আমি কাউকে বলিনি সে নাম তামান্না জেনিফার পর্ব ১৮

আমি কাউকে বলিনি সে নাম
তামান্না জেনিফার
পর্ব ১৮
__________________________
সন্ধে নেমে গেছে , চারদিকে গাঢ় অন্ধকার জমতে শুরু করেছে ৷ নয়ন এসে দাঁড়িয়ে আছে তার বড় চাচীর কবরের পাশে ৷ কবরটা বাঁধাই করা হয়েছিল গত বছর ৷ সেই বাঁধানো কবরের পাশে লাগানো শিউলি গাছ ভর্তি হয়ে গেছে ফুলে ৷ মিষ্টি গন্ধে মাথাটা ঝিমঝিম করছে ৷ বাড়ি আসলেই আগে এখানে এসে বসে নয়ন ৷ মানুষটা চলে গেছে তিন বছর হয়ে গেলো ৷ তবুও এখানে এসে বসলে মনে হয় মানুষটাকে অনুভব করা যায় ৷

ঢাকা ইউনিভার্সাটিতে ভর্তি হবার পর প্রথম প্রথম ঘন ঘন বাড়িতে আসতো নয়ন ৷ সময়ের সাথে বাড়ির সাথে আরও দুরত্ব বেড়েছে ৷ দুটো কোচিং এ ক্লাস নেয় নয়ন , সাথে আরও দুটা টিউশনি … নিজের ছুটি হলেও স্টুডেন্টদের কারও না কারও পরীক্ষা থাকে ৷ আর আসা হয় না ৷ সে আসে না জন্য মা মন খারাপ করে , রূপা অভিমান করে ৷ কিন্তু বাস্তবতার কাছে সব তুচ্ছ হয়ে যায় ৷

—ভাইজান , বাড়িত চলেন , চাচী ডাকে

—কী রে তুই এখানে ! কিভাবে জানলি আমি এখানে ?

—আমি সবই জানি ৷

রহস্যময় হাসি হাসে রূপা ৷ এই মেয়েটা দ্রুত বড় হয়ে যাচ্ছে ! এ বছর এস এস সি পরীক্ষা দিলো ৷ রেজাল্টের অপেক্ষায় আছে ৷ নয়ন জানে রূপার রেজাল্ট খুব ভালো হবে না ৷ ওর পরীক্ষার আগে যখন বাড়ি এসেছিল , অংক করতে দিয়েছিল সে ৷ একটা অংকও পারেনি ৷ ইংলিশেরও ভয়াবহ অবস্থা ৷ অবশ্য এর জন্যে ওর বাবা মাও দায়ী ৷ কোন প্রাইভেটই দেয়নি ৷ নিজে নিজে যতটা পারে তাই পড়ছে মেয়েটা ৷

সেবার রতনের ঘটনার পর আলেয়া বেগম রূপাকে কোন পুরুষ মানুষের কাছে পাঠানোর কথা স্বপ্নেও ভাবতে পারেন না ৷ সেদিন আলেয়া বেগম সময় মত না পৌছালে রূপার একটা ক্ষতিই হয়ে যেতো ৷ রতন হাত ধরে টেনে নিয়ে যাচ্ছিল রূপাকে , ওর মুখে হাত দিয়ে চেপে রেখেছিল ৷ একবার সে হাত ছুটিয়ে শুধু একটা চিৎকারই দিতে পেরেছিল রূপা “ও চাচী গো, আমারে বাঁচান ! ” আলেয়া বেগমের কানে পৌছেছিল সে চিৎকার ! তারপর দৌড়ে এসে রতনকে দেখে হাতের কাছে থাকা আধখানা ইট তুলে ছুড়ে মেরেছিল তার দিকে ! তারপর ওকে মাটিতে ফেলে এলোপাথারি মেরেই চলেছিল পাগলের মত !

