তোকে_ঘিরে❤ পর্ব_১৫

তোকে_ঘিরে❤
পর্ব_১৫
#ফাবিয়াহ্_মমো🍁

– আমি কিন্তু সেদিনের মতো চলে যাবো।

উনি কথাটুকু শেষ করতেই দুহাত মেলে বলে উঠলেন,
– কাম ফাস্ট পূর্ণ! বুকে আসো প্লিজ। জড়িয়ে ধরো!

ঝাপসা ছলছল দুটো চোখ! বুকের মধ্যে টিপটিপ শব্দ! গাড়ির ভেতরে এসির শীতলতা! সব মিলিয়ে পূর্বের আবেদন ছিলো এক নিসঙ্কোচ উপহার! আজ কতদিন পর পূর্বের সামনে নিজেকে খুঁজে পেলাম!! ঠিক কত দিন পর নিজেও জানি না! মনের মধ্যে উত্থাল পাত্থাল চাপা উত্তেজনার সাগরে হাবুডুবু খেয়ে উনার উপর ঝাঁপিয়ে পরলাম। উনি তাল সামলাতে না পেরে পিছিয়ে গিয়ে জানালার সাথে পিঠ ঠেকিয়ে দুহাতে জাপটে ধরলেন। উনার বুকটার কাছে নিজের মুখটা চেপে উনার পিঠের উপর পাচঁ আঙ্গুলে শার্ট খামচে ধরেছি। চোখ থেকে দীর্ঘ প্রশস্ত পানি গড়িয়ে পরছে আমার। উনি একহাত এনে আমার চুলে রেখে অন্যহাতে নিজের সাথে আরো শক্তযুগলে চেপে ধরলেন। মনে হচ্ছিলো আমার চেয়ে হাজারগুণ বেশি যন্ত্রণা উনার ভেতরটা কুড়ে কুড়ে খাচ্ছিলো। গাড়ির ভেতর হিমশীতল অবস্থা, প্রচুর নিরবতা, শব্দহীন মূর্ছনা চলছে। অনেকক্ষন পর উনি স্নিগ্ধ নম্র কন্ঠে বলে উঠলেন,

– খুব কষ্ট দিয়েছি ?

না, প্রচণ্ডরূপে আনন্দ দিয়েছেন! এমন আনন্দময় ঘনঘটা দিয়েছেন যে আমি এখন কল্পনাময় অদ্ভুত রাজ্যে ডুবে সারাক্ষন বিভোর থাকি। খাওয়া, নাওয়া, ঘুম, পড়া, সব লাট বাজারে উঠিয়ে আমি সকলের কাছ থেকে পাগলের আখ্যা পেয়েছি। কি দারুন না? এগুলো কষ্ট নাকি?

উনি অন্যের নিরবতা সহ্য করতে পারেন না অথচ নিজে নিরবতার মূর্তপ্রতীক হয়ে থাকেন। এ কেমন জ্বালা? পূর্ব নিজের কাছ থেকে আমাকে ছাড়ানোর জন্য আমার বাহু ধরে টান দিতেই আমি আরো কঠিনভাবে ধরলাম! কিসের ছাড়াছাড়ি? আমি ছাড়বো না! একদম ছাড়বোনা! উনি কয়েকবার চেষ্টা করে হাল ছেড়ে আমার উদ্দেশ্যে আবার বলে উঠলেন,

– তুমি আমাকে মার্ডার করতে এভাবে ধরে আছো পূর্ণ! আমাকে ছাড়ো প্লিজ।

আমি চরমভাবে উনাকে চেপে ধরলে উনি অস্ফুটিত কন্ঠে খুবই নিচুস্বরে ‘উহ্’ করে উঠলেন। শব্দটা এতোই নিচু ছিলো যে কোনো পিপড়ার কানেও পৌছাবে কিনা সন্দেহ আছে! আমি তড়িৎগতিতে উনাকে ছেড়ে দিয়ে দেখি উনি কুচকানো চোখ খুলে আমার দিকে তাকালেন। অনেকটা ব্যঙ্গতার সুরে বললেন,

– তুমি কি শাড়ি পরে আমাকে মেরে ফেলতে চাইছো পূর্ণ? এভাবে মার্ডার করার প্ল্যান?

