আবেগময় সম্পর্ক পাট২

#আবেগময়_সম্পর্ক
#দ্বিতীয়_পর্ব
#লেখিনীতে_মৃদু_সুপ্রিয়া

বাসর ঘরে বসে নিজের স্বামীর জন্য অপেক্ষা করছিল মেহুল। মেহুলের অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে আকাশ বাসর ঘরে প্রবেশ করে। মেহুল ঘোমটাহীন হয়ে বসে ছিল। আকাশ মেহুলের দিকে এক বার তাকিয়ে চোখ সরিয়ে নিয়ে বলে, “নিজের ভালোবাসার মানুষের সাথে বাসর না করে অন্য কারো সাথে বাসর করতে চলে এসেছেন তাহলে।”

মেহুল রাগান্বিত হয় আকাশের কথায়। ছোটবেলা থেকে রাগ নিয়ন্ত্রণ করতে সফল নয় সে। আজও পারল না নিজের রাগ নিয়ন্ত্রণ করতে। আকাশকে শক্ত কথা শুনিয়ে দিল।

“আপনি কি ভেবেছেন? আমাকে যা খুশি বলবেন আর আমি সহ্য করবো। প্রথমত, আমার কোন ভালোবাসার মানুষ নেই। আমি জীবনে প্রেম পিরিতির পাশ দিয়ে হাটিনি। আপনিই আমার জীবনে প্রথম পুরুষ। বরঞ্চ আমারই আপনার বিরুদ্ধে অভিযোগ করা উচিৎ কারণ আমি আপনার জীবনে প্রথম নারী নই। আমি আপনার দ্বিতীয় স্ত্রী।”

আকাশ ভাবলেশহীন ভাবে বলল, “আমাকে দোষ দিচ্ছেন কেন? আমি তো বিয়ের আগেই আপনার পরিবারকে সব জানিয়ে দিয়ে ছিলাম। যে আমার আগের স্ত্রী ছিল এমনকি আগের পক্ষের একটা ছেলেও আছে। সব জেনেই তো আপনি এই বিয়েতে রাজি হয়েছিলেন।”

মেহুল কি বলবে বুঝতে পারে না। তার নিজের পরিবারই যে তাকে অনেক বড় ধোকা দিয়ে গেছে। মেহুল সন্তপর্ণে নিজের দুঃখ আড়াল করে বলে, “বিয়ে যখন হয়ে গেছে তখন আমরা একে অপরের সাথে একটা সম্পর্কে জড়িয়ে গেছি। এটা মানতেই হবে।”

আকাশ মেহুলকে প্রশ্ন করে, “বিয়ের দিন তাহলে আপনি ওভাবে উঠে গিয়েছিলেন কেন?”

“কারণ আমি জানতে পেরেছিলাম আপনার স্ত্রী নিরুদ্দেশ। সে যদি কখনো ফিরে আসে তাহলে আমি কি করবো বলুন? আপনার নিশ্চয়ই নিজের প্রথম স্ত্রীর প্রতি তীব্র অনুরাগ আছে। যেহেতু সে আপনার সন্তানের মা।”

“সে আর কখনো ফিরবে না।”

“আপনি এত নিশ্চিত হয়ে কথাটা বলছেন কিভাবে?”

আকাশ এই কথার কোন উত্তর না দিয়ে বিছানায় শুয়ে পড়ে। মেহুল ভাবে তাকে হয়তো আকাশ বলবে সোফায় গিয়ে শুয়ে পড়তে। কিন্তু মেহুলকে অবাক করে আকাশ বলে, “আপনি এই বিছানাতেই শুয়ে পড়ুন। আপনি যেহেতু আমার স্ত্রী, তাই আপনার অধিকার আছে আমার জীবনে।”

মেহুলকে আরো বেশি অবাক করে দিয়ে আকাশ তাকে নিজের কাছে টেনে নেয়। মুহুর্তেই আকাশ মেহুলকে নিজের বুকের মধ্যে মিশিয়ে নেয়। তারা আরো ঘনিষ্ঠ হতে যাবে এমন সময় দরজায় কেউ কড়া নাড়ে।

