নীলাম্বরীর_প্রেমে পর্ব : ৯

নীলাম্বরীর_প্রেমে পর্ব : ৯
#Tuhina pakira

সকাল ১০ টা ।।

মা কে প্রণাম করে উঠে দাঁড়ালো স্পর্শ। স্পর্শের মা চোখের জল মুছে বললো,
-” সাবধানে যাবি। পৌঁছে ফোন করবি। ঠিক মতো খাওয়া দাওয়া করবি। হ্যাঁ মনে করে প্রতিদিন আমাকে ভিডিও কল করতে ভুলবিনা। মনে থাকবে? ”

মায়ের প্রতিটা প্রশ্নে স্পর্শ হেসে মাকে জড়িয়ে ধরে বললো,

– ” সব মনে থাকবে। কিন্তু তুমি কাঁদছো কেনো? কাঁদার কী আছে। এইতো টুক করে যাবো, থাকবো, তারপর টুক করে চলে আসবো।”

স্পর্শের কাঁধে হালকা বাড়ি মেরে ওর মা বলে উঠলো,

-” দেখবো তুমি কতো টুক করে চলে আসো। দেখো ওখানে গিয়ে যেনো আবার ওখানেই থাকার মতলব করো না। যদি ওইসব শুনি তবে তোর কান আমি লাল করে দেবো। ”

-” তার জন্যও তো আমাকে এখানেই আসতে হবে। তাছাড়া এখানে না এসে যে আমি থাকতেই পারবো না। হয়তো সময় অতিবাহিত হবে কিছুটা কিন্তু ফিরে যে আসতেই হবে। সারাদিনের পর পাখিরা যেমন তার নীড়ে ফেরে। তেমনি, দিন শেষে এটাই যে আমার নীড়। আমার শান্তির জায়গা। ”

-” সাবধানে যাবি স্পর্শ। আর কেবল মাকে ফোন করলে হবে না তোমার আরেক মা কেউ ফোন করতে হবে।”

স্পর্শ এগিয়ে গিয়ে আয়ুর মায়ের পা ছুঁয়ে বললো ,

-” অবশ্যই , অ্যান্টি। তোমরাও ভালো থাকবে। আর তোমার বাড়ির ওই বুড়িটাকে দেখে রেখো। কারোর কথাই যে সে শোনে না। ”

আয়ুর মা ছলছল চোখে তাকিয়ে ঘাড় নেড়ে সম্মতি জানালো। ছেলেটাকে তিনি অত্যন্ত স্নেহ করেন। স্পর্শ হবার পর প্রায়ই সে স্পর্শকে তার কাছে নিয়ে এসে রাখতো। সংসার সামলে বন্ধুর বাড়ি গিয়ে স্পর্শ কে কোলে নিয়ে থাকতো।

-” আর এই যে দ্রুতি মন দিয়ে পড়াশোনা করিস। আর এই যে দিহান পড়াশোনায় মন দে। বায়না কম কর।”

দ্রুতি , দিহান হেসে হ্যাঁ বললো। ওদের ও খারাপ লাগছে খুব। আর আয়ান এক কোণে দাঁড়িয়ে রয়েছে। স্পর্শ ওর কাছে এগিয়ে যেতেই আয়ান ওর দিকে তাকিয়ে বললো,

-” তুমি যাওনি স্পর্শ দা। দিদি খুব কষ্ট পাবে। আমারও কিন্তু কান্না পাচ্ছে। যাওনি প্লিজ। ”

-” আরে ছোটু তুই না স্ট্রং বয়। স্ট্রং মানুষেরা কাঁদে না। আমি তোকে রোজ ফোন করবো ঠিক আছে।”

আয়ান ওর হাফ পেন্টের পকেট থেকে একটা লেসার লাইট বের করে স্পর্শকে দিল। স্পর্শের হেসে আয়ানের চুল গুলো এলোমেলো করে দিয়ে বললো,

-” এটা আর এখন লাগবে না। এর কাজ আপাতত বন্ধ থাকবে কিছু সময়। তোর কাছে রেখে দে। ফিরে এসে নেবো। দিবি তো?”

