আমি সেই চারুলতা পর্ব-৪৪

0
3607

(প্লট পরিবর্তিত হয়েছে। যারা আগের পর্বটি(ডিলিট করা পর্ব) পড়েছেন তাদের আবারও পড়ার অনুরোধ রইলো।)

#আমি_সেই_চারুলতা
#Shuvra_Priya (স্নেহা)
#পর্বঃ৪২ (অন্তিম পর্বের দ্বিতীয় অংশ)
_________________________

– বাসায় যা বিন্দিয়া। বিয়ের আগে এখানে সেখানে ঘোরা উচিত না। সবাই বলে, তাতে নাকি নজর লাগে। তোর বিয়েতে কিন্তু আমি তোকে সাজাবো। তুই মানা করতে পারবিনা।
– চারু তুই! চারু এমন করিস না আমার সাথে। তুই অন্তত আমারে বোঝার চেষ্টা কর। জমিদার বাড়ির ছেলের সাথে বিয়া ঠিক হইছে আমার। বিয়াটা হইয়া গেলে আমি বিষ খামু চারু। তোর ভাইয়ে তো তোর সব কথা শুনে। একটু বোঝা তোর ভাইরে।
– আমার ভাইয়ের নিজস্ব একটা জীবন আছে। তার যেমন ইচ্ছে নিজের জীবন তেমন ভাবেই সাজাবে সে। বিয়েটা করে নে বিন্দিয়া। তবে সাবধানে থাকিস, ওবাড়ির সবাই যেমন খারাপ না তেমমি সবাই কিন্তু ভালোও না। আর আমার ভাইয়ের আশা ছেড়ে দে। সে একবার যে সিদ্ধান্ত নেয় তাতে অটুট থাকে। আমরা দুই ভাই-বোন একই রকম বিন্দিয়া। আমাদের মনে মায়া দয়া নেই। কোথাও না কোথাও বাবার ছায়া পেয়েছি আমরা দুজনেই। তোর প্রতি আমারই মায়া হচ্ছেনা আমার ভাইয়ের কি মায়া হবে?
– আমার প্রতি তোর মায়া হইতাছে না?
– সত্যি বলতে হচ্ছেনা। করুণাও হচ্ছেনা। আমরা মানুষ বিন্দিয়া। আর মানুষ কখনো নিখুঁত হয়না। আমরাও নিখুঁত না। আমাদের মন পাথরের মতো শক্ত। সেখানে কারোর প্রতি সহজে মায়া জন্মায় না। জীবনে অনেক ভুল করেছি কিন্তু কখনো সর্বস্ব দিয়ে অনুতপ্ত হইনি। তবে ভাইয়া হয়েছে। ভাবির প্রতি করা প্রতিটা অন্যায়ের প্রতি সে অনুতপ্ত হয়েছে। আমরা যেমন সহজে কাউকে ভালোবাসিনা তেমনি একজনকে ভালোবাসলে নিজেদের সবটা দিয়ে ভালোবাসি। তাই বলছি, আমার ভাইয়ের মনে তুই জায়গা করতে পারবিনা। বিয়ে করে সুন্দরমতো সংসার কর।
চারুর কথার প্রভাবে নাকি অপরাধবোধে সেইটা ঠিক বোঝা গেলো না তবে বিন্দিয়া জাবিনকে বিয়েটা করেই নিলো। ছেলেটা ভালোই। শহরে থেকেছে অনেকটা সময় আবার গ্রামেও থেকেছে। সে যেমনি শহুরে ভাষায় কথা বলতে পারে তেমনি গ্রামীণ ভাষায়ও কথা বলতে পারে। সকলের সাথে মিশে যেতে পারে দ্রুতই। বিন্দিয়া সর্বোচ্চ দিয়ে চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে জাবিনকে মেনে নেওয়ার। হয়তো কিছুদিনের মধ্যে মেনেও নেবে। মানব মন বড়ই অদ্ভুত, যেসব কাজ আজ অসম্ভব বলে মনে হয় সময়ের ব্যাবধানে সেসব কাজই হয়ে ওঠে খুব স্বাভাবিক। তবে পুরোনো দীর্ঘশ্বাসটি কোথাও না কোথাও রয়েই যায়।

★★★

হামিদ সোনাদীঘির পাড়ে দাঁড়িয়ে থাকে। এখনো জল পদ্মে পরিপূর্ণ। পদ্ম কি কম ছিলো যে হামিদের একটা মাত্র পদ্মকেও সে গ্রাস করে নিলো। হামিদ ভাবে নিজের ছোটবেলার কথা, ছোটবেলাই ভালো ছিলো। বড় হওয়ার এ কষ্ট আর সহ্য হয়না তার। কি সুন্দর দেড়শো টাকা বেতনের কাজে হয়ে যেতো তার। অবশ্য হতো না, সে শুধু হেলাফেলায় সময় কাটানোর জন্য ওই কাজটা বেছে নিয়েছিলো। যদিও বাইরে দেখা যাচ্ছে সে কাজ করছে তবে তেমন কাজ সে করতো না। গ্রামে সবকিছুর দাম কম ছিলো বিধায় হাতখরচ কোনোমতে চলে যেতো। তখন টাকা ছিলো না কিন্তু সুখে ভরপুর ছিলো জীবনটা আর এখন হাজার হাজার টাকা মাসে আয় করে কিন্তু তাও মনে কোথাও একটু সুখ নেই। কালো পদ্মের সাথে সাথেই সুখটাও মরে গেছে তার। ইশ! যদি আরেকটা বার ফিরে পাওয়া যেতো পদ্মফুলটাকে। আরেকটা বার আবদার করতো, “আমারে একটু বুকে নিয়া ঘুমাইবেন?” হামিদ নিজের সর্বশক্তি দিয়ে হলেও আকড়ে ধরতো নিজের কালো পদ্মকে। আর কখনোই যেতে দিতো না। কক্ষনো না।

