কৃষ্ণাবতী ৫ম_পর্ব

কৃষ্ণাবতী
৫ম_পর্ব

– শুধু ভাত-কাপড়ের দায়িত্ব নিলেই কি স্বামী হওয়া যায় দাদান? যে বিয়ের স্বীকৃতি সমাজে আমি দিবো না সেই বিয়ের নিয়ম মানা আর না মানা একই বলে আমার মনে হয়।

কথা শেষে দেবব্রত চলে যেতে নিলে প্রদীপ বাবু হিনহিনে কন্ঠে বলে উঠেন,
– তাহলে কি তুমি কৃষ্ণার দায়িত্ব নিজে অস্বীকার করছো দেবব্রত?

প্রদীপ বাবু তীর্যক প্রশ্নে পা দুটো থেমে যায় দেবব্রতের। দাদানের বিরোধীতা সে কখনোই করে নি। কিন্তু আজ বিরোধীতা করতে যেনো বাধ্য হচ্ছে। যে বিয়েটাকে মন থেকে মানা কষ্টকর হয়ে উঠছে দেবব্রতের জন্য সেই বিয়ের আচার অনুষ্ঠান যেনো মরার উপর খাড়ার মতো লাগছে। কৃষ্ণার দায়িত্ব এড়ায় নি বলেই তো দামিনীকে ফিরিয়ে দিয়েছে আবার কেনো এসব ঢং করতে হবে, সেটার কোনো উপযুক্ত ব্যাখ্যা খুজে পাচ্ছে না দেবব্রত। দাদানের দিকে স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে সে। প্রদীপ বাবুও তার কথায় অনড়। তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে বিদ্রুপের স্বরে বলেন,
– আমি ভেবেছিলাম তোমার মাঝে আমার গুণ রয়েছে। তোমার হয়তো দায়িত্বজ্ঞান রয়েছে। কিন্তু তুমি আমাকে ভুল প্রমাণিত করে দিলে। তুমি তো আমায় কথা দিয়েছিলে
– কথা তো দামিনীকে আমাদের পরিবার দিয়েছিলো, আমি দিয়েছিলাম। রাখলাম কোথায়। সবটাতে তোমার জিদ ই বড় হলো। দায়িত্ব নেবার কথা যখন উঠছে, বেশ সেটা আজ পরিষ্কার করে দিচ্ছি।

বলেই কাকীমার কাছ থেকে থালাটা ছিনিয়ে নিয়ে কোনোরকম কৃষ্ণার হাতে ধরিয়ে শক্ত কন্ঠে দেবব্রত বলে,
– আজ থেকে তোর নিজের পায়ে দাঁড়ানো অবধি সব দায়িত্ব আমার। শুধু আমার স্ত্রীর অধিকারটুকু আমি দিতে পারবো না। গট ইট?

দেবব্রতের চোখের তীব্র দৃষ্টি জানান দিচ্ছে তার ভেতরে কতোটা দাউদাউ করে আগুণ জ্বলছে। রাগে চোখ, নাক লাল হয়ে আছে আর চোয়াল শক্ত। কথাটা বলে প্রদীপ বাবুর দিকে তাকিয়ে বলে,
– আই থিংক এবার তুমি হ্যাপি?

বলে কৃষ্ণার দিকে বিতৃষ্ণার নজর নিক্ষেপ করে গটগট করে হাটা দিলো দেবব্রত। কৃষ্ণা তার যাবার পানে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলো। তার বুঝতে বাকি রইলো না যেখানে তার কোনো দোষ নেই সেখানেও তার মাষ্টারমশাই তাকে দুষছে। এই “কৃষ্ণাবতী দেবব্রত ভট্টাচার্য” হবার পথটা এতো সহজ নয়। কারণ পথটা তাকে একাই পার হতে হবে। এদিকে ছেলের রাগের নমুনা দেখে অবন্তীকা দেবী খুশিই হলেন। যাক তার ছেলে এই গেয়ো মেয়েটাকে কখনোই মেনে নিবে না। এও কম কিসের। ঘরে একটা ঝি তো এমনেও থাকে, এটাও থাকবে। সময় সুযোগ বুঝে ঠিক এই মেয়েকে বের করে দেওয়া যাবে। প্রদীপ বাবু চিন্তিত মুখে নাতির যাওয়ার দিকেই তাকিয়ে রয়েছেন। কৃষ্ণার ভবিষ্যৎ নিয়ে তিনি সত্যি ই চিন্তিত_____