বিচার হয়েছিল রতনের ৷ আলেয়া বেগম ঢাল হয়ে দাঁড়িয়ে বিচার বসিয়েছিলেন ৷ বাড়ির কোন পুরুষই চায়নি বিচার হোক ৷ গাজী মিয়া বলেছিলেন “ওরে বিদায় কইরা দিতাছি , বিচারের দরকার নাই ৷ মাইয়্যারই মান যাইবো ” …. আলেয়া বেগম কারও কথা না শুনে দৃঢ় গলায় বলেছিল “বিচার হইবো , হইবোই ….” জেল খেটেছিল রতন , তারপর জেল থেকে বের হয়ে আর গ্রামে আসেনি ৷ তারপর থেকেই রূপাকে আরও চোখে চোখে রাখেন তিনি ৷

—ভাইজান , চলেন ৷ বইসা রইলেন যে !

—তোর রেজাল্ট দিবে আগামী সপ্তাহে জানিস ?

—হ জানি

—ফেলটেল করবি না তো ! যে অবস্থা দেখে গেছিলাম , পাশ করার তো কথা না

—ফেল হইলে ফেল হইবো ! আমার চেহারা ছবি সুন্দর আছে , ফেল হইলেও আমার বিয়া হইবো ৷

—বিয়া করতে চাস ?

—হ , বিয়া তো করা লাগবোই ৷ বাড়িত সকাল বিকাল ঘটক আসে ৷

—আচ্ছা ঘটক আটকাবার ব্যবস্থা করে যাবো ৷

—ক্যান ! ঘটক না আইলে বিয়া হইবো ক্যামনে ?

—বিয়া করা লাগবো না ! যা বাড়িত যা , আইতাছি …

রূপা হাসে ৷ তার বিয়ের কথা শুনলেই নয়ন রেগে যায় ৷ রেগে গেলে ওর কপালের দুপাশের রগ ফুলে উঠে , দেখতে মজা লাগে রূপার ৷ রূপাকে সে নিশ্চয় পছন্দ করে , তা না হলে এভাবে রেগে যাবে কেন ! এই মানুষটাকে রাগাতে খুব ভালো লাগে …

নয়নের সামনে অংক কষতে বসে ইচ্ছা করেই ভুল করতো সে ৷ যাতে আরও বেশি সময় একসাথে থাকা যায় ৷ নয়ন জানে না যে রূপা কী পরিমান মেধাবী ! কোন সাহায্য ছাড়াই সে খুব ভালোভাবে নিজের প্রস্তুতি নিয়েছে , পরীক্ষাও খুব ভালো হয়েছে ৷ রেজাল্ট নিয়ে তার কোন চিন্তা নাই সেজন্যই , যে পরীক্ষা দিয়েছে তার মন ঠিক জানে রেজাল্ট কী হবে ….

আজকাল নয়নের সাথে একদমই কম যোগাযোগ হয় তার ৷ বাড়ি না আসলে তো আর দেখা সাক্ষাতের সুযোগ মেলে না ৷ নয়ন অবশ্য আগের মতই আছে , উদাসীন ৷ তবে রূপার ব্যাপারে সে সবসময়ই মনোযোগ দেয় ৷ ছোট ছোট বিষয়গুলোর খেয়াল রাখে ৷ একবার শহর থেকে ফেরার সময় সায়েন্টিফিক ক্যালকুলেটর নিয়ে আসলো , এই জিনিস তাদের গ্রামে পাওয়া যায় না ৷ রূপা তখন প্রায় মাসখানেক সেই ক্যালকুলেটর মাথার কাছে নিয়ে ঘুমিয়েছে ৷ একদিন স্কুলে রূপার এই অমূল্য সম্পদ চুরি হয়ে গেলো ৷ সে এমন কান্না করেছিল যে আলেয়া বেগম নিজে স্বামীকে শহরে পাঠিয়ে আরেকটা ক্যালকুলেটর এনে দিয়েছিল ৷ রূপা কাউকে বলতে পারেনি তার যে জিনিস হারিয়েছে সেটা আর কখনও পূরণ হবার নয় …সেটা ছিল অমূল্য … সেটা ছিল ভালোবাসার উপহার ! সব কথা কী বলা যায় ! সব নাম কী বলা যায় ! কিছু কথা কিছু নাম শুধু মনের গহীনে বদ্ধ করে রাখার জন্যই , বাইরে আনার জন্য নয় ৷