– আপনাকে এমন কেন দেখাচ্ছে? উহ্ করলেন যে?
– তুমি তাহলে বুঝেছো?

উনি আমার দিকে গম্ভীর দৃষ্টিতে তাকিয়ে শার্টের বোতাম খুলতে ব্যস্ত হলেন। কি করবেন উনি? শার্ট খুলছেন কেন? শাড়ির আচঁলে হাত শক্ত হয়ে এলো আমার। দুটো বোতাম খুলে শার্টটা ডানপাশে টেনে বেশ অল্পতায় বুক উন্মুক্ত করলে দেখি বুকের ওই জায়গায় রক্ত চিকচিক করছে। আমি অস্থির হয়ে উনার ক্ষতপূর্ণ জায়গায় দ্রুত শাড়ির আচঁল চেপে ধরলাম। উনি ঈষৎ ব্যথায় চোখ বন্ধ করে বলে উঠলেন,

– শাড়িতে কি লাগিয়েছো?
– সেইফটিপিন ছাড়া কিছুই না।
– তোমার সেইফটিপিনটা পুরো ঢুকে গেছে। চেক করো।

আমি বামহাতে উনার বুকে আচঁল চেপে শাড়ির এপাশ ওপাশ দেখতেই একটা জায়গায় সিলভার রঙের সেইটিপিন পুরো লাল হয়ে আমার শাড়ির ওই জায়গায় রক্তের ছোপসহ লেগে আছে। অর্ধঝুলে থাকা রক্ত মাখা সেইফটিপিনটা টান দিয়ে শাড়ি থেকে বিচ্ছিন্ন করে ছুড়ে ফেললাম নিচে। উনি চোখ খুলে বলে উঠলেন,

– শাড়িতে সেইফটিপিনের কোম্পানি দেখা যাচ্ছে। আমার হাতটাও ডেড! কি করলে বলো তো?

আমি ভ্যাবাচেকা হয়ে আছি উনার অবস্থা দেখে। আমি যে শাড়িটা সেইফটিপিনের উপর ডিপেন্ড করে পড়েছি সেটা উনাকে কিভাবে বুঝাই? কন্ঠ খাদে নামিয়ে বলে উঠি,

– শাড়ি পরতে পারি না। সেইফটিপিনের সাহায্যে পরতে হয়েছে। আপনার কি খুব ব্যাথা করছে?
উনি চোখ বন্ধ করে জানালায় মাথা হেলান দিয়ে বললেন,
– না।

ক্ষত জায়গাটা চেক করতে আঁচল সরিয়ে দেখি রক্ত পরা বন্ধ হয়েছে। কিন্তু জায়গাটা ফুলে কঠিন লাল হয়ে আছে। সামান্য সূচ ফুটলেই কি যন্ত্রণা!! বুকের নরম জায়গায় একটা সেইফটিপিন ঢুকলে কেমন করুণ দশা হবে? উফ…কি করলাম?উনি তো ধাক্কা দিয়ে আমাকে সরিয়ে দিতে পারতো! কেন দিলো না? পূর্ব চোখ মেলে জোরে নিশ্বাস ছেড়ে সিটে সোজা হয়ে বসে শার্টের বোতাম লাগিয়ে ফেললেন। ফের দুইপাশে হাত প্রসার করে বললেন,

– হু আবার আসো। তখন ব্যাথার জন্য পিসফুলি ধরতে পারিনি।

আমি উনার দিকে ড্যাবড্যাব করে তাকিয়ে থাকলে উনি নিজেই আবার জড়িয়ে ধরেন আমাকে। আমার মাথাটা চেপে ধরলেন উনার উষ্ণময় প্রশান্ত বুকে। একটু পর ঠোঁটেজোড়া নামিয়ে আলতো করে স্পর্শ করলেন কানে। পূর্বের স্পর্শ ছিল স্নিগ্ধতায় স্ফুটিত নবজাত গোলাপের উপর আঙ্গুল ছুঁয়ে আবেগান্বিত হওয়ার মতো উচ্ছাস! স্বচ্ছ নদীর বুক থেকে ভাসমান শাপলা তুলে দুমুঠো হাতের যুগলে নিয়ে বুকভরে নিশ্বাস নেওয়ার মতো উল্লাস!! পূর্ব কি ছিলো? কি ছিলো উনার প্রতিটা কর্মে, প্রতিটা স্পর্শে, প্রতিটা মূহুর্তে? বহু অব্যক্ত কথার ভাঁজেই উনি আমাকে সুখকর অনুভূতিতে ভাসিয়ে নিয়ে যাচ্ছিলেন। ”প্রিয় মানুষকে সামনে পেলে সব মনগড়া অভিমান যেনো ভেঙ্গে যায়।”

