Friday, May 1, 2026
Home "ধারাবাহিক গল্প আমি কাউকে বলিনি সে নাম আমি কাউকে বলিনি সে নাম তামান্না জেনিফার পর্ব ২৮

আমি কাউকে বলিনি সে নাম তামান্না জেনিফার পর্ব ২৮

আমি কাউকে বলিনি সে নাম
তামান্না জেনিফার
পর্ব ২৮
_________________________

ইমরানের আজকাল কিছুই ভালো লাগে না ৷ বাচ্চাটা বাবা বাবা বলে মুখে ফেনা তুলে ফেলে আজকাল ৷ তাকে সারাক্ষন কাছে না পাবার একটা তুমুল যন্ত্রনা হয় ভেতরে ৷ বন্ধুদের আড্ডায় যেতে ভালো লাগে না , নেশাপানিতেও আগ্রহ আসে না ৷ সারাক্ষন শুধু বাচ্চাটাকেই দেখতে ইচ্ছা করে ৷ কী সুন্দর করে ডাকে “আব্বা বাব্বা বাবা বাবা …! ” ইশ সময়টা হাতের নাগালে চলে যাচ্ছে , কিছুতেই কিছু ঠিক হচ্ছে না ৷

নিপার যে এত জেদ তা কখনই বোঝেনি ইমরান ৷ এদিকে বউ ফিরছে না জন্য তার বাবা মাও রাগ হচ্ছেন ৷ নিপাকে আনতে গিয়েছিলেন বড়মিয়া , তাকেও সে বলে দিয়েছে ঐ এক কথা ৷ ঘুরে ফিরে একটাই কথা তার ৷ সুমাইয়া থাকলে ঐ বাড়িতে সে কিছুতেই ফিরবে না ! একটা জলজ্যান্ত মানুষকে এভাবে বাড়ি থেকে তাড়ানো যায় ! যদিও ইমরানের বাবা মা নিপার পক্ষে , নিষ্ফলা জমির পেছনে আর খরচ করতে চান না তারা ৷ এমনিতেওসুমাইয়া বাবা মায়ের পছন্দের বউ হয়ে উঠতে পারেনি কখনও , নিপাও কতটা পেরেছে কে জানে ! তবুও নিপা নিষ্ফলা না , এই বংশের প্রদীপ সে জ্বালিয়েছে ৷ বড়মিয়ার নাতীকে চাই , আর কিছু যা হয় হোক তাতে তার কিছু যায় আসে না ৷

সুমাইয়ার জন্য খারাপ লাগে ইমরানের ৷ মেয়েটাকে সে ভালোবাসে , যে ভালোবাসাটা নিপার উপর কখনই জন্মেনি ৷ সুমাইয়া কড়া কড়া কথা বলে , তবুও ওর মধ্যে কী যেন আছে যার কারণে ইমরান ওকে মাথা থেকে তাড়াতে পারে না ৷

দরজায় আওয়াজ শুনে সে তাঁকিয়ে দেখে সুমাইয়া এসেছে ৷ মাথার ভেতর ঝড় চলছিল বলেই হয়ত সুমাইয়াকে দেখে ধরমরিয়ে উঠে বসে সে ৷

—কী ব্যাপার ? আমারে দেখে এমনে উঠলা যে ?

—না কিছু না ৷ বসো ৷

—তুমি নিপারে নিয়া আসো ৷ আমি জানি ও আমার জন্যই আসতেছে না ৷ আমি চলে যাবো ঠিক করছি ৷ ওরে নিয়া আসো ৷

—এত ভালোবাসলা তুমি ওরে , বিনিময়ে সে তোমারেই বাড়ি ছাড়া করতে উঠে পরে লাগছে ৷ সে বললেই সেইটাই হবে না কী ! কোথাও যাইবা না তুমি ৷ এখানেই থাকবা ৷

—আমার না কখনও এই সংসারটাকে আপন মনে হয় নাই ৷ প্রথম থেকেই মনে হয়েছে আমার সাথে ধোকাদারি করছে ৷ রাগটা আমার বাপের উপর আছিল বুচ্ছো , পড়ছে তোমাদের উপর ৷ আমারে না খেদাইলে হ্যায় তো বিয়া করতে পারতেছিল না ৷ আমার বিয়ার এক মাস না যাইতেই আবার বিয়া করলো দেখলা না …

