Monday, September 14, 2026
Home "ধারাবাহিক গল্প কৃষ্ণাবতী কৃষ্ণাবতী ২০ম_পর্ব

কৃষ্ণাবতী ২০ম_পর্ব

কৃষ্ণাবতী
২০ম_পর্ব

কৃষ্ণার নির্বিকার প্রশ্নে দেবব্রত একটু হতচকিত হয়। কৃষ্ণা এভাবে প্রশ্ন করবে আশা করে নি। কৃষ্ণার উৎসুক চোখ তার দিকে স্থির। দেবব্রত কি উত্তর দিবে ভাষা খুজে পাচ্ছে না। দেবব্রতের নির্বাক চিত্ত দেখে কৃষ্ণা ম্লান হাসি দেয়৷ তারপর অভিমানের স্বরে বলে,
– খুব কঠিন প্রশ্ন করে ফেললাম কি? এজন্য বুঝি চুপ করে আছেন! আমার ভুল, ক্ষমা করে দিবেন মাষ্টারমশাই। উত্তরটা আমার জানা তবুও বারে বারে একই প্রশ্ন করে বিব্রত করা। জানি আমাকে শুধু ঘোরের মাঝেই আপনার ভালোলাগে। আর অর্জুনদা কে আমি ভালোবাসি না। তার প্রেম নিবেদন আমি ফিরিয়ে দিয়েছি। যেভাবেই হোক না কেনো আমাদের বিয়েটা তো হয়েছে। এখনো আপনার নামের সিঁদুর পড়ে রয়েছি। তাই এই সম্পর্কটাকে অস্বীকার করার ক্ষমতা আমার নেই। আর সত্যি বলতে এই বিয়েটা আমার জীবনের অকাট্য সত্যি। আমি আমার ঘরে যাচ্ছি মাষ্টারমশাই।

কৃষ্ণার গলা কাঁপছে। তার কষ্ট হচ্ছে। খুব কষ্ট। কারণ কবি-সাহিত্যিকের ভাষায় সে দেবব্রতকে ভালোবেসে ফেলেছে। ভালোবাসার অনুভূতিটা যতটা সুন্দর, এর বিরহের অনুভূতিটা ততটাই অসহ্যকর যন্ত্রণার। হয়তো অর্জুনদাও এই অনুভূতিটাই অনুভব করছে। তাইতো সে এতোটা ব্যাকুল ছিলো৷ কৃষ্ণা চলে যেতে ধরলেই দেবব্রত তার হাত টেনে ধরে নিজের কাছে নিয়ে আসে। দেবব্রতের এরুপ আচারণে খানিকটা ভ্যাবাচেকা খেয়ে যায় কৃষ্ণা। দেবব্রতের মানুষ এরুপ কাজ করতে পারে এটা শুধুই কাল্পনিক। তাদের মাঝামাঝি দূরত্ব এতটাই কম যে দেবব্রত উষ্ণ নিঃশ্বাস কৃষ্ণার মুখে আছড়ে পড়ছে। কৃষ্ণার চোখ দেবব্রতের চোখে স্থির। দেবব্রতের চোখে এক অন্য অস্থিরতা। মুখটা খানিকটা নামিয়ে কৃষ্ণার মুখের কাছাকাছি এনে শান্ত কন্ঠে দেবব্রত বলে,
– সব প্রশ্নের উত্তর কি এক কথায় দেওয়া যায়? আর যদি উত্তরদাতার প্রশ্নের উত্তর ই জানা না থাকে তবে! তবে সে কি করে উত্তর দিবে। আমি শুধু জানি তুই আমার। আমার একান্ত। তুই আমার সেই বাজে অভ্যাস, যা আমি চাইলেও ছাড়তে পারবো না। তুই আমার চোখের ক্ষুধা। কথাগুলো খুব কঠিন আমি জানি। তোর মোটা মাথায় তা ঢুকবে না। শুধু এটুকু জেনে রাখ, তুই আমার স্ত্রী, আমার অর্ধাঙ্গিনী। না তোর আমার থেকে মুক্তি আছে না আমার তোর থেকে।