হঠাৎ পূর্বের ঘড়ি থেকে টিট টিট টিট করে শব্দ বেজে উঠলো! উনি আমার পিঠের উপর থেকে হাতটা উঠিয়ে সময় একবার পরোখ করে আমাকে ছেড়ে দেওয়ার জন্য হাত নরম করে বলে উঠলেন,

– সময় হয়ে গিয়েছে পূর্ণ। আই হেভ টু গো।

ডুকরে কেদেঁ উঠে পূর্ণতা। পূর্বকে ছেড়ে শার্টের কলার দুহাতে আকড়ে কান্না ভেজা সিক্ত কন্ঠে টেনেটেনে বলে উঠে,

– না গেলে হয়না? আরেকটু থাকুন।

পূর্ব ওর অশ্রুমাখা চোখের দিকে তাকিয়ে কিছু বলতে যেয়েও থেমে যায়। পূর্ণতাকে ছেড়ে থাকতে পূর্বের যে অসহ্য কষ্ট হয়!উফ খানখান হয়ে যায় বুকটা! কি করে বুঝবে পাগলীটা? আমি তো নিজেই ওকে ছেড়ে থাকতে পারছিনা। আমাকে যেতে হবে পূর্ণ!

পূর্ব ওর অশ্রুপূর্ণ চোখের উপর স্পর্শ করতে এগিয়ে আসলে চোখ বন্ধ করে ফেলে পূর্ণতা। পূর্বের ঠোঁটের স্পর্শ পাওয়ার জন্য বুকটা উছলে উঠছে! ইশশ..পূর্বের স্পর্শ?ক্ষীপ্র গতিতে ধুকপুক করছে! উল্কাপিণ্ডের মতো ছুটছে! পূর্ণতা আরো শক্ত করে পূর্বের কলার চেপে ধরে। ঠিক এখনই একটা অদ্ভুত আনন্দের দোলা লাগবে পূর্ণতার তৃষ্ণার্ত মনে! মুখ এগিয়ে ঠোঁট ছোঁয়ানোর অন্তিম মূহুর্তে নিজেকে কন্ট্রোল করে পূর্ণতাকে দূরে ঠেলে ধাক্কা দেয় পূর্ব। পূর্ণতা দিকভ্রষ্ট পথিকের মতো একধ্যানে তাকিয়ে আছে পূর্বের দিকে। চোখ থেকে পড়ছে অশ্রু, চোয়াল নড়ছে মৃদ্যু মৃদ্যু। যেকোনো সময় গলদেশ ভেদ করে উঠবে আত্মগোপনের কান্না! পূর্ব পূর্ণতার দিকে পিঠ দিয়ে জানালায় একহাত রেখে চোখ বন্ধ করে মাথা নুয়ে ঘন ঘন নিশ্বাস ছাড়ছে। পূর্ণতার খুব কষ্ট হচ্ছে! ড্যাম! এখানে আসলাম কেন? নিজের সাথে প্রলাপ করতেই পেছন থেকে ভেসে আসে কারোর ফুপিয়ে কান্নার আওয়াজ! পূর্ব ঝট করে চোখ খুলে জানালা থেকে হাত সরিয়ে পিছনে ঘুরে দেখে পূর্ণতা ঠোঁট কুচঁকে কাদঁছে! এই মর্মাহত দৃশ্যের জন্য কোনো ছেলেরই মানসিক প্রস্তুতি থাকে না! চূর্ণবিচূর্ণ মনের মধ্যে বজ্রপাতের উৎকন্ঠা তৈরি হয়ে যায়! মূহুর্তের মধ্যে এলোমেলো হয়ে যায় পুরো মাথা! পূর্বের সবকিছু গুলিয়ে গেলো পূর্ণতার কান্না দেখে! কতটা নিঃস্বার্থ হলে একটা মেয়ে দুদিনের পরিচিত ছেলের সামনে কাদঁতে পারে? পূর্ব ব্যতিব্যস্ত হয়ে পূর্ণতাকে বুকে চেপে ধরলো। দুহাত গালে চেপে বুক থেকে উঠিয়ে প্রচণ্ড উদগ্রীব কন্ঠে বলে উঠলো,

