গল্পঃ প্রেমমোহ লেখিকাঃ ফারজানাআফরোজ পর্বঃ ২

গল্পঃ প্রেমমোহ
লেখিকাঃ ফারজানাআফরোজ
পর্বঃ ২

দূর থেকে সাদা শাড়ি পরিহিতা একজন তরুণীকে দেখে চমকে উঠলো স্পন্দন। এত রাতে একজন মেয়ে তাও আবার রাস্তায়? ব্যাপারটা সুবিধার মনে হলো না তার কাছে। গাড়ি থামিয়ে মেয়েটির কাছে এগিয়ে গেলো স্পন্দন।

–” এক্সকিউজ মি ম্যাম, এত রাতে আপনি এইখানে কি করছেন?”

–” মরতে এসেছি।”

দুইটা বাক্য মুখ থেকে বের করে ছেলেটির দিকে তাকালো শুভ্রতা। চারপাশ ঘোলাটে হতে লাগলো তার। সেন্স হারিয়ে স্পন্দনের গায়ে হেলে পরলো সে।

–” এই এই কি হলো এইটা? মরতে আসছেন ভালো কথা আমার গায়ে পড়লেন কেন? এইজন্যই কারো সাহায্য করতে নেই। উফফ বিরক্তিকর। মনে হচ্ছে মেয়েটা সেন্স হারিয়েছে। আপাতত বাসায় নিয়ে যাই পরে যা হবার হবে। এমনিতেই আম্মু ভীষণ রেগে আছে। আজ দিয়ার বার্থডে আর আমি আজকেও লেট। এখন আবার এই মেয়ে। উফফ। ”

শুভ্রতাকে পাঁজা কোলে তোলে নিয়ে গাড়িতে বসিয়ে দিল। আড় চোখের একবার তাকালো স্পন্দন।

–” মেয়েটা ভয়নক সুন্দরী। রাস্তায় বাজে ছেলের হাতে পরলে খারাপ কিছু ঘটে যেতে পারে।”

গাড়ি স্টার্ট দিয়ে বাসার উদ্দেশ্য চলে গেলো স্পন্দন।

ড্রয়িং রুমে গালে হাত দিয়ে বসে আছে দিয়া। আজ তার আঠারো তম জন্মবার্ষিকী । বাড়ির সকলে থাকলেও তার সবচেয়ে প্রিয় ব্যাক্তি অর্থাৎ তার মেঝ ভাই অনুষ্ঠানে অনুপস্থিত। রাগে কষ্টে তার কান্না পাচ্ছে কিন্তু তবুও সে কান্না না করে রাগ করে বসে আছে। রাগের কারণে রাতের খাবারও সে খায়নি। স্পন্দনের মা মিসেস সাবিনা বেগম আদুরে গলায় বললেন,

–” কিছু খেয়ে নে মা। জানিস তো স্পন্দন কেমন। ওর যখন যা ইচ্ছা করে তাই করে কারো কথা তো সে শোনে না। ও একটা রোবট। শুধু শুধু রোবটের উপরে রাগ কেন করছিস?”

–” তোমার ছেলেকে আজ আমি খুন করবো। জানো আমার সব বান্ধবীদের ইনভাইট করছিলাম শুধু মাত্র ওর জন্য। একটাকে দেখেও যদি ওর মনে প্রেম প্রেম ভাব আসে তাহলে তো আমাদেরই ভালো। কিন্তু হলো কি? সে এখনও আসেনি। আম্মু স্পন্দন ভাইয়া কি সত্যিই তোমার পেটের ছেলে?”

–” আমিও এই কথা ভাবি। এমন নিরামিষ ছেলে কি করে আমার পেট থেকে বের হয়ে আসছে? মাঝে মাঝে ভাবি হসপিটালের লোকগুলো হয়তো আমার বাচ্চাকে রেখে এই ছেলে আমার কোলে দিয়েছে। জানিস তো পালা জিনিসের মায়া বেশি তাইতো কিছু বলি না।”

মেয়ের কথার সাথে তাল মিলিয়ে চলতে লাগলেন মিসেস সাবিনা বেগম। মায়েদের সব দিক নজর রেখে সাবধানে কথা বলতে হয়। সন্তানের কষ্ট মায়ের বুকে তীরের মত বিঁধে। গাড়ির শব্দে দিয়া এবং মিসেস সাবিনা বেগম আঁতকে উঠলেন। দিয়া ভয়ে ভয়ে মায়ের পিছনে গিয়ে বলল,