★★★

– তোমার কাছে বিষাক্ত ভালোবাসার সংজ্ঞা কি সুহাসিনী?
– হঠাৎ এ প্রশ্ন করছেন শিহাব?
– এমনিই জিজ্ঞেস করলাম।
– বিবেকহীন, যুক্তিহীন, আত্মসম্মান বর্জিত অনুভূতিকেই বিষাক্ত ভালোবাসা বলে। ঠিক যেমনটা আমি আপনাকে ভালোবাসি কিন্তু আপনি ভালোবাসেন অন্য কাউকে। নিজের আত্মসম্মানের বলি দিয়ে আমি আপনাকে ভালোবাসি। তবে আপনার ভালোবাসাটাও বিষাক্ত ভালোবাসা শিহাব কারণ আপনি যাকে ভালোবাসেন সে আপনাকে ভালোবাসেনা। এইটাও কিন্তু একটা বিষাক্ত ভালোবাসা।
– ঠিকই বলেছো সুহাসিনী। আমি যাকে ভালোবাসি সে অন্য কাউকে ভালোবাসে এইটা পৃথিবীর বিষাক্ততম অনুভূতি। বুকটা হাজারো কষ্টে চৌচির হয়, মনের হাজারো খন্ড হয় কিন্তু যার জন্য হয় সে কখনো চেয়েও দেখেও না।
– আর যদিও বা দেখে তবুও তার মূল্য দেওয়ার সাধ্য তার নেই কারণ সে ইতিমধ্যেই অন্যজনে আসক্ত।
শিহাব এক পলক সুহাসিনীর দিকে তাকিয়ে নিজের দৃষ্টি নত করে। সুহাসিনী যে কথাটা তাকে উদ্দেশ্য করেই বলেছে সেটা বুঝতে সময় লাগেনা শিহাবের।
– তুমি বিয়েটা ভেঙে দাও সুহাসিনী। আমি তোমাকে যথাযথ মূল্যায়ন করতে পারবোনা। মেয়ে হিসেবে তুমি শতভাগ পার্ফেক্ট। রুপে, গুনে, বুদ্ধিমত্তায় অনন্য। সেখানে আমার নিজেকেই তোমার অযোগ্য মনে হয়, আমি তো কখনো তোমাকে মন থেকে ভালোও বাসতে পারবোনা।
– রূপ, গুন, বুদ্ধি এইসব থেকেই বা কি হবে শিহাব যদি ভালোবাসার মানুষটিকে নিজেরই করতে না পারলাম।
– সবার তো আর সব ইচ্ছে পূরণ হয়না সুহাসিনী। আমি স্বর্ণলতাকে ভালোবাসি। তাকে পাবোনা জেনেও ভালোবাসি। আমার ভালোবাসায় কোনো খাত নেই, কারণ আমি তাকে পাওয়ার জন্য ভালোবাসিনি, আমি তাকে পাবোনা জেনেই ভালোবেসেছি।
– আমিও আপনাকে পাওয়ার জন্য ভালোবাসিনি শিহাব, তবে ভাগ্য যদি আমাকে আপনার সাথে মিলিয়ে দেয় তবে আমি কেনো ছাড়বো?
– তুমি বুদ্ধিমতি সুহাসিনী, এইসব বাচ্চামো তোমাকে মানায় না। তুমি যথেষ্ট ম্যাচুয়র।
– আমার না আপনার স্বর্ণলতাকে দেখার খুব ইচ্ছে। সে ঠিক কতটা সুন্দরী যে তাকে ছাড়িয়ে আপনার মন মস্তিষ্ক অন্য কাউকে কল্পনা করতে জানেনা!
– সে যথেষ্ট সুন্দরী সুহাসিনী তবে আমাকে কেবল তার সৌন্দর্য আকৃষ্ট করেনি। সৌন্দর্যের মায়ায় পড়লে বোধহয় অনেক আগেই তাকে ভুলে যেতাম। তবে আমি আজও প্রতিদিন একটু একটু করে নতুনভাবে তাকে ভালোবাসি আর এই পাঁচ বছরে এমন এক মুহুর্ত নেই যখন আমি তাকে ভালোবাসিনি। পাঁচ বছর আগে আমি যতটা তাকে ভালোবাসতাম এখন তার চেয়েও অনেক বেশি ভালোবাসি কিন্তু এই পাঁচটা বছরে আমি একবারও দেখিনি আমার স্বর্ণলতাকে। তাকে শেষবার দেখেছিলাম কিছুদিন আগে। নিজের স্বামীর কাধে মাথা রেখে বসে ছিলো নদীর পাড়ে। আমার স্বর্ণলতা ভালোই অন্যের সাথে সুখে আছে। আমিও চাই সে সুখে থাকুক। আমার সবটুকু সুখ শুষে নিয়ে আমার ভালোবাসাটা সুখে থাকুক।
– তাহলে তার এই সুখ সহ্য করতে না পেরে বিয়ের তারিখ আগে বাড়িয়ে দিলেন কেনো শিহাব?
– ভালোবাসার মানুষটিকে অন্যের হাতে তুলে দিতে সক্ষম এমন খুব কম মানুষই আছে দুনিয়ায় কিন্তু ভালোবাসার মানুষটিকে অন্যকারোর সাথে দেখার মতো সাহস কারোর নেই। তেমনি আমি জানি স্বর্ণলতা অন্যকারোর। আমি মেনে নিয়েছি তবে স্বচক্ষে সেটা দেখার সাহস আমার মাঝে ছিলোনা তাই রাগের মাথায় মা-কে বলে বিয়ের তারিখ সামনে এনেছিলাম। যখন রাগ কমে এলো তখন বুঝলাম কি সর্বনাশ ঘটে গেছে আমার দ্বারা। এখন আমার হাতে আর কিছু নেই। তুমি বিয়েটা ভেঙে দাও সুহাসিনী।
– না শিহাব আমি বিয়েটা ভাঙবো না। আমি আপনাকে চাই। যেকোনো মূল্যেই চাই।
– তুমি আমাকে কখনোই পাবেনা সুহাসিনী। হয়তো পরিস্থিতির চাপে মানিয়ে নেবো কিন্তু ভালোবাসাটা সম্ভব নয়। প্রতিটি মানুষের মনেই একটা বিশেষ জায়গা থাকে আর ওই বিশেষ জায়গাটা কেবল একজন বিশেষ মানুষকেই দেওয়া যায়। আর আমি সেই জায়গাটা অন্য কাউকে দিয়ে দিয়েছি। আমি শেষ পর্যন্ত চেষ্টা করবো মানিয়ে নেওয়ার কিন্তু আমি যদি মানিয়ে নিতে অক্ষম হই তবে আমি পালিয়ে যাবো সুহাসিনী। বিয়ের আসরে বর পালিয়ে গেলে সেইটা নিশ্চয়ই তোমার কিংবা আমার কোনো পরিবারের জন্যই সুখকর হবেনা?
– ভালোবাসি আপনাকে শিহাব। সবটা দিয়ে ভালোবাসি। আপনার জন্য সব ধরনের কলঙ্ক মাথা পেতে নিতেও আমি রাজি শিহাব।
– তুমি ঠিকই বলেছিলে সুহাসিনী, বিবেকহীন, যুক্তিহীন, আত্মসম্মান বর্জিত অনুভূতিকেই বিষাক্ত ভালোবাসা বলে।