নয়ন এখনও কবরের কাছেই বসে আছে ৷ এখান থেকে তার উঠতে ইচ্ছা করছে না ৷ রূপার জন্য চিন্তা হচ্ছে ৷ এই মেয়েটা হাতে পায়ে বড় হচ্ছে ঠিকই কিন্তু বুদ্ধিসুদ্ধি হচ্ছে না ৷ এত কম বয়সে বিয়ে করলে কী কী পরিনতি হতে পারে সেসব একবারও ভাবছে না ৷ কী সুন্দর কথা ” ফেল করে বিয়ে করবে” ৷ অথচ লেখাপড়া শেখাটা কত বেশি জরুরি সেই জ্ঞানটাও ওর মধ্যে নাই ৷ নাহ , একবার মেয়েটাকে বোঝাতে হবে ৷

নাদের মিয়া মসজিদ থেকে এশার নামাজ পড়ে ফিরছে ৷ এশার নামাজের পর মায়ের কবরের পাশে দাঁড়িয়ে বেশ খানিকক্ষন দোয়া খায়ের করে সে ৷ আজকে অন্ধকারে সে দেখলো কবরের পাশে কিছু একটা বসে আছে ! ভীষণ ভয় পেয়ে “ইয়া আল্লাহ বাঁচাও” বলে এক দৌড়ে সোজা বাড়ির ভেতর চলে যায় সে ৷ ঘরে বসে হাফাতে হাফাতে বলে

—বউ , বউ ! পানি দেও , পিয়াস লাগছে

লাকী ঘরে ঢুকে দেখে নাদের মিয়া দরদর করে ঘামছে ৷ তার হাতে পানির গ্লাস দিয়ে হাত পাখা দিয়ে বাতাস করতে করতে বলে

—কী হইছে আপনের ? ডড়াইছেন ?

—মায়ের কবরের কাছে কেডা জানি বইসা আছে বউ ?

—কবরের কাছে কেডা বইসা থাকবো ? আপনে ভুল দেখছেন ৷ চলেন আমার সাথে , বাতি নিয়া গিয়া দেইখা আসি ৷

—না , অত সাহসের দরকার নাই ৷ ভুল দেখলে ভুল দেখছি ৷ এইটা পরীক্ষা করতে যাবার দরকার নাই ৷

—দরকার আছে ৷ বাড়ির পাশেই কবর ৷ এমন কথা উঠলে বাড়িত টেকা মুশকিল হইয়া যাইবো ৷ আর পরীক্ষা না হলে আপনের মনে খচখচানি থাকবো ৷ আপনে রাত বিরাতে ফেরেন , মনের সাহস কইমা যাইবো ৷

—কিছু থাকলে সে কী আমগো লাইগা বইসা আছে ?

—না থাকলে নাই ৷ চলেন ৷

লাকীকে থামানো গেলো না ৷ একটা টর্চ লাইট হাতে সে একাই এগুতে থাকলো ৷ অগত্যা নাদের মিয়াকে পিছু পিছু যেতেই হলো ৷

টর্চের আলোয় একটু দূর থেকেই তারা দেখলো “সেই কিছু একটা” মানুষটা নয়ন …. লাকীকে থামিয়ে দিলো নাদের ৷ তারপর বললো “বউ আর যাইয়া কাম নাই…” খানিকক্ষন পর আবার বললো “নয়নের মত কইরা মায়েরে আমরা কেউ ভালোবাসতে পারি নাই … আমাদের ভালোবাসার মধ্যে দায় আছে , ওরটা খাঁটি ৷ সোনার চাইতেও খাঁটি …”

লাকী কথা বাড়ায় না ৷ তার নীরবতা বলে দেয় নাদের মিয়া ভুল বলেনি ৷

চলবে–

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here