–” আমি যে ওকে বকছি ভুলেও বলবে না।”

–” ওকে বলব না। ভয় পাবি আবার বকাও দিবি। ”

দরজার কলিং বেল বাজার আগেই দরজা খুলে দিলেন স্পন্দনের মা। স্পন্দনের কোলে একটি মেয়েকে দেখে অবাক হবার চরম পর্যায় চলে গেলেন দিয়া আর ওর মা। রুমের ভিতর ঢুকে সোফায় শুভ্রতাকে শুইয়ে দিয়ে সেও সোফায় বসে দিয়াকে বলল,😐

–” এক গ্লাস পানি আনতো দিয়া।”

দিয়া পানি আনতে চলে গেলো। স্পন্দনের মা সন্দিহান নজরে তাকিয়ে উচ্চ শব্দে বলে উঠলো,

–” মেয়েটা কে স্পন্দন? দেখে তো মনে হচ্ছে বিধবা। কোথায় পেয়েছিস?”

ভাবলেশহীন ভাবে উত্তর দিল স্পন্দন,

–” মরতে আসছিল তাও আবার আমার গাড়ির নিচে। বাঁচাতে গিয়েছিলাম পরে অজ্ঞান হয়ে পড়েছে। ইচ্ছা থাকা না সত্ত্বেও নিয়ে আসলাম। তোমাকে তো বলেছি মেয়ে মানুষ আমার এলার্জি।”

–” তোর মনে দয়া মায়া নেই। এত সুন্দর মেয়েটাকে তুই রেখে আসার চিন্তা করছিল? তোর দ্বারাই সম্ভব।”

–” বাজে না বকে বলো একে কই রাখবে। ভাবছি আজকে ড্রয়িং রুমেই থাকুক সকালে সেন্স আসলে পাশের বাসার লতিফ ভাইয়ের গাড়ি দেখিয়ে দিবো। লতিফ ভাই পুলিশ উনার গাড়িতে মরলেও সমস্যা হবে না।”

মিসেস সাবিনা বেগম রাগে ইচ্ছা করছে ছেলেকে ধরে কষিয়ে কয়েকটা থাপ্পড় বসাতে। অন্যের জীবন বাঁচানো ফরয আর সে কিনা মরার জন্য গাড়ি ঠিক করে দিচ্ছে। রেগে আগুন হয়ে বললেন,

–” আমাদের গেস্ট রুমে মেয়েটাকে নিয়ে চল। রাতটা ঐখানেই থাকবে। আমি বরং কিছু খাবার রেখে দেই যদি রাতে সেন্স আসে তো খেয়ে নিবে।”

–” আম্মু তুমি কি বলছ জানো তুমি? এই মেয়ে কম হলেও ষাট কেজি হবে। আমার শরীরে যত এনার্জি ছিল গাড়ি থেকে নামানোর পর সব বিদায় হয়ে গিয়েছে আপাতত ওকে কোলে নেওয়ার শক্তি আমার নেই।”

বিরক্ত হয়ে রাগী গলায় বললেন সাবিনা বেগম,

–” তোকে মারার জন্য আমার শরীরে প্রচুর শক্তি আছে। ভালোই ভালো মেয়েটাকে কোলে তোল। কথা না শুনলেই তোর আব্বুকে ডাকবো।”

স্পন্দন বাধ্য ছেলের মতো শুভ্রতাকে কোলে নিয়ে যাবে তার আগেই দিয়া পানির গ্লাস এগিয়ে দিয়ে বলল,

–” তুমি কখনো জন্মদিনের দিন কান্না করেছ ভাইয়া?”