৪.
কৃষ্ণার মনটা ভালো লাগছে না। এখানে অন্না ব্যাতীত কেউ ই তার সাথে কথা বলে না। মামা বাড়িতে মারঝামটি থাকলেও সেখানে কথা বলার লোক তো ছিলো। শিপ্রা মেয়েটা পুরো মামার মতো, সরল। কপটতার কোনো ছোয়া নেই। অন্না ও ভালো কিন্তু ওর চালচলন বুঝতে সময় লাগবে কৃষ্ণার। এক মোবাইল নিয়ে যে বসে থাকে তো থাকে। আর বাকি মাষ্টারমশাই, ভয়ে তার সামনেও যাচ্ছে না কৃষ্ণা। আর দাদানের সাথে তো তার মনের কথা বলা যায় না। ইশশ গ্রামটাকে খুব মিস করছে। এই শহরের ধাচ ই আলাদা। জানালা খুললে পাখির কলরবের থেকে গাড়ির হর্ণ বেশি শোনা যায়। পুকুর, গাছ নেই ই। কোথায় পুকুর পাড়ে পা ভিজিয়ে ঘন্টার ঘন্টা বসে রইতো সে। ইচ্ছে হলেই গাছে চড়ে বসতো। তা কিছুই করতে পারবে না এখানে কৃষ্ণা। একবার তো মনে মনে ভেবেই নিয়েছিলো দাদানকে বলবে, এখানে আর থাকবে না কৃষ্ণা; গ্রামে যাবে। কিন্তু মাষ্টারমশাই এর বউ হবার লোভে সেই কথাটা বলা হয় নি কৃষ্ণার। লোকটাকে যে মনে ধরেছে তার। আহা কি ভালো মানুষটা, শুধু রাগটাই বেশি। জানালায় ধারে দাঁড়িয়ে এসব ভাবতে যখন ব্যস্ত কৃষ্ণা তখন পিছন থেকে শুনতে পায়,
– রাজ কপাল নিয়ে আও নাই গো মেয়ে, ফুটো কপাল তোমার বুঝলে। তাই তো নাগর থাকতিও আশ্রিতার মতো পড়ে রয়েছো।

পেছন ফিরে তাকাতেই দেখে সোমা মাসি ঝাড়ু হাতে দাঁড়িয়ে আছে। মহিলার বয়স চল্লিশের বেশি। কালো, লম্বা, সিমসিমে গড়ণের মহিলা সোমা মাসি। সিঁথি ভর্তি সিঁদুর, হাতে শাখা পলা, সারাটাক্ষণ পান চিবিয়ে ঠোঁট লাল করে রাখেন। কৃষ্ণার উনার কথাগুলো বেশ লাগে। এই মানুষটাকে কেনো যেনো কিশোরী কৃষ্ণার বেশ ভালো লাগে। অনেকটা মা, মা অনুভূতি আসে তার কাছ থেকে। মুখে হাসি নিয়ে এগিয়ে এসে বললো কৃষ্ণা,
– সে তো আমি জানি আমি পোঁড়াকপালী। গোপাল আমার ভাগ্যে এই অবধি সুখ লিখে নি। কিন্তু সকল সুখ এর চেয়েও বড় কিছু যে গোপাল আমায় দিয়েছে তাতো তুমি জানো না। আমাকে গোপাল মাষ্টারমশাইকে দিয়েছে। তার হাতে আমার সিঁথিতে সিঁদুর পরিয়েছে।
– ওরে বোকা মেয়ে রে, সিঁদুর পরালে কি নাগরের সুখ পাওন যায়। ওই সিঁদুরের কি দাম ল, যখন তার ঘরেই তোর ঠায় হয় নি। বড় বাবু সৌদামিনী দিদিরে ভালো পায়। বুঝলিরে মুখপুড়ি, তুই তার ঘাড়ে চাইপে বইছোস। তোর ঘটে তো এইটা এখন ঢুকবো না। যখন তোকে কর্তামা বাইর করে ওই মাইয়ারে এ বাড়ির কর্তামা বানাইবো তখন তুই বুঝবি।

সোমা মাসির কথায় খানিকটা চটে গেলো কৃষ্ণা। তার মাষ্টারমশাই বলেছে, যতদিন সে তার যোগ্য না হবে ততদিন এ বিয়ে মেনে নিবেন না। কিন্তু যদি সে ওই দিদিমনির মতো মাষ্টারমশাই এর যোগ্য হয়ে উঠে তবে তো মাষ্টারমশাই এর তাকে মেনে নিতে আপত্তি নেই। আর মাষ্টারমশাই তাকে ঠকাবে না, ঠকাতে হতে তো সে তাকে গ্রামে ছেড়ে আসতো। দিদিমনিকেও না করে দিতো না। সোমামাসি কিচ্ছু বুঝেনা। ক্ষিপ্ত কন্ঠে কৃষ্ণা তখন বলে,
– না, তুমি মিথ্যে বলছো। মাষ্টারমশাই আমার, সে আমার ই থাকবে। তুমি জানো না মাসি।

সোমা মাসি আর কথা বাড়ালেন না। বিদ্রুপের হাসি হেসে মনে মনে ভাবলেন,
” তোর ভাগ্যে গোপাল দুঃখ রেখেছে মুখপুড়ি। যেদিন বুঝবি সেদিন বাঁচনের ইচ্ছাও শেষ হয়ে যাবে”