– কাদঁছো কেন? উফফ! এভাবে কাদঁলে…

পূর্ব দাতেঁ দাঁত চেপে ঠোঁট শক্ত করে নিজেকে দমানোর প্রয়াস করে। পূর্ণতার চোখ মুছিয়ে সামনের সিট থেকে বোতল নিতেই ঘড়িতে আবার টিট টিট করে এলার্ম সাউন্ড বেজে উঠে। পূর্ব আরো একবার সময়টা চেক করে অন্যমনায় বলে উঠে, ‘শিট! দেরি হচ্ছে!’। পূর্ণতাকে জোর করে পানি খাইয়ে কিছুটা স্বাভাবিক করলে তাড়াহুড়ো কন্ঠে বলে উঠে,

– আমার যেতে হবে পূর্ণ! কেদোঁ না!
পূর্ণতা হেচকির সুরে কেঁপে উঠে বলে,

– আপনার…আপনার সাথে কি আর..আর দেখা হবে না?
– হবে।
– কক..কবে?
– অনিশ্চিত মিটিং সবচেয়ে বড় সার্প্রাইজিং!

পূর্বের কথার সারমর্ম এটাই দাড়ায়, আবার কবে দেখা হবে তার কোনো নির্দিষ্ট ডেট নেই। পূর্ণতা নিজের কোল থেকে হাতটা এগিয়ে পূর্বের দিকে অশ্রান্ত কন্ঠে অসহায় চাহনিতে বলে উঠে ,

– ওয়াদা করুন দেখা করবেন?

টুপ করে শব্দহীন কান্নার দুফোটা অশ্রুধারা চিবুক ভিজিয়ে পড়লো পূর্ণতার। পূর্ব শান্ত হয়ে পূর্ণতার দিকে তাকিয়ে থাকলে কিছুক্ষণ পর পূর্ণতার হাতটা নিজের হাতের ভাঁজে মিলিয়ে লালচে ঠোঁটের পরশ বসিয়ে পূর্ণতার দিকে গম্ভীর মুখে বলে উঠে,

– আবার দেখা করবো।

বলেই হাত ছেড়ে দিয়ে পকেট থেকে রিমোট বের করে গাড়ির লক খুলে দেয় পূর্ব। পূর্ণতা গাড়ির হ্যান্ডেলে হাত দিয়ে পূর্বের দিকে তাকিয়ে দরজা খুলে পা বাইরে দেয়। শেষ মূহুর্ত পযর্ন্ত পূর্বের দিকে অপলক চাহনিতে চোখের পানি ফেলে বেরিয়ে যায় গাড়ি থেকে। পূর্ণতা বের হতেই রাস্তার ওপাশ থেকে ড্রাইভার দৌড়ে এসে গাড়িতে ঢুকে। চোখের সামনে থেকে চলে যায় কালো নতুনত্বের সুন্দর আভিজাত্য গাড়ি। চুপচাপ নিবার্ক চাহনিতে বাকরুদ্ধ হয়ে কাদঁতে থাকে সবচেয়ে অসহায় মানুষটি। উপর দাত দিয়ে নিচের ঠোঁট কামড়ে হাতের উল্টোপিঠে চোখ মুছে পা ঘুরায় পূর্ণতা। আঙ্গুলের প্রান্ত থেকে চোখের পানিটা স্বচ্ছন্দে মাটিতে গোল হয়ে পরে। পূর্ণতা চোখ নিচু করে নিরুদ্যমে হাটঁতে থাকে। কেমন যন্ত্রণা? আবার কি হবে দেখা?

দেড়ঘন্টা যাবৎ গোসল সেরে মাথায় টাওয়াল পেচিয়ে বেরিয়ে আসে পূর্ণতা। বারান্দায় এসে ভেজা কাপড়গুলো তারে নেড়ে দিতেই দ্রুততার সহিত মা বারান্দায় এসে বলে,

– পূর্ণতা, তুই কিছু লুকাচ্ছিস?

