আমি কাউকে বলিনি সে নাম তামান্না জেনিফার পর্ব ৮

আমি কাউকে বলিনি সে নাম
তামান্না জেনিফার
পর্ব ৮
__________________________

সব ভালোই চলছিল নিপার জীবনে ৷ হঠাৎ করে গত তিন দিন থেকে আজাদের কল আসছে না ৷ নিপা কল দিলেও বন্ধ পাচ্ছে মোবাইল ৷ এদিকে বিয়ের বাকী আর মাত্র এক সপ্তাহ …

নিপার মনে নানান কুচিন্তা আসে ৷ একেক বার মনে হয় আজাদের কোন বিপদ হলো না তো ! আবার মনে হয় স্বপ্ন দেখিয়ে আজাদ তাকে ধোকা দিচ্ছে না তো …. কদিন আগে প্রজাপতির মত উচ্ছ্বল জীবন কাটানো মেয়েটা আবার যেন চুপসে গেল মাত্র তিন দিনেই ৷

বাড়িতে বিয়ের আয়োজন শুরু হয়ে গেছে ৷ আজকে দুটো গরু কেনা হয়েছে বিয়ের ভোজের জন্য ৷ গাজী মিয়া বিয়েতে নমঃ নমঃ করে রাজী হলেও মেয়ের বিয়ের আয়োজনে কোন কমতি রাখতে চান না ৷ তার একমাত্র মেয়ে , সারা গ্রামের মানুষ যেন একটা বেলা ভরপেট খেতে পারে সে ব্যবস্থাই তিনি করছেন ৷ বাড়িতে থাকা বছর কামলা রতন তার সাথে সাথে সব কাজে ছুটে বেড়াচ্ছে ৷ গাজী মিয়া বারান্দায় বসে রতনকে ডাকলেন ৷

—রতইন্যা , এদিক আয় দি বাপ

—জে মামা কন

—মধুখালীর বড়মিয়াসাবরে দাওয়াত পৌছাইছোস ?

—হ , কাল বৈকালে গেছিলাম ৷ বড়মিয়াসাব কইছেন তিনি অবশ্যই আইবেন ৷

—আলহামদুলিল্লাহ ৷ বাজার সদাই সব হইছে ? দিন তো আর বেশি নাই ৷

—সব হইতাছে মামা , আপনে পেরেশান হইয়েন না

—বাবুর্চি কারে আনবা ? মোতালেব মিয়া বলে কাম ছাইড়া দিছে !

—হ মামা , মোতালেব মিয়া চোক্ষে দেখে না , বুইড়া হয়া গেছে ৷ তয় তার বেটা শুনছি ভালোই পাকানি হইছে ৷ ভাবতেছি তারেই ডাকুম ৷

—ভালো মনে করলে তারেই ডাক , তোর উপ্রে আমার বিশ্বাস আছে রে রতইন্যা …

—মামা , বড়মামীর কী করবেন কিছু ভাবছেন ? বিয়ার দিন ঝামেলা পাকাইলে অসুবিধা হইয়্যা যাইবো ৷ কদিন ধইরা বড়মামীর চিল্লাফাল্লা বাড়ছে ৷ ঐ দেখেন অহনও চিল্লাইতাছে …

—দেখি , ব্যবস্থা কিছু করুমনে …

নিপার মায়ের আজ বোধহয় শরীর বেশি ভালো না ৷ সকাল থেকেই চিৎকার করছে ৷ গাজী মিয়া তার ঘরের বন্ধ দরজার সামনে কতক্ষন দাঁড়ালেন , তারপর দরজার তালা খুলে ঘরে ঢুকলেন ৷ বউটা মাটিতে শুয়ে ঘরঘর আওয়াজ করছে কুকুরের মত ৷ কেউ বোধহয় পানি খেতে দিয়েছিল , সেই পানি মেঝেতে পড়ে কাদা হয়ে গেছে ৷ নিপার মা সেই কাদায় হাত দিয়েছিল বোধহয় , তার মুখে চুলেও কাদা লেগে আছে ….

গাজী মিয়া বউয়ের সামনে সহসা আসেন না ৷ বউটার এই অবস্থার জন্য ভেতরে ভেতরে নিজেকেই দায়ী করেন তিনি ৷ নিপার জন্মের আগে ছয়বার গর্ভপাত হয়েছিল তার ৷ কোনটা তিন মাসে কোনটা পাঁচমাসে …. তিনি স্বামীকে অনেক অনুরোধ করেছিলেন , বলেছিলেন দুটা ছেলে তো আছে , আর বাচ্চা না নেই … গাজী মিয়ার এক কথা ছিল “একখান মাইয়্যা না হইলে ঘরের শোভা হয় না ! একখান মাইয়্যা আমার লাগবোই ৷ ”