আয়ান মাথা হেলিয়ে হ্যাঁ বোঝালো। স্পর্শ হেসে ওর মায়ের কাছে আবারো এগিয়ে গেলো। অপর দিকে আয়ান, দ্রুতি, দিহান স্কুলের জন্যে বেরিয়ে পড়লো। ওরা তিন জনে একই স্কুলে পড়ে।


এক ঘন্টা পর বাড়ি থেকে বেরোলো স্পর্শ। সাদ , অরূপ ও মিথিলার সঙ্গে স্টেশনের বাইরে টিকিট কাউন্টারের সামনে দাঁড়িয়ে রয়েছে স্পর্শ।

-” এতটা পথ একা যাবি, আমরা দিয়ে আসি না।”

-” টেনশন করিস না অরূপ। আমি চলে যাবো।”

সাদ স্পর্শের কাঁধে হাত রেখে বলল,
-” আঙ্কেল তোর সাথে কোথায় মিট করবে?”

-” বাবা এয়ারপোর্টে পৌঁছে যাবে। আর তাছাড়া জয় আঙ্কেল আর শুভ কাকাই ঐখানে আমার সাথে দেখা করে নেবে।”

মিথিলা তো স্পর্শের দিকেই তাকিয়ে রয়েছে। স্পর্শ হেসে মিথিলাকে বললো
-” ওই শাকচুন্নি তোকে বলেছিনা প্রেম প্রেম নজরে আমার দিকে তাকাবিনা। ”

মিথিলা স্পর্শের হাতে মেরে বললো,
– ” তুই এমন কেনো স্পর্শ। আমাকে তুই এতো টুকু বুঝিস না।”

সাদ মিথিলার মাথায় গাট্টা মেরে বললো,
-” ও তোকে বুঝে কী করবে? বুজবুজি কাটবে? চল যা একটা ট্রেনের টিকিট কাট। ও কী হেঁটে হেঁটে ওর গন্তব্যে যাবে নাকি। ”

মিথিলা মাথায় হাত বুলিয়ে টিকিট কাউন্টারে চলে গেলো। সাদ বেশ জোরেই মেরেছে। অবশ্য ও লাগার জন্যেই মেরেছিল।

-” আয়ু কান্নাকাটি করে নি?”

অরূপের প্রশ্নের প্রত্যুত্তরে স্পর্শ কিছু বললো না। প্ল্যাটফর্মের দিকে এগিয়ে গেলো।


-” দেখলি তোর গিফট কেনার চক্করে কতো দেরী হয়ে গেছে। খিদেয় পেটে ইঁদুরে ডন দিচ্ছে। ”

-” আরে রূপা বুঝিস না কেনো পরশু স্পর্শ দার জন্মদিন। তাই তো গিফট টা কিনলাম। এবার তো সামনের সপ্তাহে এই দিকে আসবো। মাঝে তো আর পড়া নেই। ”

আয়ু আর রূপা বাড়ি আসছিল। সামনে আসতেই দেখলো ট্রেন পাশ হচ্ছে। তাই দুজনে নেমে হেঁটে গেটের পাশের ছোটো জায়গা দিয়ে বেরিয়ে আসতেই রূপা 2 নম্বর প্ল্যাটফর্মের দিকে আঙুল দেখিয়ে বললো,
-” আয়ু দেখ ওটা তোর স্পর্শ দা না? ”

রূপার দেখানো হাতের দিকে তাকিয়ে আয়ু বললো ,

-” হ্যাঁ তাইতো। কিন্তু কোথায় যাচ্ছে? আচ্ছা তুই বরং বাড়ি যা। গিয়ে দেখ তোর পেটের ইঁদুরের জিম শেষ হলো কিনা। হলে কিছু খেয়ে নিস। আমি আসছি একটু পর।”

আয়ু কে থামিয়ে রূপা বললো,
-” ওতোই যখন ভালবাসিস বলে দিলেই তো পারিস।”

-” তোকে বলেছে? ”

-” তাহলে আমাকে বল , ঐ টা কে তোর, দাদা ? সব সময় একে অপরের পিছে লেগে থাকিস টম অ্যান্ড জেরির মতো। আবার পর দিকে একে অপরকে চোখে হারাস। তোদের কান্ড কারখানা আমি কিছুই বুঝি না বাপু। ”

– ” দাদা হবে তোর। আর তাছাড়া কানের কাছে ফ্যাচফ্যাচ না করে বাড়ি যা। আমি সাইকেল টা গ্যারেজ করি গিয়ে।”

আয়ু সাইকেলটা নিয়ে গ্যারেজে রাখতে গেলো। আয়ুর গা ছাড়া ভাব দেখে রূপা ফোরন কেটে বললো ,

-” যেই দেখলি ওমনি ছুট তাইনা। আবার বলে ভালোবাসে না। ধুর চলে গেলো। আমি বাড়ি যাই এবার মনে হয় মাথা ঘুরে পড়ে যাবো। ”