তারে নেড়ে দেওয়া কামিজটায় ক্লিপ লাগিয়ে বলে উঠলাম,

– না তো। তোমার কাছ থেকে কিছু লুকানোর ছিলো?
– ওই ছেলের মাথায় সেলাই লেগেছে। বুঝতেই পারছিস কেমন হামলা করেছে।
– খুবই বড় বাঁচা বেঁচে গেছে মা। এখন যেই পরিস্থিতি! মানুষই জিন্দা থাকেনা।
– তুই আমার সাথে ইয়ার্কি করছিস?
– আমি তো কিছু বলি নি মা।
– তোর পক্ষ থেকে কোনো ষড়যন্ত্র ছিলো কিনা সেটা আমায় খুলে বল!
– আয়মান, শ্রেয়া, রাজিব কক্ষনো এমন জঘণ্য কাজ করবেনা মা। তুমি ওদের খুব ছোট থেকেই চিনো।
– আমি ওদের কথা বলছিনা!
– মা, তাহলে আমি কিছুই জানিনা। আমি সত্যি কিছু জানিনা।

মা আমার দিকে কিছুক্ষণ অগ্নিচ্ছটা দৃষ্টির মতো তাকিয়ে থেকে চলে গেল। আমি মাথা থেকে টাওয়াল খুলতে খুলতে রুমে ঢুকে বিছানায় বসে মোবাইল হাতে নিয়ে আয়মান ও শ্রেয়াকে কনফারেন্স অডিও কল দিলাম। চোখ ফুলে আছে। ভিডিও কল দিলে নিশ্চিত পাবো গালাগাল উপহার! ওরা এক্টিভ ছিলো বিধায় চট করেই রিসিভ!

– সারাদিন পর এখন স্মরন করলি হারামি?, আয়মানের চাপা অভিমান। বদমাইশটা ইমোশনাল ব্ল্যাকমেইল করতে চ্যাম্পিয়ন!

– বাসার কি অবস্থা? আন্টির কি খবর পূর্ণতা?, শ্রেয়ার উদ্বিগ্ন কন্ঠের কেয়ারনেস গুণটা মাঝে মাঝে আমাকে চরমাবস্থায় সাপোর্ট করে।

সবার শেষে আমি বলে উঠলাম,
– রাজিব ইনেক্টিভ কেন? ও কোথায়?

আয়মান আমার জবাবে সবসময়ের মতো কথা গুছিয়ে বলে উঠলো,

– তুই বলে কালকে রাজিবকে ইনসাল্ট করছিস। ওইটা ওর গায়ে লাগছে। এখন ওই শোকে শোকে কই আছে কে জানে? বাদ দে। বাসার খবর বল!

– দোস্ত? তোদের একটা সিক্রেট বলি? প্লিজ তোরা আমার উপর রাগারাগী বা চিল্লাচিল্লি করিস না।

আয়মান একধাপ উত্তেজিত কন্ঠে বলে উঠলো,

– শালার মাইয়া মানুষরে আমার এই কারনেই দেখতে মন চায় না! কথায় কথায় শা**র ফর্মালিটি মারায়!
আয়মানের মুখ থেকে অশ্রাব্য গালি শুনে আমি বকতে যাবো তার আগেই শ্রেয়ার জবাব,

– তোর মতো মুখ খারাপের কপালে জীবনেও বউ জুটবেনা! আমার অভিশাপ!

– তোর মতো শাকচুন্নির দোয়ায় কোনোদিন গরু মরে না! তোর অভিশাপ তোর উপরেই লাগুক! তুই জামাইর হাতে চটকানা খেতে খেতে মরবি!

– তুই খুব খারাপ আয়মান! আমায় যদি ভুলেও এ্যাসাইমেন্টের জন্য রিকুয়েস্ট করিস! তোকে জুতা দিবো!

– তোর জুতা আমি বিক্রয় ডট কমে বিক্রি করে তোর বাসার নিচে কুত্তা ভাড়া করমু! দেখিস তোরে কেমনে নাচায়!

– উফফ! তোকে..
– কুত্তাগুলা দুইপায়ে দাড়ায়া তোরে ফ্লাইয়িং কিস দিবো বুঝলি?
– ছিঃ!