★★★

আমাকে খোজার জন্য খুব তাড়া তাই না অফিসার, সোজা গ্রাম অবধি চলে এলেন? ফোন নাম্বার ট্র‍্যাক করছেন। সিমের ডিটেইলস বের করতে চাইছেন। আপনার সাথে আমার কোনো শত্রুতা নেই। এইসব থেকে দূরে সরে যান। শুধু শুধু আমার শত্রুর সংখ্যা বাড়ানোর কোনো ইচ্ছে নেই। আর নিতান্তই যদি না সরতে চান তবে চলুন দেখা করা যাক। কাল সন্ধ্যা ৭ টায়, মধুরোড ৭/৫ পল্লিগীতি ফ্যাক্টরির সামনে। করবেন নাকি দেখা? আপনার বউয়েরও তো খুব শখ আমার সাথে দেখা করার, তো আশা করছি আসছেন।

হোসেনের কাছে থেকে পাওয়া বসের নাম্বারটা সিফাত নিয়েছিলো চারুর কাছ থেকে। সেই নাম্বারটা ট্র‍্যাক করতে পাঠানো হয়েছিলো কিন্তু পাঁচ বছরে একটা বারের জন্যেও সিম কার্ডটি ওপেন হয়নি। আর আজ সরাসরি এমন একটা ম্যাসেজের জন্য প্রস্তুত ছিলোনা সে। সিফাত বিলম্ব না করে সরাসরি চলে গেলো চারুর কাছে। লতাকে ঘুম পাড়াচ্ছে সে। হামিদ কিছুটা দূরেই চেয়ারে বসে দেখে যাচ্ছে নিজের মেয়েকে। ফাতেমার সাথে মিল নেই চেহারার তাও কেমন যেনো ফাতেমার কথাই মনে করাচ্ছে মেয়েটা,
– বেলিফুল, মধুরোড ৭/৫ পল্লিগীতি ফ্যাক্টরিটা কোথায়?
– এড্রেস তো আপনিই বলে দিলেন সিফাত। আমি আর কি বলবো?
– মানে আমি বলতে চাইছি জায়গাটা কোথায়?
– পাশের গ্রামে? (হামিদ)
– পাশের গ্রামে কোথায়?
– এ গ্রাম থেকে উত্তর পূর্ব দিকে ৯ কি.মি. এর মতো গেলেই পল্লিগীতি ফ্যাক্টরি। আপনি হঠাৎ সেই ফ্যাক্টরির কথা জিজ্ঞেস করছেন কেনো? সেটা তো অনেক আগেই বন্ধ হয়ে গেছে। (চারু)
– আমার জন্মেরও আগে ওই ফ্যাক্টরি বন্ধ পইড়া রইছে। কোনোদিন খুলতে দেহি নাই। বাইশ বছর আগেও যেমন ছিলো এহনও তেমনই পইড়া আছে। (হামিদ)
– এর জন্যই তথাকথিত সেই বস আমাকে সেখানে দেখা করতে বললো।
– বস দেখা করতে বলেছে মানে? কোন বস?
সিফাত হামিদ এবং চারুকে ক্ষুদ্র বার্তাটি দেখালো। চারু এই প্রথমবারের মতো আশার আলো দেখতে পেলো। সেই তথাকথিত বসকে তার খুজতে হবেনা সে নিজেই ডেকে নিয়েছে নিজের মৃ*ত্যুকে। এইবার সকল হিসেব হবে সমানে সমানে। নিজের জীবন দিলে হলেও চারু তার ভবলীলা সাঙ্গ করবে।
হামিদ চোখমুখ বন্ধ করে একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়বো। শেষ অবধি চারু জানতে চলেছে সেই ভয়ংকর সত্য। চারু কি আদেও সইতে পারবে সেটা?
– প্রস্তুতি গ্রহণ করুন সিফাত। কাল রাতেই আমরা সেখানে যাবো।
– বাচ্চাদের কে দেখবে?
– হিমেল দেখবো। ওই ভীতু এমনেও কোনো কামের না। উল্টাপাল্টা কিছু হইতে দেখলেই প্যান্ট ভিজায়া ফেলবো, এরচেয়ে ভালো সে এখানে বাচ্চাদের সাথেই থাকুক।(হামিদ)
– কথাটা কিন্তু খারাপ বলোনি হামিদ।
অতঃপর কাজ সবটাই হলো পরিকল্পনা মাফিক। নির্দিষ্ট সময়েই তারা পৌঁছে গেলো ফ্যাক্টরির সামনে। নিচতলায় কাউকেই দেখা গেলো না। তিনজনেই সিড়ি বেয়ে দোতলায় উঠলো আর সেখানেই অপেক্ষা করছিলো তাদের জন্য এক চমক। মোটা ভারী পুরষালি কণ্ঠে কেউ বলে উঠলো,
– বাহ! চলে এসেছো তবে? বলতে হয় সাহস আছে তোমাদের। আমার নরকপুরীতে তোমাদের আজ খুবই বাজেভাবে স্বাগত করা হবে। প্রস্তুত তো তোমরা?
চারিদিকে অন্ধকার ছিলো এতক্ষণ। মুহুর্তেই লাইট জ্বলে উঠলো। সম্পূর্ণ মুখমণ্ডল কালো মুখশে আবৃত এক ব্যক্তি। তবে চারু জানে এই লোকটি বস নয়। বস আরো লম্বা, হ্যাংলা পাতলা কিন্তু এই লোকটার পেটটা একটু মোটা। লম্বাও নয় তেমন, যদিও চেহারা দেখেনি তবুও হাত পায়ের কিছুটা কুচকানো চামরা দেখে অনুমান করা যায় লোকাটা নিঃসন্দেহে পঞ্চাশার্ধ। এইটা কি সেই বসের আন্ডারে কাজ করা কেউ। এইবার লোকটা মুখোশ খুলতেই চমকে উঠলো হামিদ আর চারু, কারণ এ আর কেউ নয় বরং ছোট জমিদার সাহেব।
