদে না দাঁড়াইলে হয় না? মাসুদ ভাই আগে থেকেই আপনারে অনেক থ্রেট দিসে। কত আঘাত ও করছে তার লোক দিয়া। আপনার বাপের পা ভাঙসে। এখন এমপি পদে দাঁড়াইলে আপনিই জয়ী হবেন নিশ্চিত। তখন তো মাসুদ আপনারে মাইরা ফেলবে ভাই। এসব থেকে দূরে সরে যান ভাই, আপনার কিছু হলে আমাদের কি হবে?’

অহর্নিশ ঢগঢগ করে পানি খায় নিজের চাহিদা মতোন। অতঃপর হাতের পানির বোতলটা ছুঁড়ে মারে নাহিদের দিকে। শার্টের হাতা দিয়ে কপালের ঘামগুলো মুছে নিয়ে বলল,

‘ পানি খা আর আজাইরা টেনশন কমা। আমার কিছুই করতে পারবে না ও। আমার যা ইচ্ছা আমি তাই করবো। ‘

‘ জানি ভাই কিন্তু ভাবীর কথা একটু ভেবে দেখেন। ‘

আয়ন্তিকার কথা মনে হতেই অহর্নিশের সাহস ফিকে পড়ে যায়। চোখ বন্ধ করে নিয়ে সে নতজানু হয়। উদাসীন মনে তপ্তশ্বাস ফেলে। আজ কেনো যেনো মনে হলো তার আয়ন্তিকা তার জীবনে প্রবেশ করে বড্ড বেশি ভুল করেছে। অহর্নিশ আয়ন্তিকার জীবনটাকে নষ্ট করে দিয়েছে। এইযে তার জীবনের কোনো সিয়রিটি নেই। এখন হুট করে তার কিছু হয়ে গেলে আয়ন্তিকার কি হবে?এই সমাজে যে বিধবাদের প্রচুর কষ্ট বহন করতে হয়। তাদের বংশে মেয়েদের দ্বিতীয় বিয়েরও কোনো নিয়ম নেই। তার কিছু হলে আয়ন্তিকার জীবনটাই নষ্ট হয়ে যাবে। চট করে চোখ খুলে অহর্নিশ! বুক ভর্তি শ্বাস টেনে সে সতেজতা নিয়ে বলল,

‘ না আমার কিছু হবে আর না আয়ন্তিকার কিছু হতে দিবো আমি নাহিদ। সো অযথা চিন্তা বাদ দিয়ে কাজে যা। ‘

অহর্নিশ দ্রুত পায়ে সেখান হতে প্রস্থান করে। এখন আয়ন্তিকার স্কুলে যাওয়া দরকার। ছুটির সময় হয়ে গিয়েছে প্রায়। বাইকে বসে ফুল স্প্রিডে শো শো করে চলে যায় অহর্নিশ!

.

স্কুলের বড় মাঠ পেরিয়ে গেটের সামনে আসার পর আয়ন্তিকা খেয়াল করে অহর্নিশ কে। বাইকে হেলান দিয়ে একমনে ফোনে কথা বলে যাচ্ছে। ছোট্ট করে শ্বাস ফেলে এগিয়ে যায় সেদিকে। অহর্নিশের সামনে দাঁড়াতেই অহর্নিশ ‘পরে কথা বলছি ‘ বলে ফোন কেটে দেয়। ফোন পকেটে ঢুকিয়ে নিয়ে অহর্নিশ নম্র কন্ঠে বলল,

‘ হেলমেট পড়ে বাইকে বসো। আমি আসছি। ‘

আয়ন্তিকা এবার কৌতূহল নিয়ে বলল,

‘ বাইক কার?’

অহর্নিশ বিরক্তি নিয়ে তাকায় আয়ন্তিকার পানে। মাত্রাতিরিক্ত বিরক্তি নিয়ে বলল,

‘ অবশ্যই আমার! আমার ছাড়া অন্য মানুষের বাইকে তো আর উঠতে বলবো না তোমাকে। উঠে বসো। আসছি একটু। ‘

আয়ন্তিকা অকপটে জবাব দেয়, ‘ আচ্ছা। ‘

অহর্নিশ চলে যাওয়ার পর আয়ন্তিকা বাইকে উঠে বসে। কেমন ভয় ভয় লাগছে তার। আগে কখনো বাইকে ওঠা হয়নি। উঠে বসে চারপাশে দৃষ্টি দেয় সে, কিছু উৎসুক চোখ তার দিকে নিবদ্ধ। আশপাশের কিছু মানুষ কেমন অদ্ভুতুরে দৃষ্টি নিয়ে দেখছে তাকে। এমনভাবে দেখার কারণটা খুঁজে পেলো না আয়ন্তিকা। ইতস্তত বোধ করে মাথা নুইয়ে নেয় সে। খানিকক্ষণ বাদে অহর্নিশ এসে বসে পড়লো বাইকে। হেলমেট পড়ে নিয়ে বাইক স্টার্ট দিতে দিতে ব্যাস্ত কন্ঠে বলল,

‘ আগে কখনো বাইকে উঠেছো?’