—হুম

—নিপা এই সংসারে আসার পর আমি বুচ্ছি সংসারের প্রতি মায়া কারে কয় ৷ তুমি নেশা কইরা আমার সাথে জোরাজুরি করতা , আমার মনে হইতো আমি মরলে বাঁচি ৷ প্রথম প্রথম নিপার ঘরে তুমি যখন থাকতা আমার খুব আরামে ঘুম হইতো ৷ কিন্তু আস্তে আস্তে তুমি যখন ওর ঘরে বেশি আমার ঘরে কম থাকা শুরু করলা , আমার আর সারা রাত ঘুম হইতো না ৷ আমি তোমাগো ঘরের দরজার পাশে আইসা দাঁড়াইতাম ৷ তোমাগো ফিসফিস হাসি কানে আসলে বুকের ভেতর ছিঁড়ে যাইতো কী জানি ! খুব কষ্ট হইতো আমার ৷ তারপর নিপার যখন বাচ্চা প্যাটে আসলো আমি তখন যানি আরও একলা হইয়া গেলাম ! মনে মনে দোয়া করতাম আল্লাহ নিপারে মাইরা ফালাও ! শেষে যখন ওরে হাসপাতালে নিলো , ও তখন মইরাই গেছে প্রায় ! ডাক্তার আশেপাশে কাউরে না পাইয়া আমারেই কইছিল “মা , বাচ্চা দুজনকে বাঁচানো হয়তো সম্ভব হবে না , একজন হয়তো বাঁচবে ” …আমি তখন খুনির মত কুইছিলাম মায়ের দরকার নাই বাচ্চারেই বাঁচান ! আমার উপর ঘেন্না আইনো না … একটা সংসারের খুব লোভ হইছিল আমার ৷ ঐ মুহূর্তে মনে হইছিল আমি তো মা হইতে পারমু না , বাচ্চাটা বাঁচলে ওরে নিয়া আমাগো সংসার হইবো ৷ যাক সেইসব কথা ৷ এই কয়মাস নিপা নাই , আমি হাড়ে হাড়ে বুচ্ছি নিপা এই বাড়িত না থাকলেও এই সংসার আমার আর হইবো না ৷ আমি প্রথম থেকে যে অবহেলা সংসারের প্রতি করছি , সংসার এখন আমারে সেইটা ফেরত দিতেছে আর কিছু না ৷ আমি ভাবছিলাম প্রতিবাদ করলেই সমাধান হয় ৷ আসলে সংসার করতে গেলে অনেক সময় চুপও থাকা লাগে , অনেক সময় মানায়েও নেওয়া লাগে ৷ আমি মানতেও পারিনি , মানাতেও পারিনি ৷ তবে নিপা পারবে ৷ ওরে তুমি নিয়া আসো ৷ এই বাড়ির সন্তান এই বাড়িতেই বড় হোক ৷

—সুমাইয়া , আমারে তুমি মাফ কইরা দিও ৷ আমি খারাপ মানুষ , তোমা যোগ্য মর্যাদা আমি দিতে পারি নাই ৷ পঁচা শামুকে পা কাঁটছে তোমার …

—আমিও অযোগ্য ৷ আমার তেজ আছে , সহ্য ক্ষমতা নাই ৷ এই বাড়ির কাজের লোক পর্যন্ত নিপার জন্যে কান্দে , অথচ আমারে এরা জমের মত ভয় পায় ৷ তোমার মা আমারে ভয় পায় ৷ তুমিও আমারে ভয় পাও ৷ আমি কারও মনে আমার জন্য ভালোবাসা তৈরি করতে পারিনি ৷

—আমি তোমারে ভালোবাসি বউ !

—আমি তোমার অভ্যাস ৷ ভালো তুমি নিপারেই বাসো ৷ এই যে এতগুলা দিন নিপা নাই , তুমি একদিনও আমার কাছে আসোনি …. থাক , আমি আসলে আর থাকতে চাই না ৷ তুমি আমার একটা উপকার করবা ?

—কী ?

—আমারে শহরে কোথাও রাখার ব্যবস্থা করো ৷ আমি আবার পড়াশোনা করতে চাই ৷ অনার্সে ভর্তির ব্যবস্থা কইরা দেও ৷ প্রথম দুই চার মাস আমার খরচ চালাইও , এরপর আমি একটা ব্যবস্থা কইরা নিমু ৷ কিছুইতো পারলাম না , পড়াশোনাটা শেষ করতে চাই ৷

—আমি তোমারে শহরে নিয়া যামু ৷ ভর্তি করামু ৷ খরচও চালামু আজীবন ৷ শুধু তুমি আমারে মন থেইকা বাইর কইরা দিও না … আমি মূর্খ মানুষ , অসৎ সঙ্গে মিশে নেশাপানি করাও শিখছি ৷ কিন্তু তুমি যে খাঁটি হীরা এটুকু আমি বুঝি ৷ আমি তোমারে আগলায়ে রাখতে পারলাম না , আমারে মাফ করে দিও ৷

—বিশ্বাস করো , একসময় তোমার উপর আমার অনেক রাগ আছিল ৷ এখন আর নাই ৷ কারও উপর রাগ নাই ৷ তাইলে আমি সব গুছায়ে নিতেছি ৷ কবে যাইতে হবে আমারে বইলো …

ইমরান আর জবাব দেয় না ৷ তার ভীষণ কান্না পাচ্ছে ৷ পুরুষ মানুষের কাঁদতে নেই ৷ পুরুষ মানুষের কান্নার স্বাধীনতাও নেই ৷ সে সুমাইয়ার আর কোন কথাই শুনতে পাচ্ছে না ৷ শুধু নিজের চোখের পানি আটকানোর চেষ্টা করে যাচ্ছে …

কিন্তু এত চেষ্টার পরেও লাভ হয় না ৷ সুমাইয়া মাথার উপর হাত রাখতেই শিশুর মত শব্দ করে কাঁদতে শুরু করে ইমরান …

সুমাইয়ার খুব ইচ্ছে করছে ইমরানের মাথাটা বুকে শক্ত করে চেপে ধরতে ৷ কিন্তু সে দ্রুতপায়ে ঘর থেকে বের হয়ে যায় ৷ সব ইচ্ছের মূল্য দিতে নেই ৷ যে ঘর ছাড়তেই হবে , সে ঘরের প্রতি মায়া বাড়িয়ে লাভ কী !

চলবে…

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here