দেবব্রত তখন কৃষ্ণার কপালে কপাল ঠেকায়। আবেশে কৃষ্ণার চোখ বুঝে আছে। খুব কাছে মাষ্টারমশাই তার। হাতপা জোড়া কাঁপছে রীতিমতো। মেরুদন্ড দিয়ে এক শীতল পরশ বয়ে যাচ্ছে। কি মনে করে কৃষ্ণার কপালে তার উষ্ণ ঠোঁটজোড়া ছুয়ে দিলো। কানে মুখ লাগিয়ে বললো,
– আমি শুধু ঘোরের মাঝেই তোকে কাছে টানি না। ঘোর ব্যাতীত ও তোকে আমার ভালোলাগে। কিন্তু এই ভালোলাগাটা যেনো চিরস্থায়ী হয় তাই আমার যে সময় চাই।
– সময়ের অপেক্ষায় রইলাম। কিন্তু যদি অপেক্ষার প্রহরে আমি ই বিলীন হয়ে যাই তাহলে
– আমি তোকে কোথাও বিলীন হতে দেবো না। তুই আমার।

বলেই কৃষ্ণাকে বুকের মাঝে জড়িয়ে ধরে দেবব্রত। কৃষ্ণার চোখ থেকে টুপ করে পানি গড়িয়ে পড়ে। সেও তার মাষ্টারমশাই কে আকড়ে ধরে। দেবব্রত কোমল স্বরে বলে,
– কখনো যদি তুই বিলীন হয়ে যাস, তবে আমার অন্তরাত্মাও বিলীন হয়ে যাবে। তুই আমার সেই নদী যার কবলে আমার ভাঙ্গন নিশ্চিত৷

দেবব্রত আরোও শক্ত করে জড়িয়ে ধরে তাকে। সে সময় চায়, কারণ দ্বিতীয় বার যখন কৃষ্ণাকে কাছে টানবে তখন যেনো কোনো দ্বিধা মনে না জন্মায়। কৃষ্ণার কিশোরী মনটাকে ভালোবাসার শুভ্রতায় সজ্জিত করতে চায় দেবব্রত৷ এজন্যই হয়তো শেক্সপিয়ার বলেছেন,
“Love looks not with the eyes, but with the mind, And therefore is winged Cupid painted blind”

দেবব্রত ও কৃষ্ণাকে মন থেকে ভালোবাসতে চায়। শুধু চোখের ক্ষুধা নয় তাকে সে মনের ক্ষুধাও বানাতে চায়______

এক সপ্তাহ পর,
দুপুর ১টা,
অন্না এবং কৃষ্ণা ক্লাসে বসে রয়েছে। একটু আগেই একটা ক্লাস শেষ হয়েছে তাদের। আজ ক্লাস করতে করতে হাপিয়ে উঠেছে তারা। কিছুদিন পর টেস্ট পরীক্ষা। পড়ার চাপ যেনো দ্বিগুন বেড়ে গেছে। অন্না ক্লান্ত স্বরে বললো,
– আর কতো ক্লাস করবো রে, আজ মন্র হয় খাওয়াও হবে না।
– আর একটা ক্লাস এর পরেই বাড়ি চলে যাবো।
– তোর এতো ক্লাস করার এনার্জি আসে কোথা থেকে? সকালে উঠিস, ভোগ বানাস, ঠাকুরের আরতি করিস, তারপর মা-জ্যেঠীমাকে সাহায্য করিস, এর পর টানা ক্লাস। এতো এনার্জি কোথায় পাস?
– ওই মোবাইল থেকে চোখ সরালেই দেখবি জীবনটা সহজ। তোর মন তো পড়ে আছে ওই মোবাইলে।

কৃষ্ণার কথা শুনে ভ্রু কুচকে জ্ঞানী জ্ঞানী ভাব নিয়ে অন্না বলে,
– সত্যি বলতে মনটা অন্যখানে পড়ে রয়েছে। ব্যাপারটা যদিও বেশ সিক্রেটিভ। কিন্তু যেহেতু তুই আমার বেস্টু তাই তোকে বলছি। আমার রিচার্জ ব্যাটারিকে এই সপ্তাহখানিক দেখছি না। তাই কলেজে আজকাল মন বসে না
– রিচার্জ ব্যাটারি? সে কে?
– নাম বললে চাকরি থাকবে না।

চোখ টিপ্পনী দিয়ে কথাটা বলে অন্না। কৃষ্ণা কিছু বলতে যাবে তার আগেই একটি মেয়ে তার বেঞ্চের সামনে এসে দাঁড়ায়। মেয়েটা খুব কর্কশ কন্ঠেই বলে,
– তুমি কি কৃষ্ণাবতী?
– হ্যা, কেনো বলো তো?
– তোমাকেই তো অর্জুন দাদা সবার সামনে প্রেম নিবেদন করেছিলো তাই নয় কি?
-……..