– আ আপনে? (হামিদ)
হামিদের এখনো বিশ্বাস হচ্ছেনা এইটা সেই লোক। এই লোকটা নিতান্তই সহজ সরল ধরনের। হামিদের সাথে বেশ কয়েকবার কথাও হয়েছিলো তার। এই লোকের বেকুবের মতো কথাবার্তায় নিজ মনেই কতবার হেসেছে তার হিসেব নেই কিন্তু এই লোক কিভাবে বস হয়? এইটা কিভাবে সম্ভব?
– না আপনি বস নন। হতে পারেন না। নিশ্চয়ই বোকা বানানোর চেষ্টা করছেন আমাদের৷ ভালোয় ভালোয় তাকে বের করে আনুন বলে দিচ্ছি। (চারু)
– আরে বাবা আস্তে। এত চিৎকার করো তুমি? আমিই বস আর তুমি যার কথা বলছো সে অভি। আমার ছেলে অভি। দেখা করবে তার সাথে? পরে করো, আগে তোমাদের সাথে একটু কথাবার্তা বলি। চা নাস্তা করো। ততক্ষণে চলে আসবে অভি এবং স্মৃতি। ওহ, তোমাকে তো বলাই হয়নি স্মৃতি তোমার বোন। বিশ্বজিতের বড় মেয়ে। স্মৃতি অবশ্য তোমাকে বোন বলে স্বীকার করেনা। পৃথিবীর সবচেয়ে খারাপ পজিশনে তুমি থাকো সেটাই তার লক্ষ্য। এই নারী চরিত্র সত্যিই ভীষণ অস্বাভাবিক। নইলে কোনো শত্রুতা নেই, কিছু নেই সে কেনো তোমার খারাপ চাইবে বলো তো? যাই হোক, অনেকক্ষণ যাবত দাঁড়িয়ে আছো। এখন একটু বসো। চা নাস্তা কিছু করবে নাকি?
– আপনার এখানে খেতে আসিনি আমরা।
– যাক বাবা ভালোই হয়েছে। এখানে খাবার দাবারের ব্যবস্থাও নেই। দূরের দোকান থেকে কিনে আনতে হয়। আরে তোমরা দাঁড়িয়ে আছো কেনো? এতগুলো চেয়ার আছে, বসে যাও কোনো একটায় নইলে কিছুক্ষণ পর যা দেখবে তাতে তো এমন ধাক্কা খাবে যে আর উঠে দাঁড়ানোর জোর পাবেনা।
– বাজে বকা বন্ধ করুন। ডাকুন অভিকে।
– বাব্বাহ! এত শখ অভিকে দেখার? এক রাতেই মায়ায় ফেলে দিয়েছে বুঝি?
কথা বলেই ছোট জমিদার বিশ্রী একটা হাসি দিলো। চারুর ষষ্ঠ ইন্দ্রিয় অবধি ঘৃণায়, রাগে বিষিয়ে উঠলো। ইচ্ছে করছে এখনি এই নরপিশাচটির ধর থেকে মাথা আলাদা করে দিতে, কিন্তু চারু অপারগ এখনো অনেক কিছু জানতে হবে তাকে।
– লজ্জা করলো না আপনের সকলের সাথে এই ভালো মানুষির নাটক করতে? (হামিদ)
– লজ্জা থাকলে তো লজ্জা করবে? আরে বাবা এইসব কাজে কি লজ্জা পেলে চলে নাকি? তুমি তো লজ্জা পেয়েই চলে গিয়েছিলে এখান থেকে। তো এখনো বোনকে বলোনি বস কে? হ্যাঁ আমার কথা হয়তো জানতেনা কিন্তু অভির কথা তো জানতে? বলো জানতে না?
চারু এবং সিফাত দুজনেই বিষ্ময়ের দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে হামিদের দিকে। দুজনের চোখেই খেলা করছে হাজারো প্রশ্ন। হামিদ নিজের চোখ বন্ধ করে নিলো। চারুকে কিছু বলার সাহস তার ছিলো না। হামিদের এই চোখ বন্ধ করে নেওয়া যেনো আরো একবার সকল উত্তর দিয়ে দিলো চারুকে।
– ধোকা! আরো একবার ধোকা দিলে তুমি আমাকে!
হামিদ ব্যাথাতুর চোখে চেয়ে রইলো চারুর দিকে। সে হাজার চেষ্টা করেও একথা চারুকে বলতে সক্ষম হয়নি তাই সিদ্ধান্ত নিয়েছিলো চারু যা দেখার সরাসরি দেখবো। চারুর এমন প্রতিক্রিয়াতেও খুব একটা অবাক হলোনা হামিদ। এইটাই তো হওয়ার ছিলো। আসলেই সে দ্বিতীয়বার ঠকালো চারুকে।
– সয়ে গেছে ভাইয়া। এখন আর অবাক হইনা। তবে ঠকানোর মাত্রাটা এইবার অনেক বাড়িয়ে দিলে তুমি। একবারও ভাবলেনা এই বোঝাটা আমার সইবে কি না?
– চারু আমি সাহস পাই নাই তোরে জানাইতে কিন্তু বিশ্বাস কর তোরে ঠকানোর ইচ্ছা আমার ছিলোনা।
– আমাকে কেনো বলোনি হামিদ?(সিফাত)
হামিদ কোনো উত্তর দেওয়ার আগেই ভেতরের ঘর থেকে বেড়িয়ে আসে দুজন তরুন তরুণী। চারু অবাক হয়ে চেয়ে থাকে তাদের দিকে। তারা যে চারুরই চেনাজানা কেউ সেটা বুঝতে দেরি হয়নি তার। এমনকি এই মুখোশে আবৃত লোকটিই তথাকথিত সেই বস। আচমকা অভি নিজের মুখ থেকে খুলে ফেললো মুখোশটি।