এরপর নিপার জন্ম হলো ঠিকই , কিন্তু তার বউটা আর স্বাভাবিক থাকলো না ৷ অনেকেই বলেছিল শহরে নিয়ে তাকে ডাক্তার দেখাতে ৷ গাজী মিয়া ভেবেছিলেন ঠিক হয়ে যাবে ৷ আবার শহরে নেওয়ার ঝামেলাও তো কম না ! আসলে সেই সময় কোন ঝামেলাতেই জড়াতে মন সায় দেয়নি তার ৷ গ্রামের কবিরাজের ঔষধ খাইয়েছে বছরখানেক ৷ তারপর থেকে চিকিৎসা বন্ধ ৷ অথচ তার টাকা পয়সার তো কমতি ছিল না ৷ এখন তার মনে হচ্ছে তিনি বড্ড বেশি অন্যায় করে ফেলেছেন নিপার মায়ের সাথে ৷ স্ত্রীর মাথার কাছে বসে তার মাথায় হাত বুলাতে বুলাতে বলেন “আমরার নিপার বিয়া ঠিক হইছে বউ ৷ ওর বিয়াটা মিটা গেলেই তুমারে আমি শহরে বড় ডাক্তরের কাছে নিয়া যামু বউ ৷ ”

স্বামীকে দেখে আটোসাটো হয়ে বসে পাগলী বউটি ৷ তারপর মাথায় কাপড় তুলে নিয়ে বলে “আসসালামু আলাইকুম , আপনে ভালো আছেন নাদেরের বাপ ?”

গাজী মিয়া জবাব দিতে গিয়ে হঠাৎ খেয়াল করেন তার বউয়ের হাতে শক্ত করে ধরা একটা বটি ! তার চোখে মুখে কেমন ভয়ঙ্কর হাসি….. উত্তর না দিয়ে তিনি ঘর থেকে ছুটে বের হন …. তার পাগল বউটির হাতে বটি কিভাবে পৌছালো কে জানে ! ঘরের দরজায় কোনমতে তাল দিয়ে চিৎকার করে ডাকতে থাকেন “ওরে রতইন্যা ! তোর বড়মামীর হাতে বটি !”

বন্ধ ঘরের ওপার থেকে একটা বিভৎস্য হাসির শব্দ আসতে থাকে ….

********
শ্বশুরের চিৎকার শুনে ঘরে বসে বসে ঘামছে লাকী ৷ মনে হচ্ছে তার জীবনটা এবার বের হয়ে যাবে ৷ শাশুড়ির কাছে বটি পৌছানোর কাজটা সেই করেছিল ৷ গতকাল তার শাশুড়িকে যখন সে ভাত দিতে যায় তখন উনি বলছিলেন “আম্মাজি , একখান বটি লাগবো , হাত পায়ের নখডি বড় হইয়্যা গেছে … এইগুলান কাটতাম ”

লাকী ঝামেলা এড়াতে বটি দিয়েছে ৷ পাগল মহিলার সাথে ভেজালে যেতে চায়নি অথবা বটি তার হাতে গেলে কী বিপদ হতে পারে এই চিন্তাটা করা জরুরি মনে করেনি সে ৷ এখন কেউ যদি জানতে পারে এই কাজ সে করেছে তাহলে সর্বনাশ হয়ে যাবে ….

নাদের মিয়া আজ গঞ্জে যায়নি ৷ রাত থেকেই তার জ্বর জ্বর ভাব , একটাদিন বিশ্রাম নিতে এখনও বিছানায় শুয়ে আছে সে ৷ লাকীর চোখের আতঙ্ক তার দৃষ্টি এড়ায় না …. লাকীর হাত দুটো ধরে নাদের মিয়া বলে উঠে “আম্মারে তুমি দিছো বটি ? ”

লাকী এক ঝটকায় স্বামীর হাত ছেড়ে জবাব দেয় “হ ! আমার ঠেকা পড়ছে না ! আপনের মায়েরে আমি বটি দিতে যামু কুন দুঃখে ! আপনে আমারে এমন কতা কইতে পারলেন ….. অক্ষন আমি বাপের বাড়ি চলে যামু ৷ যেই সংসারে মান নাই , সেই সংসারে লাকী থাকবো না !”

নাদের মিয়া পাশ ফিরে শুয়ে পড়েন ৷ তার বউ দুদিন পরপর নাই কথার ছুতো ধরে বাপের বাড়ি চলে যায় , এটা দেখে সে অভ্যস্ত ৷ কখনও বাঁধা দেয় না সে , যার যেখানে ভালো লাগবে যাবে … থাকতে না চাইলে তো আর কাউকে আটকে রাখা যায় না ! মানুষ তো আর খাঁচার পাখি না !

তবে এবার যেন একটু শক্ত হলো নাদের মিয়া ৷ গম্ভীর গলায় বললো “নিপার বিয়া শ্যাষ হইলে কই যাইবা যাইও ৷ এখন তোমার কোথাও যাওন চলবে না ৷ যাও নিজের কামে যাও ৷ ”

লাকী অবাক ভালোবাসায় স্বামীর পিঠের দিকে তাঁকিয়ে থাকে , তার মুখ অপর পাশে ফেরানো ….
এই প্রথম তার স্বামী তাকে অধিকার নিয়ে বললো যাওয়া হবে না ৷ তা সে যেভাবেই হোক…

চলবে…

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here