সেইদিনের কথা আয়ু কাউকেই বলেনি। যেহেতু কথাটা স্পর্শকে নিয়ে ছিল কেবল তা স্পর্শই জানে।

একদম শেষের দিকে গাছ তলার সিটে গিয়ে বসলো স্পর্শ। উলটো দিকে বসায় ওর সামনে কেউ না এলে ওকে দেখা সম্ভব না। স্পর্শ পকেট থেকে ফোনটা বের করে একটু নিউজফিড ঘাটছিল। হঠাৎই পিছনে আয়ুর গলা পেয়ে ও যেনো চমকে উঠলো।

-” তুমি কোথায় যাচ্ছো স্পর্শ দা?”

-” কোথায়, কোথাও না । ওই একটু ঘুরতে এসেছিলাম। তুই কী করছিস এখানে? এখনও বাড়ি যাসনি কেনো?”

আয়ু স্পর্শের পাশে থাকা ল্যাগেজের দিকে তাকিয়ে বললো ,
-” ওটা নিয়ে কোথায় যাচ্ছো? ”

স্পর্শ চমকে পাশে থাকা ব্যাগটার দিকে তাকিয়ে বললো ,
-” আমি আসলে ওই …”

-” স্পর্শ দা আমতা আমতা না করে প্লিজ বলো না কোথায় যাচ্ছো?”

-” আসলে আমি ব্যাঙ্গালোর চলে যাচ্ছি। ওখানেই নিজের বাকি স্টাডি কমপ্লিট করবো।”

আয়ু অবাক নয়নে স্পর্শের দিকে তাকিয়ে বললো ,

-” তুমি কাল বিকেলের কথা ভেবে ….”

আয়ুর চোখ ছলছল করে উঠলো। স্পর্শ ওর কাছে এগিয়ে গিয়ে বলল,
-” ওই একদম কাঁদবিনা বলে দিচ্ছি। আর কালকের জন্যে না বাবা অনেকদিন আগেই টিকিট করিয়েছে।”

-” তুমি যাওনি স্পর্শ দা। আমি থাকতে পারবো না। ”

আয়ুর কী আবেশিত উক্তি যা ফেলার ক্ষমতা স্পর্শের কোনো কালেই ছিল না। কিন্তু আজ ও অপারগ, বাবার কথা যে ও ফেলতে পারবে না। ওকে তো যেতেই হবে।

স্পর্শ কাটকাট গলায় বললো ,
-” দেখেছিস তুই কতো ইমোশনাল হয়ে যাচ্ছিস। এই জন্যেই তোকে কেউ বলিনি।”

-” আমাকে কেনো বলবে তুমি তো আমাকে পর ভাবো তাইনা।”

স্পর্শ আয়ুর মাথায় হাত দিয়ে চুলগুলো এলোমেলো করে দিয়ে বললো,
-” আরে আমাদের আয়ু বুড়ি দেখি রাগ করছে। রাগ করলে হবে না এখন। বাড়িতে তোর মিমি , পাপা একা তোকেই তো ওদের খেয়াল রাখতে হবে।”

-” প্লিজ যাওনি। ”

-” আয়ু এবার কিন্তু তুই বাচ্ছামো করছিস। যা বাড়ি যা। তুই পড়তে গিয়েছিলি না ; তো বাড়ি না গিয়ে এখানে কী করছিস?”

আয়ু ঘাড় নেড়ে বোঝালো যে ও বলবে না। স্পর্শ হেসে বলল,
-” বলবিনা , আচ্ছা বলতে হবে না। যা বাড়ি যা। ”

-” তোমাকে আমি যেতে দেবো না।”

-” আচ্ছা তোর এতো ক্ষমতা। পারবি আমাকে আটকাতে?”

আয়ু স্পর্শের জামা টেনে ধরে বললো, ” এবার কী করে যাবে?”