চারু মাটিতে বসে পড়লো। তার ভেতরে কেমন ঝড় বয়ে চলেছে তা কল্পনা করতে পারছেনা কেউ। মনে হচ্ছে যেনো দুনিয়া উলোটপালোট হয়ে যাচ্ছে। চারু একমুহূর্তের জন্য ভেবে নিয়েছিলো এখানে আজ সে শিহাবকে দেখবে কিন্তু,, চারু আর কিছু ভাবতে পারেনা। কাপাকাপা কন্ঠে উচ্চারণ করলো
– শ শ শাওন ভাই! তুমি? তুমি বেঁচে আছো?
অভি কিছু না বলে মুচকি এক হাসি দিলো। মায়াবী হাসি যা দেখলে মুহূর্তের মাঝেই মন জুড়িয়ে যেতো চারুর আর আজ সেই হাসি দেখে বিতৃষ্ণায় দম বন্ধ হয়ে আসছে তার।
– তুমি? তুমি এতো বড় ধোকা দিলে আমাকে?
– শুধু আমি নয়, হামিদও দিয়েছে। ও আগে থেকেই সবটা জানতো।
চারু নিস্তব্ধ হয়ে যায়। জীবনটা আজ দ্বিতীয়বারের মতো ভীষণ শূন্য লাগছে। চারুকে চুপ থাকতে দেখে মোহিত কণ্ঠে শাওন বলে উঠলো,
– কেমন আছো মায়াবিনী?
চারুর চোখ থেকে আরো একফোঁটা অশ্রুজল গড়িয়ে পড়লো। এও কি সম্ভব? সবশেষে কি না শাওন?
– তোমার ভাইয়ের বয়স তখন সম্ভবত সতেরো। তাকে নিয়ে গিয়েছিলাম আমাদের নরকপুরীতে। দেখেছিলাম শত শত মেয়ে কিন্তু ভাইটা তোমার তখনও বেশ ছোট। নারী আকর্ষণ বুঝলোই না। ভয় লজ্জায় পালিয়ে গেলো। আমি তো ভেবেছিলাম হামিদ তোমাকে সব বলেই দেবে। এই বুঝি আমার প্ল্যান ফ্লপ হয়ে যায়। কিন্তু বেচারা এতটাই কনফিউশনে পড়ে গিয়েছিলো যে এইসব ভাবতেও পারেনি। তোমাকে বলা তো দূরে থাক। আসলে হামিদ নিজেও বেশ বোকা। সে শুধুই আমাকে সন্দেহ করে গিয়েছে কিন্তু শতভাগ নিশ্চিত ছিলোনা এইটা আমি। এইটা কোনো কথা বলো? পানির মতো পরিষ্কার সব আর হামিদ বুঝলোই না।
হামিদ অস্বস্তিতে মিইয়ে যায়। সে সত্যিই সবটা নিশ্চিত জানতো না। শাওন চারুর সাথে এমনটা করতে পারে তা কল্পনাও করেনি হামিদ তাই বারবার হিসেব গুলিয়ে যাচ্ছিলো তার। পুরোপুরি নিশ্চিত না হওয়ার কারণে সিফাতকেও কখনো সত্যটা জানায়নি হামিদ।
– কি হামিদ! বলো তোমার আদরের বোনকে সবটা। বলো বলো।
হামিদ চুপ করে রয়। শাওনকে চারু নিজের খুব ভালো বন্ধু বলেই মনে করেছে সবসময়। তার এমন জঘন্য রূপ কিভাবে মেনে নেবে? আদৌও কি সম্ভব মেনে নেওয়া?
– বাদ দাও, তোমাকে বলতে হবেনা আমিই বলছি। বলবো নাকি?
শাওন উত্তরের অপেক্ষা না করে নিজ থেকেই বলতে শুরু করলো,
– তোমাকে নিয়ে আমাদের অনেক প্ল্যান ছিলো চারুলতা। গোটা দেশে আমাদের আলাদা আলাদা আটটি ভাগ রয়েছে। একেক ভাগ একেক কাজ করে। কিন্তু এই আট দলেরই কমন এক কাজ ছিলো যাচাইকৃত সুন্দরীদের চিহ্নিত করে বিদেশে পাচার করা। মোট তেরোটি মেয়ে আমরা এভাবে সিলেক্ট করি। বারোজনকে আমরা কাজে লাগিয়ে দিয়েছি, তুমিই সর্বকনিষ্ঠ এবং একমাত্র মেয়ে যে সবটা জানার পর নিজের সর্বনাশ নিজের চোখে দেখবে। লাকি গার্ল!
– তেরোটা মেয়ের জীবন এভাবে নষ্ট করেছো তোমরা?
– উহুম! প্রচুর করেছি তবে বারো জন অত্যাধিক সুন্দরী। মেয়েরা সাধারণ খুবই সংকীর্ণ মনের হয়। তারা একাধিক পুরুষের শয্যাসঙ্গী কখনোই হতে চায়না তাই মোটামুটি কৈশোরে পা দেওয়া মাত্রই তার সাথে একাধিক পুরুষের ঘনিষ্ঠতা তৈরি করা হয়। এক্ষেত্রে তুমি আবারও সৌভাগ্যবান যে কেবলমাত্র তিন জনের সানিধ্যেই তোমাকে যেতে হয়েছে আর বর্তমানে যাকে বিয়ে করেছো তাকেই নিজের পরিচয়ে বিয়ে করেছো তুমি। সব মিলিয়ে মাত্র চার। বাকি বারো জনের সাথে যা হয়েছে তা তুমি কল্পনাও করতে পারোনা। তারা তাদের কুমারিত্ব হারায়ই নিজের পিতার কাছে। তারপর কোনো ভাই থাকলে সে। আর একাধিক ভাই থাকলে তো কথাই নেই। তারপর বিয়ে হয়, আর বিয়ের পর কি হয় সেটা তো তোমার জানাই। তুমি প্রচন্ড সৌভাগ্যবান