কৃষ্ণার মাথা হাত বুলায়ে তিনি বললেন,
– পাগলী, নাগররে কি মনে ধরছে?
– তোমাকে বলবো কেনো? তুমি মাষ্টারমশাই এর নামে বাজে কথা বলছো। আমি তোমাকে কিছুই বলবো না। আর এই নাগর কি?
– পতি, সোয়ামী। ঘটে আসলেই কিছুই নাই তোর।

বলে মাথায় আস্তে করে গাট্টা মারেন সোমা মাসি। তারপর তার কাজে মন দেন। আর প্যানপ্যান করে বলেন,
– তোর লগে বকতে গেলে আর কাম করন লাগবে না। পরে কর্তা মা আমারে বকবেনে। এরতে তুই থাক তোর মতো। আমি আমার মতো। দেখিস কোনো কালে কানতি কানতি আমার কাছেই না আওন লাগে।

কৃষ্ণা মুখ ভেচকি দিয়ে খাটে বসে পড়ে। এখন সোমা মাসির সাথে মোটেই কথা বলবে না সে। তার বিশ্বাস একদিন ঠিক তার মাষ্টারমশাই তার হবেই, হতেই হবে______

নিজের রুমে এসে একের পর এক সিগারেট ধরিয়েই যাচ্ছে। নিকোটিনের ধোয়ায় বুকের যন্ত্রণা নিভানোর চেষ্টায় ব্যস্ত দেবব্রত। দাদানের উপর রাগ হচ্ছে, কিন্তু তাকে কিছু বলাটা বেয়াদবি হবে। আরোও রাগ হচ্ছে কৃষ্ণার উপর। মেয়েটাকে সরল ভেবেছিলো, কিন্তু এখন মনে হচ্ছে না মেয়েটি মোটেই সকল নয়। বরং ধুরন্দর। সে তো পারতো দাদানকে আটকাতে। কিন্তু এমন কিছুই সে করে নি। দয়া করে বিয়ে করেছে, দায়িত্ব নিয়েছে বলে কি মাথায় উঠে গেছে? মাথা থেকে হিরহির করে নামানোর ব্যবস্থা করতে হবে। পরমূহুর্তেই আবার নিজের মনকে শান্ত করার চেষ্টা করছে দেবব্রত। ছোট একটা মেয়ে, যেখানে দেবব্রত দাদানের উপর কথা বলতে পারে না সেখানে ওই বা কি বলবে। আর সত্যি তো এটাই সে তার বিবাহিত স্ত্রী। এগুলো তো তার প্রাপ্য। উফফফফ কি করবে দেবব্রত বুঝে উঠতে পারছে না। ইচ্ছে করছে মরে যেতে। এই দমবন্ধ অবস্থায় কোনো মানুষ সুস্থ থাকে না। কাল রাত থেকে দামিনীর কান্নারত মুখখানি চোখে ভাসছে। মেয়েটার চোখে জলের কণা দেখলে যার বুকে মোচর দিত, সেই মেয়েটাকে সবচেয়ে বড় আঘাত সে দিয়েছে। শাস্ত্র মতে দ্বিতীয় বিয়ে করা গেলে হয়তো দেবব্রত সেটাই করতো। কিন্তু দামিনী তো আর সতীনের ঘর করবে না। আচ্ছা কৃষ্ণাকে ডিভোর্স দিলে কি খুব ক্ষতি হবে। না না না কি ভাবছে দেবব্রত! মেয়েটির জীবনটাই নষ্ট হয়ে যাবে তাহলে। আর না পেরে এশট্রেটা ছুড়ে মারলো দেবব্রত। রাগ, ক্ষোভ গুলো জড় বস্তুগুলোর উপরেই ঝাড়তে লাগলো সে। হঠাৎ মোবাইল বাজার আওয়াজে ধ্যান ভাঙ্গে তার। মোবাইলটা যে কোন কোনায় রেখেছে মনে আসছে না। অনেক খুজে মোবাইল পেতে পেতে ৩টি মিসড কল হয়ে গেছে। মোবাইল স্ক্রিনে চোখ দিতেই দেখলো লেখা দেখা যাচ্ছে,
” অনুরাগ আংকেল”

নামটি দেখতেই গ্লানিতে বুকটা ভরে উঠলো দেবব্রতের। হাতটা কাঁপছে, কাঁপা হাতে ফোনটা রিসিভ করে “হ্যালো” বলতেই অপরপাশ থেকে শোনা যায়,
.………….

চলবে

(পরবর্তী পর্ব ইনশাআল্লাহ কালকে রাতে দিবো। কার্টেসী ব্যাতীত দয়া করে কপি করবেন না)

মুশফিকা রহমান মৈথি

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here