আকাশ বিরক্তি বোধ করে সরে আসে। মেহুল দরজাটা খুলতেই রায়ানকে দেখতে পায়। রায়ান মেহুলের শাড়ির আঁচল ধরে বলে, “আমার খুব ভয় করছে নতুন মা। আমি তোমার সাথে থাকতে চাই।”

মেহুল আকাশের দিকে তাকায়। আকাশের চোখমুখে বিরক্তির ছাপ স্পষ্ট। তবে মায়াবী মেহুল কিছু তেই পাতল না ছোট্ট রায়ানের অনুরোধ ফেলতে। তাই রায়ানকে কোলে তুলে নিয়ে আদর করে বলে, “এসো আমাদের সাথে ঘুমাও।”

রায়ানকে কোলে করে এনে বিছানায় নিজের পাশে শুইয়ে দেয় মেহুল। আকাশ বিরক্তিতে বোধ করে একটু দূরে সরে যায়। রায়ান মেহুলের কাছে জেদ ধরে, “নতুন মা তুমি আমাকে গল্প শোনাও না। আমি তোমার কাছে রাজপুত্রর গল্প শুনব।”

মেহুল রায়ানের মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে রাজপুত্রর গল্প শোনাতে থাকে। এভাবেই একসময় ঘুমের ঘোরে তলিয়ে যায় রায়ান। সেই সময় আকাশ মেহুলকে বলে, “আপনিও এখন ঘুমিয়ে নিন। ছেলেটা অনেক বিরক্ত করে।”

মেহুল বুঝতে পারে রায়ানকে কোন কারণে পছন্দ করে না আকাশ। কিন্তু নিজের ছেলেকে অপছন্দ করার পেছনে কিসের যুক্তি থাকতে পারে সেটাই বুঝতে পারে না মেহুল।

এসব নিয়ে আর না ভেবে মেহুল ঘুমিয়ে পড়ে। মধ্যরাতে হঠাৎ কোন শব্দে তার ঘুম ভেঙে যায়। মেহুল লাইট জ্বালিয়ে দেখে রায়ান তার পাশেই আছে কিন্তু আকাশ কোথাও নেই। মেহুল বিছানা থেকে উঠে পড়ে। তারপর বেলকনিতে আসে। আকাশ বেলকনিতে দাঁড়িয়ে ছিল। মেহুলকে দেখে আকাশ বলে,“আপনার ঘুম ভেঙে গেছে?”

“কিছু একটা শব্দ পেলাম মনে হয়।”

“আমার হাত লেগে ফুলের টবটা পড়ে গেছে। সেটারই শব্দ হয়তো শুনেছেন।”

মেহুল মেঝেতে পড়ে থাকা ফুলের টবটি তুলে উপরে রাখে। আকাশের দৃষ্টি স্থির ছিল উপরের দিকে। গগণ পানে তাকিয়ে কি যেন দেখছিল সে। মেহুলের কৌতুহল হয় বিষয়টা নিয়ে।

কৌতুহলবশত জিজ্ঞাসা করে বসে, “আপনি এত রাতে এভাবে আকাশের দিকে তাকিয়ে কি দেখছেন?”

আকাশ রহস্যের হাসি দিয়ে বলে, “ঐ আকাশের তারার মাঝে অনেক রহস্য লুকিয়ে আছে। তারারা যেভাবে জ্বলে নিভে, আমাদের জীবনও ঠিক তেমন। আকাশের চাঁদও নিজের মাঝে অনেক রহস্য লুকিয়ে রাখে। কখনো পূর্ণিমার আলোতে আলোকিত করে ধরনীকে তো কখনো অমাবস্যার আধারে ঢেকে দেয়। আমাদের জীবনেও এমন কেউ আসে আলো নিয়ে আবার সেই কখনো অন্ধকারে ঢেকে দিয়ে যায়। সৃষ্টিকর্তা হয়তো প্রকৃতিকে দিয়ে আমাদের সেই সংকেত টাই দিয়ে থাকেন।”

আকাশের এমন রহস্যময় কথা মেহুল বুঝতে পারে না৷ আকাশ মেহুলের দিকে দেখে বলে, “বুঝতে পারেন নি নিশ্চয়ই? না বোঝাটাই স্বাভাবিক। যান ঘুমিয়ে পড়ুন।”