আমি কল দিলাম নিজের জন্যে, এদিকে কুকুর বিড়ালের মতো দুটোর ঝগড়া শুরু হয়ে গেছে! আল্লাহ্ তুমি রহম করো! আমি প্রচুর বিরক্ত হয়ে বলে উঠলাম,

– তোরা দুইটা যদি চুপ না করিস আমি সত্যি সত্যি বাঘের মতো সবগুলাকে চাবাবো!

ব্যস! ফোনের ওপাশ চুপচাপ! সুনশান নিরবতা! আমি বিছানার উপর চুল ছড়িয়ে শুয়ে পরতেই বলে উঠলাম আজকের ঘটনা। পুরো হিস্টোরি এ টু জেট বর্ননা দিয়ে শান্ত করলাম নিজেকে। আমি ওদের পূর্বের ব্যাপারে তখন না বলে এখন কেনো বললাম, তাই ভাবছেন ঠিক না? এইযে বলি শুনুন, এখন যদি না বলতাম ওরা আমার পেট থেকে কথা খুচিয়ে বের করতো। আমার এইসব সিক্রেট কথা কোনোদিন সিক্রেট হয়ে থাকতে পারেনা ওদের কাছে। শ্রেয়া কিছুটা রাগী গলায় বলে উঠলো,

– তুই পূর্বকে যেতে দিলি কেন বোকা!
– তো কি করবো? উনি যেতে চাইছিলেন আমি আটকে রাখব?
মাঝখান থেকে আয়মান বলে উঠলো কিছুটা শান্ত কন্ঠে,

– শ্রেয়া তুই আসলেই বলদের বাচ্চা! পূর্ণতার বিবরণ অনুযায়ী, পূর্ব যেভাবে আসছে! প্রচুর রিস্ক নিয়ে আসছে বুঝছিস? থাক! তুই তো সোজা জিনিস বুঝার মতো ক্ষমতা নিয়ে জন্মাসনি! এই গুনাহ্ মাফ!

শ্রেয়া আবার ক্ষুদ্ধ হলো! আয়মানের এই খোটা দেওয়ার স্বভাবের জন্য ওকে কি করতে ইচ্ছা করে! শ্রেয়া বলে উঠলো,

– তুই একটা ইবলিশ! কথা বলবিনা বদমাঈশ! একদম বলবিনা!
– তুই তো শয়তানের তল দিয়ে আসোস-যাস! আমাকে কোন্ মুখে ইবলিশ বলোস!

– তোরা কি শুরু করলি? এইজন্য তোদের সাথে কথা বলতে আমার ইচ্ছা টিচ্ছা করেনা!

আয়মান আমার কথার প্রক্ষিতে বলে উঠলো,
– শোন পূর্ণতা তুই ওই বলদের কথায় কান দিয়ে পূর্বের উপর রাগ করে থাকিস না। পূর্ব সিরিয়াসলি একটা ডেয়ার পার্সন! আনিশার সাথে রিলেশন থাকাকালীন কিভাবে ছিলো ওইটা তো জানিনা, বাট তোর সাথে যেভাবে মিট করে আমার ভাই কনসেপ্ট বুঝা শেষ! পোলা তোর উপ্রে হাবুডুবু খাইতেছে!

শ্রেয়া আয়মানের খোচা খেয়ে বলে উঠলো,
– চোরের মতো কারা লুকোচুরি করে শুনি? কোন জায়গায় দেখছিস লুকোচুরি করা ভালো লক্ষন?
– দেখ! কাউয়ার মতো কা কা করিস না। আমার মাথা বহুত কষ্টে ঠান্ডা রাখছি। তোর কথা শুনে যদি ফোর্টি নাইন হয়! উপরে আল্লাহ্ আসে ভাই…তোর একদিন কি আমার একদিন!

– উফফফ!! থাম!থাম!থাম!

– দেখ বইন, এই কালসাপরে চুপ থাকতে বলিস। মাথায় ঘিলুর বদলে ঘিলু তো নাই। যা আছে তাও সব নষ্ট!

– তুই বলতে চাচ্ছিস পূর্ব একদম দুধে ধোয়া তুলসীপাতা?, শ্রেয়ার রাগী কন্ঠ!