চারুলতা। প্রচন্ড সৌভাগ্যবান। বিশ্বজিৎ শুরু থেকেই নারী লোভী ছিলো কিন্তু সে কখনোই তোমাকে ধর্ষনে রাজি হয়নি। এই প্রথম কোনো মেয়ের প্রতি সম্মান দেখেছিলাম তার চোখে। অবশ্য শয়তান শয়তানই হয়। সে নিজে না করলেও অন্যকেউ করার ইচ্ছে পোষণ করলেই বাধা দিতো না। পিতৃত্ববোধ বিশেষভাবে ছিলো তার মাঝে। বিশ্বজিৎকে দিয়ে যখন আর কোনো আশা থাকেনা তখন টার্গেট করি হামিদকে। হামিদের সাথে আগে থেকেই বন্ধুত্বের সম্পর্ক ছিলো আমার। সেই সুযোগেই তাকে একদিন নিয়ে যাই সুন্দরী নারীদের ডেরায় কিন্তু মনোরমা সত্যিই ছেলেটাকে যোগ্য হিসেবে গড়ে তুলেছিলো। মহিলার প্রসংসা না করে পারলাম না। সেই আদর্শেই হামিদ সেখান থেকে একপ্রকার পালিয়ে যায় আর যোগাযোগ একেবারেই বন্ধ করে দেয়। হামিদকে দিয়ে তোমাকে প্রহার করানো তো দূরে থাক, মায়ের মৃত্যুর পর ও তোমার রক্ষক হয়ে আমাদের পুরো পরিকল্পনাটা আবারও ভেস্তে দিলো।
এই অবধি হামিদ সহ্য করতে পারলোনা। নিজের বোন কে নিয়ে এমন জঘন্য মনোভাব কোনো সুস্থ মানুষেরই সহ্য হবেনা। চেয়ার গুলো থেকে হাতের কাছে থাকা একটা চেয়ার উঠিয়ে ছুড়ে মারলো অভি ওরফে শাওনের দিকে। শাওন বোধহয় প্রস্তুতই ছিলো এমন কিছুর জন্য তাই দ্রুতই কোনোরকম ক্ষয়ক্ষতি ছাড়াই সরে যেতে সক্ষম হলো সেখান থেকে,
– ভাই র*ক্ত এতো গরম কেনো? আস্তে-ধীরে করো। আমি মরলে তোমার বোনের এত প্রশ্নের উত্তর কে দেবে বলো তো? তবে যাই বলো তেরো জন মেয়ের মাঝে সত্যিই সবচেয়ে সৌভাগ্যবান চারুলতা!
– খবরদার তোর ওই জঘন্য মুখে আমার বইনের নাম নিবি না।
– এই তুমি! যত নষ্টের গোড়া ভাই তুমি। আমাদের প্ল্যান একে একে সব ফেইল হলো তোমারই জন্য। আর সবচেয়ে বড় প্ল্যান ফেইল হলো শিহাবের জন্য। এই শিহাবও না, ভালোবাসার জন্য দুনিয়ায় আর কোনো মেয়ে পায়নি। তবে যাই বলো না কেনো, শিহাব সত্যিই তোমাকে ভালোবেসেছে। দুনিয়ার একমাত্র ছেলে যে তোমাকে সত্যিই নিঃস্বার্থভাবে ভালোবেসেছে। আর বাকি রইলো আরেক জঘন্য লোকের কথা। নিঃসন্দেহে সে তোমার জন্যেও জঘন্য আর আমার জন্যেও জঘন্য। কে জানো? বিশ্বজিৎ! শেষ বয়সে এসে তার মনে হলো সে এইসব ঠিক করছেনা। আমাদের বিরুদ্ধে প্রমান রাখতে সব লিখে রাখতে লাগলো একটা খাতায় সাথে ছিলো আমাদের একটা ছবি কিন্তু অর্ধেকটা লিখতেই তোমরা তার ভবলীলা সাঙ্গ করে দিলে আর সেই আধ লেখা খাতাটা গিয়ে পড়লো শিহাবের হাতে। তার কাছে আমি তো মা*রা গেছি। সে হন্য হয়ে খুজতে লাগলো ছোট জমিদারকে। আমাদের ভাগ্য সুপ্রসন্ন ছিলো যে আমরা আগেই বুঝতে পেরে গিয়েছিলাম শিহাব জানতে পেরে গেছে অনেককিছুই। ওহ তোমাকে তো একজনের সাথে পরিচয় করানোই হয়নি। স্মৃতি তোমার বড় বোন। স্মৃতির পরিচয় দিতে মুখ থেকে মুখোশ খুলে নেয় স্মৃতি। এলোমেলো স্ট্রেইট হেয়ারগুলো ছড়িয়ে পড়ে চারিদিকে। অত্যাধিক সুন্দরী এ নারী। তবে চারু তার মুখ দেখে অবাকের শীর্ষে পৌঁছে গেলো কারণ এ কার কেউ নয় বরং মিলি! সিফাত মাথায় একটু চাপ দিতেই মনে পড়ে গেলো সেদিন সপিং মলে দেখা হয়েছিলো মেয়েটার সাথে। হামিদ এখনো ভ্রুযুগল কুঞ্চিত করে মিলিকে চেনার চেষ্টা চালালেও খুব একটা সুবিধা করতে পারলো না।
– চিনতে পারলে তো চারুলতা?
– তুমি! তুমি কিভাবে আমার বোন হও তুমি তো শিহাবের বোন তাই না?
– আজব এক ক্যারেক্টর তুমি চারুলতা। এখন তুমি গবেষণা করতে বসে যাবে আমি কার বোন? আশা করি তোমার নরকে বসবাস করা দিনগুলো খুবই কষ্টের সাথে কাটবে।
– এই সুন্দরীদের দিয়ে অনেক কিছু করিয়েছি আমরা চারুলতা তবে তোমার জায়গা কেবল পতিতা পল্লীতেই হবে। এইটা স্মৃতির ঠিক করা।