মেহুল তাই করে। বেলকনি থেকে পুনরায় রুমে এসে রায়ানকে জড়িয়ে ঘুমিয়ে পড়ে।

❤️
আজ মেহুলের বৌভাত। আমিনা আক্তার সকাল সকাল মেহুলকে অনেক সুন্দর একটা শাড়ি এবং কিছু গহনা দিয়ে গেছেন পড়ার জন্য। মেহুল সেই শাড়ি ও গহনায় নিজেকে আবৃত করে নিয়েছে। রায়ান সকাল থেকে মেহুলের আশেপাশেই ঘুরঘুর করছে৷ ছেলেটা একদম ছাড়তেই চায়না মেহুলকে। মেহুলও রায়ানের সাথে অভ্যস্ত হয়ে যাচ্ছে ধীরে ধীরে।

রায়ান হঠাৎ ছাদে যাওয়ার বায়না ধরে। মেহুল রায়ানকে ছাদে নিয়ে যায়। ছাদে রায়ান ফুটবল নিয়ে খেলতে থাকে।

হঠাৎ ভারী পুরুষালি গলা শুনতে পায় মেহুল। কেউ বলল, “এখানে কি করছেন?”

মেহুল পিছনে ফিরে আকাশকে দেখতে পায়। আকাশ বাঁকা চোখে তার দিকেই তাকিয়ে ছিল। মেহুলকে ভালো করে পরখ করে বলে, “আপনাকে অনেক বেশি সুন্দর লাগছে।”

হঠাৎ এমন কথায় লজ্জায় মেহুলের ফর্সা মুখ লাল হয়ে যায়। আকাশও খানিকটা বিব্রত বোধ করে। এই বিব্রতি ভাব কা*টানোর জন্য বলে, “এই রোদে ছাদে থাকার দরকার নেই। আপনি নিচে চলুন।”

মেহুল রায়ানকে নিয়ে নিচে নেমে আসে। মেহুল যাওয়ার পর আকাশও ছাদ থেকে নিচে নামে। আমিনা আক্তার মেহুলকেই খুঁজছিলেন৷ মেহুলকে দেখামাত্র বলে, “কোথায় গিয়েছিলে তুমি? আমি অনেকক্ষণ ধরে তোমাকে খুঁজছিলাম।”

“একটু ছাদে গিয়েছিলাম।”

“আচ্ছা নাও এই নাও চাল আর ডাল। আমাদের বাড়ির নিয়ম নতুন বউ বাড়িতে এলে বৌভাতে চালে, ডালে খিচুড়ি তৈরি করে সবাইকে খাওয়ায়। আজ আমার ছোট ছেলে আসছে। বিয়ের দিন পরীক্ষা ছিল জন্য আসতে পারে নি। সেই কারণে আমি ব্যস্ত থাকব। তুমি একা খিচুড়ি করতে পারবে তো?”

মেহুল সম্মতি জানিয়ে বলে, “হ্যাঁ আমি পারব।”

আমিনা আক্তার চলে যান। মেহুল বলে তো দেয় পারবে। কিন্তু আজ অব্দি কখনো সে নিজে রান্না করে খায়নি। মাঝে মধ্যে কফি আর চা বানিয়ে খেয়েছে নতুবা অমলেট। তাই বাধ্য হয়ে ইউটিউব দেখে খিচুড়ি রান্না করতে থাকে।

কিন্তু বিপত্তি বাধে গরম খিচুড়ি নামানোর সময়। মেহুলের হাতে ছ্যা*কা লাগে। সে ব্যাথায় শিৎকার করে ওঠে। তৎক্ষনাৎ আকাশ ছুটে আসে। মেহুলের হাত ধরে বেসিনের কাছে নিয়ে যায়। তার হাতে পানি দিতে দিতে বলে, “নিজের যত্ন নিতে শিখুন। কিভাবে কাজ করেন?”

মেহুল মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে ছিল আকাশের দিনে। একদিনেই কত যত্নশীল লাগছে লোকটাকে। কোন গভীর সম্পর্কে জড়িয়ে যাচ্ছে সে লোকটার সাথে? এটাই কি তবে আবেগময় সম্পর্ক?

#চলবে

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here