– তুলসীপাতা না তেজপাতা ওইটা তোর বুঝার ক্ষমতা নাই! পূর্বের নাস্তিক হওয়ার ঘটনা শুইনা যেমনে লাফ দিছিলি এটলিস্ট তোর মাথায় বান্দরের লেজের মতো চুল ছাড়া কিছুই নাই। পূর্ণতা? পূর্ব তো তোরে প্রমিস করছেই আবার দেখা করবো! টেনশন নেস কেন?

আয়মানের এই খোচা একটু গুরুতর ভাবে লাগলে শ্রেয়া কল থেকে অফলাইনে চলে যায়। আমি কিছু করার বা বলার আগেই স্ক্রিনে তাকিয়ে দেখি, ‘Shreya left the group call’. যা বাবা! এইবার বেটা আয়মান শান্তি পাক! আয়মান কলের বিপরীতে বলে উঠলো,

– ভালো হইছে শাকচুন্নিটায় গেছে।
– শান্তি পাইছিস?
– ধুর! বাদ দে তো। একটা কথা মন দিয়ে শোন, রাজিবের সাথে কথা বলিস না। শালার মাথা ঠিক নাই। পূর্বের ব্যাপারে এতোবড় মিথ্যা যে রটাইতে পারে, তার দ্বারা সবই সম্ভব। পূর্ব তোরে ভালোবাসে বইন। পোলাটার উপর আমার কেন জানি মায়া লাগতাছে। আমি নিজের চোখে দেখছি, রাজনীতিতে যারা জড়ায় তাদের কেমন করুন দশা হয়। আর পূর্ব তো কমরেড। কমরেড হওয়ার জন্য অনেক শ্রম, কষ্ট, মনোবল দেওয়া লাগে। পূর্ব যে কত কষ্ট করছে! আমি আন্দাজ করতে পারি দোস্ত। সব ছেলেরা ওই আসনে যাওয়ার যোগ্যতা পায় না বুঝলি? প্রচুর টেকনিক, বুদ্ধি, সাহস লাগে। ওর আজকের কৌশল শোনার পর আমি নিজে একটা ছেলে হইয়া টাস্কি খাইছি! জানি তুই কষ্ট পাইছোস। কিন্তু তুই একবার চিন্তা কইরা দেখ, ও একটা ছেলে হইয়া নিজেরে কেমন কন্ট্রোল কইরা চলতাছে! তুই কিন্তু আজকে একা গেছিলি। পারলে তোর সাথে অনেক কিছুই করতে পারতো। বল করছে?

দ্বিতীয় দফায় আমাকে জড়িয়ে ধরতেই উনি সেইফটিপিনের ব্যথায় চুপ করে ছিলেন। সাথেসাথে ধাক্কা বা সিনক্রিয়েট করেনি। যখন আমি নিজ থেকে চাচ্ছিলাম উনি আমায় স্পর্শ করুক, তখনো উনি কাছে ভিড়েনি। উত্তরটা কি আসতে পারে? আমি আয়মানকে বলে উঠলাম,

– না।

– ওরে ওর মতো থাকতে দে। তোর চেয়ে কয়েকগুণ বেশি পূর্ব ভালো বুঝে। তুই বিশ্বাস করবি কিনা জানিনা, তোর থেকে এই ঘটনা শোনার পর তোর পূর্বের সাথে দেখা করতে ইচ্ছা করতাছে। ওইদিনের গণধোলাই আমি ভুলে গেছি। আমার ব্যাপারে বলিস।

আয়মানের সাথে কিছুক্ষন কথা বলে মোবাইলটা পাশে রাখলাম। চোখের উপর নিজের ডানহাতটা উঠালাম। ডানহাতের উল্টোদিকে পূর্বের ঠোঁটের স্পর্শ এখনো যেনো সতেজ প্রানবন্তের মতো উজ্জীবিত হয়ে আছে। পূর্ব! পূর্ব! পূর্ব! আপনার পূর্ব দিগন্তে মাতালের মতো দিকভ্রান্ত হতে ইচ্ছে হয়! বারবার…বহুবার…হাজারবার! প্রতিটা ক্ষনে ক্ষনে অপরাজিতার ন্যায় দেখতে ইচ্ছে হয়! এক পলক! দুই পলক! শত পলক!

– ‘চলবে’

#FABIYAH_MOMO🍁🍁

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here