মেয়েটার এমন খাপছাড়া প্রশ্নের ঠিক কি উত্তর দিবে বুঝে উঠছিলো না কৃষ্ণা। কৃষ্ণাকে চুপ থাকতে দেখে অন্না নিজ থেকে মেয়েটাকে জিজ্ঞেস করে,
– তোমাকে ঠিক চিনলাম না, কে তুমি?
– আমি মিতালী, অর্জুন দাদা আমার খুড়তোতো দাদা। কমার্সে আছি আমি তোমাদের সাথে
– কি হয়েছে একটু খোলসা করে বললে সুবিধা হয়!
– দাদা সেই রাতে ঘরে ফিরে নি। যখন ফিরেছে তার পর থেকে না ঠিকমত খাচ্ছে না ঠিকমত কারোর সাথে কথা বলছে। শুধু একটা চোখের ছবির সামনে মুখ বুঝে বসে থাকে।

মিতালীর কথা শুনে কৃষ্ণার মন খারাপ হয়ে যায়। আজ তার কারণেই লোকটার এই অবস্থা। কেনো বুঝলো না সে আগে, তাহলে হয়তো লোকটার পরিণতি এমন হতো না। কৃষ্ণাকে মিতালী কম কথা শুনায় নি। কিন্তু কৃষ্ণা কোনো কথাই বলে না। শুধু চুপ করে কথাগুলো শুনে যায়। অর্জুনদার অবস্থা শুনে অন্নার কেনো যেনো খুব কষ্ট হয়। বুকের মাঝে একটা আটকা যন্ত্রণা হতে থাকে। এই যন্ত্রণার কারণটা তার জানা, কিন্তু ফলাফল শুন্য_________

১৭.
বারান্দায় দাঁড়িয়ে আছে অর্জুন। হাতে সিগারেট। সিগারেটটি জ্বলছে৷ পড়ন্ত বিকালে তার উদাস মনে এটা যেনো একটা অভ্যেস হয়ে গেছে। ল্যাপটপে গাণ বাজছে, বেদনার গাণ।
“আমার মল্লিকাবনে যখন প্রথম ধরেছে কলি
তোমার লাগিয়া তখনি, বন্ধু, বেঁধেছিনু অঞ্জলি ।।
তখনো কুহেলীজালে,
সখা, তরুণী উষার ভালে
শিশিরে শিশিরে অরুণমালিকা
উঠিতেছে ছলোছলি ।।
এখন বনের গান, বন্ধু, হয় নি তো অবসান-
তবু এখনি যাবে কি চলি ।
ও মোর করুণ বল্লিকা,
ও তোর শ্রান্ত মল্লিকা
ঝরো-ঝরো হল, এই বেলা তোর শেষ কথা দিস বলি ।।”

দেখতে দেখতে পনেরোটা দিন হয়ে গেছে। কৃষ্ণাবতী থেকে পাওয়া আঘাতটা এখনো তাজা। এখন আর ওই ক্যানভাসের চোখজোড়ার দিকে তাকিয়ে থাকতে ভালো লাগে না তার। হঠাৎ কারোর উপস্থিতিতে বেশ বিরক্ত হয় অর্জুন। তার রুমে সবার আসা বারণ। বিরক্ত স্বরে বলে উঠে,
– মিতালী যা ঘর থেকে, আমাকে একা ছেড়ে দে
-………

অপরপাশ থেকে কোনো জবাব না পেয়ে বিরক্তির সাথে পেছনে ফিরে অর্জুন। পেছনে ফিরতেই দেখে.…………

চলবে

[ আজ গল্পটা অনেক ছোট একটা পর্ব দিয়েছি এবং অনেক দেরি করে দিয়েছি। তার জন্য ক্ষমাপ্রার্থী। কাল ইনশাআল্লাহ ডাবল পর্ব দিবো। পরবর্তী পর্ব ইনশাআল্লাহ আগামীকাল সকালে পোস্ট করবো। কার্টেসী ব্যাতীত দয়া করে কপি করবেন না]

মুশফিকা রহমান মৈথি

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here