এক শ্বাসে পানি শেষ করে শুভ্রতাকে কোলে নিয়ে যেতে যেতে বলল,

–” জন্মের পর যদি কান্না না করতাম তাহলে নার্স, ডক্টর, আমার আপন বাবা মা আমাকে মৃত সন্তান ভেবে কবরে ট্রান্সফার করে দিতো। ভাগ্যিস কান্না করে ছিলাম সেদিন।”

স্পন্দন চলে গেলো দিয়া এইবার ভ্যাঁ ভ্যাঁ করে কাঁদতে শুরু করলো। সে বুঝাতে চেয়েছে একটা তার অভার স্মার্ট ভাই বুঝছে আরেকটা।

সকালের দিকে শুভ্রতার সেন্স ফিরে আসলো। নিজেকে রুমে আবিষ্কার করে আতংকে উঠলো। চোখ মেলে তাকিয়ে রুমটা পর্যবেক্ষণ করলো সে কোথায়। মনে মনে বলল,

–” সুইসাইড করলে তো সারাজীবন জাহান্নামী হতে হয় তাহলে আমি কোথায়? তারমানে এখনও মারা যায়নি আমি।”

দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বিছানা থেকে উঠতে যাবে আবারো মাথা ঘুরালো। গতকাল থেকে না খেয়ে থাকার ফলে শরীর বড্ড ক্লান্ত তার। চোখ জোড়া বারবার বন্ধ হয়ে যাবার উপক্রম। পেটের ভিতর তো প্রচন্ড ক্ষুধা তার। হঠাৎ টেবিলের দিকে চোখ যেতেই খুশি হলো সে। পানির জগ, প্লেটে কিছু রেখে ঢেকে রাখা হয়েছে। এখন তার ফ্রেশ হবার মত মন মানসিকতা নেই। খাটে বসেই জগ থেকে পানি গ্লাসে ঢেলে কুলি করে ফ্লোরে পানি ফেলল। চারটা পাউরুটি, একটা পরোটা, ডিম ভাজি দেখেই সেখানে বসে গপাগপ করে খেয়ে নিলো।

স্পন্দন আসছিল মেয়েটি জেগেছে কিনা দেখতে। দরজার কাছে আসতেই শুভ্রতার রাক্ষসীর মত খাবার খাওয়া দেখে বুকে সূরা বলে ফুঁ দিল। বিরবির করে বলা শুরু করলো,

–” হে আল্লাহ রাস্তা থেকে মানুষ নয় রাক্ষসী কোলে করে নিয়ে এসেছি। এইজন্যই বলি এত ওজন কেন।”

খাবার খেয়ে পেট বাবাজিকে শান্ত করে শুভ্রতা উঠে দাঁড়ালো। শরীর এখনো ক্লান্ত তার তাই বেশিক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকতে পারলো না। মাথা ধরে খাটের উপর বসে পড়ল। আকাশের কথা তার মাথাতে আসতেই আবারো কান্না করতে লাগলো। কারো মৃত্যু, জন্ম নিয়ে তো তার কোনো হাত নেই। আল্লাহ তাআলা যখন যা চাইবেন তাইতো হবে তাহলে কেন সবাই তাকে দোষ করছে? আচ্ছা যাদের বাবা মা নেই তাদের কি তাহলে সমাজ নিচু চোখে দেখে? শুভ্রতা দু’চোখ পানিতে ভরপুর। স্পন্দন তখন শব্দ করে বলল,

–” শুনুন মরার জন্য আমার গাড়ি যথার্থ নয়। কারণ আমি থানা পুলিশ মোটেও লাইক করি না। আপনাকে ফ্রী-তে উপদেশ দিচ্ছি মরার জন্য আমাদের পাশের বাসার লতিফ ভাই আছে। জন্মগতভাবে সে আমার শত্রু। ওর গাড়ির নিচে শুয়ে থাকবেন। তাছাড়া ব্যাটা পুলিশ তেমন কিছু হবে না তবুও কিছু টাকা ব্যয় করবে তাই আমার জন্য অনেক। আপনাকে একটা বস্তার ভিতর ভরে আমি ওই লোকের গাড়ির নিচে ফেলে আসবো। কত ভালো আইডিয়া দেখেছেন।”

শুভ্রতা ভীষণ অবাক। এই প্রথম কেউ কাউকে মরার জন্য এত উৎসাহ করছে। শুভ্রতা ভাবছে লোকটা পাগল কিনা। স্পন্দন আরো কিছু উপদেশ দিতে যাবে তার আগেই ওর মা এসে ধমক দিয়ে শুভ্রতার কাছে এসে বসলো,

–” ওর কথা বাদ দেও। সব সময় বাজে বকে এখন বলো মা কি হয়েছে তোমার? সুইসাইড কেন করতে গিয়েছিলে?”

চলবে,

বানান ভুল ক্রুটি ক্ষমা সুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন..😊

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here