হামিদ অনেকক্ষণ যাবত চারুর এই অসম্মান সহ্য করে গেলেও এইবার আর পারলো না। মুহূর্তেই রড জাতীয় কিছু একটা নীচ থেকে তুলে ছুড়ে মারলো সেটা অভির দিকে। অভি প্রস্তুত ছিলোনা বিধায় সেটা সরাসরি তার মাথায় গিয়ে আঘাত হবে এবং হাতে বন্দুক থাকায় এলোমেলোভাবে সেটা এগিয়ে যায় হামিদের দিকে। ঘটনার আকষ্মিকতায় স্তব্ধ অভি নিজেও কিন্তু এমন সময়েই সিফাত ধাক্কা দিয়ে নীচে ফেলে দিলো হামিদকে আর গু*লিটা সরাসরি তার বুকের বাঁ পাশে গিয়ে আঘাত করলো। চারু চিৎকার করে উঠলো সিফাতের নাম ধরে। দৌড়ে এগিয়ে গেলো সেখানে। চারিদিক র*ক্তে রঞ্জিত হয়ে গেছে ইতিমধ্যে। সিফাতের নিঃশ্বাস নিতেও যেনো কষ্ট হচ্ছে। কোনোমতে চারুকে বললো,
– আপনার সাথে অনেকে পথ চলার বাকি ছিলো বেলিফুল। কিন্তু আফসোস তা হলোনা। মেয়েটার খেয়াল রাখবেন বেলিফুল। আপনি ছাড়া ওর আর কেউ নেই।
– সিফাত! সিফাত কি বলছেন আপনি? কিচ্ছু হবেনা আপনার। আমি এখনি আপনাকে হসপিটালে নিয়ে যাবো।
– লাভ নেই বেলিফুল। মানুষ নাকি মৃ*ত্যুর আগেই বুঝতে পারে তার মৃ*ত্যু হবে। আমিও বোধহয় বুঝেছিলাম। আমি আমার সকল সম্পদ আপনার আর পুতুলের নামে করে দিয়েছি। যদিও পুতুলের নামে আগেও সব করা ছিলো কিন্তু আমি আপনার নামেও করে দিয়েছি। বাবার শখ ছিলো একটা অনাথ আশ্রম দেবেন তিনি। আমি পূরণ করতে পারিনি আপনি করবেন। আর শেষ একটা কথা বলতে চাইছি বেলিফুল, আমি ভালোবাসি আপনাকে। প্রচন্ড রকমের ভালোবাসি। আমার বেলিফুল যেনো কখনো অন্যের বাগানে শোভা না পায়। পরকালে আমি আল্লাহর কাছে চাইলে যেনো খুব সহজেই আপনাকে পেয়ে যাই। অন্য কারোর সাথে যেনো আমার তুলনা না হয়। কথাটা রাখবেন বেলিফুল। আমাদের একসাথে দীর্ঘপথ চলাটা না হয় পরকালেই হবে।
– স স সিফাত!
– শহহহহহ! কিচ্ছু বলবেন না বেলিফুল। আমি জানি আমার সময় শেষ। অন্তিম মূহুর্তটা আমি আপনার বুকে মাথা রেখে কাটিয়ে দিতে চাই। ইশশ! আসার আগে কেনো মেয়েটাকে একবার ভালো করে দেখে এলাম না বেলিফুল? কে জানতো এইটাই শেষবারের মতো মেয়েটাকে দেখা! আমার মেয়ের খেয়াল রাখবেন বেলিফুল। ওর মায়ের কুদৃষ্টি হতে বাঁচিয়ে রাখবেন। জানি সহজ নয় তবে অসম্ভবও নয়। আপনি চারুলতা, আপনি সেই চারুলতা যে একাই নিজের শত্রু নিধনের ক্ষমতা রাখে বুকে অসীম সাহস নিয়ে। যে কখনোই হার মানেনা।কক্ষনো না!
– না! না আমি চারুলতা নই। আমি বেলিফুল। আপনার বেলিফুল। আপনার বেলিফুল। চোখ খুলে রাখুন সিফাত। কিচ্ছু হবেনা আপনার। আপনার বেলিফুল বাঁচাবে আপনাকে।
সিফাতের ঠোঁটে মুচকি হাসির রেখা ফুটে ওঠে এবং শেষ নিঃস্বাস ত্যাগ করে ভালোবাসার মানুষটির কোলে। চারু এখনো অদ্ভুত দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। কাদতে পারছেনা সে। নিজেকে কেমন অনুভূতিহীন পাথর লাগছে। চারু একবার সিফাতের কপাল ছুয়ে দিলো, তারপর দুটো গাল তারপর বন্ধ হয়ে যাওয়া দুচোখ, এলোমেলো চুল। তাজা গরম রক্ত। এই রক্ত যেনো হাজার গুনে বাড়িয়ে দেয় চারুর র*ক্তপিপাসা। আজ এখানে র*ক্তের বন্যা বইবে। হয় মরবে নয় মারবে। আজ হবে সকল হিসাব। চারু সিফাতকে ছেড়ে উঠে দাঁড়াতেই অভি আর স্মৃতি একধরনের মাস্ক পড়ে নিলো আর সাথে সাথে একধরনের গ্যাসে ছেয়ে গেলো সম্পূর্ণ ঘরটি। চারু যেনো অবাক হওয়াও ক্ষমতা ভুলে গেছে। রাগে, দুঃখে তার ষষ্ঠ ইন্দ্রিয় অবধি কাপছে। তবে সে রাগ বেশিক্ষণ স্থায়ী হলো না। মুহুর্তের মাঝেই শিথিল হয়ে এলো সকল কিছু। সে কখন মেঝেতে পড়ে গেলো তা সে নিজেও ঠাহর করতে পারেনা। আচ্ছা হামিদ? হামিদের কি হলো? ঠিক আছে তো ও?