‘ নাহ! ‘

‘ তাহলে আমাকে পেছন থেকে জরীয়ে ধরো নয়তো পড়ে যাবে। ‘

‘ সমস্যা নেই পারবো। ‘

অহর্নিশ ভ্রুকুটি কুঁচকে নেয়। আয়ন্তিকার কথাটা তার মোটেই ভালো লাগল না। মেয়েটা মাত্রাতিরিক্ত জেদী! এখন পড়ে টরে গেলে যে আঘাত পাবে সেই আঘাতের মূল ব্যাথা তো অহর্নিশ অনুভব করবে তা কি এই মেয়ে বোঝে না? অহর্নিশ ঝাঁঝ নিয়ে বলল,

‘ ত্যাড়ামো না করে যা করতে বলেছি তা করো। ‘

আয়ন্তিকা করলো না। ধরলো না অহর্নিশ কে। হাত গুটিয়ে ঠায় বসে রইল। অহর্নিশ দাঁতে দাঁত চেপে বাইক স্টার্ট দেয়। ঠাটিয়ে কয়েকটা চড় মারতে ইচ্ছে করছে তার আয়ন্তিকা। এমন উদ্ভট, লজিকহীন জেদের কি কোনো মানে হয়?নিজের জীবনের প্রতি ও কোনো দরদর দেই আয়ন্তিকার?রাগের বসে অহর্নিশ স্প্রিড বাড়িয়ে দিয়ে বাইক নিজ মতে চালানো শুরু করে। মাঝপথে এসে চোখমুখে খিঁচে বন্ধ করে নেয় আয়ন্তিকা। থরথর করে কাঁপার এক পর্যায়ে সে ধপ করে জরীয়ে ধরে অহর্নিশ কে। তাতে মুখ বাঁকিয়ে অহর্নিশ বলল,

‘ এখন জরীয়ে ধরলো কেন?’

আয়ন্তিকা জবাব দিলো না। ভয়ে সে এঁটে সেঁটে আছে অহর্নিশের সাথে। মনে মনে আটস্থ করলো আর কোনোদিনও সে অহর্নিশের সাথে বাইকে উঠবে না। কোনোদিনও না!
________________

রাত দশটা!
ফিজিক্স বইটা নিয়ে অন্যমনষ্ক হয়ে বসে আছে আয়ন্তিকা। তার সামনেই অহর্নিশ ল্যাপটপ নিয়ে বসে। আঁড়চোখে বারংবার পর্যবেক্ষণ করার চেষ্টা করছে আয়ন্তিকা কে! এক পর্যায়ে ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে বলল,

‘ বই নিয়ে অন্যমনষ্ক হয়ে বসে আছো কেনো?পড়ো! কি ভাবছো এতো?’

আয়ন্তিকা বই পাশে রেখে দিয়ে অহর্নিশের পাশে ব্যাবধান বজায় রেখে বসলো। হাত দিয়ে ওড়না নাড়াচাড়া করতে করতে বলল,

‘ আমি গ্রামে যেতে চাই একটু। ‘

অহর্নিশ সটান হয়ে বসে গম্ভীর কন্ঠে বলল,

‘ আগেও বলেছি আয়ন্তিকা এখন আমার হাতে টাইম নেই। তোমাকে আমি দিয়ে আসতে পারবো না। ‘

‘ আপনাকে দিয়ে আসতে হবেনা। আমি মামার সাথে চলে যাবো। মামা পরশু যাচ্ছে। ‘

অহর্নিশ ল্যাপটপ বন্ধ করে দেয় তৎক্ষনাৎ। গ্লাস হাতে নিয়ে গলা সিক্ত রূপে প্রদান করে বলল,

‘ কোথাও যাওয়ার দরকার নেই। আমি ফ্রী হলে আমি নিজেই নিয়ে যাবো তোমাকে। এখন পড়তে বসো যাও। ‘

‘ অহর্নিশ প্লি..’

অহর্নিশ উঠে দাঁড়িয়ে আয়ন্তিকার দিকে তাকিয়ে ধমকে বলল,

‘ আমি কি বলেছি শুনোনি তুমি? যাও পড়তে বসো।’

আয়ন্তিকা ঠোঁট কামড়ে কান্না দমন করার প্রয়াস চালায়। উঠে দাঁড়িয়ে চটজলদি রুম হতে বেড়িয়ে যায় সে। অহর্নিশ সেদিকে তাকিয়ে ধপ করে বসে পড়ে। একটু বেশিই কি কড়া ব্যাবহার করে ফেললো সে? ভাবতে ভাবতেই রুম হতে বেড়িয়ে আসে। আয়ন্তিকার রুমে গিয়ে চারপাশে চোখ বুলায়! কোথাও আয়ন্তি নেই। চিন্তিত হয়ে বেলকনিতে যায় সে। রেলিঙ ধরে আয়ন্তিকা দাঁড়িয়ে বিড়বিড় করছে কিছু। অহর্নিশ তা স্পষ্টত বুঝতে পারেনা।আরেকটু সামনে আগাতে বুঝতে পারে তাকে গালাগাল করা হচ্ছে। উদ্ভট গালি শুনে সে থতমত খায়! আয়ন্তির পিছে দাঁড়িয়ে সে বলল,

‘ আয়ন্তি?’

আয়ন্তিকা পিছে তাকিয়ে একদম সন্নিকটে আবিষ্কার করে অহর্নিশ কে। পা উঁচু করে সে অহর্নিশের কলার চেপে ধরে বলল,

‘ এখন এসেছেন কেন হ্যা?যান এখান থেকে! অভদ্র লোক! আপনি একটা পাতিলের বাচ্চা। পোড়া পাতিলের কালি, ইদুরের বিষ তুই! ‘

আরেকদফা চমকে অহর্নিশ আয়ন্তিকার কোমড়ে হাত রাখে। আয়ন্তিকার থামার কোনো নাম নেই তাও। পরিশেষে অহর্নিশ আয়ন্তিকার খয়েরী বর্ণের কোমল ঠোঁটযুগলে চট করে নিজ ওষ্ঠের আয়ত্তে নিয়ে নেয়।

চলবে…
আগেও বলেছি অসুস্থ। কি থেকে কি লিখেছি জানা নেই। ভুলত্রুটি ক্ষমার দৃষ্টিতে দেখবেন।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here