স্পর্শ দূরে তাকিয়ে দেখলো ট্রেন আসছে।কিন্তু আয়ু ওকে যেভাবে টানছে তাতে বিপদ ঘটে যেতে পারে। -” কোন অধিকারে আটকাবি আয়ু? আমি তোর কে? কী রে বল কে? ”

স্পর্শের হাতটা আয়ু ছেড়ে দিল। সত্যিই তো স্পর্শ ওর কে ? কেউ না। ছোটো থেকে একসঙ্গে বড়ো হওয়া, সারাদিন টম অ্যান্ড জেরির মতো একে অপরের পিছনে লেগে থাকা, একে অপরকে চোখে হারানো এই সবের পরেও স্পর্শ কিনা বললো , ‘আয়ু ওর কে হয়?’ আয়ু তৎক্ষণাৎ পিছন ফিরে গেলো। ওর খুব কষ্ট হচ্ছে কিন্তু ও কাঁদবে না কিছুতেই কাঁদবে না।

যথা সম্ভব নিজেকে শান্ত করে আবার স্পর্শের দিকে তাকিয়ে বললো,
-” আমার জন্যে না অন্তত নীলাম্বরীর জন্যে থেকে যাও।”

স্পর্শ বুঝতে পারছে এই কথাটায় আয়ুর মনের অভিমান ফুটে উঠেছে। কিন্তু অভিমানের পারদ না কমিয়ে স্পর্শ বলল,

-” ধুর বোকা , নীলাম্বরীকে তো নিয়েই যাচ্ছি আমার সঙ্গে এই যে এই খানে।”

স্পর্শ ওর বুকের পাম পাশটা দেখিয়ে কথাটা বললো। আয়ু অবাক হয়ে ওর দিকেই তাকিয়ে রয়েছে। স্পর্শ খানিকটা আয়ুর দিকে এগিয়ে গিয়ে ওর কানের কাছে মুখ নিয়ে এসে বললো,

-” ভালোবাসি, খুব খুব ভালোবাসি।”

আয়ুর কান দিয়ে যেনো কোনো হিম শীতল বাতাস বয়ে গেল। যা ওর দেহের প্রতিটা শিরায় উপশিরায় কয়েক মুহূর্তেই ছড়িয়ে পড়ল। ও মাথা ঘুরিয়ে স্পর্শের দিকে তাকাতেই স্পর্শ বলে উঠলো, ” আই লাভ ইউ নীলাম্বরী।”

আয়ুর মুখ মলিন হয়ে গেল। স্পর্শের দিক থেকে চোখ সরিয়ে নিলো। সেইসময় পিছন থেকে ট্রেন আসার শব্দ শোনা গেলো। বর্ধমান টু হাওড়া কর্ড লাইনের ট্রেন 2 নম্বর প্ল্যাটফর্মে এসে গেছে। যাত্রীরা একে একে ট্রেন থেকে নামছে। সাদ আর অরূপ ছুটতে ছুটতে এসে স্পর্শের হাতে ট্রেনের টিকিটা ধরিয়ে দিল। আয়ু আর কিছু বললো না। একটা মলিন হাসি দিয়ে এগিয়ে চললো তার গন্তব্যে। স্পর্শ ওর যাবার দিকে তাকিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলে ট্রেনে উঠে পড়লো। ট্রেন চলতে আরম্ভ করেছে এখনও ঠিক মতো রানিং নেইনি। আয়ুর কাছে যেতেই স্পর্শ বলে উঠলো ,

-” সাবধানে থাকবি। দুষ্টুমি করবিনা। টাটা। ”

কিন্তু আয়ু কিছু বললো না। যে যাবার সে যাবে তাকে আটকাবার সাধ্য ওর নেই। আয়ু স্পর্শের দিক থেকে চোখ সরিয়ে পিছন দিকে ফিরে কারোর সাথে ধাক্কা লাগলেও নিজেকে সামলে নিলো। আজ থেকে তাকে নিজেকে নিজেকে সামলাতে হবে। বাবা মাকে না বলতে পারা ভুল কাজগুলো কেউ আর মিষ্টি বকা দিয়ে শুধরে দেবে না ।

স্পর্শ যত দূর পারলো আয়ুর দিকে তাকিয়ে ছিল। মনে মনে একটা কথাই আউরালো ,

-” তোর মনে জমা অভিমান সে নাহয় ফিরে এসেই কমাবো। ততদিন দুই প্রান্তে দুজনেই না হয় জ্বললাম। এই কষ্ট না হয় দুইজনে ভোগ করলাম। এই কষ্ট যে মৃত্যু যন্ত্রণা সম। কিন্তু একদিন এই যন্ত্রণার উপসম ঠিক হবে। হতেই হবে। শুধু আফসোস , তোর মলিন হাসি আমি দেখতে পাবো না। তবে ফিরে এসে তোর মুখের মলিন হাসি ঠিকই দেখে নেবো। ওই হাসিতেই যে আমি পাগল। ”

(চলবে )
{ বিঃ : ত্রুটি ক্ষমা করবেন । ভালো কিংবা খারাপ কেমন হয়েছে জানাবেন । হ্যাপি রিডিং }

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here