বিঃদ্রঃ দুই পর্বে শেষ করা গেলো না। লাইট ইউজাররা পড়তে পারবেনা। তাই অন্তিম পর্ব আগামীকাল পোস্ট করা হবে এই পর্বে আশানুরূপ রেসপন্স পাওয়া গেলে। সবাই রেসপন্স করুন। কাল গল্প দেওয়ার কথা থাকলেও অনলাইনে যাওয়ার সুযোগ হয়নি বিধায় পোস্ট করতে পারিনি। এরজন্য আবারও দুঃখিত। আপনারা দয়া করে বিরূপ মন্তব্য করবেন না। লেখার আগ্রহ হারিয়ে যায়। আর হাজার দুয়ের শব্দের মতো একটা পর্ব বাকি আছে। আর গল্প গল্পই হয়। সকলের মনমতো হবেনা সেটাই স্বাভাবিক। এন্ডিং যেমনই হয়, আশা করছি আপনারা মেনে নেবেন। এই গল্পের এন্ডিং অন্য সাধারণ গল্পের থেকে আলাদা ভেবে রাখা হয়েছে। সেভাবেই এন্ডিং আসবে আর ২০২০ সাল থেকেই আমি এভাবে ভেবে রেখেছিলাম। মাঝখানে তাড়াহুড়ো করতে গিয়ে জগাখিচুরি বানিয়ে দিয়েছিলাম কিন্তু সেই পর্ব এখন ডিলিট। যারা কপি করে রেখেছেন তারাও ডিলিট করে দিন।

_______________________

To Be Continued…
®শুভ্রা আহমেদ প্রিয়া

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here